সংবাদ

ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, একই আঙিনায় আজান-শঙ্খধ্বনি


প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল
প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, একই আঙিনায় আজান-শঙ্খধ্বনি
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরে চৌধুরী বাড়ির বামপাশে মসজিদ ও ডানপাশে মন্দির। ছবি : সংবাদ

একই সীমানাপ্রাচীরের অভ্যন্তরে মহিমান্বিত রূপে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে যখন ধূপের সুবাস আর দেবীর আবাহনে বাজছে ঢাকের বোল, অন্যপাশে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পবিত্র আজানের সুমধুর সুর। কোনো ধরনের উসকানি কিংবা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ছুঁতে পারেনি এই আঙিনাকে; বরং যুগ যুগ ধরে এখানে পাশাপাশি চলছে দুই ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রার্থনার স্বতঃস্ফূর্ত ধারাবাহিকতা।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়িতে দেখা মিলেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন চিরন্তন ও গৌরবময় দৃশ্য।

সরেজমিনে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে স্থানীয় শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৯৬২ সালে একই চত্বরে নির্মিত হয় ‘চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’। সেই থেকে বিগত প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ, যার দক্ষিণ প্রান্তেই রয়েছে মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা।

বর্তমানে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ। ঢাকের আওয়াজ, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ থাকলেও সেখানে অক্ষুণ্ন রয়েছে সুগভীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা। মসজিদে আজানের ধ্বনি শোনামাত্রই মন্দিরের ঢাক-ঢোল, আতসবাজিসহ সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ও শব্দ পরিবেশন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ধরে কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা ছাড়াই এই অলিখিত নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলা হচ্ছে।

চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির আপন মহিমায় বিরাজ করছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এবং স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। আজ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, “আমাদের ধর্মীয় উৎসবে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় মুসলমান ভাইয়েরা অত্যন্ত সজাগ ও সহনশীল। নাগরপুরের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক।”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১,৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে নাগরপুরের ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়ির মণ্ডপটি এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বনিক এবং টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, আবহমান বাংলার সম্প্রীতির চমৎকার একটি উদাহরণ নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি। পূজাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হলেও এখানে কোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত শঙ্কা নেই।

টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, “আমাদের ঐতিহ্য হলো প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন। একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।”

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, একই আঙিনায় আজান-শঙ্খধ্বনি

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একই সীমানাপ্রাচীরের অভ্যন্তরে মহিমান্বিত রূপে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে যখন ধূপের সুবাস আর দেবীর আবাহনে বাজছে ঢাকের বোল, অন্যপাশে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পবিত্র আজানের সুমধুর সুর। কোনো ধরনের উসকানি কিংবা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ছুঁতে পারেনি এই আঙিনাকে; বরং যুগ যুগ ধরে এখানে পাশাপাশি চলছে দুই ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রার্থনার স্বতঃস্ফূর্ত ধারাবাহিকতা।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়িতে দেখা মিলেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন চিরন্তন ও গৌরবময় দৃশ্য।

সরেজমিনে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে স্থানীয় শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৯৬২ সালে একই চত্বরে নির্মিত হয় ‘চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’। সেই থেকে বিগত প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ, যার দক্ষিণ প্রান্তেই রয়েছে মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা।

বর্তমানে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ। ঢাকের আওয়াজ, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ থাকলেও সেখানে অক্ষুণ্ন রয়েছে সুগভীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা। মসজিদে আজানের ধ্বনি শোনামাত্রই মন্দিরের ঢাক-ঢোল, আতসবাজিসহ সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ও শব্দ পরিবেশন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ধরে কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা ছাড়াই এই অলিখিত নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলা হচ্ছে।

চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির আপন মহিমায় বিরাজ করছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এবং স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। আজ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, “আমাদের ধর্মীয় উৎসবে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় মুসলমান ভাইয়েরা অত্যন্ত সজাগ ও সহনশীল। নাগরপুরের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক।”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১,৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে নাগরপুরের ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়ির মণ্ডপটি এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বনিক এবং টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, আবহমান বাংলার সম্প্রীতির চমৎকার একটি উদাহরণ নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি। পূজাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হলেও এখানে কোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত শঙ্কা নেই।

টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, “আমাদের ঐতিহ্য হলো প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন। একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।”


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত