সংবাদ

জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ ইন্ডিজোট


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ ইন্ডিজোট
ছবি : সংগৃহীত

ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ এবং এসআইআর ঘিরে বিতর্ক–সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার পাশাপাশি এবার সরাসরি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী জোট INDIA। বিরোধীদের অভিযোগ, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা আটটায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দশ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সময় নির্ধারিত হয়েছে বলে বিরোধী জোট সূত্রে দাবি করা হয়। ওই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ বিরোধী শিবিরের নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিও এই রাজনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এসআইআর এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির দাবি জানানোই বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য।

বিতর্কের সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত এক অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর আপত্তি সত্ত্বেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, গত দশ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই দুই নির্বাচন কমিশনার মোট ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, এসআইআর-পরবর্তী নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তির বিষয়টিও সামনে আসে।

এই অভিযোগ সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে? কমিশনের প্রতিটি সদস্যের মতামত কি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে? আর ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এই প্রশ্নগুলিই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। ফলে কমিশনের বক্তব্য এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবির মধ্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিতর্ক। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের দাবি, শুধু বিবৃতি দিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়; নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত অভিযোগের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর INDIA জোটের বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন সদন অভিযানে অংশ নেন বিরোধী সাংসদেরা। দিল্লিতে একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিরোধীরা এই ইস্যুকে জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এবার রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি পেশের উদ্যোগের মাধ্যমে সেই আন্দোলনকে সাংবিধানিক স্তরে পৌঁছে দিতে চাইছে তারা।

তবে এই লড়াই কেবল একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকা বা না-থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে আস্থার প্রশ্ন। বিরোধীদের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হবে, তা নির্ভর করবে তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার উপর। কিন্তু অভিযোগগুলিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

এখন নজর রাষ্ট্রপতির কাছে বিরোধীদের বক্তব্য এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। রাষ্ট্রপতি ভবনে এই সাক্ষাতের মাধ্যমে কি নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হবে? নাকি রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই আটকে থাকবে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন? উত্তর নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের উপর। 

/

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ ইন্ডিজোট

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ এবং এসআইআর ঘিরে বিতর্ক–সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার পাশাপাশি এবার সরাসরি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী জোট INDIA। বিরোধীদের অভিযোগ, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা আটটায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দশ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সময় নির্ধারিত হয়েছে বলে বিরোধী জোট সূত্রে দাবি করা হয়। ওই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ বিরোধী শিবিরের নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিও এই রাজনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এসআইআর এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির দাবি জানানোই বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য।

বিতর্কের সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত এক অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর আপত্তি সত্ত্বেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, গত দশ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই দুই নির্বাচন কমিশনার মোট ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, এসআইআর-পরবর্তী নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তির বিষয়টিও সামনে আসে।

এই অভিযোগ সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে? কমিশনের প্রতিটি সদস্যের মতামত কি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে? আর ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এই প্রশ্নগুলিই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। ফলে কমিশনের বক্তব্য এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবির মধ্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিতর্ক। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের দাবি, শুধু বিবৃতি দিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়; নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত অভিযোগের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর INDIA জোটের বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন সদন অভিযানে অংশ নেন বিরোধী সাংসদেরা। দিল্লিতে একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিরোধীরা এই ইস্যুকে জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এবার রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি পেশের উদ্যোগের মাধ্যমে সেই আন্দোলনকে সাংবিধানিক স্তরে পৌঁছে দিতে চাইছে তারা।

তবে এই লড়াই কেবল একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকা বা না-থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে আস্থার প্রশ্ন। বিরোধীদের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হবে, তা নির্ভর করবে তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার উপর। কিন্তু অভিযোগগুলিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

এখন নজর রাষ্ট্রপতির কাছে বিরোধীদের বক্তব্য এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। রাষ্ট্রপতি ভবনে এই সাক্ষাতের মাধ্যমে কি নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হবে? নাকি রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই আটকে থাকবে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন? উত্তর নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের উপর। 

/


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত