মইনুল ইসলামের সিরিয়াল নম্বর ১১৩। সকাল সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তখনও তেলের গাড়ি জোনাকি ফিলিং ষ্টেশন পাম্পে ঢোকেনি।
তার সামনে বাইক, ট্রাক, বাসসহ অন্তত ১১২টি যান। গরমে উত্তপ্ত পরিবেশ। হাতে এক কাপ চা আর শুকনা রুটি এটাই তার সকালের নাশতা। তবু মুখে একটু খুশির ঝিলিক। কারণ খবর পেয়েছেন, পাম্পে তেলের গাড়ি এসে গেছে।
দুপুর বারোটা বেজে গেছে। তখনও গোসল হয়নি, জোটেনি আর কোনো খাবার। তেল দেওয়া শুরু হবে, সেই অপেক্ষায় আছেন মইনুল।
পেট্রোল পাম্পের চারপাশ তখন উৎসবের মেজাজ। যেন কেউ লটারি জিতেছে। চিৎকার, করতালি, কেউ কেউ হাত তুলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন। খুশির কারণ শুধু এই যে, ‘তেল পাবেন তারা’।
মইনুল পেশায় বাস হেল্পার। তিনি বললেন, “একদম শেষে আমার সিরিয়াল আসবে। তাও খুশি। গাড়ি তো এলো, এখন তেল তো পাবই।”
তিনি জানালেন, গত দুই দিন ধরে তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে ছুটছেন। “কাল রাতেও ৩টা পাম্প ঘুরেছি। কোথাও তেল নেই। আজ সকালে ভাগ্য ভালো। গাড়ি এসে গেছে সকাল সাড়ে ১০টায়। এখন সিরিয়াল শেষে হয়তো আমার নম্বর আসবে।”
প্রশ্ন করায় নাশতা নিয়ে মইনুল জানালেন, “রুটি-চা খেয়েই সিরিয়াল ধরেছি। পেট ভরেনি, কিন্তু কাজ চালিয়ে নিচ্ছি।”
পাশ থেকে এক ব্যক্তিগত গাড়ির চালক বলেন, “এসি চালাতে পারি না, শার্ট খুলেছি।”
পাম্পের অন্য প্রান্তে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক জাকির হোসেন। গায়ে শার্ট নেই, কাঁধে গামছা। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ, দরজা জানালা খোলা। ঘামে ভিজে একশা।
জাকির বলেন, “আমার সিরিয়াল কখন আসবে জানি না। সকাল থেকে লাইনে আছি। ট্যাংকে তেল আছে, কিন্তু খুব স্পর্শকাতর অবস্থায়। এসি চালালে তেল শেষ, তখন গাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতে হবে। তাই শার্ট খুলে গরম সামলাচ্ছি।”
পাশেই কয়েকজন ড্রাইভার লাইনে দাঁড়িয়ে। তাদের কারও দুই ঘণ্টা, কারও তিন ঘণ্টা, কারও পাঁচ ঘণ্টাও পেরিয়ে গেছে। বাথরুমের ব্যবস্থা নেই, খাবারের জোগান নেই। তবু লাইন ছাড়ার উপায় নেই।
জাকিরের গলায় রাগ ও ক্ষোভের বদলে অবসাদ, “সরকার বলে তেলের মজুদ যথেষ্ট। কিন্তু সেই মজুদ তো সরকারের কাছেই আছে। আমরা তো পাচ্ছি না। দাম বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভোগান্তি কমেনি বরং বেড়েছে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে তেলের জন্য।”
আরেক পাম্পের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আরেক বাসের হেলপার নাহিদ। রাত ২টায় বাস নিয়ে পাম্পে এসেছেন। সকাল ১০টা বাজে, তখনও তেলের গাড়ি আসেনি।
নাহিদ বললেন, “ওই পাশের পাম্পে দাঁড়িয়েছিলাম। মেসার্স খান এন্ড চৌধুরী ফিলিং ষ্টেশন তেল শেষ। তারপর এ পাশে আসলাম। এখনো গাড়ি আসেনি। যাত্রী নিয়ে বের হতে পারছি না। মালিকের ফোন, যাত্রীদের গালি সব সহ্য করতে হচ্ছে।”
তিনি জানান, আগে ২৭ লিটার তেলে এক দিন চলতো। এখন ১৩ লিটার তেলের জন্য পাম্প থেকে পাম্পে ঘুরতে হয়। “তেল পেলে যাত্রী সেবা দিই। এক টাকা বেশি নিতে পারি না। উল্টো যাত্রীরা বলে, ‘ওই শালা গাড়ি থামাস কেন?’ কিন্তু তারা দেখে না সারা রাত তেলের জন্য না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।”
আলী ইসলামের অভিযোগ, ‘আমরা দেশের বোঝা হয়ে গেছি’ বেশ কয়েকজন চালক-হেলপার মিলে যখন তেলের অপেক্ষায় সময় কাটাচ্ছেন, তখন আলী ইসলাম নামের এক বাসচালক ক্ষোভ ঝাড়লেন। তার কণ্ঠে ক্লান্তি ও ক্ষোভের মিশেল। “বউ-বাচ্চা ফেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। এটা কোন দেশ? কী করছেন সরকার? আমরা দেশের বোঝা হয়ে গেছি, তাই আমাদের সঙ্গে মশকরা করছেন। তেলের দাম বাড়িয়েছেন, কিন্তু তেল দিচ্ছেন না পর্যাপ্ত। এক পাম্পের ম্যানেজার বলে, ‘ডিপো থেকে তেল আসছে না।’ আমরা কি করব?”
‘মায়ের মুখ দেখিনি কত দিন’ সানারপাড়ের বাসিন্দা সোহেল মিয়া (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে), পেশায় রজনীগন্ধা পরিবহনের হেল্পার। গত কয়েক দিন ধরে তিনি বাসায় যেতে পারেননি। মাকে দেখেননি। গাড়ি নিয়ে পাম্পে দাঁড়িয়ে আছেন।
“তেল পেলে চাকা ঘোরে। না পেলে থমকে যায়। এটাই বাস্তব। গাড়ি চালিয়ে আবার সিরিয়াল ধরতে আসতে হয়। সিটে বসে দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমাই। এভাবে আর কত দিন চলবে? এই পেশাটাই অভিশাপ হয়ে গেছে।”
এক পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম বলেন, “ডিপো থেকে আমরা পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না। যে পরিমাণ বরাদ্দ আসে, তা দিয়েই চালাতে হয়। কিছু সময় আসে, কিছু সময় আসে না। চালকদের কষ্ট দেখি, কিন্তু কিছু করার নেই। সরকার বলছে পর্যাপ্ত মজুদ আছে, কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুদ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সঙ্কটজনক নয়। কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতা এবং কিছু ‘অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে’ পাম্পগুলোতে তেলের সংকট দেখা যাচ্ছে।
সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু ভোগান্তি কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী মাসুদ। তিনি বলেন, “শুধু দাম বাড়ালেই হবে না, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাম্পে পাম্পে তেল পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চালক-যাত্রী সবাই ভোগান্তিতে পড়বেন।”

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
মইনুল ইসলামের সিরিয়াল নম্বর ১১৩। সকাল সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তখনও তেলের গাড়ি জোনাকি ফিলিং ষ্টেশন পাম্পে ঢোকেনি।
তার সামনে বাইক, ট্রাক, বাসসহ অন্তত ১১২টি যান। গরমে উত্তপ্ত পরিবেশ। হাতে এক কাপ চা আর শুকনা রুটি এটাই তার সকালের নাশতা। তবু মুখে একটু খুশির ঝিলিক। কারণ খবর পেয়েছেন, পাম্পে তেলের গাড়ি এসে গেছে।
দুপুর বারোটা বেজে গেছে। তখনও গোসল হয়নি, জোটেনি আর কোনো খাবার। তেল দেওয়া শুরু হবে, সেই অপেক্ষায় আছেন মইনুল।
পেট্রোল পাম্পের চারপাশ তখন উৎসবের মেজাজ। যেন কেউ লটারি জিতেছে। চিৎকার, করতালি, কেউ কেউ হাত তুলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন। খুশির কারণ শুধু এই যে, ‘তেল পাবেন তারা’।
মইনুল পেশায় বাস হেল্পার। তিনি বললেন, “একদম শেষে আমার সিরিয়াল আসবে। তাও খুশি। গাড়ি তো এলো, এখন তেল তো পাবই।”
তিনি জানালেন, গত দুই দিন ধরে তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে ছুটছেন। “কাল রাতেও ৩টা পাম্প ঘুরেছি। কোথাও তেল নেই। আজ সকালে ভাগ্য ভালো। গাড়ি এসে গেছে সকাল সাড়ে ১০টায়। এখন সিরিয়াল শেষে হয়তো আমার নম্বর আসবে।”
প্রশ্ন করায় নাশতা নিয়ে মইনুল জানালেন, “রুটি-চা খেয়েই সিরিয়াল ধরেছি। পেট ভরেনি, কিন্তু কাজ চালিয়ে নিচ্ছি।”
পাশ থেকে এক ব্যক্তিগত গাড়ির চালক বলেন, “এসি চালাতে পারি না, শার্ট খুলেছি।”
পাম্পের অন্য প্রান্তে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক জাকির হোসেন। গায়ে শার্ট নেই, কাঁধে গামছা। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ, দরজা জানালা খোলা। ঘামে ভিজে একশা।
জাকির বলেন, “আমার সিরিয়াল কখন আসবে জানি না। সকাল থেকে লাইনে আছি। ট্যাংকে তেল আছে, কিন্তু খুব স্পর্শকাতর অবস্থায়। এসি চালালে তেল শেষ, তখন গাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতে হবে। তাই শার্ট খুলে গরম সামলাচ্ছি।”
পাশেই কয়েকজন ড্রাইভার লাইনে দাঁড়িয়ে। তাদের কারও দুই ঘণ্টা, কারও তিন ঘণ্টা, কারও পাঁচ ঘণ্টাও পেরিয়ে গেছে। বাথরুমের ব্যবস্থা নেই, খাবারের জোগান নেই। তবু লাইন ছাড়ার উপায় নেই।
জাকিরের গলায় রাগ ও ক্ষোভের বদলে অবসাদ, “সরকার বলে তেলের মজুদ যথেষ্ট। কিন্তু সেই মজুদ তো সরকারের কাছেই আছে। আমরা তো পাচ্ছি না। দাম বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভোগান্তি কমেনি বরং বেড়েছে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে তেলের জন্য।”
আরেক পাম্পের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আরেক বাসের হেলপার নাহিদ। রাত ২টায় বাস নিয়ে পাম্পে এসেছেন। সকাল ১০টা বাজে, তখনও তেলের গাড়ি আসেনি।
নাহিদ বললেন, “ওই পাশের পাম্পে দাঁড়িয়েছিলাম। মেসার্স খান এন্ড চৌধুরী ফিলিং ষ্টেশন তেল শেষ। তারপর এ পাশে আসলাম। এখনো গাড়ি আসেনি। যাত্রী নিয়ে বের হতে পারছি না। মালিকের ফোন, যাত্রীদের গালি সব সহ্য করতে হচ্ছে।”
তিনি জানান, আগে ২৭ লিটার তেলে এক দিন চলতো। এখন ১৩ লিটার তেলের জন্য পাম্প থেকে পাম্পে ঘুরতে হয়। “তেল পেলে যাত্রী সেবা দিই। এক টাকা বেশি নিতে পারি না। উল্টো যাত্রীরা বলে, ‘ওই শালা গাড়ি থামাস কেন?’ কিন্তু তারা দেখে না সারা রাত তেলের জন্য না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।”
আলী ইসলামের অভিযোগ, ‘আমরা দেশের বোঝা হয়ে গেছি’ বেশ কয়েকজন চালক-হেলপার মিলে যখন তেলের অপেক্ষায় সময় কাটাচ্ছেন, তখন আলী ইসলাম নামের এক বাসচালক ক্ষোভ ঝাড়লেন। তার কণ্ঠে ক্লান্তি ও ক্ষোভের মিশেল। “বউ-বাচ্চা ফেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। এটা কোন দেশ? কী করছেন সরকার? আমরা দেশের বোঝা হয়ে গেছি, তাই আমাদের সঙ্গে মশকরা করছেন। তেলের দাম বাড়িয়েছেন, কিন্তু তেল দিচ্ছেন না পর্যাপ্ত। এক পাম্পের ম্যানেজার বলে, ‘ডিপো থেকে তেল আসছে না।’ আমরা কি করব?”
‘মায়ের মুখ দেখিনি কত দিন’ সানারপাড়ের বাসিন্দা সোহেল মিয়া (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে), পেশায় রজনীগন্ধা পরিবহনের হেল্পার। গত কয়েক দিন ধরে তিনি বাসায় যেতে পারেননি। মাকে দেখেননি। গাড়ি নিয়ে পাম্পে দাঁড়িয়ে আছেন।
“তেল পেলে চাকা ঘোরে। না পেলে থমকে যায়। এটাই বাস্তব। গাড়ি চালিয়ে আবার সিরিয়াল ধরতে আসতে হয়। সিটে বসে দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমাই। এভাবে আর কত দিন চলবে? এই পেশাটাই অভিশাপ হয়ে গেছে।”
এক পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম বলেন, “ডিপো থেকে আমরা পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না। যে পরিমাণ বরাদ্দ আসে, তা দিয়েই চালাতে হয়। কিছু সময় আসে, কিছু সময় আসে না। চালকদের কষ্ট দেখি, কিন্তু কিছু করার নেই। সরকার বলছে পর্যাপ্ত মজুদ আছে, কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুদ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সঙ্কটজনক নয়। কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতা এবং কিছু ‘অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে’ পাম্পগুলোতে তেলের সংকট দেখা যাচ্ছে।
সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু ভোগান্তি কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী মাসুদ। তিনি বলেন, “শুধু দাম বাড়ালেই হবে না, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাম্পে পাম্পে তেল পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চালক-যাত্রী সবাই ভোগান্তিতে পড়বেন।”

আপনার মতামত লিখুন