সংবাদ

আরটিআই তথ্যে তোলপাড়, কোন্দলে ভারতের নির্বাচন কমিশন


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০১ এএম

আরটিআই তথ্যে তোলপাড়, কোন্দলে ভারতের নির্বাচন কমিশন
ছবি : সংগৃহীত

দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই কি বাড়ছে মতবিরোধ? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয়ের কোনও পদক্ষেপ না করার তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা নথি ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে পৃথক দুটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। দুই কমিশনারের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গ। তাদের বক্তব্য ছিল, নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা না করেই তিনি সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডিরেক্টর জেনারেল এবং সমমর্যাদার আধিকারিকদের মধ্যে কাজের দায়িত্ব বণ্টন করেছিলেন। এই পদক্ষেপের বৈধতা ও প্রশাসনিক পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন তারা।

শুধু কাজের দায়িত্ব বণ্টন নয়, মনীশ গর্গের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারী আচরণের অভিযোগও তোলা হয়েছিল বলে আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

কেন কোনও পদক্ষেপ করল না ক্যাবিনেট সচিবালয়?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি উঠে এসেছে আরটিআই-এর জবাবে। সমাজকর্মী কমোডোর লোকেশ কে বাটরা এই বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। তার প্রশ্নের উত্তরে ক্যাবিনেট সচিবালয় জানিয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। চিঠি দুটি এসেছিল দুই কমিশনারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

ক্যাবিনেট সচিবালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সমগ্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ না আসায় এই বিষয়ে পদক্ষেপ করা কিংবা নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজে হস্তক্ষেপ করা যথাযথ হতো না। অর্থাৎ, অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও তার ভিত্তিতে সরাসরি কোনও পদক্ষেপের পথে হাঁটেনি কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয়।

আরটিআই-এর জবাবে আরও জানানো হয়েছে, চিঠি দুটি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছিল। চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের কাছেও। ভবিষ্যতে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে ওই চিঠিগুলিকে বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন, কমিশনের অন্দরে কী ঘটেছিল?

এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ কেন প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে মীমাংসা করা গেল না। দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি এবং ক্যাবিনেট সচিবালয়ের সীমিত ভূমিকা—সব মিলিয়ে সামনে এসেছে একাধিক প্রশাসনিক প্রশ্ন।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। আরটিআই-এর মাধ্যমে চিঠি ও তার প্রেক্ষিতে ক্যাবিনেট সচিবালয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তথ্য সামনে আসা মানেই অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। একইভাবে, ক্যাবিনেট সচিবালয় কোনও পদক্ষেপ করেনি বলেই অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রযোজ্য নিয়ম এবং নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের নিষ্পত্তি কোথায়?

নির্বাচন কমিশন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্তরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাজকর্ম নিয়ে দুই কমিশনারের আপত্তি এবং সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে।

এখন নজর থাকবে, এই অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আরও কোনও নথি প্রকাশ্যে আসে কি না। কারণ, বিষয়টি শুধুমাত্র কয়েকজন আধিকারিকের মধ্যে মতবিরোধের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও জনবিশ্বাসের প্রশ্ন।

/ 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


আরটিআই তথ্যে তোলপাড়, কোন্দলে ভারতের নির্বাচন কমিশন

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই কি বাড়ছে মতবিরোধ? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয়ের কোনও পদক্ষেপ না করার তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা নথি ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে পৃথক দুটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। দুই কমিশনারের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গ। তাদের বক্তব্য ছিল, নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা না করেই তিনি সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডিরেক্টর জেনারেল এবং সমমর্যাদার আধিকারিকদের মধ্যে কাজের দায়িত্ব বণ্টন করেছিলেন। এই পদক্ষেপের বৈধতা ও প্রশাসনিক পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন তারা।

শুধু কাজের দায়িত্ব বণ্টন নয়, মনীশ গর্গের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারী আচরণের অভিযোগও তোলা হয়েছিল বলে আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

কেন কোনও পদক্ষেপ করল না ক্যাবিনেট সচিবালয়?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি উঠে এসেছে আরটিআই-এর জবাবে। সমাজকর্মী কমোডোর লোকেশ কে বাটরা এই বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। তার প্রশ্নের উত্তরে ক্যাবিনেট সচিবালয় জানিয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। চিঠি দুটি এসেছিল দুই কমিশনারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

ক্যাবিনেট সচিবালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সমগ্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ না আসায় এই বিষয়ে পদক্ষেপ করা কিংবা নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজে হস্তক্ষেপ করা যথাযথ হতো না। অর্থাৎ, অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও তার ভিত্তিতে সরাসরি কোনও পদক্ষেপের পথে হাঁটেনি কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয়।

আরটিআই-এর জবাবে আরও জানানো হয়েছে, চিঠি দুটি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছিল। চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের কাছেও। ভবিষ্যতে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে ওই চিঠিগুলিকে বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন, কমিশনের অন্দরে কী ঘটেছিল?

এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ কেন প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে মীমাংসা করা গেল না। দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি এবং ক্যাবিনেট সচিবালয়ের সীমিত ভূমিকা—সব মিলিয়ে সামনে এসেছে একাধিক প্রশাসনিক প্রশ্ন।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। আরটিআই-এর মাধ্যমে চিঠি ও তার প্রেক্ষিতে ক্যাবিনেট সচিবালয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তথ্য সামনে আসা মানেই অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। একইভাবে, ক্যাবিনেট সচিবালয় কোনও পদক্ষেপ করেনি বলেই অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রযোজ্য নিয়ম এবং নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের নিষ্পত্তি কোথায়?

নির্বাচন কমিশন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্তরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাজকর্ম নিয়ে দুই কমিশনারের আপত্তি এবং সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে।

এখন নজর থাকবে, এই অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আরও কোনও নথি প্রকাশ্যে আসে কি না। কারণ, বিষয়টি শুধুমাত্র কয়েকজন আধিকারিকের মধ্যে মতবিরোধের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও জনবিশ্বাসের প্রশ্ন।

/ 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত