সংবাদ

‘এই উগ্রবাদী তো আকাশ থেকে পড়েনি’ - অধ‍্যাপক আনু মুহাম্মদ


প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম

‘এই উগ্রবাদী তো আকাশ থেকে পড়েনি’ - অধ‍্যাপক আনু মুহাম্মদ

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। শুধু শিক্ষক নন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই সময়ের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের সম্পদ, কৃষি, সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি আন্দোলন করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্তর্র্বতী সরকার এমন কী চুক্তি করেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়? কেনো অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এই চুক্তিকে 'দাসখত' বা 'অধীনতার চুক্তি' বলে মন্তব্য করেছেন?

চুক্তিটি নিয়ে কেন এতো বিতর্ক?

এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি ও স্থানীয় শিল্পে কতটা প্রভাব ফেলবে? এসব বিষয়ে সংবাদ ডিজিটাল সংস্করণের বার্তা প্রধান, রাশেদ আহমেদ কথা বলেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি হুবহু ছাপা হলো।

রাশেদ আহমেদ: জুলাই আন্দোলনে আপনি ছিলেন এবং 'দ্রোহের পদযাত্রা' - একটি কর্মসূচি আপনারা জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত যাত্রা করেছিলেন। তারপর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। ইউনুস সরকার আসলো। ওই সরকারকে আপনাদের সমর্থন শেষ পর্যন্ত কন্টিনিউ করলেন না কেন? 

আনু মুহাম্মদ: আসলে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে যে প্রত্যাশাটা তৈরি হয়েছিল, যে একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, বিশেষত এমন একটা পরিস্থিতি কিংবা এমন একটা রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যাওয়া যেটা মুক্তিযুদ্ধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। মানে মুক্তিযুদ্ধে তো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা ছিল। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র হবে না সেরকম ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতা গ্রহণের মতো যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের শক্তি - সামাজিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক শক্তি দরকার - সেই শক্তি তো বাংলাদেশে এখন খুব দুর্বল।

তার ফলে সরকার পতন হলে একটা বিপদের মধ্যে আমরা পড়ে যেতে পারি - এই আশঙ্কা আমাদের ছিল। সেটা আমার ২রা আগস্টের বক্তৃতার মধ্যেই ছিল। তারপরে একটা চেষ্টা - বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সংগঠন নিয়ে কীভাবে অন্তর্র্বতী সরকার হতে পারে তার একটা রূপরেখা আমরা দিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি তো আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। যখন শেখ হাসিনা চলে গেল, তখন যেটা হয় যে সব গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখি যে শেষ সিদ্ধান্তটা আসলে সেনাবাহিনী থেকে আসে। সেনাবাহিনী যতক্ষণ পর্যন্ত একটা সরকারের সমর্থনে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন-নিপীড়ন যাই হোক না কেন সরকার টিকে থাকে। সেনাবাহিনী সরে গেলেই তখন আর সরকার টিকতে পারে না। এটা আমরা ৯০ সালেও দেখেছি, ৮৭ সালেও যে গণঅভ্যুত্থানের অবস্থা হয়েছিল তাতে এরশাদ পড়ে যাওয়ার কথা, পড়েনি কারণ সেনাবাহিনীর সমর্থন তখনও ছিল। ৬৯-এর আগেও অনেক আন্দোলন হয়েছে, আইয়ুব খান পড়েনি কারণ সেনাবাহিনী তখনও ছিল।

রাশেদ আহমেদ: ২০২৪ সালে কি হলো?

আনু মুহাম্মদ: ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের প্রথম দিক থেকেই সেনাবাহিনী বুঝতে পারে যে তাদের পক্ষেও অসম্ভব হবে এই ক্ষোভটাকে সামাল দেয়া। তখন তারা সরে যায়। কিন্তু ৫ই আগস্টে যখন শেখ হাসিনা চলে যান, তখন তো ক্ষমতাটা সেনাবাহিনীর হাতেই আসলো। এদের হাতেই চলে গেল - সেনাবাহিনী এবং এই শক্তি। এখন রাজনৈতিকভাবে দেখা গেল যে সেনাপ্রধান প্রথম নামটা বললেন 'জামায়াতে ইসলামী'।

রাশেদ আহমেদ: যখন সেনাবাহিনী সামনে এলো, কোন আলোচনা হয়েছিল আপনাদের সাথে? বা আপনাদের ডাকা হয়নি?

আনু মুহাম্মদ: না না, আমাদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। এটা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের কারো কারো সাথে তারা যোগাযোগ করেছিল। তানজিম উদ্দীন খান, তিনি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে ওখানে কীভাবে পুরো জিনিসগুলো হলো। আসিফ নজরুল তো আমাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের মধ্যে ছিল, কিন্তু আসিফ নজরুলের অবস্থান তো ভিন্ন, অন্যরকম।

রাশেদ আহমেদ: তারপর কাদের হাতে গেল ক্ষমতা? কারা নিয়ন্ত্রণে নিলো সবকিছু?

আনু মুহাম্মদ: ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস সেই সময় গ্রহণযোগ্যতা পেলেন দুটো কারণে। একটা হলো যে তার আন্তর্জাতিক একটা পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। আর একটা হচ্ছে তিনি নিপীড়িত ছিলেন এবং সেটা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল। সেই সরকারে একটা অংশ এনজিও ধরনের সংগঠনগুলো থেকে আসলো। গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে মুহাম্মদ ইউনুসের ব্যক্তিগত যোগাযোগে যারা, তারা আসলো। এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রবাসী - মানে বাংলাদেশে তারা থাকেই না এরকম বেশ কয়েকজন লোক আসলো। এবং তাদের পরবর্তী ভূমিকা থেকে আমরা দেখলাম যে ইউনুস যাদেরকে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী বানালেন, তাদের বেশ কয়েকজন একটা কর্পোরেট লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছে।

রাশেদ আহমেদ: ২ তারিখে আপনারা দ্রোহের যাত্রা করলেন। এই যে একটা আন্দোলন করছেন, তার ফসলটা আপনাদের হাতে আসতে হবে - এগুলো নিয়ে ভাবেননি তখন?

আনু মুহাম্মদ: ভাবলেও তো কোনো উপায় নেই। সব আন্দোলনে আমাদের এই দশাই হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সময় সরকারের অনিয়ম, অন্যায়, অত্যাচার কিংবা সামাজিক বৈষম্য এগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কিন্তু ফলটা কে নেবে? ফলটা নেবে যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী কোনো না কোনো পক্ষ। সেটিই হয় এবং এবারও তাই হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: তাহলে কি আমরা এটা বলব যে আপনারা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস করেন - অনেক কিছু এখন আর তাদের হাতের মধ্যে নাই?

আনু মুহাম্মদ: না, সে তো নাই। আমাদের হাতে তো এখন এই সমস্ত বিষয়ে কিছু নাই। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তো বলে, 'এই তো আপনাদের জন্য এরকম হলো'। আগেই তো জানা ছিল এটা কার হাতে যাবে। এখন এই কথাটা যারা বলেন তারা যদি নিজেরা আওয়ামী লীগের শাসনকে মনে করতেন যে আওয়ামী লীগের শাসন থাকা দরকার বাংলাদেশে, তাহলে তো আওয়ামী লীগের যে অপকর্ম কিংবা লুণ্ঠন, দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র - এগুলোর বিরুদ্ধে তাদের একটু মুখ খোলা দরকার ছিল।

রাশেদ আহমেদ: উগ্রবাদের উত্থান কি লক্ষ্য করেছেন?

আনু মুহাম্মদ: আজকে যে উগ্রবাদী আমরা দেখছি, এই উগ্রবাদী তো আকাশ থেকে পড়েনি। হঠাৎ করে জন্মগ্রহণ করেনি ৫ই আগস্ট। এদের প্রত্যেকের বয়স ৩০, ৪০, ৫০ বছর বয়স। এরা তো সেদিনই জন্মগ্রহণ করেনি। এরা তো ওই সময়ের মধ্যে ছিল। এবং এই যে বাউলদের ওপরে হামলা কিংবা মাজার-টাজার কিংবা অনলাইনে তাদের যে অ্যাক্টিভিটি—এটা তো বহুদিন থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরা অনলাইন এবং অফলাইন বিভিন্ন জায়গায় অ্যাক্টিভ ছিল। এবং তাদের একটা বড় জায়গা ছিল আওয়ামী লীগের মধ্যে। নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা এমন ধরনের কাজ করেছে—একে তো বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীকে দিচ্ছে, বিদেশি কোম্পানিকে একটার পর একটা চুক্তি করতে দিচ্ছে; আবার এখানেও ইসলামি শক্তিগুলোকে ভাবছে যে হাতে রাখলে আমরা চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এদেরকে খুশি রাখতে হবে, এখানকার যারা ধনিক গোষ্ঠী আছে তাদের খুশি রাখতে হবে, আর ইসলামি গোষ্ঠী আমাদের হাতে যদি থাকে তাহলে মোটামুটি আমরা নিশ্চিন্ত।

রাশেদ আহমেদ: ইসলামি গোষ্ঠী একটি বিষয়, উগ্রবাদিতা আরেকটি বিষয়।

আনু মুহাম্মদ: না না, ইসলামি গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেই তো এই উগ্রবাদী গোষ্ঠী এসেছে। আপনি ধরেন হেফাজতে ইসলাম কিংবা খেলাফতে মজলিশ—এদের সবার সাথে সরকারের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। এবং সরকার ভাবছে যে এটা তাদের হাতে। এমনকি জামায়াতের সাথেও বিভিন্ন ধরনের নেগোসিয়েশনের মধ্যে ছিল। যে কারণে ২৮শে অক্টোবর যখন বিএনপির ওপর আক্রমণ হলো সর্বব্যাপী, তখন জামায়াতে ইসলামী খুব শান্তিপূর্ণভাবে বড় সমাবেশ করে চলে গেল। তো এই সমস্ত কায়দা-কানুন, কলাকৌশল কিংবা তারা বলবে যে এটা কৌশলগতভাবে আমরা করেছি—এই কৌশলগতভাবে এগুলো করতে করতে এই শক্তিগুলোর জন্ম এবং বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে যে সমস্ত উগ্রবাদী-এরা তো খুমেয়িনির চাইতেও ভয়ঙ্কর। যেরকম তাদের ভূমিকা এবং দৃষ্টিভঙ্গি।

রাশেদ আহমেদ: এই যে গোষ্ঠীগুলো জন্ম হলো, এটা কি মানুষের মানসিক পরিবর্তন ঘটেছে? মেধা ও মননের পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশে? প্রগতির ধারায় যে নাই—এটা তো আপনাদেরও একটা ব্যর্থতা যে আপনারা ধরতে পারেননি।

আনু মুহাম্মদ: হ্যাঁ, আমাদের অনেকেরই ব্যর্থতা। এবং স্বাধীনতার পর থেকে যারা সরকারে ছিল তাদের প্রত্যেকের দায় আছে এটার জন্য। এবং এটার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে শিক্ষা। আপনি ধরেন একটা পাবলিক এডুকেশন বলতে যা বোঝায় - সর্বজনীন শিক্ষা - এই শিক্ষা ব্যবস্থাটাই দাঁড় করানো যায়নি স্বাধীনতার পরে। এখন আওয়ামী লীগ যখন চলে গেল তখন তাদের দাপটটা আরও বেড়ে গেল। কারণ তারা ভাবল যে এখন আমরা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। কিন্তু এটা তো তৈরি হয়েছে। এবং শেখ হাসিনা আমল থাকলে এদের শক্তি বৃদ্ধি আরও ঘটত। কারণ তারা একটা নিপীড়িত হিসেবে দুই দিক থেকেই সুবিধা পেয়েছে। একটা হচ্ছে নিপীড়িত হিসেবে তারা এক ধরনের সহানুভূতি পেয়েছে যে ইসলামি গোষ্ঠীগুলি খুব নিপীড়িত, তাদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ চেষ্টা করছে যে তারা আরও যথেষ্ট ইসলামাইজড হওয়ার জন্য। মসজিদ করে দিচ্ছে, মডেল মসজিদ হচ্ছে, কালচারাল সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভূমিকা বাড়ছে, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই তো শিক্ষাটা বিপর্যস্থ অবস্থায় চলে যাওয়ার কারণে যারা তৈরি হচ্ছে একেবারে শিশু বয়স থেকে, তাদের তো পুরো মনোজগতই অন্যরকম হয়ে যায়। তারা যে ধরনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, যেভাবে বিশ্বাস তৈরি করছে—সেটার সাথে ধর্মেরও সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে নাই। সেখানে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, অযৌক্তিক অবস্থান, অন্য যে কোনো ভিন্ন পরিচয়, ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন মত—সবার প্রতি একটা ঘৃণা।

তাদের অনেক নেতা আছে যারা তাদেরকে শেখায় যে ধর্মের বিধি-বিধানই তারা এমন ভাবে ব্যাখ্যা করে যে তারা ইচ্ছা করলে যদি কারো তার থেকে ভিন্ন মত হয় তাহলে তাকে খুন করা—এটা ধর্ম অনুযায়ী ঠিক আছে। এগুলো যদি ছোটবেলা থেকে এই ধরনের বিশ্বাস থেকে হয়, সে তো তার কাছে ওইটাই মনে হচ্ছে যে ন্যায়, বৈধ এবং ন্যায্য কাজ এবং এটা আল্লাহর নির্দেশ। এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছে এবং যাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলছে—সেই সরকারের লোকজনের যদি অত্যাচারী ভাবটা যদি ব্যাপক বিস্তৃত হয়, তাহলে তো যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী তাদের জন্য খুব সহজ যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে হইলো এই যে মানুষের ওপর অত্যাচার, সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, সম্পদ পাচার-এই সমস্ত জিনিসগুলো তাদের জন্য খুব সহজ হয়ে যায়।

রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টের পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিভিন্ন ভাস্কর্য, তারপর ৩২ নম্বরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া—এগুলো প্রথম দিন থেকেই হলো। আপনারা যারা প্রগতি রাজনীতি করেন, আপনারা তখন কিন্তু এটার প্রতিবাদ করেননি ওই সময়ে।

আনু মুহাম্মদ: তথ্যটা ঠিক না। ৫ই আগস্ট রাতেই আমি ভিডিওতে এটার প্রতিবাদ করেছি। তারপর থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সেখান থেকে প্রতিবাদ করা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে অন্তর্র্বতী সরকার এটা একদিক থেকে জামায়াত, এনসিপি আর বিএনপির প্রভাব তিনটা দলেরই আছে। তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব হচ্ছে জামায়াত। এবং তারপর এনসিপি তো জামায়াতের সাথেই সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তো সেভাবেই অন্তর্র্বতী সরকার নিজের যে ভূমিকা পালন করেছে সেটার প্রত্যেকটা বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য ছিল। কখনোই আমরা এটার ব্যাপারে কোনো ছাড় দিইনি।

রাশেদ আহমেদ: ২ আগস্ট দ্রোহের যে যাত্রাটা করেছিলেন, ১৮ মাসে অনেক কিছু ঘটার পরও ওইরকম কোনো যাত্রা করতে দেখিনি।

আনু মুহাম্মদ: ওই যাত্রা তো আর এমনি হয় না। ওই যাত্রা তো ওইরকম একটা ক্ষোভ বহু বছরের, ১৫ বছরের ক্ষোভের একটা প্রকাশ। এবং ক্ষোভের পাশাপাশি ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২ এই সময়গুলিতে সরকারের যে ভূমিকা, একটার পর একটা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ-সেটার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের সময়ে জুলাই সনদ তৈরি হলো। সেই সনদটা সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলি?

আনু মুহাম্মদ: এটা ইতিহাসকে যথাযথভাবে নিয়ে আসেনি। সেজন্য জুলাই সনদের এটা সংবিধানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আমি সমর্থন করি না। তারপর মুক্তিযুদ্ধ, আগের যে লড়াই-সংগ্রামগুলো হয়েছে সেটাও যথাযথভাবে তার মধ্যে আসেনি। আর জুলাই সনদের মধ্যে অন্যান্য যে সমস্ত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেগুলি অনেকগুলোই ঠিক আছে, আমরা একমত। যেমন ধরেন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো, ভারসাম্য তৈরি করা কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা কিংবা বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা—এগুলো তো ঠিক আছে। কিন্তু যে জায়গাটাতে আমি লিখেছিও এটা, মূলনীতি সংস্কারের ক্ষেত্রে যে প্রস্তাব তারা দিল—সংবিধান সংস্কার কমিশন—সেখানে একটা বড় আপত্তি ছিল আমার দুইটা বিষয়ে। একটা হইলো যেমন সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে তারা সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দিচ্ছে। বাদ দিয়ে তারা বলতে পারে যে হ্যাঁ এটার কোনো বাস্তবতা নাই। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল সংবিধানের মধ্যে কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা তো ছিল না। ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। সমাজতন্ত্র,সংবিধানে ছিল, সেটা ধারের কাছে ছিল না—বরং উল্টো যাত্রা আমরা দেখছি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে দেয়াল—দেয়ালে যে সমস্ত কথাবার্তা ছিল—সেই সমস্ত কথাবার্তার মধ্যে কিন্তু গণতান্ত্রিক, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সাম্য এই সমস্ত বিষয়গুলোর আকাঙ্ক্ষাটাই ব্যক্ত হয়েছে। এবং আমি মনে করি যে ওইটাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা। সেখানে 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার' এই কথাটা অনেকবার ছিল। তো ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার—এটিই হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতার মূল কথা। তো সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতা যদি না থাকে, এটা যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অধীনে হয় কিংবা ধর্মের মধ্যে হলেও ধর্ম নিরপেক্ষ এটা একটা ধর্মকে দিলেই একটা ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না। কারণ একটা ধর্মের মধ্যে অনেক ধারা আছে। ধরেন ইসলাম যদি ধরে—ইসলাম ধর্মের মধ্যে কোনটাকে ধরবে তারা? শিয়া, সুন্নি, আহলে হাদিস? তো ধর্ম ধরলে এটা হচ্ছে বিভাজনের একটা বড় জায়গা। সমাজতন্ত্র—সেটাও খুব আপত্তিজনক যুক্তি। সেটা বলা হয়েছে যে সমাজতন্ত্র একটা স্বৈরতন্ত্র তৈরি করে, একনায়কতন্ত্র তৈরি করে, গণতন্ত্রের বিরোধী। এই সমস্ত মানে আমি বুঝলাম না যে সংবিধান সংস্কার কমিশনে তো লোকজন যারা আছে তাদের তো পড়াশোনা আছে—তারা কীভাবে এই ধরনের কথা লেখে? কারণ তুলনা তো সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের তুলনা হয় না। একটা হলো ব্যবস্থা আর একটা হলো শাসন কাঠামো। গণতন্ত্রের সাথে স্বৈরতন্ত্রের আপনি তুলনা করবেন। সমাজতন্ত্রের সাথে তুলনা হবে পুঁজিবাদের। সমাজতন্ত্র যদি তুমি বাদ দাও তাহলে তুমি পুঁজিবাদ নিচ্ছ—এটা পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। এখন বলতেই পারে যে এই দেশ তো পুঁজিবাদের ধারায় চলছে। এই কথাটি পরিষ্কারভাবে স্বীকার কোনো সরকারই করে না। যদি নির্বাচনকে গণতন্ত্র হিসেবে ধরা হয়, নির্বাচিত সরকার সমাজতন্ত্রের জন্য কাজ করছে এরকমই অনেক দৃষ্টান্ত আছে। নেপাল সমাজতন্ত্রের মধ্যে আছে, লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশ সমাজতন্ত্রের মধ্যে আছে—এরা তো সব নির্বাচিত সরকার। তো সমাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্র তৈরি করে—এই কথাটা যে বলে দিল চট করে একটা দায়িত্বহীনভাবে-এগুলো হলো জুলাই সনদের মধ্যে বোঝা যায় যে সনদ করার সময় কি ধরনের লোকজন আধিপত্য তৈরি করছে।

রাশেদ আহমেদ: স্লোগানের কথা বলছিলেন, দেয়াল লিখনের কথা বলছিলেন। সেখানে তো স্লোগান, দেয়াল লিখনে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্লোগান ছিল—'পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা', 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার', 'দাবায়ে রাখতে পারবা না'। আপনারা কী মনে করেন যে ওই ভাষাগুলো তখন ছিল—ওইটা কি একটা বলার জন্য নাকি জনগণকে রাস্তায় নামানোর জন‍্য এমন ভাষার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল?

আনু মুহাম্মদ: আসলে ওই আন্দোলনের মধ্যে বহু ধরনের লোক ছিল তো। ধরেন যারা উগ্রবাদী এখন—যারা উগ্রবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে—তারা যেমন ছিল আবার বামপন্থীরা অনেকে ছিল। দেয়ালের মধ্যে লেখার মধ্যে এটা কিছু গোষ্ঠী যে প্রতারণা করতে পারে না সেটা তো আর আমি জানি না, হতে পারে। কিন্তু এটা সত্যি মীন করে এরকম বিভিন্ন সংগঠন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী বা বিভিন্ন ধরনের তরুণদের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় ছিল সে আন্দোলনের মধ্যে। সুতরাং তারা যদি নিজের উদ্যোগে এগুলি লিখে থাকে তো অবশ্যই এটা তারা আন্তরিক ভাবেই লিখেছে।

রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের ১৮ মাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আনু মুহাম্মদ: কিছু সুবিধাজনক জায়গা ছিল যে সম্পদ লুণ্ঠন, সম্পদ পাচারের সাথে যারা বড় বড় গোষ্ঠী ছিল তারা তখন অনুপস্থিত ছিল। সুতরাং সরকারের জন্য এটা একটা ভালো সুযোগ ছিল। সেই অনুযায়ী তারা আরও অনেক সংস্কার করতে পারত। কারণ তারা সরকার পরিচালিত হচ্ছে উগ্রবাদীদের দ্বারা—এরকম একটা কিংবা তাদের ভয়ে ভীত। সেজন্য সরকার নারী বিষয়ে—লিঙ্গীয় বৈচিত্র্য কিংবা লিঙ্গীয় প্রশ্নটা—এটা হচ্ছে একটা বড় জায়গা যেটা উগ্রবাদীরা সাংঘাতিক রকম অসহিষ্ণু। তারা আসলে সব ব্যাপারে বৈষম্যবাদী বলা যায় আর কি। তারা লিঙ্গীয় বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য সব বৈষম্যের পক্ষে। সুতরাং যারা উগ্রবাদী কিংবা ভয়ঙ্কর রকম বৈষম্যবাদী—বিশেষত যারা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে—তারা এটাতে সাংঘাতিক রকম অসহিষ্ণু এবং উগ্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সেটারই আমরা বহিঃপ্রকাশ দেখছি সেই সময় এবং সরকার একটা হচ্ছে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আর একটা হচ্ছে তাদেরই দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে সরকার এ বিষয়ে আর কোনো কথাই বলেনি।

রাশেদ আহমেদ: বিভিন্ন জায়গায় যে ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হচ্ছিল—এটা কি সরকার ভীত হয়ে ব্যবস্থা নেয় নাই নাকি সরকার নিশ্চুপ থেকেছে যা হয় হোক?

আনু মুহাম্মদ: সরকারের মধ্যে তাদের চিন্তার লোকজন ছিল। যারা মনে করেছে যে ঠিকই আছে এগুলো। তারা নিজেরা করতে পারবে না রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, এরা করছে ভালোই হচ্ছে। এরকম একটা অবস্থাও সরকারের মধ্যে ছিল। আবার সরকারের ওপর যাদের প্রভাব ছিল তাদের মধ্যেও ছিল। এবং সরকারি প্রশাসন এগুলোর মধ্যেও প্রভাব যাই থাকুক না কেন সরকার বলতে তো একজনকে বোঝায় যার নেতৃত্বে সরকার গঠিত। ইউনুস সাহেবের মুখ দিয়ে তো কোনো কথাই বের করা যায়নি। ইউনুস সাহেব তো এ বিষয়ে কোনো অবস্থানই গ্রহণ করেননি। তাতে বোঝা যায় যে তার সম্মতি ছিল। সম্মতি না থাকলে তো তার অনেক প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত ভাস্কর্য কিংবা এই যে মাজার-টাজার বিভিন্ন জায়গায় হামলা—এগুলো নিয়ে সরকারের ভূমিকা খুবই নমনীয় ছিল। কোনো কোনো উপদেষ্টা খুব মিনমিন করে কিছু বলেছেন কিন্তু কোনো শক্ত পজিশন ছিল না। আপনারা দেখেন যে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচী যেভাবে ভাঙচুর হলো—পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে, সেনাবাহিনী সামনে দাঁড়িয়ে, তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে—এটা তো নির্দেশ ছাড়া তারা চুপচাপ থাকার কথা না। উপদেষ্টা অনেকেই বলছেন যে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। তো অনেক চেষ্টা করেছি মানে কী? পুলিশ নড়ে না কেন? চোখের সামনে এটা তো আকাশ থেকে হঠাৎ করে পড়েনি। এরা একটা জায়গায় জড়ো হয়েছে, জমায়েত হয়ে আস্তে আস্তে আসছে, মিছিল করছে, ওইখানে এসে সময় নিয়েছে—কয়েক ঘণ্টা তো গেছে। তো এটা তো হতেই পারে না যে এটা সরকার ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তো এটা বোঝা যায় যে সরকারের মধ্যে এইসব গোষ্ঠী—উগ্রবাদী গোষ্ঠী যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল।

রাশেদ আহমেদ: নির্বাচনের তিন দিন আগে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা চুক্তি করেছে। আপনি কি চুক্তিটা পড়েছেন?

আনু মুহাম্মদ: চুক্তি তো তখন তারা প্রকাশ করেনি। কারণ নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট তারা আগেই সাইন করছিল যে প্রকাশ করবে না। পরে চুক্তি স্বাক্ষরের পরে ৩২ পৃষ্ঠার একটা ডকুমেন্ট এখন দেখা যাচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে এর বাইরে আরও অনেক আছে। কিন্তু যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে সেটাই বাংলাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর একটা চুক্তি।

রাশেদ আহমেদ: কীভাবে ভয়ঙ্কর?

আনু মুহাম্মদ: ভয়ঙ্কর কয়েকটা দিকে। একটা হচ্ছে বাধ্যতামূলকতা—বাংলাদেশ কীভাবে কী আমদানি রপ্তানি করবে, কার কাছ থেকে আমদানি রপ্তানি করবে, কত দামে আমদানি করবে—কোনো কিছুই বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাই। ওই চুক্তিটার খসড়াটা পড়লেই বোঝা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকজনের তৈরি করা। বাংলাদেশের ওইখানে কোনো অবস্থানই নাই। জোড়-জবরদস্তি করে চাপানো হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী কী আমদানি করতে হবে। দাম যাই থাকুক। ওইটার কোয়ালিটি যাই থাকুক। কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, দাম নিয়েও কিছু বলা যাবে না। ওই দামে আমদানি করতে হবে। এবং তার মধ্যে মাছ, মাংস, মুরগি, হাঁস-মুরগি, ডিম এ সমস্ত কিছু আছে। দুধ—যেগুলো আমাদের দেশে যথেষ্ট—এগুলি আমাদের আমদানি করার কোনো কথা না, কারণ নেই। সেগুলি করতে হবে। সেখান থেকে শুরু করে অস্ত্র, তারপর হচ্ছে বোয়িং—এগুলো কোনোটিই কিন্তু আমাদের দরকার নেই। সব আমদানি করতে হবে। তো বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাণিজ্য ঘাটতি যে বেশি—এটার কারণ কী? কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা আমাদের দরকার হয় না। তো বাণিজ্য ঘাটতির যদি কেউ দায়ী হয়ে থাকে সেটা যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অর্থনীতি এরকম যে ওখান থেকে আমাদের আনার কোনো দরকার নেই। আবার রপ্তানি করার অনেক সুযোগ আছে। এটা তো তাদেরই চাহিদা। এটা তো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বা মার্কিন নাগরিকদের প্রয়োজন এবং চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস যায়। সে তো আর তারা দয়া করে কেনে তা না। তো সেটিকে একটা অজুহাত হিসেবে ধরে কিংবা যুক্তি হিসেবে ধরে তারা যা খুশি তাই আমদানি করতে হবে। শুধু আমদানি করতে হবে তা না। আমরা অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করব, কতটুকু আমদানি করব—সেটাও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে করতে হবে। সম্মতি মানে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বার্থের হানি হয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো দেশের খারাপ সম্পর্ক তার কাছ থেকে আনা যাবে না। তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা যাবে না। তার সাথে অস্ত্র কেনা যাবে না। এগুলো সবই যুক্তরাষ্ট্রের মানে এটা পুরাটাই গলায় ফাঁস লাগানো একটা চুক্তি। আবার শুল্কমুক্ত—তার মানে বাংলাদেশ সরকারের যে শুল্ক আয়—রেভিনিউ ইনকাম—সেটা ড্রাস্টিক্যালি কমে যাবে। আবার এটা বেশি দামে যেহেতু আনতে হবে তাহলে এখানে সাবসিডি দিতে হবে। মানে আর্থিক ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের বোঝার মধ্যে আমরা পড়ব। আর একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না কারণ এটা পুরাটাই যুক্তরাষ্ট্র—মার্কিন এম্বেসি আমাদের পরিচালনা করবে সব। তারপর সামরিক ক্ষেত্রে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক খারাপ তাদের সাথে কিছু করা যাবে না। সুতরাং এখানে সামরিক কৌশলগত যে ব্যবস্থা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সেটার মধ্যে আমরা একটা ভিক্টিমে পরিণত হব। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সে তখন বাংলাদেশকে ব্যবহার করবে আর কি। সেজন্য এটা খুব বিপজ্জনক বাংলাদেশের জন্য।

রাশেদ আহমেদ: এখন কী হবে তাহলে? 

আনু মুহাম্মদ: অন্তর্র্বতী সরকার এই চুক্তি নিয়ে যখন থেকে আলোচনা হয় তখন থেকেই আমরা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ফোরাম থেকে, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ অন্যান্য বিভিন্ন ফোরাম থেকে বা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে বলেছি যে এটা কোনো মতে করা যাবে না। এবং আমি নিজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে বলেছি যে আপনারা প্রতিদিন প্রধান উপদেষ্টার সাথে মিটিং করেন, ঐক্যমতের আলোচনা করেন, খাওয়া-দাওয়া হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়—এই চুক্তির বিষয়ে কী কারণে আপনারা কথা বলেন না? এবং এখন পর্যন্ত কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল কোনো কথা বলেনি। তার মানে হচ্ছে এটা একটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে অন্তর্র্বতী সরকার নির্বাচনের তিন দিন আগে যেরকম তাড়াহুড়ো করে করল তাতে দুইটা জিনিস আমার নিজের কাছে মনে হয়—এক হচ্ছে অন্তর্র্বতী সরকারের মধ্যেই তাদের একটা স্বার্থ ছিল কিংবা তাদের একটা অবলিগেশন ছিল কিংবা দাসখত দেওয়া ছিল কিংবা তাদের নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপার ছিল। কারণ তারা তো বেশ কয়েকজন হচ্ছে তারা অন্য দেশের নাগরিক। আর একটা হচ্ছে যে এই সরকারে—মানে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল, সেই সমস্ত রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়েই তারা এটা করেছে। নইলে তিন দিন আগে তাড়াহুড়ো করে তারা করল এবং রাজনৈতিক দলগুলি কিছুই বলল না এবং তাদের সম্মতি না থাকলে এটা করার তাদের তো সাহস পাওয়ার কথা না। এটা হচ্ছে বিপজ্জনক যে রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষত এখন যারা ক্ষমতায় আছে—বিএনপি। বিএনপি যদি এই চুক্তির ব্যাপারে সম্মতি দিয়ে থাকে তাহলে এটা আমাদের জন্য খুবই বিপদের কথা। এখন যে পর্যায়ে আছে চুক্তিটা—চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছে—এখন যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে সংসদে আলোচনা করতে হবে। আলোচনা করে যেটাকে র‍্যাটিফাই বলে—সংসদ অনুমোদিত হতে হবে। তো সেখানে যেমন মালয়েশিয়া সেখানে বেশ কিছু সংশোধনের কথা বলছে। বেশিরভাগ দেশ তো স্বাক্ষরই করেনি। ভারতও স্বাক্ষর করেনি। এবং এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এটা ট্রাম্পের যে শুল্ক নিয়ে যে সমস্ত তৎপরতা এটাকে অবৈধ ঘোষণা করছে। সুতরাং সরকার যদি চায় তাহলে এই সমস্ত জিনিসগুলোর সুযোগটা নিতে পারে।

রাশেদ আহমেদ: আমি যেটি বলছিলাম যে অন্তর্র্বতী সরকারের কি এরকম চুক্তি করার এখতিয়ার আছে?

আনু মুহাম্মদ: কোনো রাইটই নাই। কোনো এখতিয়ারই নাই। কোনো যৌক্তিকতাও নাই। অন্তর্র্বতী সরকার তো এগুলি করতেই পারে না। অন্তর্র্বতী সরকার কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিই করতে পারে না। অন্তর্র্বতী সরকার শুধুমাত্র সেই সময়ের জন্য আছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ৩০ বছর, ৪০ বছর, ৫০ বছর কিংবা আরও বেশি যে চুক্তিগুলো বাংলাদেশে অর্থনীতিতে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে সেগুলি চুক্তি স্বাক্ষর করার তো কোনো ধরনের এখতিয়ার এবং এটা তো খুবই কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে এটা অন্তর্র্বতী সরকারের কথা না। কিন্তু তারা বন্দর নিয়ে চুক্তি করল এবং আরও করতে চাইল—সেটা শ্রমিকদের আন্দোলনের জন্য এবং জাতীয়ভাবে প্রতিবাদও হচ্ছিল ওই বিদেশি কোম্পানিই পিছিয়ে গেছে এই চুক্তি থেকে। তারপর আবার এই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা ভয়ঙ্কর চুক্তি—এই চুক্তি করল। তারপরে আরও কিছু করল-তারা যেমন অস্ত্র আমদানির জন্য কিছু চুক্তি করছে, এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করছে। স্টার লিংকের সাথে চুক্তি করছে। এগুলো তো সব দীর্ঘমেয়াদী। কোনোটিই তারা করতে পারে না। সেজন্য আমি প্রথমেই বললাম যে সরকারের মধ্যে কিছু উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী পরিচয়ে কিছু লোকের কার্যক্রম দেখে মনে হয় যে তারা আসলে আসলে লবিস্ট হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন কোম্পানির কর্পোরেট লবিস্ট হিসেবে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের একটা লবিস্ট হিসেবে কাজ করছে আর কি।

রাশেদ আহমেদ: বিএনপি তো এখন দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছে—তাদের শক্তি আছে। মানে সেই শক্তি দিয়ে কি এগুলো বাতিল করা সম্ভব কি না?

আনু মুহাম্মদ: সেটা তো তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বা রাজনৈতিকভাবে তারা কতটা জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে নাকি তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখার প্রবণতার জন্য এই দাসত্ব তারা মেনে নেবে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আছে এবং অন্যান্য দল কেউ যদি বিএনপি যদি বলে যে আমরা এর থেকে বের হতে চাই—অন্যান্য দল যারা কেউ যদি বলে যে না আমরা বের হতে চাই না—তাহলে তো সে এক্সপোজড হবে। সে তো জনগণের সামনে পরিষ্কার হবে। কাজেই এটা তো বিএনপি উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংসদে একটা বাক্যও হয়নি এই চুক্তি বিষয়ে। না সরকারি দল বলছে কিছু, না বিরোধী দল বলছে।

রাশেদ আহমেদ: আর একটি বিষয় সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল সেটা পার্লামেন্টে পাস হয়েছে।

আনু মুহাম্মদ: না, আমি কোনো দল নিষিদ্ধ করলে কোনো—আমি দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে না। কারণ দল নিষিদ্ধ করলে সেই দলের রাজনীতি তো নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। সমাজের মধ্যে তাদের যে সমর্থন কিংবা মতাদর্শিক প্রভাব—সেটা তো আর চলে যায় না। সে তো জামায়াতকে নিয়েই আমরা বুঝছি। জামায়াতকে আওয়ামী লীগ সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও নিষিদ্ধ করার অবস্থাতেই ছিল জামায়াতে ইসলামী । কিন্তু ওই সময়ই তার সবচেয়ে বেশি বিকাশ হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা সরাসরি দমন-পীড়ন কিংবা হত্যাকাণ্ডের এগুলির সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচার হচ্ছে আলাদা বিষয়। তাদের বিচার করতে হবে—কিন্তু দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে না আমি।

রাশেদ আহমেদ: বর্তমান বিএনপি সরকারের এই অল্প সময়ের—এইটাকে মূল্যায়ন করতে বললে আপনি কীভাবে করবেন?

আনু মুহাম্মদ: কিছু কিছু প্রবণতা একটু চিন্তার বিষয়। বিশেষত এই যে ধরপাকড়—ভুল মানে মিথ্যা মামলায় ধরা কিংবা বিনা বিচারে আটকে রাখা—এগুলি কিছু কিছু প্রবণতা এখন এই কম সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। তারপর মব সন্ত্রাসটা—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য ছিল বন্ধ হয়েছে কিন্তু তো বন্ধ তো হয়নি। তারপরে শিক্ষা বিষয়ে—মানে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে যে আগে—আগে যে ধরনের কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়া তারপর পরিণতি—কনসিকুয়েন্স কী হবে, ফলাফল কী হবে—এগুলি ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে প্রবণতা আমরা আগে দেখছি—সেরকম কিছু কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর এই সরকারের একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে অন্তর্র্বতী সরকারের ওপর একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। কারণ এই সময়ে কী কী হলো, কী কী ভুল হলো, কী কী ঠিক হলো—সমস্ত কিছুর একটা দলিল থাকা দরকার। এবং এই সময় যারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ করছে—চুক্তিটুক্তি এই ধরনের কাজ করছে—তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা—এটা এই সরকারের দায়িত্ব।

রাশেদ আহমেদ: আপনি কি বিচার করার কথা বলছেন?

আনু মুহাম্মদ: জবাবদিহি মানে আপনি যদি অপরাধ যদি পানিশমেন্টের মতো হয় তাহলে তো পানিশমেন্টের মধ্যেও যাইতে হবে। কিন্তু এটার একটা পর্যালোচনা প্রথমে হওয়া উচিত সরকারের করা উচিত যে অন্তর্র্বতী সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা এবং যে সমস্ত চুক্তি হয়েছে সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড কারা জড়িত ছিল, কীভাবে জড়িত ছিল, কেন করছে—সে তো বাংলাদেশের মানুষের জানার দরকার আছে, অধিকার আছে।

রাশেদ আহমেদ: অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আনু মুহাম্মদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


‘এই উগ্রবাদী তো আকাশ থেকে পড়েনি’ - অধ‍্যাপক আনু মুহাম্মদ

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। শুধু শিক্ষক নন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই সময়ের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের সম্পদ, কৃষি, সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি আন্দোলন করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্তর্র্বতী সরকার এমন কী চুক্তি করেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়? কেনো অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এই চুক্তিকে 'দাসখত' বা 'অধীনতার চুক্তি' বলে মন্তব্য করেছেন?

চুক্তিটি নিয়ে কেন এতো বিতর্ক?

এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি ও স্থানীয় শিল্পে কতটা প্রভাব ফেলবে? এসব বিষয়ে সংবাদ ডিজিটাল সংস্করণের বার্তা প্রধান, রাশেদ আহমেদ কথা বলেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি হুবহু ছাপা হলো।

রাশেদ আহমেদ: জুলাই আন্দোলনে আপনি ছিলেন এবং 'দ্রোহের পদযাত্রা' - একটি কর্মসূচি আপনারা জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত যাত্রা করেছিলেন। তারপর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। ইউনুস সরকার আসলো। ওই সরকারকে আপনাদের সমর্থন শেষ পর্যন্ত কন্টিনিউ করলেন না কেন? 

আনু মুহাম্মদ: আসলে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে যে প্রত্যাশাটা তৈরি হয়েছিল, যে একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, বিশেষত এমন একটা পরিস্থিতি কিংবা এমন একটা রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যাওয়া যেটা মুক্তিযুদ্ধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। মানে মুক্তিযুদ্ধে তো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা ছিল। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র হবে না সেরকম ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতা গ্রহণের মতো যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের শক্তি - সামাজিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক শক্তি দরকার - সেই শক্তি তো বাংলাদেশে এখন খুব দুর্বল।

তার ফলে সরকার পতন হলে একটা বিপদের মধ্যে আমরা পড়ে যেতে পারি - এই আশঙ্কা আমাদের ছিল। সেটা আমার ২রা আগস্টের বক্তৃতার মধ্যেই ছিল। তারপরে একটা চেষ্টা - বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সংগঠন নিয়ে কীভাবে অন্তর্র্বতী সরকার হতে পারে তার একটা রূপরেখা আমরা দিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি তো আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। যখন শেখ হাসিনা চলে গেল, তখন যেটা হয় যে সব গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখি যে শেষ সিদ্ধান্তটা আসলে সেনাবাহিনী থেকে আসে। সেনাবাহিনী যতক্ষণ পর্যন্ত একটা সরকারের সমর্থনে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন-নিপীড়ন যাই হোক না কেন সরকার টিকে থাকে। সেনাবাহিনী সরে গেলেই তখন আর সরকার টিকতে পারে না। এটা আমরা ৯০ সালেও দেখেছি, ৮৭ সালেও যে গণঅভ্যুত্থানের অবস্থা হয়েছিল তাতে এরশাদ পড়ে যাওয়ার কথা, পড়েনি কারণ সেনাবাহিনীর সমর্থন তখনও ছিল। ৬৯-এর আগেও অনেক আন্দোলন হয়েছে, আইয়ুব খান পড়েনি কারণ সেনাবাহিনী তখনও ছিল।

রাশেদ আহমেদ: ২০২৪ সালে কি হলো?

আনু মুহাম্মদ: ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের প্রথম দিক থেকেই সেনাবাহিনী বুঝতে পারে যে তাদের পক্ষেও অসম্ভব হবে এই ক্ষোভটাকে সামাল দেয়া। তখন তারা সরে যায়। কিন্তু ৫ই আগস্টে যখন শেখ হাসিনা চলে যান, তখন তো ক্ষমতাটা সেনাবাহিনীর হাতেই আসলো। এদের হাতেই চলে গেল - সেনাবাহিনী এবং এই শক্তি। এখন রাজনৈতিকভাবে দেখা গেল যে সেনাপ্রধান প্রথম নামটা বললেন 'জামায়াতে ইসলামী'।

রাশেদ আহমেদ: যখন সেনাবাহিনী সামনে এলো, কোন আলোচনা হয়েছিল আপনাদের সাথে? বা আপনাদের ডাকা হয়নি?

আনু মুহাম্মদ: না না, আমাদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। এটা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের কারো কারো সাথে তারা যোগাযোগ করেছিল। তানজিম উদ্দীন খান, তিনি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে ওখানে কীভাবে পুরো জিনিসগুলো হলো। আসিফ নজরুল তো আমাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের মধ্যে ছিল, কিন্তু আসিফ নজরুলের অবস্থান তো ভিন্ন, অন্যরকম।

রাশেদ আহমেদ: তারপর কাদের হাতে গেল ক্ষমতা? কারা নিয়ন্ত্রণে নিলো সবকিছু?

আনু মুহাম্মদ: ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস সেই সময় গ্রহণযোগ্যতা পেলেন দুটো কারণে। একটা হলো যে তার আন্তর্জাতিক একটা পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। আর একটা হচ্ছে তিনি নিপীড়িত ছিলেন এবং সেটা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল। সেই সরকারে একটা অংশ এনজিও ধরনের সংগঠনগুলো থেকে আসলো। গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে মুহাম্মদ ইউনুসের ব্যক্তিগত যোগাযোগে যারা, তারা আসলো। এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রবাসী - মানে বাংলাদেশে তারা থাকেই না এরকম বেশ কয়েকজন লোক আসলো। এবং তাদের পরবর্তী ভূমিকা থেকে আমরা দেখলাম যে ইউনুস যাদেরকে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী বানালেন, তাদের বেশ কয়েকজন একটা কর্পোরেট লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছে।

রাশেদ আহমেদ: ২ তারিখে আপনারা দ্রোহের যাত্রা করলেন। এই যে একটা আন্দোলন করছেন, তার ফসলটা আপনাদের হাতে আসতে হবে - এগুলো নিয়ে ভাবেননি তখন?

আনু মুহাম্মদ: ভাবলেও তো কোনো উপায় নেই। সব আন্দোলনে আমাদের এই দশাই হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সময় সরকারের অনিয়ম, অন্যায়, অত্যাচার কিংবা সামাজিক বৈষম্য এগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কিন্তু ফলটা কে নেবে? ফলটা নেবে যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী কোনো না কোনো পক্ষ। সেটিই হয় এবং এবারও তাই হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: তাহলে কি আমরা এটা বলব যে আপনারা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস করেন - অনেক কিছু এখন আর তাদের হাতের মধ্যে নাই?

আনু মুহাম্মদ: না, সে তো নাই। আমাদের হাতে তো এখন এই সমস্ত বিষয়ে কিছু নাই। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তো বলে, 'এই তো আপনাদের জন্য এরকম হলো'। আগেই তো জানা ছিল এটা কার হাতে যাবে। এখন এই কথাটা যারা বলেন তারা যদি নিজেরা আওয়ামী লীগের শাসনকে মনে করতেন যে আওয়ামী লীগের শাসন থাকা দরকার বাংলাদেশে, তাহলে তো আওয়ামী লীগের যে অপকর্ম কিংবা লুণ্ঠন, দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র - এগুলোর বিরুদ্ধে তাদের একটু মুখ খোলা দরকার ছিল।

রাশেদ আহমেদ: উগ্রবাদের উত্থান কি লক্ষ্য করেছেন?

আনু মুহাম্মদ: আজকে যে উগ্রবাদী আমরা দেখছি, এই উগ্রবাদী তো আকাশ থেকে পড়েনি। হঠাৎ করে জন্মগ্রহণ করেনি ৫ই আগস্ট। এদের প্রত্যেকের বয়স ৩০, ৪০, ৫০ বছর বয়স। এরা তো সেদিনই জন্মগ্রহণ করেনি। এরা তো ওই সময়ের মধ্যে ছিল। এবং এই যে বাউলদের ওপরে হামলা কিংবা মাজার-টাজার কিংবা অনলাইনে তাদের যে অ্যাক্টিভিটি—এটা তো বহুদিন থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরা অনলাইন এবং অফলাইন বিভিন্ন জায়গায় অ্যাক্টিভ ছিল। এবং তাদের একটা বড় জায়গা ছিল আওয়ামী লীগের মধ্যে। নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা এমন ধরনের কাজ করেছে—একে তো বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীকে দিচ্ছে, বিদেশি কোম্পানিকে একটার পর একটা চুক্তি করতে দিচ্ছে; আবার এখানেও ইসলামি শক্তিগুলোকে ভাবছে যে হাতে রাখলে আমরা চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এদেরকে খুশি রাখতে হবে, এখানকার যারা ধনিক গোষ্ঠী আছে তাদের খুশি রাখতে হবে, আর ইসলামি গোষ্ঠী আমাদের হাতে যদি থাকে তাহলে মোটামুটি আমরা নিশ্চিন্ত।

রাশেদ আহমেদ: ইসলামি গোষ্ঠী একটি বিষয়, উগ্রবাদিতা আরেকটি বিষয়।

আনু মুহাম্মদ: না না, ইসলামি গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেই তো এই উগ্রবাদী গোষ্ঠী এসেছে। আপনি ধরেন হেফাজতে ইসলাম কিংবা খেলাফতে মজলিশ—এদের সবার সাথে সরকারের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। এবং সরকার ভাবছে যে এটা তাদের হাতে। এমনকি জামায়াতের সাথেও বিভিন্ন ধরনের নেগোসিয়েশনের মধ্যে ছিল। যে কারণে ২৮শে অক্টোবর যখন বিএনপির ওপর আক্রমণ হলো সর্বব্যাপী, তখন জামায়াতে ইসলামী খুব শান্তিপূর্ণভাবে বড় সমাবেশ করে চলে গেল। তো এই সমস্ত কায়দা-কানুন, কলাকৌশল কিংবা তারা বলবে যে এটা কৌশলগতভাবে আমরা করেছি—এই কৌশলগতভাবে এগুলো করতে করতে এই শক্তিগুলোর জন্ম এবং বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে যে সমস্ত উগ্রবাদী-এরা তো খুমেয়িনির চাইতেও ভয়ঙ্কর। যেরকম তাদের ভূমিকা এবং দৃষ্টিভঙ্গি।

রাশেদ আহমেদ: এই যে গোষ্ঠীগুলো জন্ম হলো, এটা কি মানুষের মানসিক পরিবর্তন ঘটেছে? মেধা ও মননের পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশে? প্রগতির ধারায় যে নাই—এটা তো আপনাদেরও একটা ব্যর্থতা যে আপনারা ধরতে পারেননি।

আনু মুহাম্মদ: হ্যাঁ, আমাদের অনেকেরই ব্যর্থতা। এবং স্বাধীনতার পর থেকে যারা সরকারে ছিল তাদের প্রত্যেকের দায় আছে এটার জন্য। এবং এটার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে শিক্ষা। আপনি ধরেন একটা পাবলিক এডুকেশন বলতে যা বোঝায় - সর্বজনীন শিক্ষা - এই শিক্ষা ব্যবস্থাটাই দাঁড় করানো যায়নি স্বাধীনতার পরে। এখন আওয়ামী লীগ যখন চলে গেল তখন তাদের দাপটটা আরও বেড়ে গেল। কারণ তারা ভাবল যে এখন আমরা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। কিন্তু এটা তো তৈরি হয়েছে। এবং শেখ হাসিনা আমল থাকলে এদের শক্তি বৃদ্ধি আরও ঘটত। কারণ তারা একটা নিপীড়িত হিসেবে দুই দিক থেকেই সুবিধা পেয়েছে। একটা হচ্ছে নিপীড়িত হিসেবে তারা এক ধরনের সহানুভূতি পেয়েছে যে ইসলামি গোষ্ঠীগুলি খুব নিপীড়িত, তাদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ চেষ্টা করছে যে তারা আরও যথেষ্ট ইসলামাইজড হওয়ার জন্য। মসজিদ করে দিচ্ছে, মডেল মসজিদ হচ্ছে, কালচারাল সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভূমিকা বাড়ছে, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই তো শিক্ষাটা বিপর্যস্থ অবস্থায় চলে যাওয়ার কারণে যারা তৈরি হচ্ছে একেবারে শিশু বয়স থেকে, তাদের তো পুরো মনোজগতই অন্যরকম হয়ে যায়। তারা যে ধরনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, যেভাবে বিশ্বাস তৈরি করছে—সেটার সাথে ধর্মেরও সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে নাই। সেখানে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, অযৌক্তিক অবস্থান, অন্য যে কোনো ভিন্ন পরিচয়, ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন মত—সবার প্রতি একটা ঘৃণা।

তাদের অনেক নেতা আছে যারা তাদেরকে শেখায় যে ধর্মের বিধি-বিধানই তারা এমন ভাবে ব্যাখ্যা করে যে তারা ইচ্ছা করলে যদি কারো তার থেকে ভিন্ন মত হয় তাহলে তাকে খুন করা—এটা ধর্ম অনুযায়ী ঠিক আছে। এগুলো যদি ছোটবেলা থেকে এই ধরনের বিশ্বাস থেকে হয়, সে তো তার কাছে ওইটাই মনে হচ্ছে যে ন্যায়, বৈধ এবং ন্যায্য কাজ এবং এটা আল্লাহর নির্দেশ। এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছে এবং যাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলছে—সেই সরকারের লোকজনের যদি অত্যাচারী ভাবটা যদি ব্যাপক বিস্তৃত হয়, তাহলে তো যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী তাদের জন্য খুব সহজ যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে হইলো এই যে মানুষের ওপর অত্যাচার, সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, সম্পদ পাচার-এই সমস্ত জিনিসগুলো তাদের জন্য খুব সহজ হয়ে যায়।

রাশেদ আহমেদ: ৫ই আগস্টের পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিভিন্ন ভাস্কর্য, তারপর ৩২ নম্বরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া—এগুলো প্রথম দিন থেকেই হলো। আপনারা যারা প্রগতি রাজনীতি করেন, আপনারা তখন কিন্তু এটার প্রতিবাদ করেননি ওই সময়ে।

আনু মুহাম্মদ: তথ্যটা ঠিক না। ৫ই আগস্ট রাতেই আমি ভিডিওতে এটার প্রতিবাদ করেছি। তারপর থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সেখান থেকে প্রতিবাদ করা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে অন্তর্র্বতী সরকার এটা একদিক থেকে জামায়াত, এনসিপি আর বিএনপির প্রভাব তিনটা দলেরই আছে। তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব হচ্ছে জামায়াত। এবং তারপর এনসিপি তো জামায়াতের সাথেই সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তো সেভাবেই অন্তর্র্বতী সরকার নিজের যে ভূমিকা পালন করেছে সেটার প্রত্যেকটা বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য ছিল। কখনোই আমরা এটার ব্যাপারে কোনো ছাড় দিইনি।

রাশেদ আহমেদ: ২ আগস্ট দ্রোহের যে যাত্রাটা করেছিলেন, ১৮ মাসে অনেক কিছু ঘটার পরও ওইরকম কোনো যাত্রা করতে দেখিনি।

আনু মুহাম্মদ: ওই যাত্রা তো আর এমনি হয় না। ওই যাত্রা তো ওইরকম একটা ক্ষোভ বহু বছরের, ১৫ বছরের ক্ষোভের একটা প্রকাশ। এবং ক্ষোভের পাশাপাশি ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২ এই সময়গুলিতে সরকারের যে ভূমিকা, একটার পর একটা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ-সেটার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হয়েছে।

রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের সময়ে জুলাই সনদ তৈরি হলো। সেই সনদটা সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলি?

আনু মুহাম্মদ: এটা ইতিহাসকে যথাযথভাবে নিয়ে আসেনি। সেজন্য জুলাই সনদের এটা সংবিধানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আমি সমর্থন করি না। তারপর মুক্তিযুদ্ধ, আগের যে লড়াই-সংগ্রামগুলো হয়েছে সেটাও যথাযথভাবে তার মধ্যে আসেনি। আর জুলাই সনদের মধ্যে অন্যান্য যে সমস্ত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেগুলি অনেকগুলোই ঠিক আছে, আমরা একমত। যেমন ধরেন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো, ভারসাম্য তৈরি করা কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা কিংবা বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা—এগুলো তো ঠিক আছে। কিন্তু যে জায়গাটাতে আমি লিখেছিও এটা, মূলনীতি সংস্কারের ক্ষেত্রে যে প্রস্তাব তারা দিল—সংবিধান সংস্কার কমিশন—সেখানে একটা বড় আপত্তি ছিল আমার দুইটা বিষয়ে। একটা হইলো যেমন সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে তারা সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দিচ্ছে। বাদ দিয়ে তারা বলতে পারে যে হ্যাঁ এটার কোনো বাস্তবতা নাই। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল সংবিধানের মধ্যে কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা তো ছিল না। ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। সমাজতন্ত্র,সংবিধানে ছিল, সেটা ধারের কাছে ছিল না—বরং উল্টো যাত্রা আমরা দেখছি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে দেয়াল—দেয়ালে যে সমস্ত কথাবার্তা ছিল—সেই সমস্ত কথাবার্তার মধ্যে কিন্তু গণতান্ত্রিক, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সাম্য এই সমস্ত বিষয়গুলোর আকাঙ্ক্ষাটাই ব্যক্ত হয়েছে। এবং আমি মনে করি যে ওইটাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা। সেখানে 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার' এই কথাটা অনেকবার ছিল। তো ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার—এটিই হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতার মূল কথা। তো সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতা যদি না থাকে, এটা যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অধীনে হয় কিংবা ধর্মের মধ্যে হলেও ধর্ম নিরপেক্ষ এটা একটা ধর্মকে দিলেই একটা ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না। কারণ একটা ধর্মের মধ্যে অনেক ধারা আছে। ধরেন ইসলাম যদি ধরে—ইসলাম ধর্মের মধ্যে কোনটাকে ধরবে তারা? শিয়া, সুন্নি, আহলে হাদিস? তো ধর্ম ধরলে এটা হচ্ছে বিভাজনের একটা বড় জায়গা। সমাজতন্ত্র—সেটাও খুব আপত্তিজনক যুক্তি। সেটা বলা হয়েছে যে সমাজতন্ত্র একটা স্বৈরতন্ত্র তৈরি করে, একনায়কতন্ত্র তৈরি করে, গণতন্ত্রের বিরোধী। এই সমস্ত মানে আমি বুঝলাম না যে সংবিধান সংস্কার কমিশনে তো লোকজন যারা আছে তাদের তো পড়াশোনা আছে—তারা কীভাবে এই ধরনের কথা লেখে? কারণ তুলনা তো সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের তুলনা হয় না। একটা হলো ব্যবস্থা আর একটা হলো শাসন কাঠামো। গণতন্ত্রের সাথে স্বৈরতন্ত্রের আপনি তুলনা করবেন। সমাজতন্ত্রের সাথে তুলনা হবে পুঁজিবাদের। সমাজতন্ত্র যদি তুমি বাদ দাও তাহলে তুমি পুঁজিবাদ নিচ্ছ—এটা পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। এখন বলতেই পারে যে এই দেশ তো পুঁজিবাদের ধারায় চলছে। এই কথাটি পরিষ্কারভাবে স্বীকার কোনো সরকারই করে না। যদি নির্বাচনকে গণতন্ত্র হিসেবে ধরা হয়, নির্বাচিত সরকার সমাজতন্ত্রের জন্য কাজ করছে এরকমই অনেক দৃষ্টান্ত আছে। নেপাল সমাজতন্ত্রের মধ্যে আছে, লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশ সমাজতন্ত্রের মধ্যে আছে—এরা তো সব নির্বাচিত সরকার। তো সমাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্র তৈরি করে—এই কথাটা যে বলে দিল চট করে একটা দায়িত্বহীনভাবে-এগুলো হলো জুলাই সনদের মধ্যে বোঝা যায় যে সনদ করার সময় কি ধরনের লোকজন আধিপত্য তৈরি করছে।

রাশেদ আহমেদ: স্লোগানের কথা বলছিলেন, দেয়াল লিখনের কথা বলছিলেন। সেখানে তো স্লোগান, দেয়াল লিখনে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্লোগান ছিল—'পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা', 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার', 'দাবায়ে রাখতে পারবা না'। আপনারা কী মনে করেন যে ওই ভাষাগুলো তখন ছিল—ওইটা কি একটা বলার জন্য নাকি জনগণকে রাস্তায় নামানোর জন‍্য এমন ভাষার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল?

আনু মুহাম্মদ: আসলে ওই আন্দোলনের মধ্যে বহু ধরনের লোক ছিল তো। ধরেন যারা উগ্রবাদী এখন—যারা উগ্রবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে—তারা যেমন ছিল আবার বামপন্থীরা অনেকে ছিল। দেয়ালের মধ্যে লেখার মধ্যে এটা কিছু গোষ্ঠী যে প্রতারণা করতে পারে না সেটা তো আর আমি জানি না, হতে পারে। কিন্তু এটা সত্যি মীন করে এরকম বিভিন্ন সংগঠন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী বা বিভিন্ন ধরনের তরুণদের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় ছিল সে আন্দোলনের মধ্যে। সুতরাং তারা যদি নিজের উদ্যোগে এগুলি লিখে থাকে তো অবশ্যই এটা তারা আন্তরিক ভাবেই লিখেছে।

রাশেদ আহমেদ: ইউনুস সরকারের ১৮ মাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আনু মুহাম্মদ: কিছু সুবিধাজনক জায়গা ছিল যে সম্পদ লুণ্ঠন, সম্পদ পাচারের সাথে যারা বড় বড় গোষ্ঠী ছিল তারা তখন অনুপস্থিত ছিল। সুতরাং সরকারের জন্য এটা একটা ভালো সুযোগ ছিল। সেই অনুযায়ী তারা আরও অনেক সংস্কার করতে পারত। কারণ তারা সরকার পরিচালিত হচ্ছে উগ্রবাদীদের দ্বারা—এরকম একটা কিংবা তাদের ভয়ে ভীত। সেজন্য সরকার নারী বিষয়ে—লিঙ্গীয় বৈচিত্র্য কিংবা লিঙ্গীয় প্রশ্নটা—এটা হচ্ছে একটা বড় জায়গা যেটা উগ্রবাদীরা সাংঘাতিক রকম অসহিষ্ণু। তারা আসলে সব ব্যাপারে বৈষম্যবাদী বলা যায় আর কি। তারা লিঙ্গীয় বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য সব বৈষম্যের পক্ষে। সুতরাং যারা উগ্রবাদী কিংবা ভয়ঙ্কর রকম বৈষম্যবাদী—বিশেষত যারা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে—তারা এটাতে সাংঘাতিক রকম অসহিষ্ণু এবং উগ্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সেটারই আমরা বহিঃপ্রকাশ দেখছি সেই সময় এবং সরকার একটা হচ্ছে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আর একটা হচ্ছে তাদেরই দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে সরকার এ বিষয়ে আর কোনো কথাই বলেনি।

রাশেদ আহমেদ: বিভিন্ন জায়গায় যে ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হচ্ছিল—এটা কি সরকার ভীত হয়ে ব্যবস্থা নেয় নাই নাকি সরকার নিশ্চুপ থেকেছে যা হয় হোক?

আনু মুহাম্মদ: সরকারের মধ্যে তাদের চিন্তার লোকজন ছিল। যারা মনে করেছে যে ঠিকই আছে এগুলো। তারা নিজেরা করতে পারবে না রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, এরা করছে ভালোই হচ্ছে। এরকম একটা অবস্থাও সরকারের মধ্যে ছিল। আবার সরকারের ওপর যাদের প্রভাব ছিল তাদের মধ্যেও ছিল। এবং সরকারি প্রশাসন এগুলোর মধ্যেও প্রভাব যাই থাকুক না কেন সরকার বলতে তো একজনকে বোঝায় যার নেতৃত্বে সরকার গঠিত। ইউনুস সাহেবের মুখ দিয়ে তো কোনো কথাই বের করা যায়নি। ইউনুস সাহেব তো এ বিষয়ে কোনো অবস্থানই গ্রহণ করেননি। তাতে বোঝা যায় যে তার সম্মতি ছিল। সম্মতি না থাকলে তো তার অনেক প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত ভাস্কর্য কিংবা এই যে মাজার-টাজার বিভিন্ন জায়গায় হামলা—এগুলো নিয়ে সরকারের ভূমিকা খুবই নমনীয় ছিল। কোনো কোনো উপদেষ্টা খুব মিনমিন করে কিছু বলেছেন কিন্তু কোনো শক্ত পজিশন ছিল না। আপনারা দেখেন যে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচী যেভাবে ভাঙচুর হলো—পুলিশ সামনে দাঁড়িয়ে, সেনাবাহিনী সামনে দাঁড়িয়ে, তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে—এটা তো নির্দেশ ছাড়া তারা চুপচাপ থাকার কথা না। উপদেষ্টা অনেকেই বলছেন যে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। তো অনেক চেষ্টা করেছি মানে কী? পুলিশ নড়ে না কেন? চোখের সামনে এটা তো আকাশ থেকে হঠাৎ করে পড়েনি। এরা একটা জায়গায় জড়ো হয়েছে, জমায়েত হয়ে আস্তে আস্তে আসছে, মিছিল করছে, ওইখানে এসে সময় নিয়েছে—কয়েক ঘণ্টা তো গেছে। তো এটা তো হতেই পারে না যে এটা সরকার ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তো এটা বোঝা যায় যে সরকারের মধ্যে এইসব গোষ্ঠী—উগ্রবাদী গোষ্ঠী যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল।

রাশেদ আহমেদ: নির্বাচনের তিন দিন আগে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা চুক্তি করেছে। আপনি কি চুক্তিটা পড়েছেন?

আনু মুহাম্মদ: চুক্তি তো তখন তারা প্রকাশ করেনি। কারণ নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট তারা আগেই সাইন করছিল যে প্রকাশ করবে না। পরে চুক্তি স্বাক্ষরের পরে ৩২ পৃষ্ঠার একটা ডকুমেন্ট এখন দেখা যাচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে এর বাইরে আরও অনেক আছে। কিন্তু যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে সেটাই বাংলাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর একটা চুক্তি।

রাশেদ আহমেদ: কীভাবে ভয়ঙ্কর?

আনু মুহাম্মদ: ভয়ঙ্কর কয়েকটা দিকে। একটা হচ্ছে বাধ্যতামূলকতা—বাংলাদেশ কীভাবে কী আমদানি রপ্তানি করবে, কার কাছ থেকে আমদানি রপ্তানি করবে, কত দামে আমদানি করবে—কোনো কিছুই বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাই। ওই চুক্তিটার খসড়াটা পড়লেই বোঝা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকজনের তৈরি করা। বাংলাদেশের ওইখানে কোনো অবস্থানই নাই। জোড়-জবরদস্তি করে চাপানো হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী কী আমদানি করতে হবে। দাম যাই থাকুক। ওইটার কোয়ালিটি যাই থাকুক। কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, দাম নিয়েও কিছু বলা যাবে না। ওই দামে আমদানি করতে হবে। এবং তার মধ্যে মাছ, মাংস, মুরগি, হাঁস-মুরগি, ডিম এ সমস্ত কিছু আছে। দুধ—যেগুলো আমাদের দেশে যথেষ্ট—এগুলি আমাদের আমদানি করার কোনো কথা না, কারণ নেই। সেগুলি করতে হবে। সেখান থেকে শুরু করে অস্ত্র, তারপর হচ্ছে বোয়িং—এগুলো কোনোটিই কিন্তু আমাদের দরকার নেই। সব আমদানি করতে হবে। তো বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাণিজ্য ঘাটতি যে বেশি—এটার কারণ কী? কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা আমাদের দরকার হয় না। তো বাণিজ্য ঘাটতির যদি কেউ দায়ী হয়ে থাকে সেটা যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অর্থনীতি এরকম যে ওখান থেকে আমাদের আনার কোনো দরকার নেই। আবার রপ্তানি করার অনেক সুযোগ আছে। এটা তো তাদেরই চাহিদা। এটা তো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বা মার্কিন নাগরিকদের প্রয়োজন এবং চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস যায়। সে তো আর তারা দয়া করে কেনে তা না। তো সেটিকে একটা অজুহাত হিসেবে ধরে কিংবা যুক্তি হিসেবে ধরে তারা যা খুশি তাই আমদানি করতে হবে। শুধু আমদানি করতে হবে তা না। আমরা অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করব, কতটুকু আমদানি করব—সেটাও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে করতে হবে। সম্মতি মানে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বার্থের হানি হয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো দেশের খারাপ সম্পর্ক তার কাছ থেকে আনা যাবে না। তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা যাবে না। তার সাথে অস্ত্র কেনা যাবে না। এগুলো সবই যুক্তরাষ্ট্রের মানে এটা পুরাটাই গলায় ফাঁস লাগানো একটা চুক্তি। আবার শুল্কমুক্ত—তার মানে বাংলাদেশ সরকারের যে শুল্ক আয়—রেভিনিউ ইনকাম—সেটা ড্রাস্টিক্যালি কমে যাবে। আবার এটা বেশি দামে যেহেতু আনতে হবে তাহলে এখানে সাবসিডি দিতে হবে। মানে আর্থিক ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের বোঝার মধ্যে আমরা পড়ব। আর একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না কারণ এটা পুরাটাই যুক্তরাষ্ট্র—মার্কিন এম্বেসি আমাদের পরিচালনা করবে সব। তারপর সামরিক ক্ষেত্রে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক খারাপ তাদের সাথে কিছু করা যাবে না। সুতরাং এখানে সামরিক কৌশলগত যে ব্যবস্থা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সেটার মধ্যে আমরা একটা ভিক্টিমে পরিণত হব। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সে তখন বাংলাদেশকে ব্যবহার করবে আর কি। সেজন্য এটা খুব বিপজ্জনক বাংলাদেশের জন্য।

রাশেদ আহমেদ: এখন কী হবে তাহলে? 

আনু মুহাম্মদ: অন্তর্র্বতী সরকার এই চুক্তি নিয়ে যখন থেকে আলোচনা হয় তখন থেকেই আমরা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ফোরাম থেকে, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ অন্যান্য বিভিন্ন ফোরাম থেকে বা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে বলেছি যে এটা কোনো মতে করা যাবে না। এবং আমি নিজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে বলেছি যে আপনারা প্রতিদিন প্রধান উপদেষ্টার সাথে মিটিং করেন, ঐক্যমতের আলোচনা করেন, খাওয়া-দাওয়া হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়—এই চুক্তির বিষয়ে কী কারণে আপনারা কথা বলেন না? এবং এখন পর্যন্ত কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল কোনো কথা বলেনি। তার মানে হচ্ছে এটা একটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে অন্তর্র্বতী সরকার নির্বাচনের তিন দিন আগে যেরকম তাড়াহুড়ো করে করল তাতে দুইটা জিনিস আমার নিজের কাছে মনে হয়—এক হচ্ছে অন্তর্র্বতী সরকারের মধ্যেই তাদের একটা স্বার্থ ছিল কিংবা তাদের একটা অবলিগেশন ছিল কিংবা দাসখত দেওয়া ছিল কিংবা তাদের নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপার ছিল। কারণ তারা তো বেশ কয়েকজন হচ্ছে তারা অন্য দেশের নাগরিক। আর একটা হচ্ছে যে এই সরকারে—মানে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল, সেই সমস্ত রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়েই তারা এটা করেছে। নইলে তিন দিন আগে তাড়াহুড়ো করে তারা করল এবং রাজনৈতিক দলগুলি কিছুই বলল না এবং তাদের সম্মতি না থাকলে এটা করার তাদের তো সাহস পাওয়ার কথা না। এটা হচ্ছে বিপজ্জনক যে রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষত এখন যারা ক্ষমতায় আছে—বিএনপি। বিএনপি যদি এই চুক্তির ব্যাপারে সম্মতি দিয়ে থাকে তাহলে এটা আমাদের জন্য খুবই বিপদের কথা। এখন যে পর্যায়ে আছে চুক্তিটা—চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছে—এখন যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে সংসদে আলোচনা করতে হবে। আলোচনা করে যেটাকে র‍্যাটিফাই বলে—সংসদ অনুমোদিত হতে হবে। তো সেখানে যেমন মালয়েশিয়া সেখানে বেশ কিছু সংশোধনের কথা বলছে। বেশিরভাগ দেশ তো স্বাক্ষরই করেনি। ভারতও স্বাক্ষর করেনি। এবং এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এটা ট্রাম্পের যে শুল্ক নিয়ে যে সমস্ত তৎপরতা এটাকে অবৈধ ঘোষণা করছে। সুতরাং সরকার যদি চায় তাহলে এই সমস্ত জিনিসগুলোর সুযোগটা নিতে পারে।

রাশেদ আহমেদ: আমি যেটি বলছিলাম যে অন্তর্র্বতী সরকারের কি এরকম চুক্তি করার এখতিয়ার আছে?

আনু মুহাম্মদ: কোনো রাইটই নাই। কোনো এখতিয়ারই নাই। কোনো যৌক্তিকতাও নাই। অন্তর্র্বতী সরকার তো এগুলি করতেই পারে না। অন্তর্র্বতী সরকার কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিই করতে পারে না। অন্তর্র্বতী সরকার শুধুমাত্র সেই সময়ের জন্য আছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ৩০ বছর, ৪০ বছর, ৫০ বছর কিংবা আরও বেশি যে চুক্তিগুলো বাংলাদেশে অর্থনীতিতে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে সেগুলি চুক্তি স্বাক্ষর করার তো কোনো ধরনের এখতিয়ার এবং এটা তো খুবই কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে এটা অন্তর্র্বতী সরকারের কথা না। কিন্তু তারা বন্দর নিয়ে চুক্তি করল এবং আরও করতে চাইল—সেটা শ্রমিকদের আন্দোলনের জন্য এবং জাতীয়ভাবে প্রতিবাদও হচ্ছিল ওই বিদেশি কোম্পানিই পিছিয়ে গেছে এই চুক্তি থেকে। তারপর আবার এই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা ভয়ঙ্কর চুক্তি—এই চুক্তি করল। তারপরে আরও কিছু করল-তারা যেমন অস্ত্র আমদানির জন্য কিছু চুক্তি করছে, এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করছে। স্টার লিংকের সাথে চুক্তি করছে। এগুলো তো সব দীর্ঘমেয়াদী। কোনোটিই তারা করতে পারে না। সেজন্য আমি প্রথমেই বললাম যে সরকারের মধ্যে কিছু উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী পরিচয়ে কিছু লোকের কার্যক্রম দেখে মনে হয় যে তারা আসলে আসলে লবিস্ট হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন কোম্পানির কর্পোরেট লবিস্ট হিসেবে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের একটা লবিস্ট হিসেবে কাজ করছে আর কি।

রাশেদ আহমেদ: বিএনপি তো এখন দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছে—তাদের শক্তি আছে। মানে সেই শক্তি দিয়ে কি এগুলো বাতিল করা সম্ভব কি না?

আনু মুহাম্মদ: সেটা তো তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বা রাজনৈতিকভাবে তারা কতটা জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে নাকি তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখার প্রবণতার জন্য এই দাসত্ব তারা মেনে নেবে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আছে এবং অন্যান্য দল কেউ যদি বিএনপি যদি বলে যে আমরা এর থেকে বের হতে চাই—অন্যান্য দল যারা কেউ যদি বলে যে না আমরা বের হতে চাই না—তাহলে তো সে এক্সপোজড হবে। সে তো জনগণের সামনে পরিষ্কার হবে। কাজেই এটা তো বিএনপি উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংসদে একটা বাক্যও হয়নি এই চুক্তি বিষয়ে। না সরকারি দল বলছে কিছু, না বিরোধী দল বলছে।

রাশেদ আহমেদ: আর একটি বিষয় সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল সেটা পার্লামেন্টে পাস হয়েছে।

আনু মুহাম্মদ: না, আমি কোনো দল নিষিদ্ধ করলে কোনো—আমি দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে না। কারণ দল নিষিদ্ধ করলে সেই দলের রাজনীতি তো নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। সমাজের মধ্যে তাদের যে সমর্থন কিংবা মতাদর্শিক প্রভাব—সেটা তো আর চলে যায় না। সে তো জামায়াতকে নিয়েই আমরা বুঝছি। জামায়াতকে আওয়ামী লীগ সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও নিষিদ্ধ করার অবস্থাতেই ছিল জামায়াতে ইসলামী । কিন্তু ওই সময়ই তার সবচেয়ে বেশি বিকাশ হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা সরাসরি দমন-পীড়ন কিংবা হত্যাকাণ্ডের এগুলির সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচার হচ্ছে আলাদা বিষয়। তাদের বিচার করতে হবে—কিন্তু দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে না আমি।

রাশেদ আহমেদ: বর্তমান বিএনপি সরকারের এই অল্প সময়ের—এইটাকে মূল্যায়ন করতে বললে আপনি কীভাবে করবেন?

আনু মুহাম্মদ: কিছু কিছু প্রবণতা একটু চিন্তার বিষয়। বিশেষত এই যে ধরপাকড়—ভুল মানে মিথ্যা মামলায় ধরা কিংবা বিনা বিচারে আটকে রাখা—এগুলি কিছু কিছু প্রবণতা এখন এই কম সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। তারপর মব সন্ত্রাসটা—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য ছিল বন্ধ হয়েছে কিন্তু তো বন্ধ তো হয়নি। তারপরে শিক্ষা বিষয়ে—মানে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে যে আগে—আগে যে ধরনের কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়া তারপর পরিণতি—কনসিকুয়েন্স কী হবে, ফলাফল কী হবে—এগুলি ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে প্রবণতা আমরা আগে দেখছি—সেরকম কিছু কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর এই সরকারের একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে অন্তর্র্বতী সরকারের ওপর একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। কারণ এই সময়ে কী কী হলো, কী কী ভুল হলো, কী কী ঠিক হলো—সমস্ত কিছুর একটা দলিল থাকা দরকার। এবং এই সময় যারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ করছে—চুক্তিটুক্তি এই ধরনের কাজ করছে—তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা—এটা এই সরকারের দায়িত্ব।

রাশেদ আহমেদ: আপনি কি বিচার করার কথা বলছেন?

আনু মুহাম্মদ: জবাবদিহি মানে আপনি যদি অপরাধ যদি পানিশমেন্টের মতো হয় তাহলে তো পানিশমেন্টের মধ্যেও যাইতে হবে। কিন্তু এটার একটা পর্যালোচনা প্রথমে হওয়া উচিত সরকারের করা উচিত যে অন্তর্র্বতী সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা এবং যে সমস্ত চুক্তি হয়েছে সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড কারা জড়িত ছিল, কীভাবে জড়িত ছিল, কেন করছে—সে তো বাংলাদেশের মানুষের জানার দরকার আছে, অধিকার আছে।

রাশেদ আহমেদ: অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আনু মুহাম্মদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত