সংবাদ

গবাদিপশুর রোগ নির্মূলে দিল্লিতে বৈজ্ঞানিক সম্মেলন শুরু

সারাদেশে পশু চিকিৎসক সংকট, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন খামারীরা


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৪ পিএম

সারাদেশে পশু চিকিৎসক সংকট, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন খামারীরা

  • প্রতি উপজেলায় দরকার কমপক্ষে ৫ জন ডাক্তার, আছেন ১ জন
  • ২০৩০ সালের মধ্যে পিপিআর মুক্ত করার লক্ষ্য

গঙ্গা অববাহিকতার দেশগুলোতে গবাদি পশুর প্রাণঘাতী রোগ নির্মূল ক্ষুদ্র খামারিদের ভাগ্য বদলে নতুন আশার আলো নিয়ে ভারতের দিল্লিতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন। ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ভুটানের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এই অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। মূলত ছাগল ভেড়ার প্রাণঘাতী ডায়রিয়া বা পিপিআর (Peste des Petits Ruminants) রোগ ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক আয়োজন।

দেশের গ্রাম-গঞ্জ চরাঞ্চলের কয়েক লাখ ক্ষুদ্র খামারি বর্তমানে ছাগল ভেড়া পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় কোটি ৭২ লাখ ছাগল ৩৯ লাখ ভেড়া পালন করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পিপিআর বা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু মারা যাওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা। এই সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সাল থেকে ভ্যাকসিন প্রদান প্রকল্প শুরু হলেও প্রয়োজনীয় পশু চিকিৎসকের অভাবে মাঠ পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

সম্মেলনে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের একজন ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, "ছাগল ভেড়ার পিপিআর রোগ নির্মূলে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে প্রায় কোটি ৭৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে রোগটি বর্তমানে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রোগটি দেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে আমরা বদ্ধপরিকর।"

আন্তর্জাতিক খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) বিশেষজ্ঞরা এই সম্মেলনে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পশু চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচ্ছলতা ফেরাতেকালো জাতের ছাগলপালনের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও পরবর্তীতে নানা কারণে স্তিমিত হয়ে যায়। বর্তমান সরকার আবারো এই খাতকে চাঙ্গা করতে উদ্যোগ নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র ডাক্তার সংকট। সারাদেশে বর্তমানে মাত্র হাজার ৬০০ জন ভেটেরিনারি ডাক্তার কর্মরত আছেন, যেখানে প্রয়োজন কমপক্ষে হাজার বা তারও বেশি।

মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে নোয়াখালীতে কর্মরত একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার বলেন, "সুবর্ণচরসহ আশপাশের এলাকায় কয়েক হাজার ভেড়া পালন করা হয়। এসব পশু পিপিআর, জ্বর সর্দিতে আক্রান্ত হয়। প্রতিটি উপজেলায় বর্তমানে মাত্র একজন করে ডাক্তার আছেন, অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেবা নিশ্চিত করতে উপজেলায় কমপক্ষে জন ডাক্তার থাকা জরুরি। ডাক্তার না থাকায় খামারিরা হাতুড়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং ভুল চিকিৎসায় গবাদি পশু মারা যাচ্ছে।"

দিল্লির এই সম্মেলনে গবাদি পশুর রোগ নির্মূলে বর্তমান পদ্ধতির কোনো ত্রুটি আছে কি না বা চিকিৎসার মান কতটুকু উন্নত হয়েছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য বলেন, "আমাদের প্রধান লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ছাগল ভেড়ার পাতলা পায়খানা বা পিপিআর নির্মূল করা। সম্মেলনে আমরা আমাদের অগ্রগতি ভবিষ্যৎ গাইডলাইন নিয়ে আলোচনা করব।" চারণভূমি কমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাব সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মাধ্যমে খামারিদের জীবন-মান উন্নয়নে নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচিত হবে; এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


সারাদেশে পশু চিকিৎসক সংকট, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন খামারীরা

প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

  • প্রতি উপজেলায় দরকার কমপক্ষে ৫ জন ডাক্তার, আছেন ১ জন
  • ২০৩০ সালের মধ্যে পিপিআর মুক্ত করার লক্ষ্য

গঙ্গা অববাহিকতার দেশগুলোতে গবাদি পশুর প্রাণঘাতী রোগ নির্মূল ক্ষুদ্র খামারিদের ভাগ্য বদলে নতুন আশার আলো নিয়ে ভারতের দিল্লিতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন। ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ভুটানের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এই অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। মূলত ছাগল ভেড়ার প্রাণঘাতী ডায়রিয়া বা পিপিআর (Peste des Petits Ruminants) রোগ ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক আয়োজন।

দেশের গ্রাম-গঞ্জ চরাঞ্চলের কয়েক লাখ ক্ষুদ্র খামারি বর্তমানে ছাগল ভেড়া পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় কোটি ৭২ লাখ ছাগল ৩৯ লাখ ভেড়া পালন করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পিপিআর বা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু মারা যাওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা। এই সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সাল থেকে ভ্যাকসিন প্রদান প্রকল্প শুরু হলেও প্রয়োজনীয় পশু চিকিৎসকের অভাবে মাঠ পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

সম্মেলনে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের একজন ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, "ছাগল ভেড়ার পিপিআর রোগ নির্মূলে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে প্রায় কোটি ৭৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে রোগটি বর্তমানে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রোগটি দেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে আমরা বদ্ধপরিকর।"

আন্তর্জাতিক খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) বিশেষজ্ঞরা এই সম্মেলনে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পশু চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচ্ছলতা ফেরাতেকালো জাতের ছাগলপালনের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও পরবর্তীতে নানা কারণে স্তিমিত হয়ে যায়। বর্তমান সরকার আবারো এই খাতকে চাঙ্গা করতে উদ্যোগ নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র ডাক্তার সংকট। সারাদেশে বর্তমানে মাত্র হাজার ৬০০ জন ভেটেরিনারি ডাক্তার কর্মরত আছেন, যেখানে প্রয়োজন কমপক্ষে হাজার বা তারও বেশি।

মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে নোয়াখালীতে কর্মরত একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার বলেন, "সুবর্ণচরসহ আশপাশের এলাকায় কয়েক হাজার ভেড়া পালন করা হয়। এসব পশু পিপিআর, জ্বর সর্দিতে আক্রান্ত হয়। প্রতিটি উপজেলায় বর্তমানে মাত্র একজন করে ডাক্তার আছেন, অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেবা নিশ্চিত করতে উপজেলায় কমপক্ষে জন ডাক্তার থাকা জরুরি। ডাক্তার না থাকায় খামারিরা হাতুড়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং ভুল চিকিৎসায় গবাদি পশু মারা যাচ্ছে।"

দিল্লির এই সম্মেলনে গবাদি পশুর রোগ নির্মূলে বর্তমান পদ্ধতির কোনো ত্রুটি আছে কি না বা চিকিৎসার মান কতটুকু উন্নত হয়েছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য বলেন, "আমাদের প্রধান লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ছাগল ভেড়ার পাতলা পায়খানা বা পিপিআর নির্মূল করা। সম্মেলনে আমরা আমাদের অগ্রগতি ভবিষ্যৎ গাইডলাইন নিয়ে আলোচনা করব।" চারণভূমি কমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাব সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মাধ্যমে খামারিদের জীবন-মান উন্নয়নে নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচিত হবে; এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত