রসুনের গলার ফাঁকে ফাঁকে যেন লুকোচুরি খেলা করছে বাঙ্গির চারা। এক ফাঁকে রসুন, আরেক ফাঁকে বাঙ্গি। এক জমিতে দুই ফসল। ব্যয় কম, লাভ বেশি। এ যেন কৃষকের কল্পনার ফসলকে সত্যি করার এক অনন্য উদাহরণ।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন বাঙ্গিতে মেতেছে। মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষা বিশাল চর জুড়ে সবুজ লতার মেলা। লতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁচা-পাকা বাঙ্গি। যেন মাটি থেকে ফুটে ওঠা সোনার বল।
চাষিরা বলছেন, রসুনের জমিতেই বাঙ্গির বিচি বুনেন তাঁরা। রসুনের জন্য যে সার-কীটনাশক দেন, সেখানেই বড়ে ওঠে বাঙ্গির লতা। আলাদা করে কোনো খরচ নেই। শুধু বীজ আর একটু ওষুধ- এতেই স্বপ্নের ফসল।
পলাশতুলীর বাঙ্গিচাষি জাহাঙ্গীরের চোখে-মুখে যেন বিজয়ের হাসি। তিনি বলেন, “গত বছর ৩৫ শতক জমিতে খরচ হয়েছিল ৭-৯ হাজার টাকা। এ বছর একটু বেড়েছে। তবু লাভের আশা অনেক বেশি।”
মির্জারচর গ্রামের জামান তো আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। “২ বিঘা জমিতে বাঙ্গি করেছি। খরচ ২০ হাজার টাকা। আশা করছি ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারব,” বললেন তিনি। এখনই জমিতেই আকারভেদে প্রতি পিস বাঙ্গি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৯০ টাকায়।
ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে নেই। নৌকা নিয়ে ঘাটে এসে জমি থেকেই বাঙ্গি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারি ক্রেতারা। নরসিংদীর পাইকারি ফল ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, আগে ১০০ পিস বাঙ্গি কিনতেন ৫-৬ হাজার টাকায়। এখন কিনতে হচ্ছে ৭-৯ হাজার টাকায়। প্রতি বাঙ্গির দাম জমি থেকেই ৭০-৯০ টাকা। সব মিলিয়ে খুচরায় একশ টাকায় গিয়ে ঠেকছে।
কেন এত দাম? উত্তরটা দিলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজল হক। তিনি বলেন, “রায়পুরার বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের রাস্তার দুপাশে বাঙ্গির চাষ দেখে আমি অভিভূত। চাষিরা গরম মৌসুমকে টার্গেট করে ভালো দাম পাচ্ছেন।”
এই বাঙ্গি শুধু সুস্বাদুই নয়, স্বাস্থ্যসম্মতও। কম সুগার থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের কাছেও এটি জনপ্রিয়। আছে শর্করা, ভিটামিন ও মিনারেল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় ৮৫ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষ হয়েছে। রায়পুরার পাঁচটি ইউনিয়নে হয় এই চাষ। বিশেষ করে বাঁশগাড়ি ও মির্জাচর ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি বাঙ্গি হয়। তবে সদর, পলাশ, শিবপুর, বেলাবো ও মনোহরদীতেও কম-বেশি বাঙ্গি চাষ হচ্ছে।
চাষিরা জানান, বাঙ্গি চাষে বড় ব্যয় নেই। ধান বা অন্যান্য ফসলের মতো না। রসুনের সাথী ফসল হিসেবে এটি যেন এক অনন্য বরকত। জমিতে এক কাজে দুই ফসল। সারের খরচ একই। কীটনাশকও লাগে কম। শুধু বীজ আর একটু পরিশ্রম—বাকিটা প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিলেই চলে।
আর এ কারণেই নরসিংদীর চরাঞ্চল প্রতিবছরই বাঙ্গির আবাদ বাড়াচ্ছে। কৃষক হয়ে উঠছেন স্বাবলম্বী। চর এলাকা এখন শুধু ধানের জন্য নয়, বাঙ্গির জন্যও বিখ্যাত হচ্ছে।
বাঙ্গি বোঝাই নৌকা ঘাটে ভিড়ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। কৃষকের মুখে হাসি। একদিকে রসুনের সুগন্ধ, আরেক দিকে বাঙ্গির মিষ্টি গন্ধ- মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নরসিংদীর চরাঞ্চল।

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬
রসুনের গলার ফাঁকে ফাঁকে যেন লুকোচুরি খেলা করছে বাঙ্গির চারা। এক ফাঁকে রসুন, আরেক ফাঁকে বাঙ্গি। এক জমিতে দুই ফসল। ব্যয় কম, লাভ বেশি। এ যেন কৃষকের কল্পনার ফসলকে সত্যি করার এক অনন্য উদাহরণ।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন বাঙ্গিতে মেতেছে। মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষা বিশাল চর জুড়ে সবুজ লতার মেলা। লতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁচা-পাকা বাঙ্গি। যেন মাটি থেকে ফুটে ওঠা সোনার বল।
চাষিরা বলছেন, রসুনের জমিতেই বাঙ্গির বিচি বুনেন তাঁরা। রসুনের জন্য যে সার-কীটনাশক দেন, সেখানেই বড়ে ওঠে বাঙ্গির লতা। আলাদা করে কোনো খরচ নেই। শুধু বীজ আর একটু ওষুধ- এতেই স্বপ্নের ফসল।
পলাশতুলীর বাঙ্গিচাষি জাহাঙ্গীরের চোখে-মুখে যেন বিজয়ের হাসি। তিনি বলেন, “গত বছর ৩৫ শতক জমিতে খরচ হয়েছিল ৭-৯ হাজার টাকা। এ বছর একটু বেড়েছে। তবু লাভের আশা অনেক বেশি।”
মির্জারচর গ্রামের জামান তো আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। “২ বিঘা জমিতে বাঙ্গি করেছি। খরচ ২০ হাজার টাকা। আশা করছি ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারব,” বললেন তিনি। এখনই জমিতেই আকারভেদে প্রতি পিস বাঙ্গি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৯০ টাকায়।
ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে নেই। নৌকা নিয়ে ঘাটে এসে জমি থেকেই বাঙ্গি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারি ক্রেতারা। নরসিংদীর পাইকারি ফল ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, আগে ১০০ পিস বাঙ্গি কিনতেন ৫-৬ হাজার টাকায়। এখন কিনতে হচ্ছে ৭-৯ হাজার টাকায়। প্রতি বাঙ্গির দাম জমি থেকেই ৭০-৯০ টাকা। সব মিলিয়ে খুচরায় একশ টাকায় গিয়ে ঠেকছে।
কেন এত দাম? উত্তরটা দিলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজল হক। তিনি বলেন, “রায়পুরার বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের রাস্তার দুপাশে বাঙ্গির চাষ দেখে আমি অভিভূত। চাষিরা গরম মৌসুমকে টার্গেট করে ভালো দাম পাচ্ছেন।”
এই বাঙ্গি শুধু সুস্বাদুই নয়, স্বাস্থ্যসম্মতও। কম সুগার থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের কাছেও এটি জনপ্রিয়। আছে শর্করা, ভিটামিন ও মিনারেল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় ৮৫ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষ হয়েছে। রায়পুরার পাঁচটি ইউনিয়নে হয় এই চাষ। বিশেষ করে বাঁশগাড়ি ও মির্জাচর ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি বাঙ্গি হয়। তবে সদর, পলাশ, শিবপুর, বেলাবো ও মনোহরদীতেও কম-বেশি বাঙ্গি চাষ হচ্ছে।
চাষিরা জানান, বাঙ্গি চাষে বড় ব্যয় নেই। ধান বা অন্যান্য ফসলের মতো না। রসুনের সাথী ফসল হিসেবে এটি যেন এক অনন্য বরকত। জমিতে এক কাজে দুই ফসল। সারের খরচ একই। কীটনাশকও লাগে কম। শুধু বীজ আর একটু পরিশ্রম—বাকিটা প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিলেই চলে।
আর এ কারণেই নরসিংদীর চরাঞ্চল প্রতিবছরই বাঙ্গির আবাদ বাড়াচ্ছে। কৃষক হয়ে উঠছেন স্বাবলম্বী। চর এলাকা এখন শুধু ধানের জন্য নয়, বাঙ্গির জন্যও বিখ্যাত হচ্ছে।
বাঙ্গি বোঝাই নৌকা ঘাটে ভিড়ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। কৃষকের মুখে হাসি। একদিকে রসুনের সুগন্ধ, আরেক দিকে বাঙ্গির মিষ্টি গন্ধ- মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নরসিংদীর চরাঞ্চল।

আপনার মতামত লিখুন