সংবাদ

মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ বোকা প্রাণী


ওয়াসিম খান রানা
ওয়াসিম খান রানা
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ বোকা প্রাণী
প্রতীকী ছবি: সম্পাদিত

মানুষকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন থেকে শিল্প সব কিছুতেই মানুষের অবদান অতুলনীয়। আর ইসলামে তো বলাই আছে, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এই বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ বা দ্বিমত নেই। কারণ আমরা মানবজাতিও নিজেদের সেরা ভাবতে ভালোবাসি।

তবে একটু গভীরে তাকালে একটি অদ্ভুত সত্য চর্মচক্ষুতে দৃশ্যমান। এই বুদ্ধিমান প্রাণীটিই প্রতিদিন এমন কিছু কাজ করে, যা দেখলে মনে হয় বুদ্ধি থাকলেই বুদ্ধিমান হওয়া যায় না। আজ আমরা একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজব! মানুষ কি আদতে বুদ্ধিমান, নাকি পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ এক বোকা প্রাণী।

১. অন্ধ বিশ্বাস: মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা

প্রতিদিন আমরা যাত্রার সঙ্গী হিসেবে যানবাহনে উঠি। চালকের নাম জানি না, তার লাইসেন্স আছে কিনা জানি না। মাতাল কিনা জানি না। তবুও নিশ্চিন্তে বসে পড়ি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হোক বা রূপসা থেকে পাটুরিয়া- এই অজানা মানুষটির হাতেই নিজের জীবন তুলে দিই বিনা প্রশ্নে।

ইদানিং অ্যাপ-ভিত্তিক উবার কিংবা পাঠাও যানবাহনে এই বিশ্বাস আরও অন্ধ। একধাপ এগিয়ে। একটা স্ক্রিনে নাম আর রেটিং দেখে উঠে পড়ছি অপরিচিত কারো পেছনে। সেই মানুষটা কে, কোথা থেকে এসেছে, কিছুই জানি না। তবুও এক অদৃশ্য বিশ্বাসে চলে যাচ্ছি। একটা কুকুর কিংবা বিড়াল কিন্তু মানুষের মতো এতোটা সহজতর নয়। অপরিচিত কেউ কাছে গেলেই সতর্ক হয়। কিন্তু মানুষ কেবল অদৃশ্য এক বিশ্বাসের দাস। 

২. প্রতারণা: মিথ্যে কথার ফাঁদে পড়া

পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী মানুষ, যাকে কেবল ‘কথা’ দিয়ে বোকা বানানো যায়। একটি কুকুরকে আপনি মুখে ডাকলে সে আসবে না, যদি না আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা হাতে খাবার দেখে সে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু মানুষকে ‘লটারি জিতেছেন’, ‘টাকা দ্বিগুণ হবে’ বা ‘বিদেশে চাকরি দেব’ এমন কিছু লোভনীয় কথা বললেই সে তার সারা জীবনের জমানো টাকা প্রতারকের হাতে তুলে দেয়। অথচ পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীকে এত সহজে ‘স্ক্যাম’ বা প্রতারণা করা অসম্ভব।

৩. হোটেলের খাবার: ইন্দ্রিয় থাকতেও ব্যবহার করি না

ধরুন, আপনি খাবার খাবেন।  কী করবেন? আশেপাশের একটা রেস্টুরেন্টে যাবেন (যার যার সাধ্যমতো)। এখন কথা হচ্ছে, একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা কী করি? রঙিন মেনু কার্ড দেখি, দাম দেখি, এর বেশি ভাবার সময় হয়তো পাই না। কিন্তু রান্নাঘরে যাই না। রাঁধুনির হাত পরিষ্কার কিনা দেখি না। তেল কতদিনের পুরনো, মাংস কোথা থেকে এসেছে, কিছুই জিজ্ঞেস করি না। 

অথচ একটা কুকুর বা বিড়াল যে কোনো খাবার মুখে দেওয়ার আগে ভালো করে শোঁকে। গন্ধে বুঝে নেয়, এটা খাবে কি খাবে না। প্রকৃতি তাদের দিয়েছে সতর্কতার এক সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষের কাছে এই প্রবৃত্তি কি নেই, নাকি থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয়? এটা কি বোকামি নয়?

৪. মুদ্রা: কাগজের প্রতি অদ্ভুত বিশ্বাস

মানুষ সারাজীবন গাধার মতো খাটে কিছু রঙিন কাগজের (টাকা) জন্য। আমরা বিশ্বাস করি এই কাগজের মূল্য আছে। কারণ সরকার বলেছে। যদি কাল সরকার ঘোষণা দেয় যে, এই কাগজ অচল (যেমন নোট বাতিল), তবে মানুষ এক মুহূর্তেই ভিখারি হয়ে যাবে। অথচ প্রকৃতির বাঘ বা সিংহের সম্পদ হলো তার শক্তি আর এলাকা। যা কোনো সরকার বা ব্যাংক কেড়ে নিতে পারে না। মানুষ এমন এক কাল্পনিক ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে বেঁচে আছে, যা যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।


শূন্যতার ডাক

৫. উঁচু ভবন: ‘নিরাপদ’ ভেবে খাঁচায় বসবাস

মানুষ মাটির জীব, কিন্তু সে থাকে ১০ বা ২০ তলা ভবনের উপরে। আমরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করি, যে ইঞ্জিনিয়ার বা কন্ট্রাক্টর এই বিল্ডিং বানিয়েছে, সে সিমেন্ট বা রডে চুরি করেনি। অথচ ভূমিকম্প বা আগুন লাগলে এই ভবনই মানুষের মৃত্যুফাঁদ বা কবরে পরিণত হয়। নিজের তৈরি খাঁচায় নিজেকে বন্দি করে ‘নিরাপদ’ ভাবাটা মানুষের অন্যতম বড় বোকামি।

৬. দাম্পত্য জীবন: সবচেয়ে কাছের মানুষকেও চিনি না

সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়, কথা কাটাকাটি হয়, মনোমালিন্য হয়। সারাদিন একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু রাতে সেই একই খাটে ঘুমায়। সেই হাতের রান্না-ই খায়। পরের দিন আবার স্বাভাবিক। এটা এক অদ্ভুত মানবীয় বৈশিষ্ট্য। আমরা জানি সম্পর্কে সমস্যা আছে, কিন্তু, না সমস্যা ঠিক করতে পারি, না সম্পর্ক ছাড়তে পারি। মাঝখানে ঝুলে থাকি। এই অর্ধ-সচেতন অবস্থাটাই বোকামির এক বড় উদাহরণ।

৭. বিজ্ঞাপন ও প্রতারণার ফাঁদ: বারবার একই ভুল

একই কোম্পানি বারবার ঠকিয়েছে। পণ্যের মান খারাপ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। কিন্তু নতুন প্যাকেটে নতুন বিজ্ঞাপন দেখলে আবার কেনে। একটা চকচকে ছবি, একটা বড় ছাড়ের ঘোষণা ব্যস, মানুষ আবার দৌড় দেয়। তবে একটা বিড়াল একবার ফাঁদে পড়লে দ্বিতীয়বার সেই ফাঁদের ধারে কাছেও যায় না। কিন্তু মানুষ? ইতিহাস বলছে, মানুষ বারবার একই ফাঁদে পড়ে, শুধু ফাঁদের রং বদলে যায়। 

৮. সোশ্যাল মিডিয়া : যাচাই না করে বিশ্বাস করার মহামারী

ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো খবর দেখলে মানুষ প্রথমে কী করে? সত্যি কিনা যাচাই করে? না। শেয়ার করে দেয়। কারণ খবরটা তার বিশ্বাস বা ভয়ের সঙ্গে মিলে গেছে, এটুকুই যথেষ্ট। এই ভুয়া তথ্যের মহামারী প্রমাণ করে, মানুষের কাছে সত্য যাচাইয়ের সব উপকরণ আছে, কিন্তু সে যাচাই করতে চায় না। নিজের বিশ্বাসকে নিশ্চিত করার জন্য যা দরকার তাই খোঁজে, বাকিটা উপেক্ষা করে।

৯. ডাক্তার ও ওষুধ : প্রশ্ন না করে গিলে ফেলি

ডাক্তার যা লিখলেন, বিনা প্রশ্নে কিনে খাই। এই ওষুধ কেন? পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী? অন্য বিকল্প আছে কিনা, জিজ্ঞেস করি না। সাদা অ্যাপ্রন দেখলেই সব প্রশ্ন থেমে যায়। কর্তৃত্বের প্রতি এই অন্ধ আনুগত্য মানবীয় মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন দুর্বলতা। মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম-এর বিখ্যাত মিলগ্রাম পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ কর্তৃত্বের আদেশে অন্যকে গুরুতর ক্ষতি করতেও রাজি হয়। ১৯৬১ সালে করা এই পরীক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা প্রতিনিয়ত-ই দেখি, সরকার বললেই মানুষ অন্যায় মেনে নেয়, বস বললেই কর্মী অনৈতিক কাজ করে, ধর্মীয় নেতা বললেই অনুসারী যেকোনো নির্দেশ পালন করে।


জীবনের জটিলতা

১০. ইতিহাস থেকে না শেখা : সবচেয়ে পুরনো বোকামি

যুদ্ধ এই পৃথিবীর এক অমোঘ সত্য। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার এক হিংস্র প্রবণতা মানুষ বহন করে চলেছে। তাই যুদ্ধ হয়। আবার শেষও হয়। মানুষ বলে আর না। কিন্তু কিছু বছর পরে আবার যুদ্ধ। অর্থনৈতিক সংকট আসে। মানুষ বলে, শিক্ষা নিলাম। কয়েক দশক পরে একই সংকট ফিরে আসে।

এখন কথা হচ্ছে এখানে বোকামির কী আছে। প্রাণীজগতে দলনেতা সামনে থেকে দলকে রক্ষা করে। আর মানুষের ক্ষেত্রে? নেতারা নিরাপদ বাংকারে বসে থাকে, আর তাদের মুখের কথায় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যুদ্ধে গিয়ে একে অপরকে হত্যা করে। যাদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, কেবল একজন নেতার ওপর অন্ধ বিশ্বাস ও আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি তাকে মারতে যাই এবং নিজেও মরি।

যুদ্ধে নেতার কথায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দেয় আবার হাজারো প্রাণ কেড়ে নেয়। দিনশেষে রাজত্ব করে রাজা আর যারা সংগ্রাম করে বিজয় আনে তারা প্রজাই রয়ে যায়। বলা যায়, আমরা নিজেদের শাসন বা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর নিজেরাই শাসক খুঁজি। আর এটা যুগের পর যুগ ধরে বহমান। আজও ঘটছে, কালও ঘটবে।

বিখ্যাত স্পানিশ দার্শনিক জর্জ স্যান্টায়ানা তার বিখ্যাত বই “দ্য লাইফ অফ রিজন" (১৯০৫-১৯০৬)–এ লিখেছিলেন, “দোজ হু ক্যানট রিমেম্বার দ্য পাস্ট আর কনডেমড টু রিপিট ইট”(যে অতীত মনে রাখে না, সে সেই অতীত আবার পার করতে বাধ্য।) মানব ইতিহাস এই উক্তির-ই যেন জীবন্ত দালিলিক প্রমাণ।

১১. নিজের ধ্বংস নিজে ডেকে আনা

পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই এমন প্রাণী যে জেনে বুঝে নিজের বাসস্থান ধ্বংস করে। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু দূষণ, সমুদ্র দূষণ, সবই মানুষের কাজ। আর মানুষ জানেও যে এটা ক্ষতিকর। এছাড়া ধূমপান ক্ষতিকর, সিগারেটের প্যাকেটেই লেখা থাকে। তবুও কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সেই প্যাকেট কেনে। জেনেশুনে বিষ খাওয়া, এর চেয়ে বড় বোকামি আর কী হতে পারে? আর এটা মানুষই করে। 

১২. বোকামির মনোবৈজ্ঞানিক কারণ

মানুষ কেন এত সহজে বিশ্বাস করে? মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে আছে কয়েকটি কারণ-

জ্ঞানীয় আলসেমি: মস্তিষ্ক শক্তি বাঁচাতে চায়। প্রতিটি বিষয় যাচাই করা কষ্টকর, তাই ‘বিশ্বাস’ নামক শর্টকাট বেছে নেয়।

বিশ্বাসের আয়নায় সত্য খোঁজা: আমরা সেই তথ্যই বিশ্বাস করি যা আমাদের বিদ্যমান ধারণার সাথে মেলে। বাকিটা উপেক্ষা করি।

সামাজিক অনুকরণ: সবাই করছে, তাই আমিও করি। প্রশ্ন করাটাকে অনেক সময় ‘বিচ্ছিন্নতা’ মনে হয়।

কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস:  ডাক্তার, নেতা, বিশেষজ্ঞ তথা কর্তৃপক্ষ যা বলে, মানুষ প্রশ্ন না করে মেনে নেয়।


অনন্ত অভিযাত্রা

১৩. সবচেয়ে বড় বোকামি: নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবা

ডানিং-ক্রুগ্রার ইফেক্ট অনুযায়ী যে যত কম জানে, সে নিজেকে তত বেশি বুদ্ধিমান মনে করে। যে সত্যিকারের জ্ঞানী, সে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন। বারট্রান্ড রাসেলের একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক- “দা ট্রাবল উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ দ্যাট দা স্টুপিড আর ককশিওর অ্যান্ড দি ইন্টেলিজেন্ট আর ফুল অফ ডাউট।”

অর্থাৎ, বোকারা সবসময় নিশ্চিত, আর বুদ্ধিমানরা সন্দেহে থাকে। মানুষ যখন নিজেকে সব জানা মনে করে, তখনই সে সবচেয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় বোকা হয়ে যায়।

মানুষ তার ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ সহজাত সতর্কতা হারিয়ে ফেলেছে। আমরা সমাজ ও সিস্টেমের ওপর এতটাই অন্ধভাবে নির্ভরশীল যে, আমাদের নিজেদের বিচার-বুদ্ধি এখন আর কাজ করে না। এই ‘অতি বিশ্বাস’ বা ‘ওভার স্ট্রাস্ট’ আসলে সরলতা নয়, এটি এক ধরণের বিবর্তনগত বোকামি, যা মানুষকে যেকোনো মুহূর্তে বিপদে ফেলতে পারে।

যে প্রাণী মহাকাশে রকেট পাঠাতে পারে, সে প্রাণী রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর দেখে খাবার খায় না এই বৈপরীত্যই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর এ কারণ-ই প্রমাণ করে মানুষ আসলে “বোকা” নয় বরং সে “বিশ্বাসনির্ভর প্রাণী”। সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র সবই সেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে।

আপনি ব্যাংকে টাকা রাখেন- কারণ বিশ্বাস।

ডাক্তারকে দেখান- কারণ বিশ্বাস।

যানবাহনে ওঠেন- কারণ বিশ্বাস।

যদি মানুষ সবকিছু নিজে যাচাই করে, কিছুই বিশ্বাস না করতো তাহলে গোটা সভ্যতাই ভেঙে পড়ত।

লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ বোকা প্রাণী

প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মানুষকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন থেকে শিল্প সব কিছুতেই মানুষের অবদান অতুলনীয়। আর ইসলামে তো বলাই আছে, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এই বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ বা দ্বিমত নেই। কারণ আমরা মানবজাতিও নিজেদের সেরা ভাবতে ভালোবাসি।

তবে একটু গভীরে তাকালে একটি অদ্ভুত সত্য চর্মচক্ষুতে দৃশ্যমান। এই বুদ্ধিমান প্রাণীটিই প্রতিদিন এমন কিছু কাজ করে, যা দেখলে মনে হয় বুদ্ধি থাকলেই বুদ্ধিমান হওয়া যায় না। আজ আমরা একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজব! মানুষ কি আদতে বুদ্ধিমান, নাকি পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ এক বোকা প্রাণী।

১. অন্ধ বিশ্বাস: মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা

প্রতিদিন আমরা যাত্রার সঙ্গী হিসেবে যানবাহনে উঠি। চালকের নাম জানি না, তার লাইসেন্স আছে কিনা জানি না। মাতাল কিনা জানি না। তবুও নিশ্চিন্তে বসে পড়ি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হোক বা রূপসা থেকে পাটুরিয়া- এই অজানা মানুষটির হাতেই নিজের জীবন তুলে দিই বিনা প্রশ্নে।

ইদানিং অ্যাপ-ভিত্তিক উবার কিংবা পাঠাও যানবাহনে এই বিশ্বাস আরও অন্ধ। একধাপ এগিয়ে। একটা স্ক্রিনে নাম আর রেটিং দেখে উঠে পড়ছি অপরিচিত কারো পেছনে। সেই মানুষটা কে, কোথা থেকে এসেছে, কিছুই জানি না। তবুও এক অদৃশ্য বিশ্বাসে চলে যাচ্ছি। একটা কুকুর কিংবা বিড়াল কিন্তু মানুষের মতো এতোটা সহজতর নয়। অপরিচিত কেউ কাছে গেলেই সতর্ক হয়। কিন্তু মানুষ কেবল অদৃশ্য এক বিশ্বাসের দাস। 

২. প্রতারণা: মিথ্যে কথার ফাঁদে পড়া

পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী মানুষ, যাকে কেবল ‘কথা’ দিয়ে বোকা বানানো যায়। একটি কুকুরকে আপনি মুখে ডাকলে সে আসবে না, যদি না আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা হাতে খাবার দেখে সে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু মানুষকে ‘লটারি জিতেছেন’, ‘টাকা দ্বিগুণ হবে’ বা ‘বিদেশে চাকরি দেব’ এমন কিছু লোভনীয় কথা বললেই সে তার সারা জীবনের জমানো টাকা প্রতারকের হাতে তুলে দেয়। অথচ পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীকে এত সহজে ‘স্ক্যাম’ বা প্রতারণা করা অসম্ভব।

৩. হোটেলের খাবার: ইন্দ্রিয় থাকতেও ব্যবহার করি না

ধরুন, আপনি খাবার খাবেন।  কী করবেন? আশেপাশের একটা রেস্টুরেন্টে যাবেন (যার যার সাধ্যমতো)। এখন কথা হচ্ছে, একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা কী করি? রঙিন মেনু কার্ড দেখি, দাম দেখি, এর বেশি ভাবার সময় হয়তো পাই না। কিন্তু রান্নাঘরে যাই না। রাঁধুনির হাত পরিষ্কার কিনা দেখি না। তেল কতদিনের পুরনো, মাংস কোথা থেকে এসেছে, কিছুই জিজ্ঞেস করি না। 

অথচ একটা কুকুর বা বিড়াল যে কোনো খাবার মুখে দেওয়ার আগে ভালো করে শোঁকে। গন্ধে বুঝে নেয়, এটা খাবে কি খাবে না। প্রকৃতি তাদের দিয়েছে সতর্কতার এক সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষের কাছে এই প্রবৃত্তি কি নেই, নাকি থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয়? এটা কি বোকামি নয়?

৪. মুদ্রা: কাগজের প্রতি অদ্ভুত বিশ্বাস

মানুষ সারাজীবন গাধার মতো খাটে কিছু রঙিন কাগজের (টাকা) জন্য। আমরা বিশ্বাস করি এই কাগজের মূল্য আছে। কারণ সরকার বলেছে। যদি কাল সরকার ঘোষণা দেয় যে, এই কাগজ অচল (যেমন নোট বাতিল), তবে মানুষ এক মুহূর্তেই ভিখারি হয়ে যাবে। অথচ প্রকৃতির বাঘ বা সিংহের সম্পদ হলো তার শক্তি আর এলাকা। যা কোনো সরকার বা ব্যাংক কেড়ে নিতে পারে না। মানুষ এমন এক কাল্পনিক ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে বেঁচে আছে, যা যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।


শূন্যতার ডাক

৫. উঁচু ভবন: ‘নিরাপদ’ ভেবে খাঁচায় বসবাস

মানুষ মাটির জীব, কিন্তু সে থাকে ১০ বা ২০ তলা ভবনের উপরে। আমরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করি, যে ইঞ্জিনিয়ার বা কন্ট্রাক্টর এই বিল্ডিং বানিয়েছে, সে সিমেন্ট বা রডে চুরি করেনি। অথচ ভূমিকম্প বা আগুন লাগলে এই ভবনই মানুষের মৃত্যুফাঁদ বা কবরে পরিণত হয়। নিজের তৈরি খাঁচায় নিজেকে বন্দি করে ‘নিরাপদ’ ভাবাটা মানুষের অন্যতম বড় বোকামি।

৬. দাম্পত্য জীবন: সবচেয়ে কাছের মানুষকেও চিনি না

সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়, কথা কাটাকাটি হয়, মনোমালিন্য হয়। সারাদিন একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু রাতে সেই একই খাটে ঘুমায়। সেই হাতের রান্না-ই খায়। পরের দিন আবার স্বাভাবিক। এটা এক অদ্ভুত মানবীয় বৈশিষ্ট্য। আমরা জানি সম্পর্কে সমস্যা আছে, কিন্তু, না সমস্যা ঠিক করতে পারি, না সম্পর্ক ছাড়তে পারি। মাঝখানে ঝুলে থাকি। এই অর্ধ-সচেতন অবস্থাটাই বোকামির এক বড় উদাহরণ।

৭. বিজ্ঞাপন ও প্রতারণার ফাঁদ: বারবার একই ভুল

একই কোম্পানি বারবার ঠকিয়েছে। পণ্যের মান খারাপ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। কিন্তু নতুন প্যাকেটে নতুন বিজ্ঞাপন দেখলে আবার কেনে। একটা চকচকে ছবি, একটা বড় ছাড়ের ঘোষণা ব্যস, মানুষ আবার দৌড় দেয়। তবে একটা বিড়াল একবার ফাঁদে পড়লে দ্বিতীয়বার সেই ফাঁদের ধারে কাছেও যায় না। কিন্তু মানুষ? ইতিহাস বলছে, মানুষ বারবার একই ফাঁদে পড়ে, শুধু ফাঁদের রং বদলে যায়। 

৮. সোশ্যাল মিডিয়া : যাচাই না করে বিশ্বাস করার মহামারী

ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো খবর দেখলে মানুষ প্রথমে কী করে? সত্যি কিনা যাচাই করে? না। শেয়ার করে দেয়। কারণ খবরটা তার বিশ্বাস বা ভয়ের সঙ্গে মিলে গেছে, এটুকুই যথেষ্ট। এই ভুয়া তথ্যের মহামারী প্রমাণ করে, মানুষের কাছে সত্য যাচাইয়ের সব উপকরণ আছে, কিন্তু সে যাচাই করতে চায় না। নিজের বিশ্বাসকে নিশ্চিত করার জন্য যা দরকার তাই খোঁজে, বাকিটা উপেক্ষা করে।

৯. ডাক্তার ও ওষুধ : প্রশ্ন না করে গিলে ফেলি

ডাক্তার যা লিখলেন, বিনা প্রশ্নে কিনে খাই। এই ওষুধ কেন? পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী? অন্য বিকল্প আছে কিনা, জিজ্ঞেস করি না। সাদা অ্যাপ্রন দেখলেই সব প্রশ্ন থেমে যায়। কর্তৃত্বের প্রতি এই অন্ধ আনুগত্য মানবীয় মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন দুর্বলতা। মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম-এর বিখ্যাত মিলগ্রাম পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ কর্তৃত্বের আদেশে অন্যকে গুরুতর ক্ষতি করতেও রাজি হয়। ১৯৬১ সালে করা এই পরীক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা প্রতিনিয়ত-ই দেখি, সরকার বললেই মানুষ অন্যায় মেনে নেয়, বস বললেই কর্মী অনৈতিক কাজ করে, ধর্মীয় নেতা বললেই অনুসারী যেকোনো নির্দেশ পালন করে।


জীবনের জটিলতা

১০. ইতিহাস থেকে না শেখা : সবচেয়ে পুরনো বোকামি

যুদ্ধ এই পৃথিবীর এক অমোঘ সত্য। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার এক হিংস্র প্রবণতা মানুষ বহন করে চলেছে। তাই যুদ্ধ হয়। আবার শেষও হয়। মানুষ বলে আর না। কিন্তু কিছু বছর পরে আবার যুদ্ধ। অর্থনৈতিক সংকট আসে। মানুষ বলে, শিক্ষা নিলাম। কয়েক দশক পরে একই সংকট ফিরে আসে।

এখন কথা হচ্ছে এখানে বোকামির কী আছে। প্রাণীজগতে দলনেতা সামনে থেকে দলকে রক্ষা করে। আর মানুষের ক্ষেত্রে? নেতারা নিরাপদ বাংকারে বসে থাকে, আর তাদের মুখের কথায় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যুদ্ধে গিয়ে একে অপরকে হত্যা করে। যাদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, কেবল একজন নেতার ওপর অন্ধ বিশ্বাস ও আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি তাকে মারতে যাই এবং নিজেও মরি।

যুদ্ধে নেতার কথায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দেয় আবার হাজারো প্রাণ কেড়ে নেয়। দিনশেষে রাজত্ব করে রাজা আর যারা সংগ্রাম করে বিজয় আনে তারা প্রজাই রয়ে যায়। বলা যায়, আমরা নিজেদের শাসন বা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর নিজেরাই শাসক খুঁজি। আর এটা যুগের পর যুগ ধরে বহমান। আজও ঘটছে, কালও ঘটবে।

বিখ্যাত স্পানিশ দার্শনিক জর্জ স্যান্টায়ানা তার বিখ্যাত বই “দ্য লাইফ অফ রিজন" (১৯০৫-১৯০৬)–এ লিখেছিলেন, “দোজ হু ক্যানট রিমেম্বার দ্য পাস্ট আর কনডেমড টু রিপিট ইট”(যে অতীত মনে রাখে না, সে সেই অতীত আবার পার করতে বাধ্য।) মানব ইতিহাস এই উক্তির-ই যেন জীবন্ত দালিলিক প্রমাণ।

১১. নিজের ধ্বংস নিজে ডেকে আনা

পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই এমন প্রাণী যে জেনে বুঝে নিজের বাসস্থান ধ্বংস করে। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু দূষণ, সমুদ্র দূষণ, সবই মানুষের কাজ। আর মানুষ জানেও যে এটা ক্ষতিকর। এছাড়া ধূমপান ক্ষতিকর, সিগারেটের প্যাকেটেই লেখা থাকে। তবুও কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন সেই প্যাকেট কেনে। জেনেশুনে বিষ খাওয়া, এর চেয়ে বড় বোকামি আর কী হতে পারে? আর এটা মানুষই করে। 

১২. বোকামির মনোবৈজ্ঞানিক কারণ

মানুষ কেন এত সহজে বিশ্বাস করে? মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে আছে কয়েকটি কারণ-

জ্ঞানীয় আলসেমি: মস্তিষ্ক শক্তি বাঁচাতে চায়। প্রতিটি বিষয় যাচাই করা কষ্টকর, তাই ‘বিশ্বাস’ নামক শর্টকাট বেছে নেয়।

বিশ্বাসের আয়নায় সত্য খোঁজা: আমরা সেই তথ্যই বিশ্বাস করি যা আমাদের বিদ্যমান ধারণার সাথে মেলে। বাকিটা উপেক্ষা করি।

সামাজিক অনুকরণ: সবাই করছে, তাই আমিও করি। প্রশ্ন করাটাকে অনেক সময় ‘বিচ্ছিন্নতা’ মনে হয়।

কর্তৃত্বের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস:  ডাক্তার, নেতা, বিশেষজ্ঞ তথা কর্তৃপক্ষ যা বলে, মানুষ প্রশ্ন না করে মেনে নেয়।


অনন্ত অভিযাত্রা

১৩. সবচেয়ে বড় বোকামি: নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবা

ডানিং-ক্রুগ্রার ইফেক্ট অনুযায়ী যে যত কম জানে, সে নিজেকে তত বেশি বুদ্ধিমান মনে করে। যে সত্যিকারের জ্ঞানী, সে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন। বারট্রান্ড রাসেলের একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক- “দা ট্রাবল উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ দ্যাট দা স্টুপিড আর ককশিওর অ্যান্ড দি ইন্টেলিজেন্ট আর ফুল অফ ডাউট।”

অর্থাৎ, বোকারা সবসময় নিশ্চিত, আর বুদ্ধিমানরা সন্দেহে থাকে। মানুষ যখন নিজেকে সব জানা মনে করে, তখনই সে সবচেয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় বোকা হয়ে যায়।

মানুষ তার ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ সহজাত সতর্কতা হারিয়ে ফেলেছে। আমরা সমাজ ও সিস্টেমের ওপর এতটাই অন্ধভাবে নির্ভরশীল যে, আমাদের নিজেদের বিচার-বুদ্ধি এখন আর কাজ করে না। এই ‘অতি বিশ্বাস’ বা ‘ওভার স্ট্রাস্ট’ আসলে সরলতা নয়, এটি এক ধরণের বিবর্তনগত বোকামি, যা মানুষকে যেকোনো মুহূর্তে বিপদে ফেলতে পারে।

যে প্রাণী মহাকাশে রকেট পাঠাতে পারে, সে প্রাণী রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর দেখে খাবার খায় না এই বৈপরীত্যই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর এ কারণ-ই প্রমাণ করে মানুষ আসলে “বোকা” নয় বরং সে “বিশ্বাসনির্ভর প্রাণী”। সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র সবই সেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে।

আপনি ব্যাংকে টাকা রাখেন- কারণ বিশ্বাস।

ডাক্তারকে দেখান- কারণ বিশ্বাস।

যানবাহনে ওঠেন- কারণ বিশ্বাস।

যদি মানুষ সবকিছু নিজে যাচাই করে, কিছুই বিশ্বাস না করতো তাহলে গোটা সভ্যতাই ভেঙে পড়ত।

লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত