ঢাকায় চরম অবহেলায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে বগুড়ার রাব্বানীর আদরের সন্তান, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের নির্মম মারধর ও দায় এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে শোকে পাথর হওয়া পরিবার।
রাজধানীর চানখাঁরপুলের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের ইনকিউবেটরে আকস্মিক আগুন লেগে জন্ম নেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টা বয়সি একটি নবজাতক গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে দগ্ধ নবজাতকটির বাবা মো. রাব্বানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শনিবার ভোর চারটার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে আমার সন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পরপরই নবজাতকের সামান্য শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত এনআইসিইউ সাপোর্টে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢামেকের এনআইসিইউতে কোনো সিট খালি না থাকায় সেখানকার এক চিকিৎসকের পরামর্শে এবং এক ওয়ার্ড বয়ের মাধ্যমে সকালে আমার বাচ্চাকে চানখাঁরপুলের ‘রয়েল কেয়ার হাসপাতালে’ নিয়ে যাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে অফিশিয়াল ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই তাড়াহুড়ো করে নবজাতকটিকে ইনকিউবেটরে নেওয়া হয়। আমি ও আমার ভাতিজা রেজাউল যখন বাইরে কাগজপত্র ঠিক করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ ভেতরে চিৎকার শুনতে পাই। দৌড়ে গিয়ে দেখতে পাই, শিশুটিকে যে ইনকিউবেটরের মধ্যে রাখা হয়েছিল সেটি অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং আমার বাচ্চার গায়ে আগুন লেগে গেছে। কী বীভৎস অবস্থা! অথচ এই ভয়ংকর পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালের দায়িত্বরত স্টাফরা আগেই পালিয়ে যায়, ভেতরে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
স্বজনদের প্রাণপণ প্রচেষ্টায় আগুন নেভানোর পর হাসপাতালের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শিশুটিকে দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু ঢামেকের চিকিৎসকরা শিশুটিকে পুনরায় ওই রয়েল কেয়ার হাসপাতালেই ফেরত পাঠান।
পরবর্তী সময়ে সেখানে গেলে নিজেদের চরম গাফিলতি ও দায় এড়াতে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্লিনিকের লোকজন মারধর করে বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা। বুকফাটে আর্তনাদ করে মো. রাব্বানী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সিট না পেয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ওদের চরম অবহেলায় আমার বাচ্চার কচি শরীরটা পুইড়া গেলো। আমি এই কসাইদের কঠোর বিচার চাই।’
অন্যদিকে, এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রয়েল কেয়ার হাসপাতালের ইনচার্জ মো. আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, এটি নিছক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা মাত্র এবং শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে তাদের ধারণা। তাদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, মারধরের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়, বরং সেখানে উপস্থিত থাকা অন্য রোগীদের স্বজনদের সঙ্গেই মূলত বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
একই হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট সানজিদা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই তারা নিজ উদ্যোগে শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে নিজেদের স্টাফদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়েছিলেন এবং পুরো ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এদিকে চিকিৎসাধীন নবজাতকটির শারীরিক অবস্থা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসক তাজকিয়া হক জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক; কারণ তার শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশই পুড়ে গেছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি বারবার স্বজনদের স্পষ্টভাবে জানানো হলেও তারা তা মানতে চাচ্ছেন না এবং চিকিৎসায় পুরোপুরি সহযোগিতা করছেন না।
অন্যদিকে ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ও পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুলিশ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত রয়েছে। বর্তমানে নবজাতকটি ঢামেকের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে এবং পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকায় চরম অবহেলায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে বগুড়ার রাব্বানীর আদরের সন্তান, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের নির্মম মারধর ও দায় এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে শোকে পাথর হওয়া পরিবার।
রাজধানীর চানখাঁরপুলের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের ইনকিউবেটরে আকস্মিক আগুন লেগে জন্ম নেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টা বয়সি একটি নবজাতক গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে দগ্ধ নবজাতকটির বাবা মো. রাব্বানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শনিবার ভোর চারটার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে আমার সন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পরপরই নবজাতকের সামান্য শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত এনআইসিইউ সাপোর্টে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢামেকের এনআইসিইউতে কোনো সিট খালি না থাকায় সেখানকার এক চিকিৎসকের পরামর্শে এবং এক ওয়ার্ড বয়ের মাধ্যমে সকালে আমার বাচ্চাকে চানখাঁরপুলের ‘রয়েল কেয়ার হাসপাতালে’ নিয়ে যাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে অফিশিয়াল ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই তাড়াহুড়ো করে নবজাতকটিকে ইনকিউবেটরে নেওয়া হয়। আমি ও আমার ভাতিজা রেজাউল যখন বাইরে কাগজপত্র ঠিক করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ ভেতরে চিৎকার শুনতে পাই। দৌড়ে গিয়ে দেখতে পাই, শিশুটিকে যে ইনকিউবেটরের মধ্যে রাখা হয়েছিল সেটি অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং আমার বাচ্চার গায়ে আগুন লেগে গেছে। কী বীভৎস অবস্থা! অথচ এই ভয়ংকর পরিস্থিতি দেখে হাসপাতালের দায়িত্বরত স্টাফরা আগেই পালিয়ে যায়, ভেতরে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
স্বজনদের প্রাণপণ প্রচেষ্টায় আগুন নেভানোর পর হাসপাতালের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শিশুটিকে দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু ঢামেকের চিকিৎসকরা শিশুটিকে পুনরায় ওই রয়েল কেয়ার হাসপাতালেই ফেরত পাঠান।
পরবর্তী সময়ে সেখানে গেলে নিজেদের চরম গাফিলতি ও দায় এড়াতে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্লিনিকের লোকজন মারধর করে বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা। বুকফাটে আর্তনাদ করে মো. রাব্বানী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সিট না পেয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ওদের চরম অবহেলায় আমার বাচ্চার কচি শরীরটা পুইড়া গেলো। আমি এই কসাইদের কঠোর বিচার চাই।’
অন্যদিকে, এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রয়েল কেয়ার হাসপাতালের ইনচার্জ মো. আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, এটি নিছক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা মাত্র এবং শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে তাদের ধারণা। তাদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, মারধরের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়, বরং সেখানে উপস্থিত থাকা অন্য রোগীদের স্বজনদের সঙ্গেই মূলত বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
একই হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট সানজিদা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই তারা নিজ উদ্যোগে শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে নিজেদের স্টাফদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়েছিলেন এবং পুরো ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এদিকে চিকিৎসাধীন নবজাতকটির শারীরিক অবস্থা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসক তাজকিয়া হক জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক; কারণ তার শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশই পুড়ে গেছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি বারবার স্বজনদের স্পষ্টভাবে জানানো হলেও তারা তা মানতে চাচ্ছেন না এবং চিকিৎসায় পুরোপুরি সহযোগিতা করছেন না।
অন্যদিকে ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ও পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুলিশ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত রয়েছে। বর্তমানে নবজাতকটি ঢামেকের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে এবং পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন