সংবাদ

কালাপাহাড়ে প্রকৃতির অন্য এক বাংলাদেশ


সংগ্রাম দত্ত
সংগ্রাম দত্ত
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

কালাপাহাড়ে প্রকৃতির অন্য এক বাংলাদেশ
ড্রোন দিয়ে তোলা কালাপাহাড়ের দৃশ্য।

সামনে পাহাড়। চারপাশে ঘন বন। কোথাও সরু ছড়া, কোথাও পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা। মাথার ওপর মেঘের আনাগোনা। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যখন চূড়ার কাছে পৌঁছানো যায়, তখন দূরে চোখে পড়ে হাকালুকি হাওরের নীল জলরাশি। পরিষ্কার আকাশে আরও দূরে দেখা যায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ভূখণ্ড।

এ দৃশ্যের নাম কালাপাহাড়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের এই পাহাড়কে সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে পরিচিত করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৯৮ ফুট। দুর্গম পথ, ঘন বন, ঝিরি-ঝরনা, পাহাড়ি জনপদ এবং চূড়ার বিস্তৃত দৃশ্য—সব মিলিয়ে কালাপাহাড়ের অভিজ্ঞতা অন্য রকম।

তবে কালাপাহাড়ের গল্প শুধু পাহাড়, বন আর ঝরনার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি, সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় নানা ঐতিহাসিক কাহিনি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতিও।

পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরি ঝিরি ছড়া 

সম্প্রতি সিলেট বিভাগের পর্যটক সুদর্শন দেব কালাপাহাড় ভ্রমণে গিয়ে ‘জাহাজ মারা’ এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত একটি বিমানের কিছু অংশ দেখতে পান। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজের অ্যাকাউন্টে ছবি ও তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর তোলা ছবিতে দেখা যায়, মাটির নিচে ও লতাপাতায় ঢেকে থাকা অবস্থায় বিমানের কিছু ভাঙা অংশ এখনো পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে পাহাড়ের যে স্থানে বিমানের অংশটি পড়ে, সেটিই ‘জাহাজ মারা’ নামে পরিচিত।

বিমানের কিছু অংশ ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। আর যেসব অংশ এখনো পড়ে আছে, সেগুলোও মাটি, লতাপাতা ও জঙ্গলে ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে। ফলে কালাপাহাড়ে যাঁরা যান, তাঁদের কাছে ‘জাহাজ মারা’ শুধু একটি দুর্গম পাহাড়ি স্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতির ভেতরে হারিয়ে যাওয়া এক যুদ্ধস্মৃতিরও অংশ।

পাহাড়ের পথে শুরু আসল যাত্রা

কুলাউড়া শহর থেকে কালাপাহাড়ের দূরত্ব আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৭ কিলোমিটার। শহর থেকে গাড়িতে রবিরবাজার হয়ে কর্মধার আজগরাবাদ চা-বাগান এলাকায় যেতে হয়। এরপর গাড়ির পথ শেষ। শুরু হয় পায়ে হাঁটার যাত্রা। আজগরাবাদ থেকে বেগুনছড়া পুঞ্জি পর্যন্ত যেতে হয় পাহাড়ি পথে। পুঞ্জিতে পৌঁছে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নিয়ে শুরু করতে হয় মূল ট্রেইল। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার হাঁটা শেষে পৌঁছানো যায় কালাপাহাড়ের চূড়ার দিকে।

এ পথ কোনো সাজানো পর্যটনকেন্দ্রের পথ নয়। কোথাও খাড়া ঢাল, কোথাও সরু মেঠোপথ, কোথাও ছড়া পার হতে হয়। বর্ষায় মাটি ও পাথর পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। কোনো কোনো জায়গায় গাছের গুঁড়ির তৈরি সাঁকোও পেরোতে হয়। কিন্তু পথ যত দুর্গম হয়, চারপাশের দৃশ্য যেন তত বদলে যায়। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ। বনের ভেতর নেমে আসে নীরবতা। কোথাও ঝিরির স্বচ্ছ পানি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। আবার হঠাৎ মেঘ এসে ঢেকে দেয় চারপাশ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, শহর ও জনবসতি যেন অনেক দূরে ফেলে আসা হয়েছে।

চূড়ার কাছে পৌঁছে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। পরিষ্কার দিনে দূরে দেখা যায় হাকালুকি হাওরের নীল জলরাশি। পূর্ব-দক্ষিণ দিকে তাকালে চোখে পড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ভূখণ্ড। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তখন অনেকটাই ভুলে যান পর্যটকেরা।

এক পাহাড়ের কত নাম

কালাপাহাড়কে ঘিরে স্থানীয়ভাবে একাধিক নামের প্রচলন রয়েছে। কালাপাহাড়ের পাশাপাশি লংলা পাহাড়, হারারগজ পাহাড় ও ষাড়েরগজ পাহাড় নামেও এই পাহাড়শ্রেণিকে ডাকা হয়। বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির সূত্রে পাহাড়টি ‘হাড়ারগজ রিজার্ভ ফরেস্ট’ নামেও পরিচিত।

পাহাড়ের জাহাজ মারা স্থানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ যা পর্যটক সুদর্শন দে অবলোকন করছেন।

পাহাড়টির একটি অংশ বাংলাদেশের কুলাউড়া-জুড়ী এলাকার সীমান্তঘেঁষা ভূখণ্ডে এবং অন্য অংশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিস্তৃত। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের অংশে এবং বাকি অংশ ভারতের ত্রিপুরায়। ভারতীয় অংশে পাহাড়টির একটি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত। সীমান্তবর্তী এই অবস্থানই কালাপাহাড়ের ভূপ্রকৃতিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

ঝরনার শব্দে বদলে যায় বন

কালাপাহাড়ের বড় আকর্ষণ এর ঝরনা ও পাহাড়ি জলধারা। স্থানীয়ভাবে পাষাণের ধর ঝর্ণা, জাহাজমারা বাবা ঝর্ণা, উপলিয়া সং ঝর্ণা, শোলকুটার সং ঝর্ণা, বেলকুমা ঝর্ণা, জাহাজমারা পাদদেশ-১ ও জাহাজমারা পাদদেশ-২সহ বেশ কয়েকটি ঝরনার নাম প্রচলিত। বর্ষায় পাহাড়ি জলধারাগুলো যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। বনভূমির মধ্য দিয়ে পানি নেমে যাওয়ার শব্দে তৈরি হয় অন্য রকম এক পরিবেশ। কোথাও পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি ছুটে চলে, কোথাও সরু ছড়া পাহাড়ি পথের সঙ্গে মিশে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ের বনাঞ্চলে বানর, সাপ, হাতিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। অতীতে হরিণ ও বাঘও দেখা যেত বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে। তবে এই জীববৈচিত্র্যের ভেতর ভ্রমণের অর্থ হলো বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে চলা। বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অতিরিক্ত শব্দ, প্লাস্টিক বর্জ্য কিংবা অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

পাহাড়ের ভেতরে যুদ্ধের স্মৃতি

কালাপাহাড়ের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাসও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ এলাকায় একটি বিমান ভূপাতিত হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পাহাড়ের যে স্থানে বিমানের ভাঙা অংশ পড়ে, স্থানীয়ভাবে সেই স্থানটি ‘জাহাজ মারা’ নামে পরিচিত। সিলেট বিভাগের পর্যটক সুদর্শন দেব কালাপাহাড় ভ্রমণে গিয়ে সম্প্রতি সেখানে বিমানের কিছু অংশ দেখতে পান। মাটি, লতা-পাতা ও জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকা ধাতব অংশগুলোর ছবি তুলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

তার প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বিমানের কিছু অংশ এখনো ওই এলাকায় পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, এর কিছু অংশ এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশও সময়ের সঙ্গে মাটি ও উদ্ভিদের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান জাপান বিমান বাহিনীর আক্রমণে এ এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে যে তথ্য প্রচলিত, সেটি আরও নথিভুক্ত ও যাচাই করা গেলে কালাপাহাড়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে আসতে পারে। প্রকৃতির ভেতর পড়ে থাকা এই ধাতব টুকরোগুলো তাই শুধু পুরোনো বিমানের অংশ নয়; স্থানীয় মানুষের কাছে এগুলো একটি যুদ্ধকালীন স্মৃতির চিহ্ন।

পাহাড়ের সঙ্গে মিশে আছে খাসিয়া জীবন

কালাপাহাড়ের সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানকার মানুষ। পাহাড়সংলগ্ন বেগুনছড়া পুঞ্জি, লবণছড়া পুঞ্জি ও পুঁটিছড়া পুঞ্জিসহ কয়েকটি খাসিয়া পল্লিতে বসবাস করেন খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এসব পুঞ্জিতে প্রায় পাঁচশ পরিবার বসবাস করে। তাঁদের অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। পান চাষ তাঁদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

পাহাড়ের মধ্যে লুকায়িত ও শতাধিক ঝরনার একটি 

পাহাড় ও বনকে ঘিরে গড়ে ওঠা তাঁদের জীবনযাপন কালাপাহাড়ের পর্যটন অভিজ্ঞতারও একটি অংশ। তাই এই এলাকায় পর্যটনের বিকাশ মানে শুধু রাস্তা তৈরি, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ বা মানুষের যাতায়াত বাড়ানো নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতি, জীবনযাপন ও নিজস্ব পরিসরের প্রতি সম্মান রেখে পর্যটন পরিকল্পনা করাও জরুরি।

ইতিহাসও কথা বলে

কালাপাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কিছু ঐতিহাসিক ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি। পাহাড়টির ভারতীয় অংশের পাদদেশে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি। বাংলাদেশ অংশে চূড়ার কাছাকাছি ‘ছাতাচড়া’ নামে একটি মোকামের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। তবে কালাপাহাড়ের পর্যটন পরিচিতি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক।

২০১৫ সালের দিকে ভ্রমণপিয়াসী দল ‘বিডি এক্সপ্লোরার’ পাহাড়টির চূড়া অনুসন্ধান করে জিপিএসের মাধ্যমে এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট মাপার তথ্য প্রকাশ করে। পরে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শে ‘Kulaura Problem & Prospect—কুলাউড়া সমস্যা ও সম্ভাবনা’সহ বিভিন্ন পর্যটনপ্রেমী ব্যক্তি ও সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে কালাপাহাড়কে তুলে ধরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে দুর্গম এই পাহাড়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের পর্যটকদের মধ্যে।

‘শুধু পাহাড় নয়, আরও কিছু’

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়ের কথা উঠলে সাধারণত বান্দরবানের নামই সামনে আসে। তবে সিলেট বিভাগেও কালাপাহাড়ের মতো অনন্য ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের একটি পাহাড় রয়েছে। তার মতে, কালাপাহাড়ের আকর্ষণ শুধু উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে গিরিখাত, গুহা, পাহাড়ি ঝরনা, বন ও অতীত ঐতিহ্যের নানা উপাদান। এসবের খবর পেয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগ্রহও বাড়ছে।

কালাপাহাড় বনের মধ্যে বন্য হাতি

তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, অনেক পর্যটক এসব দুর্গম স্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেন না। ‘হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্রাভেল এন্ড ট্যুর’ দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের সহযোগিতা করে এবং স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে তাঁদের এসব স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

তিনি মনে করেন, কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে কালাপাহাড়ে যাতায়াতব্যবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। সড়ক যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটকের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলও সহজ হবে। একই সঙ্গে পর্যটনকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সম্ভাবনা বড়, উন্নয়নও হবে পরিকল্পিত

কালাপাহাড়ের সম্ভাবনা শুধু পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটের অংশ হিসেবে কালাপাহাড়কে কুলাউড়া ও মৌলভীবাজারের অন্যান্য আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মুরইছড়া ইকোপার্ক, চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং স্থানীয় খাসিয়া সংস্কৃতি। সময় থাকলে পর্যটকেরা পৃথিমপাশার ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়িও ঘুরে দেখতে পারেন।

এ ধরনের পর্যটন সার্কিট গড়ে উঠলে স্থানীয় পরিবহন, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইড সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর সুফল স্থানীয় মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।

তবে পর্যটন বাড়ানোর আগে প্রয়োজন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি। নিরাপদ যোগাযোগ, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, পর্যটকদের জন্য তথ্যসেবা, জরুরি সহায়তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে পর্যটনের চাপ পাহাড়ের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযাত্রায় প্রস্তুতি জরুরি

কালাপাহাড়ে ভ্রমণ সাধারণ কোনো পর্যটনকেন্দ্রে বেড়ানোর মতো নয়। পাহাড়ি ট্রেইল দুর্গম এবং বর্ষায় পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। তাই একা না গিয়ে দলবদ্ধভাবে যাওয়া নিরাপদ। সঙ্গে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার রাখা উচিত। পাহাড়ি পথে হাঁটার উপযোগী শক্ত জুতা ব্যবহার করা প্রয়োজন। আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়াও জরুরি।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—পাহাড়ে কোনো অপচনশীল বর্জ্য ফেলে আসা যাবে না। নিজেদের তৈরি বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে এনে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতি ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

প্রকৃতি রক্ষাই বড় বিনিয়োগ

একটি পর্যটনকেন্দ্র জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর মানুষের চাপও বাড়ে। কালাপাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তাই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়, বন, ঝরনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা রক্ষার বিষয়টি সামনে রাখতে হবে।

অতিরিক্ত নির্মাণ, অপরিকল্পিত সড়ক, প্লাস্টিক বর্জ্য কিংবা অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন যেন পাহাড়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট না করে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে পর্যটনের সুযোগ তৈরি করাই হতে পারে এই এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।

একই সঙ্গে ‘জাহাজ মারা’র মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোরও সংরক্ষণ প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিমানটির অবশিষ্ট অংশগুলো যদি যথাযথভাবে নথিভুক্ত, সংরক্ষিত ও স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে কালাপাহাড়ের পর্যটন অভিজ্ঞতায় প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসের একটি নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

পর্যটন মানচিত্রে নতুন অধ্যায়

কুলাউড়ার রয়েছে রেলপথের ঐতিহ্য। রয়েছে চা-বাগান, পাহাড়, বন, সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতি ও নানা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। এর সঙ্গে কালাপাহাড়কে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে কুলাউড়া শুধু যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, একটি স্বতন্ত্র পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখন পাহাড় ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ কালাপাহাড়ে আসছেন। তাঁদের কাছে এই পাহাড়ের আকর্ষণ শহুরে বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে আলাদা। এখানে নেই সাজানো বিনোদনের কৃত্রিমতা। আছে দীর্ঘ হাঁটার ক্লান্তি, বনের নীরবতা, ঝরনার শব্দ, মেঘের স্পর্শ এবং চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারপাশের বিস্তৃত ভূদৃশ্য দেখার অনুভূতি।

সার্বিকভাবে কালাপাহাড়ের দৃশ্য 

আর আছে ইতিহাসের কিছু ছড়িয়ে থাকা চিহ্ন—যার একটি ‘জাহাজ মারা’। চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে হাকালুকি হাওরের জলরাশি দেখা যায়। সামনে বিস্তৃত পাহাড়, চারপাশে বন, মাথার ওপর আকাশ। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এখনো এমন অনেক জায়গা আছে, যেগুলো পরিচিতির অপেক্ষায়।

কালাপাহাড় তেমনই একটি জায়গা। তবে এই পরিচিতি যেন কেবল পর্যটকের ভিড় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কালাপাহাড়কে ঘিরে পরিকল্পিত অবকাঠামো, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, ঐতিহাসিক নিদর্শনের সুরক্ষা এবং দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে কুলাউড়া, মৌলভীবাজার এবং পুরো সিলেট বিভাগের পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

প্রকৃতির এই চূড়াকে তাই শুধু জয় করার নয়—রক্ষা করারও দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক: প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


কালাপাহাড়ে প্রকৃতির অন্য এক বাংলাদেশ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সামনে পাহাড়। চারপাশে ঘন বন। কোথাও সরু ছড়া, কোথাও পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা। মাথার ওপর মেঘের আনাগোনা। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যখন চূড়ার কাছে পৌঁছানো যায়, তখন দূরে চোখে পড়ে হাকালুকি হাওরের নীল জলরাশি। পরিষ্কার আকাশে আরও দূরে দেখা যায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ভূখণ্ড।

এ দৃশ্যের নাম কালাপাহাড়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের এই পাহাড়কে সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে পরিচিত করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৯৮ ফুট। দুর্গম পথ, ঘন বন, ঝিরি-ঝরনা, পাহাড়ি জনপদ এবং চূড়ার বিস্তৃত দৃশ্য—সব মিলিয়ে কালাপাহাড়ের অভিজ্ঞতা অন্য রকম।

তবে কালাপাহাড়ের গল্প শুধু পাহাড়, বন আর ঝরনার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি, সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় নানা ঐতিহাসিক কাহিনি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতিও।

পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরি ঝিরি ছড়া 

সম্প্রতি সিলেট বিভাগের পর্যটক সুদর্শন দেব কালাপাহাড় ভ্রমণে গিয়ে ‘জাহাজ মারা’ এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত একটি বিমানের কিছু অংশ দেখতে পান। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজের অ্যাকাউন্টে ছবি ও তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর তোলা ছবিতে দেখা যায়, মাটির নিচে ও লতাপাতায় ঢেকে থাকা অবস্থায় বিমানের কিছু ভাঙা অংশ এখনো পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে পাহাড়ের যে স্থানে বিমানের অংশটি পড়ে, সেটিই ‘জাহাজ মারা’ নামে পরিচিত।

বিমানের কিছু অংশ ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। আর যেসব অংশ এখনো পড়ে আছে, সেগুলোও মাটি, লতাপাতা ও জঙ্গলে ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে। ফলে কালাপাহাড়ে যাঁরা যান, তাঁদের কাছে ‘জাহাজ মারা’ শুধু একটি দুর্গম পাহাড়ি স্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতির ভেতরে হারিয়ে যাওয়া এক যুদ্ধস্মৃতিরও অংশ।

পাহাড়ের পথে শুরু আসল যাত্রা

কুলাউড়া শহর থেকে কালাপাহাড়ের দূরত্ব আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৭ কিলোমিটার। শহর থেকে গাড়িতে রবিরবাজার হয়ে কর্মধার আজগরাবাদ চা-বাগান এলাকায় যেতে হয়। এরপর গাড়ির পথ শেষ। শুরু হয় পায়ে হাঁটার যাত্রা। আজগরাবাদ থেকে বেগুনছড়া পুঞ্জি পর্যন্ত যেতে হয় পাহাড়ি পথে। পুঞ্জিতে পৌঁছে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নিয়ে শুরু করতে হয় মূল ট্রেইল। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার হাঁটা শেষে পৌঁছানো যায় কালাপাহাড়ের চূড়ার দিকে।

এ পথ কোনো সাজানো পর্যটনকেন্দ্রের পথ নয়। কোথাও খাড়া ঢাল, কোথাও সরু মেঠোপথ, কোথাও ছড়া পার হতে হয়। বর্ষায় মাটি ও পাথর পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। কোনো কোনো জায়গায় গাছের গুঁড়ির তৈরি সাঁকোও পেরোতে হয়। কিন্তু পথ যত দুর্গম হয়, চারপাশের দৃশ্য যেন তত বদলে যায়। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ। বনের ভেতর নেমে আসে নীরবতা। কোথাও ঝিরির স্বচ্ছ পানি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। আবার হঠাৎ মেঘ এসে ঢেকে দেয় চারপাশ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, শহর ও জনবসতি যেন অনেক দূরে ফেলে আসা হয়েছে।

চূড়ার কাছে পৌঁছে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। পরিষ্কার দিনে দূরে দেখা যায় হাকালুকি হাওরের নীল জলরাশি। পূর্ব-দক্ষিণ দিকে তাকালে চোখে পড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ভূখণ্ড। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তখন অনেকটাই ভুলে যান পর্যটকেরা।

এক পাহাড়ের কত নাম

কালাপাহাড়কে ঘিরে স্থানীয়ভাবে একাধিক নামের প্রচলন রয়েছে। কালাপাহাড়ের পাশাপাশি লংলা পাহাড়, হারারগজ পাহাড় ও ষাড়েরগজ পাহাড় নামেও এই পাহাড়শ্রেণিকে ডাকা হয়। বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির সূত্রে পাহাড়টি ‘হাড়ারগজ রিজার্ভ ফরেস্ট’ নামেও পরিচিত।

পাহাড়ের জাহাজ মারা স্থানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ যা পর্যটক সুদর্শন দে অবলোকন করছেন।

পাহাড়টির একটি অংশ বাংলাদেশের কুলাউড়া-জুড়ী এলাকার সীমান্তঘেঁষা ভূখণ্ডে এবং অন্য অংশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিস্তৃত। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের অংশে এবং বাকি অংশ ভারতের ত্রিপুরায়। ভারতীয় অংশে পাহাড়টির একটি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত। সীমান্তবর্তী এই অবস্থানই কালাপাহাড়ের ভূপ্রকৃতিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

ঝরনার শব্দে বদলে যায় বন

কালাপাহাড়ের বড় আকর্ষণ এর ঝরনা ও পাহাড়ি জলধারা। স্থানীয়ভাবে পাষাণের ধর ঝর্ণা, জাহাজমারা বাবা ঝর্ণা, উপলিয়া সং ঝর্ণা, শোলকুটার সং ঝর্ণা, বেলকুমা ঝর্ণা, জাহাজমারা পাদদেশ-১ ও জাহাজমারা পাদদেশ-২সহ বেশ কয়েকটি ঝরনার নাম প্রচলিত। বর্ষায় পাহাড়ি জলধারাগুলো যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। বনভূমির মধ্য দিয়ে পানি নেমে যাওয়ার শব্দে তৈরি হয় অন্য রকম এক পরিবেশ। কোথাও পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি ছুটে চলে, কোথাও সরু ছড়া পাহাড়ি পথের সঙ্গে মিশে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ের বনাঞ্চলে বানর, সাপ, হাতিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। অতীতে হরিণ ও বাঘও দেখা যেত বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে। তবে এই জীববৈচিত্র্যের ভেতর ভ্রমণের অর্থ হলো বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে চলা। বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অতিরিক্ত শব্দ, প্লাস্টিক বর্জ্য কিংবা অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

পাহাড়ের ভেতরে যুদ্ধের স্মৃতি

কালাপাহাড়ের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাসও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ এলাকায় একটি বিমান ভূপাতিত হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পাহাড়ের যে স্থানে বিমানের ভাঙা অংশ পড়ে, স্থানীয়ভাবে সেই স্থানটি ‘জাহাজ মারা’ নামে পরিচিত। সিলেট বিভাগের পর্যটক সুদর্শন দেব কালাপাহাড় ভ্রমণে গিয়ে সম্প্রতি সেখানে বিমানের কিছু অংশ দেখতে পান। মাটি, লতা-পাতা ও জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকা ধাতব অংশগুলোর ছবি তুলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

তার প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বিমানের কিছু অংশ এখনো ওই এলাকায় পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, এর কিছু অংশ এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশও সময়ের সঙ্গে মাটি ও উদ্ভিদের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান জাপান বিমান বাহিনীর আক্রমণে এ এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে যে তথ্য প্রচলিত, সেটি আরও নথিভুক্ত ও যাচাই করা গেলে কালাপাহাড়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে আসতে পারে। প্রকৃতির ভেতর পড়ে থাকা এই ধাতব টুকরোগুলো তাই শুধু পুরোনো বিমানের অংশ নয়; স্থানীয় মানুষের কাছে এগুলো একটি যুদ্ধকালীন স্মৃতির চিহ্ন।

পাহাড়ের সঙ্গে মিশে আছে খাসিয়া জীবন

কালাপাহাড়ের সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানকার মানুষ। পাহাড়সংলগ্ন বেগুনছড়া পুঞ্জি, লবণছড়া পুঞ্জি ও পুঁটিছড়া পুঞ্জিসহ কয়েকটি খাসিয়া পল্লিতে বসবাস করেন খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এসব পুঞ্জিতে প্রায় পাঁচশ পরিবার বসবাস করে। তাঁদের অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। পান চাষ তাঁদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

পাহাড়ের মধ্যে লুকায়িত ও শতাধিক ঝরনার একটি 

পাহাড় ও বনকে ঘিরে গড়ে ওঠা তাঁদের জীবনযাপন কালাপাহাড়ের পর্যটন অভিজ্ঞতারও একটি অংশ। তাই এই এলাকায় পর্যটনের বিকাশ মানে শুধু রাস্তা তৈরি, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ বা মানুষের যাতায়াত বাড়ানো নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতি, জীবনযাপন ও নিজস্ব পরিসরের প্রতি সম্মান রেখে পর্যটন পরিকল্পনা করাও জরুরি।

ইতিহাসও কথা বলে

কালাপাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কিছু ঐতিহাসিক ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি। পাহাড়টির ভারতীয় অংশের পাদদেশে রয়েছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি। বাংলাদেশ অংশে চূড়ার কাছাকাছি ‘ছাতাচড়া’ নামে একটি মোকামের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। তবে কালাপাহাড়ের পর্যটন পরিচিতি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক।

২০১৫ সালের দিকে ভ্রমণপিয়াসী দল ‘বিডি এক্সপ্লোরার’ পাহাড়টির চূড়া অনুসন্ধান করে জিপিএসের মাধ্যমে এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট মাপার তথ্য প্রকাশ করে। পরে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শে ‘Kulaura Problem & Prospect—কুলাউড়া সমস্যা ও সম্ভাবনা’সহ বিভিন্ন পর্যটনপ্রেমী ব্যক্তি ও সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে কালাপাহাড়কে তুলে ধরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে দুর্গম এই পাহাড়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের পর্যটকদের মধ্যে।

‘শুধু পাহাড় নয়, আরও কিছু’

শ্রীমঙ্গলের পর্যটন উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়ের কথা উঠলে সাধারণত বান্দরবানের নামই সামনে আসে। তবে সিলেট বিভাগেও কালাপাহাড়ের মতো অনন্য ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের একটি পাহাড় রয়েছে। তার মতে, কালাপাহাড়ের আকর্ষণ শুধু উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে গিরিখাত, গুহা, পাহাড়ি ঝরনা, বন ও অতীত ঐতিহ্যের নানা উপাদান। এসবের খবর পেয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগ্রহও বাড়ছে।

কালাপাহাড় বনের মধ্যে বন্য হাতি

তাজুল ইসলাম জাবেদ বলেন, অনেক পর্যটক এসব দুর্গম স্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেন না। ‘হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্রাভেল এন্ড ট্যুর’ দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের সহযোগিতা করে এবং স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে তাঁদের এসব স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

তিনি মনে করেন, কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে কালাপাহাড়ে যাতায়াতব্যবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। সড়ক যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটকের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলও সহজ হবে। একই সঙ্গে পর্যটনকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সম্ভাবনা বড়, উন্নয়নও হবে পরিকল্পিত

কালাপাহাড়ের সম্ভাবনা শুধু পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটের অংশ হিসেবে কালাপাহাড়কে কুলাউড়া ও মৌলভীবাজারের অন্যান্য আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মুরইছড়া ইকোপার্ক, চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং স্থানীয় খাসিয়া সংস্কৃতি। সময় থাকলে পর্যটকেরা পৃথিমপাশার ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়িও ঘুরে দেখতে পারেন।

এ ধরনের পর্যটন সার্কিট গড়ে উঠলে স্থানীয় পরিবহন, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইড সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর সুফল স্থানীয় মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।

তবে পর্যটন বাড়ানোর আগে প্রয়োজন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি। নিরাপদ যোগাযোগ, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, পর্যটকদের জন্য তথ্যসেবা, জরুরি সহায়তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে পর্যটনের চাপ পাহাড়ের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযাত্রায় প্রস্তুতি জরুরি

কালাপাহাড়ে ভ্রমণ সাধারণ কোনো পর্যটনকেন্দ্রে বেড়ানোর মতো নয়। পাহাড়ি ট্রেইল দুর্গম এবং বর্ষায় পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। তাই একা না গিয়ে দলবদ্ধভাবে যাওয়া নিরাপদ। সঙ্গে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার রাখা উচিত। পাহাড়ি পথে হাঁটার উপযোগী শক্ত জুতা ব্যবহার করা প্রয়োজন। আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়াও জরুরি।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—পাহাড়ে কোনো অপচনশীল বর্জ্য ফেলে আসা যাবে না। নিজেদের তৈরি বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে এনে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতি ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

প্রকৃতি রক্ষাই বড় বিনিয়োগ

একটি পর্যটনকেন্দ্র জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর মানুষের চাপও বাড়ে। কালাপাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তাই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়, বন, ঝরনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা রক্ষার বিষয়টি সামনে রাখতে হবে।

অতিরিক্ত নির্মাণ, অপরিকল্পিত সড়ক, প্লাস্টিক বর্জ্য কিংবা অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন যেন পাহাড়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট না করে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে পর্যটনের সুযোগ তৈরি করাই হতে পারে এই এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।

একই সঙ্গে ‘জাহাজ মারা’র মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোরও সংরক্ষণ প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিমানটির অবশিষ্ট অংশগুলো যদি যথাযথভাবে নথিভুক্ত, সংরক্ষিত ও স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে কালাপাহাড়ের পর্যটন অভিজ্ঞতায় প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসের একটি নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

পর্যটন মানচিত্রে নতুন অধ্যায়

কুলাউড়ার রয়েছে রেলপথের ঐতিহ্য। রয়েছে চা-বাগান, পাহাড়, বন, সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতি ও নানা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। এর সঙ্গে কালাপাহাড়কে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে কুলাউড়া শুধু যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, একটি স্বতন্ত্র পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখন পাহাড় ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ কালাপাহাড়ে আসছেন। তাঁদের কাছে এই পাহাড়ের আকর্ষণ শহুরে বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে আলাদা। এখানে নেই সাজানো বিনোদনের কৃত্রিমতা। আছে দীর্ঘ হাঁটার ক্লান্তি, বনের নীরবতা, ঝরনার শব্দ, মেঘের স্পর্শ এবং চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারপাশের বিস্তৃত ভূদৃশ্য দেখার অনুভূতি।

সার্বিকভাবে কালাপাহাড়ের দৃশ্য 

আর আছে ইতিহাসের কিছু ছড়িয়ে থাকা চিহ্ন—যার একটি ‘জাহাজ মারা’। চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে হাকালুকি হাওরের জলরাশি দেখা যায়। সামনে বিস্তৃত পাহাড়, চারপাশে বন, মাথার ওপর আকাশ। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এখনো এমন অনেক জায়গা আছে, যেগুলো পরিচিতির অপেক্ষায়।

কালাপাহাড় তেমনই একটি জায়গা। তবে এই পরিচিতি যেন কেবল পর্যটকের ভিড় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কালাপাহাড়কে ঘিরে পরিকল্পিত অবকাঠামো, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, ঐতিহাসিক নিদর্শনের সুরক্ষা এবং দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে কুলাউড়া, মৌলভীবাজার এবং পুরো সিলেট বিভাগের পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

প্রকৃতির এই চূড়াকে তাই শুধু জয় করার নয়—রক্ষা করারও দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক: প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত