সংবাদ

প্রবন্ধ / নববর্ষ সংখ্যা ১৪৩৩

বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে


আইয়ুব মুহাম্মদ খান
আইয়ুব মুহাম্মদ খান
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১১ এএম

বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে

পহেলা বৈশাখ বাঙালির আড়াই হাজার বছরের সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও উপাদানগুলো সামনে নিয়ে আসে প্রতিবছর। সতত ষোলআনা নতুন সুধা দান করে বাঙালির মনে। সংস্কৃতির মধুভাণ্ডও সমৃদ্ধ করে যায় পুরোমাত্রায়। কোমলমতি ছোটো বাঙালি শিশুদের মনেও বৈশাখ আনন্দের মধু ঢেলে দিয়ে যায়। 

এদেশে যেমন ‘অমর একুশের চেতনা’ আছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আছে, তেমনি আছে ‘নববর্ষের চেতনা’। যে জাতির বর্ষপঞ্জি আছে, সে জাতি আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষ পালন করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে, সব সংস্কৃতিতেই নববর্ষ উদ্যাপনের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। অবশ্য নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-প্রকৃতি ও পদ্ধতি-প্রকরণের মধ্যে দেশে দেশে তারতম্য আছে। দেশে দেশে তারতম্য থাকলেও এখানে একটি মৌলিক ঐক্য সবার চোখে পড়ে। আর তা হলো পুরানো জীর্ণ এক অস্তিত্বকে বিদায় জানিয়ে নবীন সতেজ এক জীবনকে স্বাগত জানানো। সেখানেই একটি পুনর্জন্ম বা নবজন্ম বা পুনরুজ্জীবনের আনন্দে ভরে ওঠে সবার মন। 

দিল্লির বাদশাহ আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। বাদশাহ আকবরের তারিখ-ই-ইলাহি হলো বঙ্গাব্দের মূল। এই তারিখ-ই-ইলাহি, যার গণনার ভিত্তি সৌর বৎসর, প্রচলিত হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে একটি নতুন অব্দ হিসেবে। এর কার্যকারিতা প্রদান করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ ধরে। তাঁর আমলেই বাংলায় ‘ফসলি সনে’র প্রবর্তন করা হয়। এই ফসলি সন কালক্রমে বাংলা সনে পরিণত হয়। বাংলা ভাষার মানুষের নিজস্ব বারের নাম, মাসের নাম এবং বর্ষপঞ্জি রচিত হয়। এটা খুবই গৌরবের বিষয়। কাজেই বিশ্বের অন্যান্য জাতির মতো আমরাও ঘটা করে নববর্ষ পালন করতে পারি। বৈশাখ মাস থেকে বাংলা সনের শুরু। পহেলা বৈশাখ আমাদের ‘নববর্ষ’ দিবস। এই ‘নববর্ষ’ দিবস মানুষের হৃদয়ে বিশুদ্ধ জাতীয় রূপ ও রঙের নতুন আমেজ তৈরি করে। পুরাতন বছরের সকল ভুল, অপরাধ, হতাশা-গ্লানি বৈশাখী আমেজে ধুয়েমুছে শুচি হয়। জনজীবনের সংস্কৃতির চেতনায় এক নতুন আনন্দের ঢেউ তুলতে থাকে সদা। প্রবুদ্ধ মানুষের জাগ্রত জীবনের চেতনায় প্রতি নববর্ষে নবজীবনের দ্বার উন্মুক্ত করে। অসহায় ও দুঃখী মানুষ নতুন জীবন চায়, যে জীবন সুখের প্রত্যাশা রাখে। 

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক অনন্য উৎসব। এটি অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎসব। এই উৎসবে একত্রিত হতে পারে সবাই। ইচ্ছে করলে একই খাবার খেতে পারে সবাই। নতুন পোশাক পরতে পারে। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সবাই কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারে—

      এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে      মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

      বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক 

যাক পুরাতন স্মৃতি,    যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

      অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক 

      মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

      অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।...

নববর্ষের পূর্বাশার নতুন সূর্য মানুষের মনে নতুন আশা জাগায়। অতীতের আচ্ছন্নতা ও অবসাদ পরিহার করে তারা নবোদ্যমে উত্তরণের পথে এগিয়ে সফল হতে চায়। তারা আধমরা, আধ-ভোলা বিকৃত চেতনার মানুষগুলোকে জাগিয়ে ও মাতিয়ে চিন্তা ও কর্মে উদ্বুদ্ধ করতে চায়। তারা সকলে মিলে নতুন পরিকল্পনায় নতুন ও সরস জীবন রচনা করতে চায়। নববর্ষ দিবস  আমাদের মনে অনন্য এক মিষ্টি, সুন্দর শিহরন ও অনুভূতি জাগায়।

সেই আনন্দানুভূতি চোখে পড়াতেই ‘নববর্ষ দিবস’ বা ‘নিউ ইয়ার্স ডে’-তে ইংরেজ কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসন বলেছেন— “রিং আউট দ্য ওল্ড, রিং ইন দ্য নিউ,/রিং, হ্যাপি বেলস, এ্যাক্রস দ্য স্নো:/দ্য ইয়ার ইজ গোয়িং, লেট হিম গো,/রিং আউট দ্য ফল্স, রিং ইন দ্য ট্রু \”

কড়কড় বজ্রের নিনাদ মধুর দু’চোখে নতুন স্বপ্ন জাগে কিষান বধূর। লাঙ্গলের ফাল চিরে হাজারো ফসলের ঢল নামে কৃষকের মনে। আমাদের জীবনের ঐতিহ্যমাখা দিনগুলো নতুন আলোতে উদ্ভাসিত ও বিশুদ্ধ করার জন্য পহেলা বৈশাখের আগমন ঘটে। গোটা জাতি তাদের পুরানো বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নববর্ষের উচ্ছল হাওয়ায় উজ্জীবিত করে নব-প্রাণময়তায় চিত্তলোক ভরে তুলে। ঢুলির ঢোলের আওয়াজ ঢাক ঢাক, ঠুস ঠুস, ক্রিং ক্রিং সকলের মনে আনন্দ জাগায়। ততধিক উৎসবে মেতে ওঠে চারদিক। 

নববর্ষ উৎসবের গভীরতম প্রেরণাটি আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলে। প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বাংলা নববর্ষ উৎসব প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই পালিত হতো। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ড. মুহম্মদ এনামুল হক কৃষকদের ‘আমানি’  উৎসবের কথা বলেছিলেন। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে কিষানি একটি নতুন ঘটের মধ্যে পানি নিয়ে আতপ চাল ভিজিয়ে রাখতেন এবং একটি আমগাছের কচি পাতাযুক্ত ছোট ডাল রাখা হতো ঘটে। গৃহকর্ত্রী পরদিন সকালে ঘটের সেই পাতাযুক্ত ডাল থেকে ঘরের চারদিকে পানি ছিটিয়ে দিতেন। মনে করা হতো গোটা ঘরটি পরিশুদ্ধ হয়েছে। সারা বছরের মঙ্গল কামনায় এমনটি করা হতো। নতুন বছরে বেশি পরিমাণ ফসলের আশায় কৃষকের শরীরেও ওই পানি ছিটিয়ে দেওয়া হতো। এ অঞ্চল সব সময়ই কৃষিপ্রধান। শিল্পের ছোঁয়া ভালো মতোই লেগেছে তবু কৃষিনির্ভরতা এখানে একটুও কমেনি। তাই কৃষির উন্নতির জন্য পহেলা বৈশাখে পাওয়া চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠান করে থাকে এ অঞ্চলের কৃষি পরিবারগুলো। 

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বৈশাখ মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই সব মেলা একদিকে যেমন নববর্ষের আনন্দ আয়োজনের জন্য হয়, অন্যদিকে বিশেষ করে গ্রামের মানুষের সাংবৎসরিক সাংসারিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখার একটি প্রধান উৎস এটি। এছাড়া এই মেলায় খেলাধুলারও আয়োজন থাকে। এখন খেলাধুলার আয়োজনটি কমে গিয়েছে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, লাঠিখেলা, গরুর দৌড়, মোড়গের লড়াই, যাত্রা-জারিগান, পাঁচালি, পুথিপাঠ, পুতুলনাচ, সরদার বাড়ি খেলা, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, গরুর দৌড় এবং মোরগের লড়াই তেমন একটা দেখা না গেলেও কিছু কিছু খেলার আবেদন এখনো আছে। 

কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত বেশিরভাগ মানুষের বাকিতে কেনা-বেচার অভ্যাস গড়ে ওঠে। তাদের হাতে নগদ টাকাপয়সা কম থাকে। নববর্ষের দিনে তারা ফসল বিক্রির টাকায় দোকানির কাছে সারা বছরের বাকি শোধ করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানের মালিকেরা নববর্ষ উপলক্ষ্যে ‘হালখাতা’র আয়োজন করেন। এখানে ধূপ-ধুনো এবং রংবেরঙের কাগজ দিয়ে দোকানপাট সাজানো হয়। আগে দোকানদার গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের মিষ্টি, তরমুজ ও বাঙ্গি বা ফুটি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এখন কেউ কেউ বিরিয়ানিসহ নানারকম আধুনিক খাবার দিয়ে গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের আপ্যায়ন করে থাকেন। গ্রাহকেরা সারা বছরের বাকি টাকা পরিশোধ করে নতুন খাতা বা হালখাতা খোলেন। হালখাতার অনুষ্ঠান বর্তমানে প্রচলিত থাকলেও অনেক এলাকায় ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাবে এর জাঁকজমকভাব আগের চেয়ে কমে গেছে।

অতীতে জমিদারবাড়িতে প্রজারা নববর্ষে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবে যোগ দিতেন। সেখানেও মিষ্টি ও পান-সুপারি দিয়ে প্রজাদের আপ্যায়িত করা হতো। প্রজারাও তাঁদের সারা বছরের খাজনা পরিশোধ করতেন। নববর্ষের দিন প্রজারা ভালো পোশাক পড়ার চেষ্টা করতেন। এভাবে জমিদার-প্রজা একে অপরের কাছে চলে আসতেন। পরস্পর মিলিত হতেন। একে অপরের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন এবং পরস্পর পরস্পরকে সহানুভূতি দেখাতেন।

পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলায় বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন কেন্দ্রীয় সরকারের বাঁধার মুখে পড়ে। তারা একে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে আখ্যায়িত করে। এদেশের পণ্ডিতেরা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমুখের নেতৃত্বে, সম্রাট আকবর যে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন, সেটির বলেই এখানকার নববর্ষকে বাধাগ্রস্ত না করার আহ্বান জানান। পাকিস্তান সরকার সেই দাবি অগ্রাহ্য করে। এ রকম একটি অবস্থার মধ্যে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। এটি আজকের বাংলাদেশের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্বে ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে নিয়মিতভাবে দেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদানের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্যভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতে শুরু করে। সেই নববর্ষ উৎসব বিশাল থেকে বিশালতর হতে থাকে। এখন সেই অনুষ্ঠান ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল বাঙালির সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পরে নববর্ষ-উদ্যাপনের ব্যাপকতা বেড়েছে। বাঙালির স্বাদেশিক বোধ প্রবল হওয়ার কারণে গ্রামীণ বাংলাদেশের কৃষকের ক্ষুদ্র ও সীমিত আয়োজনের এই বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এখন এদেশের সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের বাক্সময় প্রকাশের এক অনন্য রূপ যেমন লাভ করেছে, তেমনি নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনাসৃষ্টি, ধর্মান্ধতা, স্বৈরশাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শুরু করে। যার উদ্যোক্তা ছিলো চারুকলার ১৯৮৬ ব্যাচ। শিক্ষার্থীদের তাৎপর্যময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় ব্যবহৃত মুখোশ, পুতুলের প্রতিমা এবং নানা লোকজ প্রতীক, কার্টুন ও আবহমান বাংলার নানা সামাজিক-রাজনৈতিক সমালোচনার উপযোগী ভাবব্যঞ্জনার চিত্রণের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ এদেশের সংস্কৃতির বহুত্ববাদী তথা সামগ্রিক বোধ-বিশ্বাস-বিনোদন এবং সৌন্দর্যচেতনা, মানবিক বোধ এবং শ্রেয়চেতনার এক অনুপম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তার গুরুত্ব অনুধাবন করেই বাংলা সংস্কৃতিবিদ্বেষী জঙ্গিবাদীরা ২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল (১লা বৈশাখ, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ) ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। পরপর বিস্ফোরণ ঘটায় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলো সেদিন। এটি ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিলো। খুবই বেদনাদায়ক ঘটনা ছিলো এটি।  এতে ১০ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। এই আঘাতের বেদনায় সবাই বিমূঢ় ছিলো কিন্তু তখনই টেলিভিশনের সংবাদদাতাকে দুই কিশোরী বলে— বোমা হামলা সত্ত্বেও সামনের নববর্ষে তারা রমনা বটমূলে গান গাইতে যাবে। পরের বছর ২০০২ সালের ১৪ই এপ্রিলে অর্থাৎ ১লা বৈশাখ, ১৪০৯ বঙ্গাব্দে তারা রমনা বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে। কিশোরী দুটি তাদের কথা রেখেছিলো। আমরা এতেই বুঝতে পারি, বাংলা নববর্ষের শক্তি কতোটা প্রখর! অর্থাৎ এই পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে কতোটা প্রাণপূর্ণ করে! বোদ্ধামহলে বিষয়টি সাড়া ফেলেছিলো। 

আর এজন্যেই ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ইউনেস্কোর The Intergovernmental Committee বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে মানব জাতির মননশীল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অনন্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এদেশের মানুষ পহেলা জানুয়ারির বদলে এখন পহেলা বৈশাখকে অতি আপন করে নিয়েছে। তারা বুঝতে শিখেছে যে, তাদের নিজের একটি বৎসর আছে, নিজের পঞ্জিকা আছে, আছে নিজের নববর্ষ এবং নববর্ষ উদ্যাপনের অনুষ্ঠান। যেখানে মাসব্যাপী সে নিজের মাতৃভাষায়, নিজের সংস্কৃতি নিয়ে আনন্দোৎসব করতে পারে। এই বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষের স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলায়। একটি বর্ষ শেষে আবার নতুন বর্ষের আবির্ভাব ঘটে। বিষয়টি অনুভব করতে গিয়ে কবি শশাঙ্কমোহন সেন বলেছেন—

“একটি বৎসর পরে,/আজি পুনঃ নীলাম্বরে/হাসি হাসি সুধামুখ যায় গড়াইয়া/এ হাসির স্রোতে ভাসি/হাসির কণিকা রাশি/তারকা বালিকাগুলি গিয়াছে মজিয়া।”

বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র ‘নববর্ষ’ একটা ‘ট্রেডিশন’, এবং একটা ঐতিহ্য হিসেবেই চলমান রয়েছে। বাংলাদেশেও সেভাবেই চলছে। বর্তমানে এটি আমাদের জাতীয় উৎসব। বড় আনন্দের বিষয় হলো— বর্তমান প্রজন্মের মানুষদের  পহেলা বৈশাখের আয়োজনে পোশাক-আশাক, খাবার-দাবার ও তৈজসপত্রে দেশজ মোটিফের ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। সুন্দর উৎসাহ-উদ্দীপনার  মধ্য দিয়ে  ছেলে-মেয়েরা দেশজ পোশাক পরছে, বিশেষ করে মেয়েরা মাটির তৈরি ও ফুলের তৈরি গয়নায় বৈশাখী সাজ সাজছে। শহুরের বৈশাখী মেলায় খুব সকালে মাটির সানকিতে পান্তা ইলিশ খেতে দেখা যায়। এজন্য এদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের কদর পূর্বের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। বৈশাখে ইলিশ মাছ নিয়ে এলাহি কাণ্ড শুরু হতে দেখা যায়। ইলিশের সঙ্গে সেখানে নানাপদের ভর্তাও লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস ঘেটে জানা যায় পান্তা ইলিশ বৈশাখী খাবারের প্রচলনে ছিলো না। কিন্তু তবু এটাই যেন এখন বাংলাদেশের বিশেষ করে শহুরে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে সচরাচর দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় নববর্ষ উৎসব উপলক্ষ্যে সর্ষে বাটা দিয়ে বারো ইঞ্চি লম্বা রুই মাছের পেটি রান্না, চিতল মাছের পেটিসহ নানা বাহারি খাবার আয়োজন করতে দেখা যায়। এমনকি বাসা বাড়িতেও এভাবেই উদ্যাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। সেখানে পাট শাক, উচ্ছে বা করলা ভাজি, বেলের শরবত, আম ডাল, কাঁচা আম মাখানো, তরমুজ-বাঙ্গি এবং সবরিকলাও খেতে দেখা যাচ্ছে। এ উৎসবটি এখন সর্বজনীন। আসলে, আমাদের এই পহেলা বৈশাখের উৎসবের অঙ্গীকার হচ্ছে আমাদের জীবনবোধের অঙ্গীকার। এদেশের মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা বাংলা ভাষার মানুষ, আমরা বাংলা সংস্কৃতির মানুষ এবং আমরা বাংলাদেশের মানুষ। 

মাঝে মাঝেই নানা দুর্বিপাক, বিপদ-আপদ ও অপশক্তি ঘিরে ধরে আমাদের। কেড়ে নিতে চায় আমাদের সংস্কৃতির সবকিছু। আঘাত হানে আমাদের মুখে-মনে এমনকি শরীরে। সে যাই হোক সব বাধা-বিপত্তি পার করে এদেশের মানুষ নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। ল্যাজে-গোবরে অবস্থা উতরে যাওয়ার সুন্দর অভ্যাস এদেশের মানুষ পূর্বপুরুষদের কাছে থেকে পেয়েছে। জীবনের যে কোনো জটিল ও পঙ্কিল পরিস্থিতি থেকে তাদের  বেরিয়ে আসতেই হবে-এটা তারা জানে। বাংলা নববর্ষ তাদের সেই প্রাণশক্তির যোগান দেয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে তাদের নতুন আশায় বুক বাঁধতে শেখায়। নববর্ষের শক্তিশয্যায় তারা বার বার ঘুরে দাঁড়ায়। প্রতি নববর্ষে এদেশের মানুষের মনেও জাগে কালবোশেখী-নববর্ষের সওগাত ও আশীর্বাদ। যেখানে তেজোদীপ্ত নতুন প্রাণের সাড়া মিলে। অতীতের সকল গ্লানি-জড়তা-জীর্ণতা দূর হয়ে যায় সহসা। মন-প্রাণ নব উদ্দীপনায় জেগে উঠে। পহেলা বৈশাখ এদেশের মানুষের মনে নতুন কিছু সৃজনের ঝড় তুলে। কাজেই বাঙালির পহেলা বৈশাখের প্রতি একটি বিশেষ মনোযোগ থাকে। এখন নির্বাচিত নতুন সরকার দেশে। এবার নতুন আঙ্গিকে এই মহান জাতীয় উৎসবটি গোটা বাংলাদেশের শহর-বন্দর-গ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

তাইতো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন—

‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’

সম্প্রদায় নির্বিশেষে এদেশের মানুষের একমাত্র উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যেখানে সব সম্প্রদায় ও শ্রেণির উপস্থিতি সম্ভব। এই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না। এই দিন বাংলাদেশের সবাইকে কাছে ডাকে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের অনুষ্ঠান। আবার সমাজের সব শ্রেণির মানুষও পহেলা বৈশাখ আসার খবর আগে থেকেই জানতে পারে। ঋতুচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পহেলা বৈশাখ উপস্থিত হয়। বিশাল সাংস্কৃতিক চেতনার আগমন ঘটে।

সংস্কৃতির এই চেতনা বাঙালির জীবনের প্রধান অংশ। আমরা জানি, সংস্কৃতি সভ্যতার চেয়েও শক্তিশালী। সভ্যতার পতন ঘটলেও সংস্কৃতির চেতনা সতেজ থাকে। জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতি চেতনার। শোষণের নতুন জাল চিড়ে যাক। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অবসান হোক। পুরনো কাসুন্দির পট ধুয়ে নতুন কাসুন্দি ভরে আনুক পহেলা বৈশাখ। অন্তরের টানে ঘ্রাণে মন ভরে যাক। বেশি বেশি স্বাজাত্যবোধ জাগ্রত হোক। ছন্দে-ছন্দে পদে-পদে বিপুল আনন্দে এ গগন পূর্ণ করে প্রাগ্রসররূপে পহেলা বৈশাখ ফিরে আসুক বার বার। সকলের মুখে একটি আওয়াজ উঠুক— ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে এই আওয়াজের কথাটিই বলে।  

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে

প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পহেলা বৈশাখ বাঙালির আড়াই হাজার বছরের সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও উপাদানগুলো সামনে নিয়ে আসে প্রতিবছর। সতত ষোলআনা নতুন সুধা দান করে বাঙালির মনে। সংস্কৃতির মধুভাণ্ডও সমৃদ্ধ করে যায় পুরোমাত্রায়। কোমলমতি ছোটো বাঙালি শিশুদের মনেও বৈশাখ আনন্দের মধু ঢেলে দিয়ে যায়। 

এদেশে যেমন ‘অমর একুশের চেতনা’ আছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আছে, তেমনি আছে ‘নববর্ষের চেতনা’। যে জাতির বর্ষপঞ্জি আছে, সে জাতি আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষ পালন করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে, সব সংস্কৃতিতেই নববর্ষ উদ্যাপনের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। অবশ্য নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-প্রকৃতি ও পদ্ধতি-প্রকরণের মধ্যে দেশে দেশে তারতম্য আছে। দেশে দেশে তারতম্য থাকলেও এখানে একটি মৌলিক ঐক্য সবার চোখে পড়ে। আর তা হলো পুরানো জীর্ণ এক অস্তিত্বকে বিদায় জানিয়ে নবীন সতেজ এক জীবনকে স্বাগত জানানো। সেখানেই একটি পুনর্জন্ম বা নবজন্ম বা পুনরুজ্জীবনের আনন্দে ভরে ওঠে সবার মন। 

দিল্লির বাদশাহ আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। বাদশাহ আকবরের তারিখ-ই-ইলাহি হলো বঙ্গাব্দের মূল। এই তারিখ-ই-ইলাহি, যার গণনার ভিত্তি সৌর বৎসর, প্রচলিত হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে একটি নতুন অব্দ হিসেবে। এর কার্যকারিতা প্রদান করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ ধরে। তাঁর আমলেই বাংলায় ‘ফসলি সনে’র প্রবর্তন করা হয়। এই ফসলি সন কালক্রমে বাংলা সনে পরিণত হয়। বাংলা ভাষার মানুষের নিজস্ব বারের নাম, মাসের নাম এবং বর্ষপঞ্জি রচিত হয়। এটা খুবই গৌরবের বিষয়। কাজেই বিশ্বের অন্যান্য জাতির মতো আমরাও ঘটা করে নববর্ষ পালন করতে পারি। বৈশাখ মাস থেকে বাংলা সনের শুরু। পহেলা বৈশাখ আমাদের ‘নববর্ষ’ দিবস। এই ‘নববর্ষ’ দিবস মানুষের হৃদয়ে বিশুদ্ধ জাতীয় রূপ ও রঙের নতুন আমেজ তৈরি করে। পুরাতন বছরের সকল ভুল, অপরাধ, হতাশা-গ্লানি বৈশাখী আমেজে ধুয়েমুছে শুচি হয়। জনজীবনের সংস্কৃতির চেতনায় এক নতুন আনন্দের ঢেউ তুলতে থাকে সদা। প্রবুদ্ধ মানুষের জাগ্রত জীবনের চেতনায় প্রতি নববর্ষে নবজীবনের দ্বার উন্মুক্ত করে। অসহায় ও দুঃখী মানুষ নতুন জীবন চায়, যে জীবন সুখের প্রত্যাশা রাখে। 

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক অনন্য উৎসব। এটি অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎসব। এই উৎসবে একত্রিত হতে পারে সবাই। ইচ্ছে করলে একই খাবার খেতে পারে সবাই। নতুন পোশাক পরতে পারে। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সবাই কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারে—

      এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে      মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

      বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক 

যাক পুরাতন স্মৃতি,    যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

      অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক 

      মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

      অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।...

নববর্ষের পূর্বাশার নতুন সূর্য মানুষের মনে নতুন আশা জাগায়। অতীতের আচ্ছন্নতা ও অবসাদ পরিহার করে তারা নবোদ্যমে উত্তরণের পথে এগিয়ে সফল হতে চায়। তারা আধমরা, আধ-ভোলা বিকৃত চেতনার মানুষগুলোকে জাগিয়ে ও মাতিয়ে চিন্তা ও কর্মে উদ্বুদ্ধ করতে চায়। তারা সকলে মিলে নতুন পরিকল্পনায় নতুন ও সরস জীবন রচনা করতে চায়। নববর্ষ দিবস  আমাদের মনে অনন্য এক মিষ্টি, সুন্দর শিহরন ও অনুভূতি জাগায়।

সেই আনন্দানুভূতি চোখে পড়াতেই ‘নববর্ষ দিবস’ বা ‘নিউ ইয়ার্স ডে’-তে ইংরেজ কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসন বলেছেন— “রিং আউট দ্য ওল্ড, রিং ইন দ্য নিউ,/রিং, হ্যাপি বেলস, এ্যাক্রস দ্য স্নো:/দ্য ইয়ার ইজ গোয়িং, লেট হিম গো,/রিং আউট দ্য ফল্স, রিং ইন দ্য ট্রু \”

কড়কড় বজ্রের নিনাদ মধুর দু’চোখে নতুন স্বপ্ন জাগে কিষান বধূর। লাঙ্গলের ফাল চিরে হাজারো ফসলের ঢল নামে কৃষকের মনে। আমাদের জীবনের ঐতিহ্যমাখা দিনগুলো নতুন আলোতে উদ্ভাসিত ও বিশুদ্ধ করার জন্য পহেলা বৈশাখের আগমন ঘটে। গোটা জাতি তাদের পুরানো বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নববর্ষের উচ্ছল হাওয়ায় উজ্জীবিত করে নব-প্রাণময়তায় চিত্তলোক ভরে তুলে। ঢুলির ঢোলের আওয়াজ ঢাক ঢাক, ঠুস ঠুস, ক্রিং ক্রিং সকলের মনে আনন্দ জাগায়। ততধিক উৎসবে মেতে ওঠে চারদিক। 

নববর্ষ উৎসবের গভীরতম প্রেরণাটি আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলে। প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বাংলা নববর্ষ উৎসব প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই পালিত হতো। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ড. মুহম্মদ এনামুল হক কৃষকদের ‘আমানি’  উৎসবের কথা বলেছিলেন। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে কিষানি একটি নতুন ঘটের মধ্যে পানি নিয়ে আতপ চাল ভিজিয়ে রাখতেন এবং একটি আমগাছের কচি পাতাযুক্ত ছোট ডাল রাখা হতো ঘটে। গৃহকর্ত্রী পরদিন সকালে ঘটের সেই পাতাযুক্ত ডাল থেকে ঘরের চারদিকে পানি ছিটিয়ে দিতেন। মনে করা হতো গোটা ঘরটি পরিশুদ্ধ হয়েছে। সারা বছরের মঙ্গল কামনায় এমনটি করা হতো। নতুন বছরে বেশি পরিমাণ ফসলের আশায় কৃষকের শরীরেও ওই পানি ছিটিয়ে দেওয়া হতো। এ অঞ্চল সব সময়ই কৃষিপ্রধান। শিল্পের ছোঁয়া ভালো মতোই লেগেছে তবু কৃষিনির্ভরতা এখানে একটুও কমেনি। তাই কৃষির উন্নতির জন্য পহেলা বৈশাখে পাওয়া চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠান করে থাকে এ অঞ্চলের কৃষি পরিবারগুলো। 

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বৈশাখ মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই সব মেলা একদিকে যেমন নববর্ষের আনন্দ আয়োজনের জন্য হয়, অন্যদিকে বিশেষ করে গ্রামের মানুষের সাংবৎসরিক সাংসারিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখার একটি প্রধান উৎস এটি। এছাড়া এই মেলায় খেলাধুলারও আয়োজন থাকে। এখন খেলাধুলার আয়োজনটি কমে গিয়েছে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, লাঠিখেলা, গরুর দৌড়, মোড়গের লড়াই, যাত্রা-জারিগান, পাঁচালি, পুথিপাঠ, পুতুলনাচ, সরদার বাড়ি খেলা, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, গরুর দৌড় এবং মোরগের লড়াই তেমন একটা দেখা না গেলেও কিছু কিছু খেলার আবেদন এখনো আছে। 

কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত বেশিরভাগ মানুষের বাকিতে কেনা-বেচার অভ্যাস গড়ে ওঠে। তাদের হাতে নগদ টাকাপয়সা কম থাকে। নববর্ষের দিনে তারা ফসল বিক্রির টাকায় দোকানির কাছে সারা বছরের বাকি শোধ করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানের মালিকেরা নববর্ষ উপলক্ষ্যে ‘হালখাতা’র আয়োজন করেন। এখানে ধূপ-ধুনো এবং রংবেরঙের কাগজ দিয়ে দোকানপাট সাজানো হয়। আগে দোকানদার গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের মিষ্টি, তরমুজ ও বাঙ্গি বা ফুটি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এখন কেউ কেউ বিরিয়ানিসহ নানারকম আধুনিক খাবার দিয়ে গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের আপ্যায়ন করে থাকেন। গ্রাহকেরা সারা বছরের বাকি টাকা পরিশোধ করে নতুন খাতা বা হালখাতা খোলেন। হালখাতার অনুষ্ঠান বর্তমানে প্রচলিত থাকলেও অনেক এলাকায় ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাবে এর জাঁকজমকভাব আগের চেয়ে কমে গেছে।

অতীতে জমিদারবাড়িতে প্রজারা নববর্ষে ‘পুণ্যাহ’ উৎসবে যোগ দিতেন। সেখানেও মিষ্টি ও পান-সুপারি দিয়ে প্রজাদের আপ্যায়িত করা হতো। প্রজারাও তাঁদের সারা বছরের খাজনা পরিশোধ করতেন। নববর্ষের দিন প্রজারা ভালো পোশাক পড়ার চেষ্টা করতেন। এভাবে জমিদার-প্রজা একে অপরের কাছে চলে আসতেন। পরস্পর মিলিত হতেন। একে অপরের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন এবং পরস্পর পরস্পরকে সহানুভূতি দেখাতেন।

পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলায় বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন কেন্দ্রীয় সরকারের বাঁধার মুখে পড়ে। তারা একে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে আখ্যায়িত করে। এদেশের পণ্ডিতেরা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমুখের নেতৃত্বে, সম্রাট আকবর যে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন, সেটির বলেই এখানকার নববর্ষকে বাধাগ্রস্ত না করার আহ্বান জানান। পাকিস্তান সরকার সেই দাবি অগ্রাহ্য করে। এ রকম একটি অবস্থার মধ্যে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। এটি আজকের বাংলাদেশের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্বে ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে নিয়মিতভাবে দেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদানের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্যভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতে শুরু করে। সেই নববর্ষ উৎসব বিশাল থেকে বিশালতর হতে থাকে। এখন সেই অনুষ্ঠান ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল বাঙালির সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পরে নববর্ষ-উদ্যাপনের ব্যাপকতা বেড়েছে। বাঙালির স্বাদেশিক বোধ প্রবল হওয়ার কারণে গ্রামীণ বাংলাদেশের কৃষকের ক্ষুদ্র ও সীমিত আয়োজনের এই বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এখন এদেশের সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের বাক্সময় প্রকাশের এক অনন্য রূপ যেমন লাভ করেছে, তেমনি নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনাসৃষ্টি, ধর্মান্ধতা, স্বৈরশাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শুরু করে। যার উদ্যোক্তা ছিলো চারুকলার ১৯৮৬ ব্যাচ। শিক্ষার্থীদের তাৎপর্যময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় ব্যবহৃত মুখোশ, পুতুলের প্রতিমা এবং নানা লোকজ প্রতীক, কার্টুন ও আবহমান বাংলার নানা সামাজিক-রাজনৈতিক সমালোচনার উপযোগী ভাবব্যঞ্জনার চিত্রণের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ এদেশের সংস্কৃতির বহুত্ববাদী তথা সামগ্রিক বোধ-বিশ্বাস-বিনোদন এবং সৌন্দর্যচেতনা, মানবিক বোধ এবং শ্রেয়চেতনার এক অনুপম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তার গুরুত্ব অনুধাবন করেই বাংলা সংস্কৃতিবিদ্বেষী জঙ্গিবাদীরা ২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল (১লা বৈশাখ, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ) ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। পরপর বিস্ফোরণ ঘটায় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিলো সেদিন। এটি ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিলো। খুবই বেদনাদায়ক ঘটনা ছিলো এটি।  এতে ১০ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। এই আঘাতের বেদনায় সবাই বিমূঢ় ছিলো কিন্তু তখনই টেলিভিশনের সংবাদদাতাকে দুই কিশোরী বলে— বোমা হামলা সত্ত্বেও সামনের নববর্ষে তারা রমনা বটমূলে গান গাইতে যাবে। পরের বছর ২০০২ সালের ১৪ই এপ্রিলে অর্থাৎ ১লা বৈশাখ, ১৪০৯ বঙ্গাব্দে তারা রমনা বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে। কিশোরী দুটি তাদের কথা রেখেছিলো। আমরা এতেই বুঝতে পারি, বাংলা নববর্ষের শক্তি কতোটা প্রখর! অর্থাৎ এই পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে কতোটা প্রাণপূর্ণ করে! বোদ্ধামহলে বিষয়টি সাড়া ফেলেছিলো। 

আর এজন্যেই ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় ইউনেস্কোর The Intergovernmental Committee বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে মানব জাতির মননশীল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অনন্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এদেশের মানুষ পহেলা জানুয়ারির বদলে এখন পহেলা বৈশাখকে অতি আপন করে নিয়েছে। তারা বুঝতে শিখেছে যে, তাদের নিজের একটি বৎসর আছে, নিজের পঞ্জিকা আছে, আছে নিজের নববর্ষ এবং নববর্ষ উদ্যাপনের অনুষ্ঠান। যেখানে মাসব্যাপী সে নিজের মাতৃভাষায়, নিজের সংস্কৃতি নিয়ে আনন্দোৎসব করতে পারে। এই বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষের স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলায়। একটি বর্ষ শেষে আবার নতুন বর্ষের আবির্ভাব ঘটে। বিষয়টি অনুভব করতে গিয়ে কবি শশাঙ্কমোহন সেন বলেছেন—

“একটি বৎসর পরে,/আজি পুনঃ নীলাম্বরে/হাসি হাসি সুধামুখ যায় গড়াইয়া/এ হাসির স্রোতে ভাসি/হাসির কণিকা রাশি/তারকা বালিকাগুলি গিয়াছে মজিয়া।”

বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র ‘নববর্ষ’ একটা ‘ট্রেডিশন’, এবং একটা ঐতিহ্য হিসেবেই চলমান রয়েছে। বাংলাদেশেও সেভাবেই চলছে। বর্তমানে এটি আমাদের জাতীয় উৎসব। বড় আনন্দের বিষয় হলো— বর্তমান প্রজন্মের মানুষদের  পহেলা বৈশাখের আয়োজনে পোশাক-আশাক, খাবার-দাবার ও তৈজসপত্রে দেশজ মোটিফের ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। সুন্দর উৎসাহ-উদ্দীপনার  মধ্য দিয়ে  ছেলে-মেয়েরা দেশজ পোশাক পরছে, বিশেষ করে মেয়েরা মাটির তৈরি ও ফুলের তৈরি গয়নায় বৈশাখী সাজ সাজছে। শহুরের বৈশাখী মেলায় খুব সকালে মাটির সানকিতে পান্তা ইলিশ খেতে দেখা যায়। এজন্য এদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের কদর পূর্বের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। বৈশাখে ইলিশ মাছ নিয়ে এলাহি কাণ্ড শুরু হতে দেখা যায়। ইলিশের সঙ্গে সেখানে নানাপদের ভর্তাও লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস ঘেটে জানা যায় পান্তা ইলিশ বৈশাখী খাবারের প্রচলনে ছিলো না। কিন্তু তবু এটাই যেন এখন বাংলাদেশের বিশেষ করে শহুরে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে সচরাচর দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় নববর্ষ উৎসব উপলক্ষ্যে সর্ষে বাটা দিয়ে বারো ইঞ্চি লম্বা রুই মাছের পেটি রান্না, চিতল মাছের পেটিসহ নানা বাহারি খাবার আয়োজন করতে দেখা যায়। এমনকি বাসা বাড়িতেও এভাবেই উদ্যাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। সেখানে পাট শাক, উচ্ছে বা করলা ভাজি, বেলের শরবত, আম ডাল, কাঁচা আম মাখানো, তরমুজ-বাঙ্গি এবং সবরিকলাও খেতে দেখা যাচ্ছে। এ উৎসবটি এখন সর্বজনীন। আসলে, আমাদের এই পহেলা বৈশাখের উৎসবের অঙ্গীকার হচ্ছে আমাদের জীবনবোধের অঙ্গীকার। এদেশের মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা বাংলা ভাষার মানুষ, আমরা বাংলা সংস্কৃতির মানুষ এবং আমরা বাংলাদেশের মানুষ। 

মাঝে মাঝেই নানা দুর্বিপাক, বিপদ-আপদ ও অপশক্তি ঘিরে ধরে আমাদের। কেড়ে নিতে চায় আমাদের সংস্কৃতির সবকিছু। আঘাত হানে আমাদের মুখে-মনে এমনকি শরীরে। সে যাই হোক সব বাধা-বিপত্তি পার করে এদেশের মানুষ নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। ল্যাজে-গোবরে অবস্থা উতরে যাওয়ার সুন্দর অভ্যাস এদেশের মানুষ পূর্বপুরুষদের কাছে থেকে পেয়েছে। জীবনের যে কোনো জটিল ও পঙ্কিল পরিস্থিতি থেকে তাদের  বেরিয়ে আসতেই হবে-এটা তারা জানে। বাংলা নববর্ষ তাদের সেই প্রাণশক্তির যোগান দেয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে তাদের নতুন আশায় বুক বাঁধতে শেখায়। নববর্ষের শক্তিশয্যায় তারা বার বার ঘুরে দাঁড়ায়। প্রতি নববর্ষে এদেশের মানুষের মনেও জাগে কালবোশেখী-নববর্ষের সওগাত ও আশীর্বাদ। যেখানে তেজোদীপ্ত নতুন প্রাণের সাড়া মিলে। অতীতের সকল গ্লানি-জড়তা-জীর্ণতা দূর হয়ে যায় সহসা। মন-প্রাণ নব উদ্দীপনায় জেগে উঠে। পহেলা বৈশাখ এদেশের মানুষের মনে নতুন কিছু সৃজনের ঝড় তুলে। কাজেই বাঙালির পহেলা বৈশাখের প্রতি একটি বিশেষ মনোযোগ থাকে। এখন নির্বাচিত নতুন সরকার দেশে। এবার নতুন আঙ্গিকে এই মহান জাতীয় উৎসবটি গোটা বাংলাদেশের শহর-বন্দর-গ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

তাইতো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন—

‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’

সম্প্রদায় নির্বিশেষে এদেশের মানুষের একমাত্র উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যেখানে সব সম্প্রদায় ও শ্রেণির উপস্থিতি সম্ভব। এই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না। এই দিন বাংলাদেশের সবাইকে কাছে ডাকে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের অনুষ্ঠান। আবার সমাজের সব শ্রেণির মানুষও পহেলা বৈশাখ আসার খবর আগে থেকেই জানতে পারে। ঋতুচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পহেলা বৈশাখ উপস্থিত হয়। বিশাল সাংস্কৃতিক চেতনার আগমন ঘটে।

সংস্কৃতির এই চেতনা বাঙালির জীবনের প্রধান অংশ। আমরা জানি, সংস্কৃতি সভ্যতার চেয়েও শক্তিশালী। সভ্যতার পতন ঘটলেও সংস্কৃতির চেতনা সতেজ থাকে। জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতি চেতনার। শোষণের নতুন জাল চিড়ে যাক। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অবসান হোক। পুরনো কাসুন্দির পট ধুয়ে নতুন কাসুন্দি ভরে আনুক পহেলা বৈশাখ। অন্তরের টানে ঘ্রাণে মন ভরে যাক। বেশি বেশি স্বাজাত্যবোধ জাগ্রত হোক। ছন্দে-ছন্দে পদে-পদে বিপুল আনন্দে এ গগন পূর্ণ করে প্রাগ্রসররূপে পহেলা বৈশাখ ফিরে আসুক বার বার। সকলের মুখে একটি আওয়াজ উঠুক— ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির চেতনাকে প্রাণপূর্ণ করে এই আওয়াজের কথাটিই বলে।  


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত