সংবাদ

স্বপ্নের ছাই ধুয়ে গেল বৃষ্টিতে, ঈদ ফ্লাইওভারের নিচে


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ১২:২১ এএম

স্বপ্নের ছাই ধুয়ে গেল বৃষ্টিতে, ঈদ ফ্লাইওভারের নিচে
ছোট ভাইকে নিয়ে এক কিশোর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের খোঁজ করছে।

রাজধানীর আকাশ সকাল থেকেই কালো। থেমে থেমে বৃষ্টি। ৫৫ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম ও তার নাতি-নাতনিদের মাথার ওপর এখন ‘ছাদ’ বলতে শুধু কালশী ফ্লাইওভার। নিঃস্ব আনোয়ারার দৃষ্টি স্থির কালশী বস্তির পোড়া ধ্বংসাবশেষের দিকে। গত কুড়িটি বছর এই জায়গাটিকেই তিনি মেনে নিয়েছিলেন নিজের ‘ঘর’ বলে।

কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ঈদুল আজহার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এখন তার পরনে থাকা কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আনোয়ারার মতো প্রায় হাজারখানেক মানুষের একই দশা। সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যার আগুন কেড়ে নিয়েছে তাদের শেষ সম্বলটুকু।আনোয়ারা বেগম বললেন, ‘আমাদের সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। শুধু প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছি।’’

রাতে পল্লবীর কালশী বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে ২৫০টিরও বেশি ঘর ও প্রায় ৫০টি দোকান পুড়ে যায়। ঈদুল আজহার মাত্র দুদিন আগে গৃহহীন হয়ে পড়েন প্রায় হাজারখানেক মানুষ। আনোয়ারার মতোই ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে এসব মানুষের। রাত কেটেছে এই ফ্লাইওভারের নিচেই।

এই আগুন শুধু ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্র নয়, পুড়িয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা সঞ্চয় আর স্বপ্নও। আনোয়ারা তার তিন সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ১৮ বছর ধরে ওই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে থাকতেন দুটি ছোট ঘরে। এখন আশ্রয় ফ্লাইওভারের নিচে।

ছিন্নমূল শিশুরা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন খুঁজছে।

তার স্বামী নাসির উদ্দিন কাজের সন্ধানে বহু বছর আগে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। দুজনে মিলে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন- এখান থেকেই।

আনোয়ারার মতোই আরেক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা প্রায় ৬০ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন। বস্তিতে তার ১০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও একটি গ্যারেজ ছিল। প্রথমে পাঁচটি রিকশা বের করা গেলেও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনটি চুরি হয়ে যায়। বাকিগুলো আগুনে পুড়ে যায়।

প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে বসবাস দেলোয়ারের। পরিচালনা করতেন ১২টি ভাড়ার ঘর। বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এখনো প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে রয়েছে বলেও জানান।

ফ্লাইওভারের নিচে বসেছিলেন ৪০ বছর বয়সী আসমা বেগম। আগুনে পুড়ে গেছে তার ভাড়ার দুটি ঘর। যেখানে মাসে ছয় হাজার টাকা দিয়ে থাকতেন স্বামী, সাত মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে। স্বামী বর্জ্য আর তিনি নিজে ভাঙারি সংগ্রহ করতেন।

উচ্ছেদের শঙ্কার কারণে ঈদের আগে কিছু জিনিসপত্র গ্রামে পাঠিয়ে দিলেও বাকি যা ছিল, আগুনে পুড়ে গেছে।  আসমা বলেন, ‘এই ফ্লাইওভারের নিচেই ঈদ কাটবে।’

পোড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে এখন পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ ও বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করতে চান তিনি। যাতে ঈদের পর অন্তত গ্রামে ফিরে যেতে পারেন।

সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আজাদ আনোয়ার জানান, বস্তিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ঘর ও ভাঙারির দোকান ছিল। যেখানে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বাস করতেন।

পুড়ে যাওয়া এলাকার সামনে তিন সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল টিম প্রায় ৬০ জন আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই দগ্ধ ও কাটা-জখমের রোগী।

এদিকে, আগুন লাগানোর অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী নাজমুল হাসান মনিকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে বস্তিবাসী। বাসিন্দাদের দাবি, নাজমুলের সঙ্গে এক দোকানদারের বিরোধ ছিল। সেই সূত্রে দিনের শুরুতেই বস্তিতে আগুন লাগানোর হুমকি দিয়েছিলেন নাজমুল। পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

ঈদ ফ্লাইওভারের নিচে হবে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।’

গত সপ্তাহে চলা উচ্ছেদ অভিযানে খালি হয়ে গিয়েছিল কালশী বস্তির প্রায় ৮০ শতাংশ। বাকি থাকা অংশের বাসিন্দারা আগুনে নিঃস্ব হয়ে এখন মানবিক বিপর্যয়ের মুখে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা এখন শুধু সরকারি ও বেসরকারি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে। তাদের কণ্ঠে শুধুই আর্তনাদ- ঈদ এলেই যেখানে ঘরে ফেরার আনন্দ, সেখানে গৃহহীন হয়ে বিদায় নেওয়ার বেদনা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬


স্বপ্নের ছাই ধুয়ে গেল বৃষ্টিতে, ঈদ ফ্লাইওভারের নিচে

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর আকাশ সকাল থেকেই কালো। থেমে থেমে বৃষ্টি। ৫৫ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম ও তার নাতি-নাতনিদের মাথার ওপর এখন ‘ছাদ’ বলতে শুধু কালশী ফ্লাইওভার। নিঃস্ব আনোয়ারার দৃষ্টি স্থির কালশী বস্তির পোড়া ধ্বংসাবশেষের দিকে। গত কুড়িটি বছর এই জায়গাটিকেই তিনি মেনে নিয়েছিলেন নিজের ‘ঘর’ বলে।

কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ঈদুল আজহার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এখন তার পরনে থাকা কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আনোয়ারার মতো প্রায় হাজারখানেক মানুষের একই দশা। সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যার আগুন কেড়ে নিয়েছে তাদের শেষ সম্বলটুকু।আনোয়ারা বেগম বললেন, ‘আমাদের সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। শুধু প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছি।’’

রাতে পল্লবীর কালশী বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে ২৫০টিরও বেশি ঘর ও প্রায় ৫০টি দোকান পুড়ে যায়। ঈদুল আজহার মাত্র দুদিন আগে গৃহহীন হয়ে পড়েন প্রায় হাজারখানেক মানুষ। আনোয়ারার মতোই ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে এসব মানুষের। রাত কেটেছে এই ফ্লাইওভারের নিচেই।

এই আগুন শুধু ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্র নয়, পুড়িয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা সঞ্চয় আর স্বপ্নও। আনোয়ারা তার তিন সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ১৮ বছর ধরে ওই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে থাকতেন দুটি ছোট ঘরে। এখন আশ্রয় ফ্লাইওভারের নিচে।

ছিন্নমূল শিশুরা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন খুঁজছে।

তার স্বামী নাসির উদ্দিন কাজের সন্ধানে বহু বছর আগে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। দুজনে মিলে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন- এখান থেকেই।

আনোয়ারার মতোই আরেক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা প্রায় ৬০ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন। বস্তিতে তার ১০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও একটি গ্যারেজ ছিল। প্রথমে পাঁচটি রিকশা বের করা গেলেও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনটি চুরি হয়ে যায়। বাকিগুলো আগুনে পুড়ে যায়।

প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে বসবাস দেলোয়ারের। পরিচালনা করতেন ১২টি ভাড়ার ঘর। বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এখনো প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে রয়েছে বলেও জানান।

ফ্লাইওভারের নিচে বসেছিলেন ৪০ বছর বয়সী আসমা বেগম। আগুনে পুড়ে গেছে তার ভাড়ার দুটি ঘর। যেখানে মাসে ছয় হাজার টাকা দিয়ে থাকতেন স্বামী, সাত মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে। স্বামী বর্জ্য আর তিনি নিজে ভাঙারি সংগ্রহ করতেন।

উচ্ছেদের শঙ্কার কারণে ঈদের আগে কিছু জিনিসপত্র গ্রামে পাঠিয়ে দিলেও বাকি যা ছিল, আগুনে পুড়ে গেছে।  আসমা বলেন, ‘এই ফ্লাইওভারের নিচেই ঈদ কাটবে।’

পোড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে এখন পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ ও বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করতে চান তিনি। যাতে ঈদের পর অন্তত গ্রামে ফিরে যেতে পারেন।

সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আজাদ আনোয়ার জানান, বস্তিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ঘর ও ভাঙারির দোকান ছিল। যেখানে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বাস করতেন।

পুড়ে যাওয়া এলাকার সামনে তিন সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল টিম প্রায় ৬০ জন আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই দগ্ধ ও কাটা-জখমের রোগী।

এদিকে, আগুন লাগানোর অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী নাজমুল হাসান মনিকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে বস্তিবাসী। বাসিন্দাদের দাবি, নাজমুলের সঙ্গে এক দোকানদারের বিরোধ ছিল। সেই সূত্রে দিনের শুরুতেই বস্তিতে আগুন লাগানোর হুমকি দিয়েছিলেন নাজমুল। পরে স্থানীয়রা তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

ঈদ ফ্লাইওভারের নিচে হবে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।’

গত সপ্তাহে চলা উচ্ছেদ অভিযানে খালি হয়ে গিয়েছিল কালশী বস্তির প্রায় ৮০ শতাংশ। বাকি থাকা অংশের বাসিন্দারা আগুনে নিঃস্ব হয়ে এখন মানবিক বিপর্যয়ের মুখে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা এখন শুধু সরকারি ও বেসরকারি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে। তাদের কণ্ঠে শুধুই আর্তনাদ- ঈদ এলেই যেখানে ঘরে ফেরার আনন্দ, সেখানে গৃহহীন হয়ে বিদায় নেওয়ার বেদনা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত