সংবাদ

প্রাচীন মমির পেটে ২৭০০ বছরের মহাকাব্য, প্রত্নতাত্ত্বিকরা হতবাক


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

প্রাচীন মমির পেটে ২৭০০ বছরের মহাকাব্য, প্রত্নতাত্ত্বিকরা হতবাক
মিশরের প্রাচীন সমাধিতে মমি।

মমি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুবিন্যস্ত কাপড়ে মোড়ানো মৃতদেহ, গিজার পিরামিড আর ফারাওদের গোপন সমাধি। তবে সম্প্রতি মিশরের এক প্রাচীন সমাধি থেকে উদ্ধার হলো এমন এক মমি যা শুধু দেহাবশেষ নয়, ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। যা নিজের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিল। আর সেটি হলো- প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমারের অমর সৃষ্টি ‘ইলিয়াড’।

হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই মমির পেটের ভেতর থেকে উদ্ধার হয়েছে এই পাণ্ডুলিপি। যেন সময়ের বুক চিরে ২,৭০০ বছর আগের এক মানুষ আজ আমাদের জানান দিচ্ছেন, সাহিত্যের মাহাত্ম্য কখনো মরে না।

মিশরের প্রাচীন সমাধি খুঁড়তে গিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদরা পেলেন সেই অভাবনীয় রহস্য। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের সেই মমির আবরণের ভেতর থেকে উদ্ধার হলো প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’-এর একটি প্যাপিরাস খণ্ড। যেন সাহিত্যের ইতিহাসের গর্ভে চাপা পড়ে থাকা অমূল্য রত্ন।

উদ্ধার হওয়া ইলিয়াড

আশ্চর্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে প্রাচীন মিশরীয় শহর অক্সিরহিঙ্কাসে। সেখানকার একটি সমাধি থেকে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মমি উদ্ধার করেছেন স্পেনের প্রত্নতত্ত্ববিদ দল। সোনার পাত ও জ্যামিতিক নকশায় সাজানো অন্যান্য মমির ভিড়েই চোখ কাড়ে একটির চমকপ্রদ আবিষ্কার। এর পেটের ওপর আবরণের ভেতরে সুন্দর করে গুটিয়ে রাখা ছিল হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্যাপিরাস।

মিলেছে ‘ইলিয়াড’-এর দ্বিতীয় সর্গের বিখ্যাত অংশ- গ্রিক বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সেনাপতিদের তালিকা। কবি যেখানে দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করে বীর গুনেউস থেকে ট্লেপোলেমাস পর্যন্ত ট্রয় যুদ্ধে অংশ নেওয়া বীরদের পরিচয় করিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিই প্রথম নিদর্শন, যেখানে মমিকরণের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রিক সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করা হয়েছিল।

বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোলজি অধ্যাপক ইগ্নাসি-জাভিয়ের আডিয়েগো বলছেন, “ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে অক্সিরহিঙ্কাসে অগণিত প্যাপিরাস পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের সঙ্গে গ্রিক সাহিত্যের প্যাপিরাসের সংশ্লিষ্টতা এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত।”

১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময় ফরাসি পণ্ডিত ভিভাঁ দ্যনো সর্বপ্রথম এই স্থান চিহ্নিত করেন। এর এক শ বছর পর কায়রো থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরের আবর্জনার স্তূপ থেকে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রায় ২ লাখ প্রাচীন প্যাপিরাস উদ্ধার করেন। যার মধ্যে ছিল সাহিত্য, সরকারি নথি, ধর্মীয় গ্রন্থ, এমনকি ব্যক্তিগত চিঠিও।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এখানেই গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের ট্র্যাকারস নাটকের প্যাপিরাস পাওয়া গিয়েছিল। আগে ধারণা করা হতো নাটকটির প্রায় পুরোটাই ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ মৃত্যুর পর নিজের প্রিয় সাহিত্য সঙ্গী হিসেবে রেখে যেতে চেয়েছিলেন? গবেষকরা বলছেন, অন্য মমির ভেতরে এর আগে বিভিন্ন ‘জাদু-জপ বা আচার-সম্বল’ পাওয়া গেলেও সাহিত্যকথা প্যাপিরাসের আকারে পাওয়া অভিনব।

কাতালোনিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক মাইতে মাসকর্ট ও এস্তের পন্স বলছেন, “আমরা এখনো বিভিন্ন ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখছি। কোনো ব্যক্তির সুরক্ষা কিংবা আচার-বিশ্বাসের অংশ হিসেবেই এটি যোগ করা হয়েছিল বলে আমরা ধারণা করছি।”

খনন

মিশরীয় প্রত্নতত্ত্ব সুপ্রিম কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিশাম এল-লেইথির মতে, গ্রিক ও রোমান যুগে অক্সিরহিঙ্কাসের শেষকৃত্য পরিচালনার ধরনে ভিন্নতা এসেছিল। আর এই আবিষ্কার তারই ইঙ্গিত দেয়।

অক্সিরহিঙ্কাস অভিযানে একই সমাধি থেকে স্বর্ণ ও তামার জিভবিশিষ্ট মমিও পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয়রা পরলোকে দেবতা ওসাইরিসের সঙ্গে কথা বলার জন্য মমির মুখে সোনার জিভ বসিয়ে দিতেন। অন্যদের মধ্যে আরও পাওয়া গেছে জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা।

গবেষক দল বলছেন, এই প্যাপিরাসের পাশাপাশি এখনো বহু নিদর্শন সংরক্ষণ ও গবেষণার অপেক্ষায় পড়ে আছে। আবিষ্কারের কাজ শেষ হয়নি, এখনো আশা করা হচ্ছে, আরও বিস্ময় বেরিয়ে আসতে পারে এই মমিগুলোর ভেতর থেকে।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখন স্বপ্ন দেখছেন, হয়তো পরবর্তী আবিষ্কার কোনো হারিয়ে যাওয়া গ্রিক ট্র্যাজেডি কিংবা অমূল্য কোনো কাব্যগ্রন্থও হতে পারে। কারণ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা প্রতিটি নিদর্শন যেন আমাদের নতুন করে প্রশ্ন শেখায়, সভ্যতার গোড়ায় ফিরে যাওয়ার পথ দেখায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


প্রাচীন মমির পেটে ২৭০০ বছরের মহাকাব্য, প্রত্নতাত্ত্বিকরা হতবাক

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মমি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুবিন্যস্ত কাপড়ে মোড়ানো মৃতদেহ, গিজার পিরামিড আর ফারাওদের গোপন সমাধি। তবে সম্প্রতি মিশরের এক প্রাচীন সমাধি থেকে উদ্ধার হলো এমন এক মমি যা শুধু দেহাবশেষ নয়, ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। যা নিজের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিল। আর সেটি হলো- প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমারের অমর সৃষ্টি ‘ইলিয়াড’।

হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই মমির পেটের ভেতর থেকে উদ্ধার হয়েছে এই পাণ্ডুলিপি। যেন সময়ের বুক চিরে ২,৭০০ বছর আগের এক মানুষ আজ আমাদের জানান দিচ্ছেন, সাহিত্যের মাহাত্ম্য কখনো মরে না।

মিশরের প্রাচীন সমাধি খুঁড়তে গিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদরা পেলেন সেই অভাবনীয় রহস্য। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের সেই মমির আবরণের ভেতর থেকে উদ্ধার হলো প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’-এর একটি প্যাপিরাস খণ্ড। যেন সাহিত্যের ইতিহাসের গর্ভে চাপা পড়ে থাকা অমূল্য রত্ন।

উদ্ধার হওয়া ইলিয়াড

আশ্চর্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে প্রাচীন মিশরীয় শহর অক্সিরহিঙ্কাসে। সেখানকার একটি সমাধি থেকে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মমি উদ্ধার করেছেন স্পেনের প্রত্নতত্ত্ববিদ দল। সোনার পাত ও জ্যামিতিক নকশায় সাজানো অন্যান্য মমির ভিড়েই চোখ কাড়ে একটির চমকপ্রদ আবিষ্কার। এর পেটের ওপর আবরণের ভেতরে সুন্দর করে গুটিয়ে রাখা ছিল হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্যাপিরাস।

মিলেছে ‘ইলিয়াড’-এর দ্বিতীয় সর্গের বিখ্যাত অংশ- গ্রিক বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সেনাপতিদের তালিকা। কবি যেখানে দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করে বীর গুনেউস থেকে ট্লেপোলেমাস পর্যন্ত ট্রয় যুদ্ধে অংশ নেওয়া বীরদের পরিচয় করিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিই প্রথম নিদর্শন, যেখানে মমিকরণের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রিক সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করা হয়েছিল।

বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোলজি অধ্যাপক ইগ্নাসি-জাভিয়ের আডিয়েগো বলছেন, “ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে অক্সিরহিঙ্কাসে অগণিত প্যাপিরাস পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের সঙ্গে গ্রিক সাহিত্যের প্যাপিরাসের সংশ্লিষ্টতা এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত।”

১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময় ফরাসি পণ্ডিত ভিভাঁ দ্যনো সর্বপ্রথম এই স্থান চিহ্নিত করেন। এর এক শ বছর পর কায়রো থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরের আবর্জনার স্তূপ থেকে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রায় ২ লাখ প্রাচীন প্যাপিরাস উদ্ধার করেন। যার মধ্যে ছিল সাহিত্য, সরকারি নথি, ধর্মীয় গ্রন্থ, এমনকি ব্যক্তিগত চিঠিও।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এখানেই গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের ট্র্যাকারস নাটকের প্যাপিরাস পাওয়া গিয়েছিল। আগে ধারণা করা হতো নাটকটির প্রায় পুরোটাই ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ মৃত্যুর পর নিজের প্রিয় সাহিত্য সঙ্গী হিসেবে রেখে যেতে চেয়েছিলেন? গবেষকরা বলছেন, অন্য মমির ভেতরে এর আগে বিভিন্ন ‘জাদু-জপ বা আচার-সম্বল’ পাওয়া গেলেও সাহিত্যকথা প্যাপিরাসের আকারে পাওয়া অভিনব।

কাতালোনিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক মাইতে মাসকর্ট ও এস্তের পন্স বলছেন, “আমরা এখনো বিভিন্ন ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখছি। কোনো ব্যক্তির সুরক্ষা কিংবা আচার-বিশ্বাসের অংশ হিসেবেই এটি যোগ করা হয়েছিল বলে আমরা ধারণা করছি।”

খনন

মিশরীয় প্রত্নতত্ত্ব সুপ্রিম কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিশাম এল-লেইথির মতে, গ্রিক ও রোমান যুগে অক্সিরহিঙ্কাসের শেষকৃত্য পরিচালনার ধরনে ভিন্নতা এসেছিল। আর এই আবিষ্কার তারই ইঙ্গিত দেয়।

অক্সিরহিঙ্কাস অভিযানে একই সমাধি থেকে স্বর্ণ ও তামার জিভবিশিষ্ট মমিও পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয়রা পরলোকে দেবতা ওসাইরিসের সঙ্গে কথা বলার জন্য মমির মুখে সোনার জিভ বসিয়ে দিতেন। অন্যদের মধ্যে আরও পাওয়া গেছে জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা।

গবেষক দল বলছেন, এই প্যাপিরাসের পাশাপাশি এখনো বহু নিদর্শন সংরক্ষণ ও গবেষণার অপেক্ষায় পড়ে আছে। আবিষ্কারের কাজ শেষ হয়নি, এখনো আশা করা হচ্ছে, আরও বিস্ময় বেরিয়ে আসতে পারে এই মমিগুলোর ভেতর থেকে।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখন স্বপ্ন দেখছেন, হয়তো পরবর্তী আবিষ্কার কোনো হারিয়ে যাওয়া গ্রিক ট্র্যাজেডি কিংবা অমূল্য কোনো কাব্যগ্রন্থও হতে পারে। কারণ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা প্রতিটি নিদর্শন যেন আমাদের নতুন করে প্রশ্ন শেখায়, সভ্যতার গোড়ায় ফিরে যাওয়ার পথ দেখায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত