‘কানাডায় একটি লেখক কর্মশালায় অ্যান কারসনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়, ১৯৮৮ সালে। সেই থেকে আমরা একে অপরের লেখা পড়ে আসছি। এখানে যে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো, তা আমাদের নিয়মিত আলাপচারিতার সঙ্গে কারসনের লেখালেখিতে বারবার ফিরে আসা কয়েকটি বিষয়— মরমিবাদ, প্রাচীনত্ব, আসক্তি ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনার এক মিশ্র রূপ। ২০০২ সালের বড়দিনের ঠিক পরপরই আমরা এই সাক্ষাৎকারটি শুরু করি। উৎসবের আনন্দময় ব্যস্ততার ধকল তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি কারসন। তিনি কমলা রঙের মখমলের সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। আমরা কয়েক ঘণ্টা ধরে কথা বললাম। সঙ্গে ছিল ধোঁয়া ওঠা উলং চায়ের কাপ— দীর্ঘ আলাপের জন্য যা আমাদের দুজনকেই সতেজ রেখেছিল।’ —সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী উইল এইটকেন
সাক্ষাৎকারটি দ্য প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটির অংশ বিশেষ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন উজ্জ্বল শিখর
উইল এইটকেন : সবাই কি নিজের মধ্যে এই তীব্র আলো বহন করে? নাকি আপনার পেছনে আলোটি একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে?
অ্যান কারসন: আমার মনে হয়, প্রত্যেকেরই এই আলোর নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা আছে। তবে প্রত্যেকে একে আড়াল করে রাখে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। কোনো এক অজানা কারণে আমার আড়াল করার উপায় তুলনামূলকভাবে কম।
উ. এ.: আপনার কি মনে হয়, এই বৈশিষ্ট্যটি আপনার মধ্যে বরাবরই ছিল? আপনার শৈশব কেমন ছিল? আমি জানি, আপনাদের অনেকবার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
অ্যা. কা.: আমার বাবা ছিলেন ব্যাংকার। কানাডার ব্যাংকব্যবস্থায় ব্যাংকারদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কারণ, প্রতি তিন বছর অন্তর ব্যবস্থাপকদের বদলি করা সেখানকার রীতি। উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা যেন বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও ব্যাংকিংয়ের নানা ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এতে ব্যাংকের লাভ হয়, কিন্তু পরিবারের জন্য ব্যাপারটি বেশ কষ্টকর।
উ. এ.: তাহলে প্রতি তিন বছর অন্তর আপনাকে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হতো?
অ্যা. কা.: মোটামুটি তা-ই। আমার বিশ্বাস, এতে টিকে থাকার ক্ষমতা বেড়েছিল। একদিনের কথা মনে পড়ে। আমরা বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ছিলাম। জানতাম, তাদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। তখন মনে মনে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা, পরেরবার কোথাও গেলে আর বন্ধু তৈরি করব না। বন্ধুত্ব করে লাভ কী, যখন তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই?’ এভাবেই যেন নিজের চারপাশে সংকোচনের একটা প্রাচীর তুলে দিচ্ছিলাম, একের পর এক দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলাম।
উ. এ.: পরের শহরে গিয়ে কি আর নতুন বন্ধু তৈরি করেননি?
অ্যা. কা.: করেছি, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সতর্কভাবে। মনের অন্তত অর্ধেক অংশ সব সময় ভাবত, ‘আমি তো চলে যাব; এই সম্পর্ক টিকবে না।’ বৌদ্ধদের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এটি বেশ ভালো। আমি যদি বৌদ্ধ হতাম, তাহলে এই মনোভাব আমার খুব কাজে আসত। কিন্তু আমি বৌদ্ধ নই; তাই আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কেবল দুঃখের।
উ. এ.: বৌদ্ধ হলে তো আপনি ইতিমধ্যেই নির্বাণ বা বোধিলাভের পথে অনেক দূর এগিয়ে যেতেন।
অ্যা. কা.: তার বদলে আমি দৃঢ়ভাবে বোধিলাভ এড়িয়ে চলেছি।
উ. এ.: এবার প্রাচীন গ্রিস সম্পর্কে একটু কথা বলতে চাই। আপনি কি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথম গ্রিক ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, ত্রয়োদশ শ্রেণিতে।
উ. এ.: শুরুতেই কি বুঝতে পেরেছিলেন, এই ভাষা আপনার জীবন বদলে দেবে?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গেই। মিসেস কোয়ান আমাকে গ্রিক ভাষা শেখাতে শুরু করেছিলেন। পোর্ট হোপে উচ্চবিদ্যালয়ে তিনি আমাদের লাতিন পড়াতেন। কিন্তু তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। আমি যে ভাষাটি শিখতে আগ্রহী, তা জানার পর তিনি নিজে থেকেই আমাকে শেখানোর প্রস্তাব দেন। আমরা দুপুরের খাবারের বিরতিতে পড়তাম।
উ. এ.: গ্রিক ভাষার আলাদা কোনো শ্রেণি ছিল না?
অ্যা. কা.: না। আমি ছাড়া আর কেউই ভাষাটি শিখতে আগ্রহী ছিল না। আমরা একসঙ্গে স্যাফোর কবিতা পড়তাম। অভিজ্ঞতাটি ছিল একেবারেই বৈপ্লবিক। পৃথিবীর সব ভাষা তো আর আমার জানা নেই। হয়তো সংস্কৃত ও চীনা ভাষা জানলে আমার চিন্তাভাবনা অন্য রকম হতো। কিন্তু গ্রিক ভাষার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা মনে হয় আধুনিক যেকোনো ভাষার চেয়ে শব্দের আরও গভীরে প্রবেশ করে। গ্রিক ভাষা পড়তে গেলে মনে হয়, শব্দ কীভাবে কাজ করে, তার একেবারে শিকড়ের কাছে পৌঁছে গেছি। আর ইংরেজি ভাষায় আমরা যেন গাছের ওপরের দিকে, ডালপালার মধ্যে ঘুরে বেড়াই।
আমার কাছে এটি ছিল বিস্ময়কর, এক নতুন সত্যের আবিষ্কারের মতো। সেই বিস্ময় এখনো কাটেনি। গ্রিক ভাষা আজও আমার কাছে এমন এক আশ্রয়স্থলের মতো, যার দ্বার সব সময় উন্মুক্ত। জায়গাটি অদ্ভুত, তবু স্বাগত জানায়।
উ. এ.: অনেকেই বলেন, প্রাচীন গ্রিকরা আসলে আমাদেরই সমকালীন মানুষ। আপনি কি একমত?
অ্যা. কা.: প্রাচীন বিষয়ের সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা আমি খুব একটা অনুভব করি না। সত্তর ও আশির দশকে, যখন আমি পড়াশোনা করছিলাম এবং শিক্ষকতা করছিলাম, তখনকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল। বলা হতো, ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্য হলো প্রাচীন জগতের সঙ্গে বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করা। এমন সব পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করে, আধুনিক জীবন সম্পর্কে যা কিছু জানা দরকার, সবই প্রাচীন গ্রিকদের অধ্যয়ন করে শেখা সম্ভব।
অন্তত বলতে গেলে, এই ধারণা অদ্ভুত।
গ্রিকদের প্রতি আমাদের আকর্ষণের কারণ অন্য কিছু। তাঁদের জগতের বিপুল অপরিচিতির মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ আমাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। চারদিকে এমন সব অদ্ভুত বিশ্বাস, জগৎ সম্পর্কে এমন সব ধারণা এবং জীবনের প্রতি এমন সব প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে আছে, যেগুলো আমাদের কাছে একেবারেই অর্থহীন মনে হয়। সেই বিশাল অপরিচিতির মধ্যে সামান্য কিছু পরিচিতির আভাস পাওয়াই আকর্ষণীয়।
উ. এ.: অর্থাৎ, এই গভীর অপরিচিত জগৎটিকে জানার আগ্রহই আপনাকে টানে। সেটি আমাদের বর্তমানের সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা এখানে মুখ্য নয়।
অ্যা. কা.: গ্রিকদের সম্পর্কে একটি বিষয় আমি বুঝতে পারি। তাঁরাও অপরিচিতি বা ভিন্নতাকে বুঝতেন এবং তার মূল্য দিতেন। দেবতা ডায়োনিসাস এই ধারণারই প্রতীক। এমন এক ভিন্নতার মুখোমুখি হওয়া, যা আপনাকে নিজের সত্তা থেকে ছিটকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়; অথচ সেই জায়গায় গিয়েও আপনি নিজের মধ্যেই অবস্থান করেন। যেন নিজের সঙ্গেই আপনার এক অপর সত্তা হিসেবে সম্পর্ক তৈরি হয়।
গ্রিকরা একে বলত বপংঃধংু— পরমানন্দ বা আত্মসত্তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রমের অভিজ্ঞতা। এই ধারণাটি গ্রিকরাই উদ্ভাবন করেছিল। একই সঙ্গে তার মূর্ত উদাহরণ হিসেবেও তারা আমাদের সামনে উপস্থিত। অবশ্য এর মধ্যে প্রাচীন গ্রিকদের প্রতি আমাদের উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করে থাকতে পারে। কে জানে!
আমরা সব সময়ই গ্রিকদের দিকে ফিরে তাকাব এবং আমাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী, তা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু এমন কোনো তৃতীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমরা বিচার করতে পারব না, যেখান থেকে আমরা নিজেরাও নই, গ্রিকরাও নই— দুজনকেই বাইরে থেকে দেখা যায়।
উ. এ.: অনেকেই জানেন না, আপনি ভাষার শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি দৃশ্যশিল্পীও। আপনি বই তৈরি করেন— একেকজন মানুষের জন্য একেকটি বই। একবার মনে আছে, আমরা অন্টারিওর গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। চারপাশ ছিল বরফে ঢাকা, সবকিছু সাদা। একসময় আপনি দূরের একটি জায়গা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি একসময় ওখানে থাকতাম।’ আমার মনে হয়, জায়গাটি ছিল পোর্ট হোপ। আমি তাকিয়ে ভেবেছিলাম, ‘ওখানে কেউ কখনো থাকত বলে তো মনে হয় না। চারদিকে তো কিছুই নেই!’ এরপর আপনি আমাকে একটি সাদা বই দিয়েছিলেন। আপনার ভাই মাইকেলের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে বইটি তৈরি করেছিলেন।
অ্যা. কা.: এখান থেকে টরন্টো যাওয়ার ট্রেনে উঠলে পোর্ট হোপের কাছাকাছি আসার সময় আমার সব সময় একধরনের অস্বস্তি হয়। আমার পরিবার সেখানে ছয়-সাত বছর ছিল। আমার বাবা-মা প্রায় পনেরো বছর সেখানে ছিলেন, আর আমার ভাইও জীবনের বিভিন্ন সময়ে সেখানে থেকেছে। বইটি যেহেতু তাকে নিয়ে, তাই জায়গাটির সঙ্গে বইটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গায় আমাদের সবার জীবন যেন ভেঙে পড়েছিল। না, কথাটা একটু বেশি কঠোর হয়ে গেল। বরং বলা ভালো, সেখানে এসে আমার ভাই ও আমি— দুজনেই আমাদের কৈশোরের শেষ সীমায় পৌঁছেছিলাম। সেটি জীবনের একটি গুরুতর সন্ধিক্ষণ।
উ. এ.: তাহলে ভাইয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার উপায় হিসেবেই বইটি লিখেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। আমার ভাই যখন মারা যায়, তার আগে বাইশ বছর ধরে আমি তার সঙ্গে দেখা করিনি। সে আমার কাছে এক রহস্যময় মানুষ ছিল। অন্য একটি দেশে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছিল। তখন তার জীবনের বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলো একত্র করে এমন কিছু তৈরি করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম, যাকে একটি নির্দিষ্ট রূপের মধ্যে ধরে রাখা যায়। এই অর্থে বইটি একটি শোকগাথা। একজন মানুষ যখন আর আমাদের নাগালের মধ্যে থাকে না, তখন তাকে কোনোভাবে একটি সীমাবদ্ধ রূপের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা।
উ. এ.: আমার মনে আছে, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন আপনার লেখাকে মানুষ গুরুত্ব দিতে চাইত না। আপনি বলতেন, ‘মারা যাওয়ার পনেরো মিনিট পর আমি বিখ্যাত হব।’ গত কয়েক বছরে সবকিছু বদলে গেছে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলেছে?
অ্যা. কা.: খুব বেশি নয়। বিমানবন্দরে কেউ আমাকে চিনে স্বাগত জানালে ভালো লাগে, এটুকু বলতে পারি। লেখালেখির ক্ষেত্রেও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। শুধু এখন মনে হয়, যা খুশি করার স্বাধীনতা কিছুটা বেড়েছে। এর ভালো ও খারাপ— দুই দিকই আছে। ভালো এই অর্থে যে, এখন অনুসন্ধানের একটি মুক্ত পরিসর তৈরি হয়েছে। খারাপ এই অর্থে যে, আগের মতো করে কেউ আমার কাজের বিচার করছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হয়।
আগে এমন একটি শূন্য পরিসর ছিল, যেখানে আমার কাজের মূল্যায়ন করা হতো। এখন যেন আগে থেকেই একটি নির্ধারিত পরিসর তৈরি রয়েছে। সেখানে একটি বিচার আগে থেকেই উপস্থিত থাকে, আর আমাকে সেই বিচার অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে হয়, অথবা ব্যর্থ হতে হয়। আমি সেই পরিসরে প্রবেশ করার আগেই বিচারটি বদলে গেছে।
উ. এ.: আগে আপনার লেখা দেখে মানুষ একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে যেত। তারা বলত, ‘এ তো কবিতা নয়, স্পষ্টতই গদ্য। এখানে অনুচ্ছেদ আছে। গদ্য ও কবিতার পার্থক্য আমি বুঝতে পারি।’ তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ অবজ্ঞাপূর্ণ।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। তারপর যা ঘটেছে, তাকে অনেকে দৃষ্টান্তের পরিবর্তন বা ঢ়ধৎধফরমস ংযরভঃ বলেন। এখন নাকি আমি কিছু ভুল করতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হয়, এর প্রকৃত অর্থ হলো, মানুষ এখনো আমার কাজ সম্পর্কে অন্ধভাবে বিচার করছে— শুধু সেই বিচারটি আগের মতো নয়।
কেন এমন হয়, জানি না। সম্ভবত মানুষ চিন্তা করতে ভয় পায়। তারা আগে থেকেই তৈরি কোনো শ্রেণি বা পরিচয়ের মধ্যে জিনিসকে বসিয়ে দিতে চায়। তখন বলতে পারে, ‘আচ্ছা, এখন আমরা জানি এটি ভালো। এবার নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যায়।’
উ. এ.: ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পাওয়ার পরও কি একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল? জানি, এর ফলে আপনার জীবনযাত্রা খুব বিলাসবহুল হয়ে ওঠেনি।
অ্যা. কা.: কীভাবে বলছেন? মনে হয়, কয়েক জোড়া মোজা কিনেছিলাম। মোজা আর একটি নতুন বালিশের খোল। এ ছাড়া এখন যেকোনো সময় ব্যাংকে ঢুকতে পারি। দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আমাকে দেখলে কর্মীরা দৌড়ে এসে ভেতরে নিয়ে যান, পেছনের ঘরে বসতে দেন। ব্যাপারটি আমার বেশ মজার লাগে। এছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
উ. এ.: অর্থ সম্পর্কে আপনার একটি মজার তত্ত্ব রয়েছে।
অ্যা. কা.: তেমন মজার কিছু নয়। প্রচলিত ধারণাটির ঠিক উল্টো কথা বলেছি মাত্র। সাধারণভাবে মনে করা হয়, জীবনের সব অর্থই— শুধু টাকা নয়, সব সংখ্যাই— ক্রমশ বড় হওয়া উচিত। কিন্তু কেন সংখ্যাগুলো বড় হবে? এর কোনো যুক্তি দেখি না। আপনি যদি ধারণাটি উল্টে দেন এবং ভাবেন যে জীবনের সব সংখ্যা ক্রমশ ছোট হওয়া উচিত, তাহলে জীবন অনেক ভালো হয়ে উঠবে।
উ. এ.: আপনার বাবা এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কী ভাবতেন?
অ্যা. কা.: বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাবা এই মত পোষণ করতেন না।
উ. এ.: টাকা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?
অ্যা. কা.: জটিল। আমি কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয় না। শুধু এটুকু জানি, অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে যখনই আলোচনা হতো, শেষ পর্যন্ত আমরা দুজন একটি টেবিলে বসে থাকতাম। চারপাশে ছড়িয়ে থাকত কাগজের ন্যাপকিন, তার ওপর নানা হিসাব-নিকাশ লেখা। আমাদের দুজনের কাছেই ব্যাপারটি ছিল চরম হতাশাজনক।
উ. এ.: কানাডা থেকে আসা আপনার লেখক সত্তাকে কোনোভাবে গড়ে দিয়েছে বলে মনে হয়?
অ্যা. কা.: না, তা মনে হয় না। অন্য কোথাও জন্মালে আমি অন্য রকম হতাম কি না, তা-ও জানি না।
যুক্তরাষ্ট্রে গেলে নিজেকে কিছুটা আলাদা মনে হয়। কিন্তু সেই অনুভূতির ব্যাখ্যা ভাষায় দিতে পারি না। আবার কানাডায় ফিরে এলে স্বস্তি অনুভব করি। হয়তো কারণ, এখানে চোখে পড়ার মতো আলাদা কেউ হয়ে থাকতে হয় না। সহজেই সবার আড়ালে থাকা যায়। কানাডার পাথর, বাতাস এবং পৃথিবীর নিজস্ব গন্ধ— এসব আমি মিস করি। কিন্তু কানাডা আমাকে লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে, এমন মনে হয় না।
উ. এ.: সমকালীন কোনো লেখকের লেখা কি আপনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে? অন্য লেখকের প্রভাবের আশঙ্কা কি আপনাকে উদ্বিগ্ন করে?
অ্যা. কা.: যতটা উদ্বিগ্ন করে, তা হলো— কারও লেখা পড়ে যদি মনে হয়, ‘বাহ, আমিও এমন কিছু লিখতে চাই’, তাহলে আমি তাঁর লেখা পড়া বন্ধ করে দিই। কারণ অনুকরণকারী হয়ে উঠতে চাই না।
আমার মধ্যে অন্যকে নকল করার একটি প্রবণতা আছে। চাইলে সহজেই কাউকে অনুকরণ করতে পারি। কিন্তু তাতে লেখাটি ব্যঙ্গাত্মক বা প্যারোডির মতো হয়ে উঠবে। এমন হয়, কারণ আমি যাঁকে অনুকরণ করতে চাই, তাঁর মতো মানুষ হয়ে উঠতে চাই না। অথচ কাউকে অনুকরণ করতে চেয়েও তাঁর মতো না হতে চাইলে, প্যারোডি ছাড়া আর কীভাবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব? যেমন, মাভিস গ্যালান্টের লেখা আমার ভালো লাগে। কিন্তু নিজে যখন লিখছি, তখন তাঁর লেখা পড়া এড়িয়ে চলি। কারণ তাঁর লেখার প্রভাব আমার মধ্যে এতটাই মিশে যেতে পারে যে, আমি নিজেই তাঁর লেখার মতো লিখতে শুরু করব।
আমি নিজের লেখককণ্ঠ সচেতনভাবে নির্মাণ করার কথা ভাবি না। তবে অন্য কারও কণ্ঠের সঙ্গে মিশে না যাওয়ার চেষ্টা করি।
উ. এ.: আমার মনে হয়, আপনাকে ও অ্যালিস মুনরোকে একসঙ্গে ভাবা যায়। আপনাদের দুজনের লেখাতেই বাস্তব জগৎ ও দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটির প্রতি গভীর টান রয়েছে। বিষয়গুলো ভালো হোক, মন্দ হোক, যন্ত্রণাদায়ক হোক কিংবা অন্য কিছু— আপনারা যেন সেগুলোকে গভীর আনন্দের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেন। আমার ধারণাটি কি ঠিক?
অ্যা. কা.: আপনার পর্যবেক্ষণটি বুঝতে পারছি। ‘গভীর আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা’— এটি বেশ ভালো একটি শব্দবন্ধ।
তবে অ্যালিস মুনরো ও আমি খুব আলাদা। আমাদের মধ্যে মিল সম্ভবত এই যে, জীবন যতই খারাপ হোক, তা থেকে আকর্ষণীয় কিছু তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে বাস্তব জগতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চারপাশের জিনিসগুলোর দিকে তাকানো— তুষার, আলো, দরজার জালের গন্ধ, কিংবা প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সামনে উপস্থিত বাস্তবতার যা কিছু উপাদান রয়েছে, সেসবের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। এতে একধরনের সান্ত্বনা রয়েছে। এসব কিছু চলতে থাকে, আর আমরা তা নিয়ে ভাবতে পারি, সেগুলোকে পাতার ওপর নতুন রূপ দিতে পারি।
উ. এ.: এবং এই অভিজ্ঞতা তো সবার জীবনেই চলতে থাকে।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, সবার জীবনেই চলতে থাকে। আর এই অভিজ্ঞতা আমরা সব সময় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।
জর্জ এলিয়টের লেখা পড়ার সময়ও আমি মূলত আবহাওয়ার বর্ণনাগুলো পড়ি। হয়তো তাঁর লেখা পড়ার এটি ভুল পদ্ধতি। কিন্তু তিনি যেভাবে গাছের ওপর আলো সরে যাওয়ার বর্ণনা দেন, কিংবা আলো একটি বেঞ্চের ওপর পড়ে আছে এবং সেখানে কারও পা রাখা— এসব দৃশ্য যেভাবে তুলে ধরেন, তাতে কী যে সান্ত্বনা পাই!
উ. এ.: অথচ আপনি এলিয়টের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন, কোনো কিছুর বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা নির্বুদ্ধিতার কাজ। তিনি কি সত্যিই এমন বলেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, বলেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বারবার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। তবে তিনি নিজের বর্ণনার পরিসর সীমিত রাখেন। আমার মনে হয়, বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর যতটা ছিল, তিনি নিজেকে ততটা ব্যবহার করতে দেননি। সাধারণত প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে আবহাওয়ার সামান্য বর্ণনা থাকে। তারপর তিনি জীবনের অর্থ নিয়ে মানুষের অধিবিদ্যাগত কথোপকথনে প্রবেশ করেন। কিন্তু আবহাওয়া সব সময় অধ্যায়ের শুরুতে থাকে, এবং তাকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি বিষয়টি ঠিক ধরতে পারেন। যেমন, সকাল এগারোটার সময় ওকগাছের বনের একটি পথে সূর্যের ওপর দিয়ে মেঘ সরে যাচ্ছে— তিনি এমনভাবে দৃশ্যটি বর্ণনা করেন, যেন বাস্তবে ঠিক এভাবেই ঘটনাটি ঘটেছিল।
লেখালেখির অন্য যেকোনো দিকের তুলনায় এই ক্ষমতাটিকেই আমি বেশি শ্রদ্ধা করি।
উ. এ.: সন্ধ্যার বর্ণনাতেও তিনি ভালো। অধ্যায়ের শুরুতে সকালের আবহাওয়া বর্ণনা করেন, আর শেষ করেন সন্ধ্যার আবহাওয়া দিয়ে।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। চীনা ও জাপানি কবিতা আমার কাছে এত তৃপ্তিদায়ক হওয়ার একটি কারণও এটি। আমার মনে হয়, সেসব কবিতারও একই উদ্দেশ্য রয়েছে। আসলে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে এটি তাদের একটি প্রধান পদ্ধতি। কোনো একটি মুহূর্তের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখা, তারপর সেই অভিজ্ঞতা থেকে এমন একটি অর্থের জন্ম দেওয়া, যা ওই মুহূর্তের চেয়ে বৃহত্তর। আমার মনে হয়, লেখালেখিতে এটিই একধরনের চূড়ান্ত সাফল্য। কিন্তু নিজের লেখালেখিতে আমি এই কাজটি করতে গিয়ে মায়ের কথা, আমার মোজা কিংবা প্রেমের জীবন নিয়ে লিখতে শুরু করি। সবকিছু জট পাকিয়ে যায়। আমার মনে হয়, আমি যদি আরও ভালো মানুষ হতাম, তাহলে এসব বিষয় বাদ দিয়ে শুধু আবহাওয়া, তুষার কিংবা আলোর একটি মুহূর্ত বর্ণনা করতে পারতাম। তাতে হয়তো আরও ভালো শিল্পকর্ম তৈরি হতো।
উ. এ.: আমার মনে হয়, আপনার মায়ের মৃত্যুর বার্ষিকীতে পাঠানো একটি ই-মেইলে আপনি ঠিক সেটিই করতে পেরেছিলেন। আপনি লিখেছিলেন, ‘একটি পুরোনো মোজার মতো আমি তাঁকে মিস করি।’
অ্যা. কা.: একটি মোজা থাকলে অন্যটিও দরকার হয়, তাই না? কোথায় থামতে হবে, সেই শিক্ষা ছিল ওই ই-মেইলে। কোথায় থামতে হয়, তা বুঝতে পারাই একটি ভালো লেখার বৈশিষ্ট্য।
উ. এ.: সাক্ষাৎকার শেষ করার জন্য এটিই বোধ হয় উপযুক্ত জায়গা। তবে আপনি যদি আর কিছু যোগ করতে চান—
অ্যা. কা.: জারট্রুড স্টাইনের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা যোগ করতে চাই: ‘এমনভাবে কাজ করো, যাতে কোনো কেন্দ্রের আর প্রয়োজন না থাকে।’ আমি আমার শিক্ষার্থীদের এই কথাটিই শেখানোর চেষ্টা করি।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
‘কানাডায় একটি লেখক কর্মশালায় অ্যান কারসনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়, ১৯৮৮ সালে। সেই থেকে আমরা একে অপরের লেখা পড়ে আসছি। এখানে যে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো, তা আমাদের নিয়মিত আলাপচারিতার সঙ্গে কারসনের লেখালেখিতে বারবার ফিরে আসা কয়েকটি বিষয়— মরমিবাদ, প্রাচীনত্ব, আসক্তি ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনার এক মিশ্র রূপ। ২০০২ সালের বড়দিনের ঠিক পরপরই আমরা এই সাক্ষাৎকারটি শুরু করি। উৎসবের আনন্দময় ব্যস্ততার ধকল তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি কারসন। তিনি কমলা রঙের মখমলের সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। আমরা কয়েক ঘণ্টা ধরে কথা বললাম। সঙ্গে ছিল ধোঁয়া ওঠা উলং চায়ের কাপ— দীর্ঘ আলাপের জন্য যা আমাদের দুজনকেই সতেজ রেখেছিল।’ —সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী উইল এইটকেন
সাক্ষাৎকারটি দ্য প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটির অংশ বিশেষ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন উজ্জ্বল শিখর
উইল এইটকেন : সবাই কি নিজের মধ্যে এই তীব্র আলো বহন করে? নাকি আপনার পেছনে আলোটি একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে?
অ্যান কারসন: আমার মনে হয়, প্রত্যেকেরই এই আলোর নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা আছে। তবে প্রত্যেকে একে আড়াল করে রাখে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। কোনো এক অজানা কারণে আমার আড়াল করার উপায় তুলনামূলকভাবে কম।
উ. এ.: আপনার কি মনে হয়, এই বৈশিষ্ট্যটি আপনার মধ্যে বরাবরই ছিল? আপনার শৈশব কেমন ছিল? আমি জানি, আপনাদের অনেকবার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
অ্যা. কা.: আমার বাবা ছিলেন ব্যাংকার। কানাডার ব্যাংকব্যবস্থায় ব্যাংকারদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কারণ, প্রতি তিন বছর অন্তর ব্যবস্থাপকদের বদলি করা সেখানকার রীতি। উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা যেন বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও ব্যাংকিংয়ের নানা ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এতে ব্যাংকের লাভ হয়, কিন্তু পরিবারের জন্য ব্যাপারটি বেশ কষ্টকর।
উ. এ.: তাহলে প্রতি তিন বছর অন্তর আপনাকে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হতো?
অ্যা. কা.: মোটামুটি তা-ই। আমার বিশ্বাস, এতে টিকে থাকার ক্ষমতা বেড়েছিল। একদিনের কথা মনে পড়ে। আমরা বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ছিলাম। জানতাম, তাদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। তখন মনে মনে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা, পরেরবার কোথাও গেলে আর বন্ধু তৈরি করব না। বন্ধুত্ব করে লাভ কী, যখন তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই?’ এভাবেই যেন নিজের চারপাশে সংকোচনের একটা প্রাচীর তুলে দিচ্ছিলাম, একের পর এক দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলাম।
উ. এ.: পরের শহরে গিয়ে কি আর নতুন বন্ধু তৈরি করেননি?
অ্যা. কা.: করেছি, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সতর্কভাবে। মনের অন্তত অর্ধেক অংশ সব সময় ভাবত, ‘আমি তো চলে যাব; এই সম্পর্ক টিকবে না।’ বৌদ্ধদের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এটি বেশ ভালো। আমি যদি বৌদ্ধ হতাম, তাহলে এই মনোভাব আমার খুব কাজে আসত। কিন্তু আমি বৌদ্ধ নই; তাই আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কেবল দুঃখের।
উ. এ.: বৌদ্ধ হলে তো আপনি ইতিমধ্যেই নির্বাণ বা বোধিলাভের পথে অনেক দূর এগিয়ে যেতেন।
অ্যা. কা.: তার বদলে আমি দৃঢ়ভাবে বোধিলাভ এড়িয়ে চলেছি।
উ. এ.: এবার প্রাচীন গ্রিস সম্পর্কে একটু কথা বলতে চাই। আপনি কি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রথম গ্রিক ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, ত্রয়োদশ শ্রেণিতে।
উ. এ.: শুরুতেই কি বুঝতে পেরেছিলেন, এই ভাষা আপনার জীবন বদলে দেবে?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গেই। মিসেস কোয়ান আমাকে গ্রিক ভাষা শেখাতে শুরু করেছিলেন। পোর্ট হোপে উচ্চবিদ্যালয়ে তিনি আমাদের লাতিন পড়াতেন। কিন্তু তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। আমি যে ভাষাটি শিখতে আগ্রহী, তা জানার পর তিনি নিজে থেকেই আমাকে শেখানোর প্রস্তাব দেন। আমরা দুপুরের খাবারের বিরতিতে পড়তাম।
উ. এ.: গ্রিক ভাষার আলাদা কোনো শ্রেণি ছিল না?
অ্যা. কা.: না। আমি ছাড়া আর কেউই ভাষাটি শিখতে আগ্রহী ছিল না। আমরা একসঙ্গে স্যাফোর কবিতা পড়তাম। অভিজ্ঞতাটি ছিল একেবারেই বৈপ্লবিক। পৃথিবীর সব ভাষা তো আর আমার জানা নেই। হয়তো সংস্কৃত ও চীনা ভাষা জানলে আমার চিন্তাভাবনা অন্য রকম হতো। কিন্তু গ্রিক ভাষার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা মনে হয় আধুনিক যেকোনো ভাষার চেয়ে শব্দের আরও গভীরে প্রবেশ করে। গ্রিক ভাষা পড়তে গেলে মনে হয়, শব্দ কীভাবে কাজ করে, তার একেবারে শিকড়ের কাছে পৌঁছে গেছি। আর ইংরেজি ভাষায় আমরা যেন গাছের ওপরের দিকে, ডালপালার মধ্যে ঘুরে বেড়াই।
আমার কাছে এটি ছিল বিস্ময়কর, এক নতুন সত্যের আবিষ্কারের মতো। সেই বিস্ময় এখনো কাটেনি। গ্রিক ভাষা আজও আমার কাছে এমন এক আশ্রয়স্থলের মতো, যার দ্বার সব সময় উন্মুক্ত। জায়গাটি অদ্ভুত, তবু স্বাগত জানায়।
উ. এ.: অনেকেই বলেন, প্রাচীন গ্রিকরা আসলে আমাদেরই সমকালীন মানুষ। আপনি কি একমত?
অ্যা. কা.: প্রাচীন বিষয়ের সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা আমি খুব একটা অনুভব করি না। সত্তর ও আশির দশকে, যখন আমি পড়াশোনা করছিলাম এবং শিক্ষকতা করছিলাম, তখনকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল। বলা হতো, ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্য হলো প্রাচীন জগতের সঙ্গে বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করা। এমন সব পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করে, আধুনিক জীবন সম্পর্কে যা কিছু জানা দরকার, সবই প্রাচীন গ্রিকদের অধ্যয়ন করে শেখা সম্ভব।
অন্তত বলতে গেলে, এই ধারণা অদ্ভুত।
গ্রিকদের প্রতি আমাদের আকর্ষণের কারণ অন্য কিছু। তাঁদের জগতের বিপুল অপরিচিতির মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ আমাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। চারদিকে এমন সব অদ্ভুত বিশ্বাস, জগৎ সম্পর্কে এমন সব ধারণা এবং জীবনের প্রতি এমন সব প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে আছে, যেগুলো আমাদের কাছে একেবারেই অর্থহীন মনে হয়। সেই বিশাল অপরিচিতির মধ্যে সামান্য কিছু পরিচিতির আভাস পাওয়াই আকর্ষণীয়।
উ. এ.: অর্থাৎ, এই গভীর অপরিচিত জগৎটিকে জানার আগ্রহই আপনাকে টানে। সেটি আমাদের বর্তমানের সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা এখানে মুখ্য নয়।
অ্যা. কা.: গ্রিকদের সম্পর্কে একটি বিষয় আমি বুঝতে পারি। তাঁরাও অপরিচিতি বা ভিন্নতাকে বুঝতেন এবং তার মূল্য দিতেন। দেবতা ডায়োনিসাস এই ধারণারই প্রতীক। এমন এক ভিন্নতার মুখোমুখি হওয়া, যা আপনাকে নিজের সত্তা থেকে ছিটকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়; অথচ সেই জায়গায় গিয়েও আপনি নিজের মধ্যেই অবস্থান করেন। যেন নিজের সঙ্গেই আপনার এক অপর সত্তা হিসেবে সম্পর্ক তৈরি হয়।
গ্রিকরা একে বলত বপংঃধংু— পরমানন্দ বা আত্মসত্তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রমের অভিজ্ঞতা। এই ধারণাটি গ্রিকরাই উদ্ভাবন করেছিল। একই সঙ্গে তার মূর্ত উদাহরণ হিসেবেও তারা আমাদের সামনে উপস্থিত। অবশ্য এর মধ্যে প্রাচীন গ্রিকদের প্রতি আমাদের উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করে থাকতে পারে। কে জানে!
আমরা সব সময়ই গ্রিকদের দিকে ফিরে তাকাব এবং আমাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী, তা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু এমন কোনো তৃতীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমরা বিচার করতে পারব না, যেখান থেকে আমরা নিজেরাও নই, গ্রিকরাও নই— দুজনকেই বাইরে থেকে দেখা যায়।
উ. এ.: অনেকেই জানেন না, আপনি ভাষার শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি দৃশ্যশিল্পীও। আপনি বই তৈরি করেন— একেকজন মানুষের জন্য একেকটি বই। একবার মনে আছে, আমরা অন্টারিওর গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। চারপাশ ছিল বরফে ঢাকা, সবকিছু সাদা। একসময় আপনি দূরের একটি জায়গা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি একসময় ওখানে থাকতাম।’ আমার মনে হয়, জায়গাটি ছিল পোর্ট হোপ। আমি তাকিয়ে ভেবেছিলাম, ‘ওখানে কেউ কখনো থাকত বলে তো মনে হয় না। চারদিকে তো কিছুই নেই!’ এরপর আপনি আমাকে একটি সাদা বই দিয়েছিলেন। আপনার ভাই মাইকেলের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে বইটি তৈরি করেছিলেন।
অ্যা. কা.: এখান থেকে টরন্টো যাওয়ার ট্রেনে উঠলে পোর্ট হোপের কাছাকাছি আসার সময় আমার সব সময় একধরনের অস্বস্তি হয়। আমার পরিবার সেখানে ছয়-সাত বছর ছিল। আমার বাবা-মা প্রায় পনেরো বছর সেখানে ছিলেন, আর আমার ভাইও জীবনের বিভিন্ন সময়ে সেখানে থেকেছে। বইটি যেহেতু তাকে নিয়ে, তাই জায়গাটির সঙ্গে বইটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গায় আমাদের সবার জীবন যেন ভেঙে পড়েছিল। না, কথাটা একটু বেশি কঠোর হয়ে গেল। বরং বলা ভালো, সেখানে এসে আমার ভাই ও আমি— দুজনেই আমাদের কৈশোরের শেষ সীমায় পৌঁছেছিলাম। সেটি জীবনের একটি গুরুতর সন্ধিক্ষণ।
উ. এ.: তাহলে ভাইয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার উপায় হিসেবেই বইটি লিখেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। আমার ভাই যখন মারা যায়, তার আগে বাইশ বছর ধরে আমি তার সঙ্গে দেখা করিনি। সে আমার কাছে এক রহস্যময় মানুষ ছিল। অন্য একটি দেশে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছিল। তখন তার জীবনের বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলো একত্র করে এমন কিছু তৈরি করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম, যাকে একটি নির্দিষ্ট রূপের মধ্যে ধরে রাখা যায়। এই অর্থে বইটি একটি শোকগাথা। একজন মানুষ যখন আর আমাদের নাগালের মধ্যে থাকে না, তখন তাকে কোনোভাবে একটি সীমাবদ্ধ রূপের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা।
উ. এ.: আমার মনে আছে, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন আপনার লেখাকে মানুষ গুরুত্ব দিতে চাইত না। আপনি বলতেন, ‘মারা যাওয়ার পনেরো মিনিট পর আমি বিখ্যাত হব।’ গত কয়েক বছরে সবকিছু বদলে গেছে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলেছে?
অ্যা. কা.: খুব বেশি নয়। বিমানবন্দরে কেউ আমাকে চিনে স্বাগত জানালে ভালো লাগে, এটুকু বলতে পারি। লেখালেখির ক্ষেত্রেও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। শুধু এখন মনে হয়, যা খুশি করার স্বাধীনতা কিছুটা বেড়েছে। এর ভালো ও খারাপ— দুই দিকই আছে। ভালো এই অর্থে যে, এখন অনুসন্ধানের একটি মুক্ত পরিসর তৈরি হয়েছে। খারাপ এই অর্থে যে, আগের মতো করে কেউ আমার কাজের বিচার করছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হয়।
আগে এমন একটি শূন্য পরিসর ছিল, যেখানে আমার কাজের মূল্যায়ন করা হতো। এখন যেন আগে থেকেই একটি নির্ধারিত পরিসর তৈরি রয়েছে। সেখানে একটি বিচার আগে থেকেই উপস্থিত থাকে, আর আমাকে সেই বিচার অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে হয়, অথবা ব্যর্থ হতে হয়। আমি সেই পরিসরে প্রবেশ করার আগেই বিচারটি বদলে গেছে।
উ. এ.: আগে আপনার লেখা দেখে মানুষ একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে যেত। তারা বলত, ‘এ তো কবিতা নয়, স্পষ্টতই গদ্য। এখানে অনুচ্ছেদ আছে। গদ্য ও কবিতার পার্থক্য আমি বুঝতে পারি।’ তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ অবজ্ঞাপূর্ণ।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। তারপর যা ঘটেছে, তাকে অনেকে দৃষ্টান্তের পরিবর্তন বা ঢ়ধৎধফরমস ংযরভঃ বলেন। এখন নাকি আমি কিছু ভুল করতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হয়, এর প্রকৃত অর্থ হলো, মানুষ এখনো আমার কাজ সম্পর্কে অন্ধভাবে বিচার করছে— শুধু সেই বিচারটি আগের মতো নয়।
কেন এমন হয়, জানি না। সম্ভবত মানুষ চিন্তা করতে ভয় পায়। তারা আগে থেকেই তৈরি কোনো শ্রেণি বা পরিচয়ের মধ্যে জিনিসকে বসিয়ে দিতে চায়। তখন বলতে পারে, ‘আচ্ছা, এখন আমরা জানি এটি ভালো। এবার নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যায়।’
উ. এ.: ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পাওয়ার পরও কি একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল? জানি, এর ফলে আপনার জীবনযাত্রা খুব বিলাসবহুল হয়ে ওঠেনি।
অ্যা. কা.: কীভাবে বলছেন? মনে হয়, কয়েক জোড়া মোজা কিনেছিলাম। মোজা আর একটি নতুন বালিশের খোল। এ ছাড়া এখন যেকোনো সময় ব্যাংকে ঢুকতে পারি। দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আমাকে দেখলে কর্মীরা দৌড়ে এসে ভেতরে নিয়ে যান, পেছনের ঘরে বসতে দেন। ব্যাপারটি আমার বেশ মজার লাগে। এছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
উ. এ.: অর্থ সম্পর্কে আপনার একটি মজার তত্ত্ব রয়েছে।
অ্যা. কা.: তেমন মজার কিছু নয়। প্রচলিত ধারণাটির ঠিক উল্টো কথা বলেছি মাত্র। সাধারণভাবে মনে করা হয়, জীবনের সব অর্থই— শুধু টাকা নয়, সব সংখ্যাই— ক্রমশ বড় হওয়া উচিত। কিন্তু কেন সংখ্যাগুলো বড় হবে? এর কোনো যুক্তি দেখি না। আপনি যদি ধারণাটি উল্টে দেন এবং ভাবেন যে জীবনের সব সংখ্যা ক্রমশ ছোট হওয়া উচিত, তাহলে জীবন অনেক ভালো হয়ে উঠবে।
উ. এ.: আপনার বাবা এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কী ভাবতেন?
অ্যা. কা.: বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাবা এই মত পোষণ করতেন না।
উ. এ.: টাকা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?
অ্যা. কা.: জটিল। আমি কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয় না। শুধু এটুকু জানি, অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে যখনই আলোচনা হতো, শেষ পর্যন্ত আমরা দুজন একটি টেবিলে বসে থাকতাম। চারপাশে ছড়িয়ে থাকত কাগজের ন্যাপকিন, তার ওপর নানা হিসাব-নিকাশ লেখা। আমাদের দুজনের কাছেই ব্যাপারটি ছিল চরম হতাশাজনক।
উ. এ.: কানাডা থেকে আসা আপনার লেখক সত্তাকে কোনোভাবে গড়ে দিয়েছে বলে মনে হয়?
অ্যা. কা.: না, তা মনে হয় না। অন্য কোথাও জন্মালে আমি অন্য রকম হতাম কি না, তা-ও জানি না।
যুক্তরাষ্ট্রে গেলে নিজেকে কিছুটা আলাদা মনে হয়। কিন্তু সেই অনুভূতির ব্যাখ্যা ভাষায় দিতে পারি না। আবার কানাডায় ফিরে এলে স্বস্তি অনুভব করি। হয়তো কারণ, এখানে চোখে পড়ার মতো আলাদা কেউ হয়ে থাকতে হয় না। সহজেই সবার আড়ালে থাকা যায়। কানাডার পাথর, বাতাস এবং পৃথিবীর নিজস্ব গন্ধ— এসব আমি মিস করি। কিন্তু কানাডা আমাকে লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে, এমন মনে হয় না।
উ. এ.: সমকালীন কোনো লেখকের লেখা কি আপনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে? অন্য লেখকের প্রভাবের আশঙ্কা কি আপনাকে উদ্বিগ্ন করে?
অ্যা. কা.: যতটা উদ্বিগ্ন করে, তা হলো— কারও লেখা পড়ে যদি মনে হয়, ‘বাহ, আমিও এমন কিছু লিখতে চাই’, তাহলে আমি তাঁর লেখা পড়া বন্ধ করে দিই। কারণ অনুকরণকারী হয়ে উঠতে চাই না।
আমার মধ্যে অন্যকে নকল করার একটি প্রবণতা আছে। চাইলে সহজেই কাউকে অনুকরণ করতে পারি। কিন্তু তাতে লেখাটি ব্যঙ্গাত্মক বা প্যারোডির মতো হয়ে উঠবে। এমন হয়, কারণ আমি যাঁকে অনুকরণ করতে চাই, তাঁর মতো মানুষ হয়ে উঠতে চাই না। অথচ কাউকে অনুকরণ করতে চেয়েও তাঁর মতো না হতে চাইলে, প্যারোডি ছাড়া আর কীভাবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব? যেমন, মাভিস গ্যালান্টের লেখা আমার ভালো লাগে। কিন্তু নিজে যখন লিখছি, তখন তাঁর লেখা পড়া এড়িয়ে চলি। কারণ তাঁর লেখার প্রভাব আমার মধ্যে এতটাই মিশে যেতে পারে যে, আমি নিজেই তাঁর লেখার মতো লিখতে শুরু করব।
আমি নিজের লেখককণ্ঠ সচেতনভাবে নির্মাণ করার কথা ভাবি না। তবে অন্য কারও কণ্ঠের সঙ্গে মিশে না যাওয়ার চেষ্টা করি।
উ. এ.: আমার মনে হয়, আপনাকে ও অ্যালিস মুনরোকে একসঙ্গে ভাবা যায়। আপনাদের দুজনের লেখাতেই বাস্তব জগৎ ও দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটির প্রতি গভীর টান রয়েছে। বিষয়গুলো ভালো হোক, মন্দ হোক, যন্ত্রণাদায়ক হোক কিংবা অন্য কিছু— আপনারা যেন সেগুলোকে গভীর আনন্দের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেন। আমার ধারণাটি কি ঠিক?
অ্যা. কা.: আপনার পর্যবেক্ষণটি বুঝতে পারছি। ‘গভীর আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা’— এটি বেশ ভালো একটি শব্দবন্ধ।
তবে অ্যালিস মুনরো ও আমি খুব আলাদা। আমাদের মধ্যে মিল সম্ভবত এই যে, জীবন যতই খারাপ হোক, তা থেকে আকর্ষণীয় কিছু তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে বাস্তব জগতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চারপাশের জিনিসগুলোর দিকে তাকানো— তুষার, আলো, দরজার জালের গন্ধ, কিংবা প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সামনে উপস্থিত বাস্তবতার যা কিছু উপাদান রয়েছে, সেসবের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। এতে একধরনের সান্ত্বনা রয়েছে। এসব কিছু চলতে থাকে, আর আমরা তা নিয়ে ভাবতে পারি, সেগুলোকে পাতার ওপর নতুন রূপ দিতে পারি।
উ. এ.: এবং এই অভিজ্ঞতা তো সবার জীবনেই চলতে থাকে।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, সবার জীবনেই চলতে থাকে। আর এই অভিজ্ঞতা আমরা সব সময় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।
জর্জ এলিয়টের লেখা পড়ার সময়ও আমি মূলত আবহাওয়ার বর্ণনাগুলো পড়ি। হয়তো তাঁর লেখা পড়ার এটি ভুল পদ্ধতি। কিন্তু তিনি যেভাবে গাছের ওপর আলো সরে যাওয়ার বর্ণনা দেন, কিংবা আলো একটি বেঞ্চের ওপর পড়ে আছে এবং সেখানে কারও পা রাখা— এসব দৃশ্য যেভাবে তুলে ধরেন, তাতে কী যে সান্ত্বনা পাই!
উ. এ.: অথচ আপনি এলিয়টের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন, কোনো কিছুর বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা নির্বুদ্ধিতার কাজ। তিনি কি সত্যিই এমন বলেছিলেন?
অ্যা. কা.: হ্যাঁ, বলেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বারবার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। তবে তিনি নিজের বর্ণনার পরিসর সীমিত রাখেন। আমার মনে হয়, বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর যতটা ছিল, তিনি নিজেকে ততটা ব্যবহার করতে দেননি। সাধারণত প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে আবহাওয়ার সামান্য বর্ণনা থাকে। তারপর তিনি জীবনের অর্থ নিয়ে মানুষের অধিবিদ্যাগত কথোপকথনে প্রবেশ করেন। কিন্তু আবহাওয়া সব সময় অধ্যায়ের শুরুতে থাকে, এবং তাকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি বিষয়টি ঠিক ধরতে পারেন। যেমন, সকাল এগারোটার সময় ওকগাছের বনের একটি পথে সূর্যের ওপর দিয়ে মেঘ সরে যাচ্ছে— তিনি এমনভাবে দৃশ্যটি বর্ণনা করেন, যেন বাস্তবে ঠিক এভাবেই ঘটনাটি ঘটেছিল।
লেখালেখির অন্য যেকোনো দিকের তুলনায় এই ক্ষমতাটিকেই আমি বেশি শ্রদ্ধা করি।
উ. এ.: সন্ধ্যার বর্ণনাতেও তিনি ভালো। অধ্যায়ের শুরুতে সকালের আবহাওয়া বর্ণনা করেন, আর শেষ করেন সন্ধ্যার আবহাওয়া দিয়ে।
অ্যা. কা.: হ্যাঁ। চীনা ও জাপানি কবিতা আমার কাছে এত তৃপ্তিদায়ক হওয়ার একটি কারণও এটি। আমার মনে হয়, সেসব কবিতারও একই উদ্দেশ্য রয়েছে। আসলে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে এটি তাদের একটি প্রধান পদ্ধতি। কোনো একটি মুহূর্তের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখা, তারপর সেই অভিজ্ঞতা থেকে এমন একটি অর্থের জন্ম দেওয়া, যা ওই মুহূর্তের চেয়ে বৃহত্তর। আমার মনে হয়, লেখালেখিতে এটিই একধরনের চূড়ান্ত সাফল্য। কিন্তু নিজের লেখালেখিতে আমি এই কাজটি করতে গিয়ে মায়ের কথা, আমার মোজা কিংবা প্রেমের জীবন নিয়ে লিখতে শুরু করি। সবকিছু জট পাকিয়ে যায়। আমার মনে হয়, আমি যদি আরও ভালো মানুষ হতাম, তাহলে এসব বিষয় বাদ দিয়ে শুধু আবহাওয়া, তুষার কিংবা আলোর একটি মুহূর্ত বর্ণনা করতে পারতাম। তাতে হয়তো আরও ভালো শিল্পকর্ম তৈরি হতো।
উ. এ.: আমার মনে হয়, আপনার মায়ের মৃত্যুর বার্ষিকীতে পাঠানো একটি ই-মেইলে আপনি ঠিক সেটিই করতে পেরেছিলেন। আপনি লিখেছিলেন, ‘একটি পুরোনো মোজার মতো আমি তাঁকে মিস করি।’
অ্যা. কা.: একটি মোজা থাকলে অন্যটিও দরকার হয়, তাই না? কোথায় থামতে হবে, সেই শিক্ষা ছিল ওই ই-মেইলে। কোথায় থামতে হয়, তা বুঝতে পারাই একটি ভালো লেখার বৈশিষ্ট্য।
উ. এ.: সাক্ষাৎকার শেষ করার জন্য এটিই বোধ হয় উপযুক্ত জায়গা। তবে আপনি যদি আর কিছু যোগ করতে চান—
অ্যা. কা.: জারট্রুড স্টাইনের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা যোগ করতে চাই: ‘এমনভাবে কাজ করো, যাতে কোনো কেন্দ্রের আর প্রয়োজন না থাকে।’ আমি আমার শিক্ষার্থীদের এই কথাটিই শেখানোর চেষ্টা করি।

আপনার মতামত লিখুন