সংবাদ

রংপুরে ঝুলছে ৬ হাজার মামলা, কাঁদছেন নির্যাতিত নারীরা


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

রংপুরে ঝুলছে ৬ হাজার মামলা, কাঁদছেন নির্যাতিত নারীরা
১৫-১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন নির্যাতিত নারীরা

রংপুরের তিনটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ৬ হাজারের বেশি মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন বিচারপ্রার্থী নির্যাতিত নারীরা। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের। ৩০০-এর বেশি মামলায় ৫ থেকে ১৮ বছর পার হলেও বিচার শুরুই হয়নি।

সরেজমিনে নারী ও শিশু আদালত ঘুরে পাওয়া গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-২ এর সামনে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অনন্দনগর গ্রামের শরীফা ইয়াসমিন। ২ লাখ টাকা যৌতুক দিতে না পারায় তাকে স্বামী ও শাশুড়ির বাড়ির লোকজন বাসা থেকে বের করে দেয়।

যৌতুক আইনে মামলা করছেন ৬ বছর ধরে, আদালতে আসছেন, কিন্তু বিচার শুরু হয়নি। কবে বিচার পাবেন, জানেন না। ২ মাস পর পর মামলার তারিখ পিছিয়ে যায়। উকিল, মহুরী এবং পেশকারের খরচ জোগাতে গিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে ফেলেছেন তিনি।

একই অভিযোগ পীরগাছার আসমা বেগম, রংপুর সদরের মারিয়ম বেগমসহ অনেকের। বেশিরভাগ মামলাই ধর্ষণের, যা ৬ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচার শেষ হচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, সহায়-সম্বল যা ছিল বিক্রি করে প্রতি তারিখে আদালতে আসেন, উকিল-মহুরী-পেশকারকে টাকা দেন আর বাড়ি ফিরে যান। 

মিঠাপুকুর উপজেলার হতদরিদ্র আসমা বেগম জানান, তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে, ৮ বছরেও বিচার শুরু হয়নি। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ভেন্ডাবাড়ি গ্রামের সোহরাব হোসেন অভিযোগ করেন, ১৮ বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন একটি ধর্ষণের মামলায়। 

ঢাকায় রিকশা চালান, ২ মাস পর রংপুরে আদালতে আসেন হাজিরা দিতে, আবার চলে যান। মামলার ধার্য তারিখে না আসলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়, তাই বাধ্য হয়ে আসতে হয়। তাদের মতো আরও অনেক নারী ও শিশু পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও বিচার পাচ্ছেন না।

দীর্ঘদিন ধরে বিচার সম্পন্ন না হওয়ার জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, আদালতে সাক্ষী হাজির করার ব্যাপারে পুলিশের দায়িত্বহীনতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারীদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছেন মানবাধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচারপ্রার্থীরা।

রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিচারপ্রার্থীরা আদালতের বারান্দায় আসছেন আর ফিরে যাচ্ছেন। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও বিচারক নিয়োগ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরেক নারী নেত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, রংপুরে নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার না হওয়ায় এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতায় না আসায় নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ জন্য বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে বিচার না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তারা বলছেন, মামলার বাদীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তারা চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিচারপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।

আদালত-১ এর বিশেষ পিপি শফি কামাল জানান, ওই আদালতে প্রায় ২ হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। মামলার তারিখে সাক্ষী আসেন না, আবার বাদীও ঠিকমতো আদালতে আসেন না। এতে মামলার জট বাড়ছে। তবে বিচারক ও তারা বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দিতে চেষ্টা করছেন।

আদালত-২ এর বিশেষ পিপি মোকসেদুল হকও একই কথা বলেন। তিনি জানান, দ্রুত বিচারপ্রার্থীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুরের আদালতে নারী নির্যাতনের মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা সেল গঠন এবং উচ্চ আদালতের কঠোর মনিটরিং দরকার।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬


রংপুরে ঝুলছে ৬ হাজার মামলা, কাঁদছেন নির্যাতিত নারীরা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রংপুরের তিনটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ৬ হাজারের বেশি মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন বিচারপ্রার্থী নির্যাতিত নারীরা। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের। ৩০০-এর বেশি মামলায় ৫ থেকে ১৮ বছর পার হলেও বিচার শুরুই হয়নি।

সরেজমিনে নারী ও শিশু আদালত ঘুরে পাওয়া গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-২ এর সামনে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অনন্দনগর গ্রামের শরীফা ইয়াসমিন। ২ লাখ টাকা যৌতুক দিতে না পারায় তাকে স্বামী ও শাশুড়ির বাড়ির লোকজন বাসা থেকে বের করে দেয়।

যৌতুক আইনে মামলা করছেন ৬ বছর ধরে, আদালতে আসছেন, কিন্তু বিচার শুরু হয়নি। কবে বিচার পাবেন, জানেন না। ২ মাস পর পর মামলার তারিখ পিছিয়ে যায়। উকিল, মহুরী এবং পেশকারের খরচ জোগাতে গিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে ফেলেছেন তিনি।

একই অভিযোগ পীরগাছার আসমা বেগম, রংপুর সদরের মারিয়ম বেগমসহ অনেকের। বেশিরভাগ মামলাই ধর্ষণের, যা ৬ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচার শেষ হচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, সহায়-সম্বল যা ছিল বিক্রি করে প্রতি তারিখে আদালতে আসেন, উকিল-মহুরী-পেশকারকে টাকা দেন আর বাড়ি ফিরে যান। 

মিঠাপুকুর উপজেলার হতদরিদ্র আসমা বেগম জানান, তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে, ৮ বছরেও বিচার শুরু হয়নি। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ভেন্ডাবাড়ি গ্রামের সোহরাব হোসেন অভিযোগ করেন, ১৮ বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন একটি ধর্ষণের মামলায়। 

ঢাকায় রিকশা চালান, ২ মাস পর রংপুরে আদালতে আসেন হাজিরা দিতে, আবার চলে যান। মামলার ধার্য তারিখে না আসলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়, তাই বাধ্য হয়ে আসতে হয়। তাদের মতো আরও অনেক নারী ও শিশু পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও বিচার পাচ্ছেন না।

দীর্ঘদিন ধরে বিচার সম্পন্ন না হওয়ার জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, আদালতে সাক্ষী হাজির করার ব্যাপারে পুলিশের দায়িত্বহীনতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারীদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছেন মানবাধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচারপ্রার্থীরা।

রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিচারপ্রার্থীরা আদালতের বারান্দায় আসছেন আর ফিরে যাচ্ছেন। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও বিচারক নিয়োগ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরেক নারী নেত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, রংপুরে নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার না হওয়ায় এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতায় না আসায় নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ জন্য বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে বিচার না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তারা বলছেন, মামলার বাদীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তারা চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিচারপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।

আদালত-১ এর বিশেষ পিপি শফি কামাল জানান, ওই আদালতে প্রায় ২ হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। মামলার তারিখে সাক্ষী আসেন না, আবার বাদীও ঠিকমতো আদালতে আসেন না। এতে মামলার জট বাড়ছে। তবে বিচারক ও তারা বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দিতে চেষ্টা করছেন।

আদালত-২ এর বিশেষ পিপি মোকসেদুল হকও একই কথা বলেন। তিনি জানান, দ্রুত বিচারপ্রার্থীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুরের আদালতে নারী নির্যাতনের মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা সেল গঠন এবং উচ্চ আদালতের কঠোর মনিটরিং দরকার।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত