সংবাদ

সিলেটের ট্রেনের টিকিট ‘সোনার হরিণ’


প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

সিলেটের ট্রেনের টিকিট ‘সোনার হরিণ’
সিলেটের রেল যোগাযোগের হতাশা ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’

সিলেটের ট্রেনের টিকিট যেন সোনাঝরা হরিণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার পরপরই মুহূর্তের মধ্যে তা উধাও হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীরা চাইলেও টিকিট পান না, অথচ চড়া দামে তা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। টিকিট নিয়ে এই নৈরাজ্যের মাঝেই আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা এবং পিবিআইয়ের তদন্তের পর বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুধু টিকিট সংকটই নয়, সিলেটের রেল যোগাযোগের সামগ্রিক চিত্রটিও বেশ হতাশাজনক। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা এলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ডাবল লাইন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি থমকে আছে। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের কথা বহু বছর ধরে শোনা গেলেও আজও তার বাস্তবায়ন নেই। সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করার পরও ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ নামের নতুন ট্রেনটির দেখা মেলেনি।

অন্যদিকে সড়কপথেও স্বস্তি নেই। দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির উন্নয়নকাজ, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অসংখ্য খানাখন্দ পেরিয়ে সিলেটে যাতায়াত অনেক সময় দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে। ফলে রেল ও সড়ক–দুই পথেই সিলেটবাসীর যাতায়াত যেন এক অন্তহীন ভোগান্তির বৃত্তে আটকে আছে।

সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস চলাচল করে। এসব ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আবদুল্লাহ আল নোমানের। আদালত ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে দেখতে পান, টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট বিক্রি হওয়াকে সন্দেহজনক মনে করে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা দায়ের করেন। আদালত মনে করছেন, কালোবাজারি ও মজুতদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট তদন্ত করছে।

এদিকে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টেও অনলাইন টিকিটের ক্ষেত্রে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম’-এর কর্মীদের বিরুদ্ধে ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অবৈধভাবে টিকিট ব্লক ও সংরক্ষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগকে আরও গতিশীল করবে। সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে জানানো হয়েছিল, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। তবে নির্ধারিত সেই সময় পার হয়ে গেলেও ট্রেনটির কোনো দেখা মেলেনি। প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলেও দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি। ২০১৭ ও ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর কথা বলা হলেও তা কেবল আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে এই দুই অঞ্চলের যাত্রীদের ঘুরপথে যাতায়াত করতে হয়, ফলে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। অথচ সরাসরি যোগাযোগ চালু হলে এই সময় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।

সিলেটের রেল যোগাযোগের বড় সীমাবদ্ধতা একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হলেও অর্থসংকটের কারণে তা স্থগিত রয়েছে। ফলে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বড় সম্ভাবনাও ব্যাহত হচ্ছে।

রেলের দুরবস্থার পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। ঢাকা বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সড়কপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দীর্ঘ যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা ও ধীরগতির উন্নয়নকাজ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। প্রবাসী অধ্যুষিত ও পর্যটনসমৃদ্ধ এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা, আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়–এবার চাই টেকসই ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


সিলেটের ট্রেনের টিকিট ‘সোনার হরিণ’

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সিলেটের ট্রেনের টিকিট যেন সোনাঝরা হরিণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার পরপরই মুহূর্তের মধ্যে তা উধাও হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীরা চাইলেও টিকিট পান না, অথচ চড়া দামে তা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। টিকিট নিয়ে এই নৈরাজ্যের মাঝেই আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা এবং পিবিআইয়ের তদন্তের পর বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুধু টিকিট সংকটই নয়, সিলেটের রেল যোগাযোগের সামগ্রিক চিত্রটিও বেশ হতাশাজনক। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা এলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ডাবল লাইন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি থমকে আছে। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের কথা বহু বছর ধরে শোনা গেলেও আজও তার বাস্তবায়ন নেই। সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করার পরও ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ নামের নতুন ট্রেনটির দেখা মেলেনি।

অন্যদিকে সড়কপথেও স্বস্তি নেই। দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির উন্নয়নকাজ, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অসংখ্য খানাখন্দ পেরিয়ে সিলেটে যাতায়াত অনেক সময় দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে। ফলে রেল ও সড়ক–দুই পথেই সিলেটবাসীর যাতায়াত যেন এক অন্তহীন ভোগান্তির বৃত্তে আটকে আছে।

সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস চলাচল করে। এসব ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আবদুল্লাহ আল নোমানের। আদালত ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে দেখতে পান, টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট বিক্রি হওয়াকে সন্দেহজনক মনে করে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা দায়ের করেন। আদালত মনে করছেন, কালোবাজারি ও মজুতদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট তদন্ত করছে।

এদিকে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টেও অনলাইন টিকিটের ক্ষেত্রে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম’-এর কর্মীদের বিরুদ্ধে ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অবৈধভাবে টিকিট ব্লক ও সংরক্ষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগকে আরও গতিশীল করবে। সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে জানানো হয়েছিল, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। তবে নির্ধারিত সেই সময় পার হয়ে গেলেও ট্রেনটির কোনো দেখা মেলেনি। প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলেও দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি। ২০১৭ ও ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর কথা বলা হলেও তা কেবল আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে এই দুই অঞ্চলের যাত্রীদের ঘুরপথে যাতায়াত করতে হয়, ফলে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। অথচ সরাসরি যোগাযোগ চালু হলে এই সময় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।

সিলেটের রেল যোগাযোগের বড় সীমাবদ্ধতা একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হলেও অর্থসংকটের কারণে তা স্থগিত রয়েছে। ফলে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বড় সম্ভাবনাও ব্যাহত হচ্ছে।

রেলের দুরবস্থার পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। ঢাকা বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সড়কপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দীর্ঘ যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা ও ধীরগতির উন্নয়নকাজ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। প্রবাসী অধ্যুষিত ও পর্যটনসমৃদ্ধ এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা, আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়–এবার চাই টেকসই ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত