সংবাদ

বিলীনের পথে প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী


প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ১১:৫১ এএম

বিলীনের পথে প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী
নদীভাঙন ও অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে সিলেটের প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী। ছবিঃ সংবাদ

পাহাড়, নদী আর পাথরের অপার সৌন্দর্য মিলে সিলেট মানেই যেন জাফলং। কিন্তু এই রূপের আড়ালেই নীরবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এক অমূল্য সাক্ষী প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী। শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকা ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি এখন নদীভাঙন, অবৈধ পাথর উত্তোলন ও চরম অবহেলার শিকার।

জাফলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবাড়ীটির দিকে তাকালে এখন আর অতীতের গৌরব পুরোপুরি অনুধাবন করা যায় না। এর একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। যে অংশটুকু এখনো টিকে আছে, সেটিও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্টেং রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগে জৈন্তিয়া অঞ্চল কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে জাফলং, জৈন্তাপুর, চারিকাটা ও ফালজুর অন্যতম। ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের কোনো এক সময়ে এসব খণ্ডরাজ্য একীভূত হয়ে বৃহত্তর জৈন্তিয়া রাজ্যের জন্ম হয়। তখন জৈন্তাপুরের নিজপাট হয়ে ওঠে রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী। ফলে জাফলংসহ অন্য এলাকাগুলো ধীরে ধীরে প্রশাসনিক গুরুত্ব হারায়।

তবে জাফলংয়ের এই প্রাচীন রাজধানী পরিত্যক্ত হলেও নিশ্চিহ্ন হয়নি। প্রকৃতির বুকেই শত শত বছর ধরে টিকে ছিল এর স্থাপত্য। ধারণা করা হয়, জৈন্তিয়ার রাজারা মাঝেমধ্যে এখানে অবস্থান করতেন এবং স্থাপনাগুলোর সংস্কার করাতেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রাজবাড়ীটি ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছিল।

১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর শুরু হয় এর অবক্ষয়ের ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামলে জৈন্তিয়ায় নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মিত হয়নি। উল্টো ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে পুরোনো রাজপ্রাসাদ, দালান ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো।

স্বাধীনতার পরও সেই ধ্বংসযজ্ঞ থামেনি। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের মহোৎসব। জাফলং নদী থেকে নির্বিচারে পাথর তোলার ফলে বদলে গেছে নদীর গতিপথ। এতে নদীভাঙন তীব্র হয়ে রাজবাড়ীর মূল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশের দেয়াল ও রাজকীয় ফটক। পূর্ব পাশের দেয়ালের অর্ধেক অংশ এবং পূর্বদিকের প্রবেশ ফটকটি এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে পশ্চিম ও উত্তর পাশের দেয়াল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বহু আগেই।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জাফলং একসময় ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের রাজধানী ছিল। নিয়াং রাজা, কল্লং রাজা ও মাইলং রাজার মতো শাসকেরা এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করতেন। ধারণা করা হয়, ১৩০০ সালের আগেই সেই রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে এবং পরে এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে জাফলং রাজবাড়ীর অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় জাফলং রাজবাড়ীর গল্প পড়বে, বাস্তবে দেখার সুযোগ আর থাকবে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬


বিলীনের পথে প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

featured Image

পাহাড়, নদী আর পাথরের অপার সৌন্দর্য মিলে সিলেট মানেই যেন জাফলং। কিন্তু এই রূপের আড়ালেই নীরবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এক অমূল্য সাক্ষী প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী। শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকা ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি এখন নদীভাঙন, অবৈধ পাথর উত্তোলন ও চরম অবহেলার শিকার।

জাফলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবাড়ীটির দিকে তাকালে এখন আর অতীতের গৌরব পুরোপুরি অনুধাবন করা যায় না। এর একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। যে অংশটুকু এখনো টিকে আছে, সেটিও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্টেং রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগে জৈন্তিয়া অঞ্চল কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে জাফলং, জৈন্তাপুর, চারিকাটা ও ফালজুর অন্যতম। ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের কোনো এক সময়ে এসব খণ্ডরাজ্য একীভূত হয়ে বৃহত্তর জৈন্তিয়া রাজ্যের জন্ম হয়। তখন জৈন্তাপুরের নিজপাট হয়ে ওঠে রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী। ফলে জাফলংসহ অন্য এলাকাগুলো ধীরে ধীরে প্রশাসনিক গুরুত্ব হারায়।

তবে জাফলংয়ের এই প্রাচীন রাজধানী পরিত্যক্ত হলেও নিশ্চিহ্ন হয়নি। প্রকৃতির বুকেই শত শত বছর ধরে টিকে ছিল এর স্থাপত্য। ধারণা করা হয়, জৈন্তিয়ার রাজারা মাঝেমধ্যে এখানে অবস্থান করতেন এবং স্থাপনাগুলোর সংস্কার করাতেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রাজবাড়ীটি ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছিল।

১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর শুরু হয় এর অবক্ষয়ের ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাস গবেষকদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামলে জৈন্তিয়ায় নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মিত হয়নি। উল্টো ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে পুরোনো রাজপ্রাসাদ, দালান ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো।

স্বাধীনতার পরও সেই ধ্বংসযজ্ঞ থামেনি। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের মহোৎসব। জাফলং নদী থেকে নির্বিচারে পাথর তোলার ফলে বদলে গেছে নদীর গতিপথ। এতে নদীভাঙন তীব্র হয়ে রাজবাড়ীর মূল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশের দেয়াল ও রাজকীয় ফটক। পূর্ব পাশের দেয়ালের অর্ধেক অংশ এবং পূর্বদিকের প্রবেশ ফটকটি এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে পশ্চিম ও উত্তর পাশের দেয়াল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বহু আগেই।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জাফলং একসময় ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের রাজধানী ছিল। নিয়াং রাজা, কল্লং রাজা ও মাইলং রাজার মতো শাসকেরা এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করতেন। ধারণা করা হয়, ১৩০০ সালের আগেই সেই রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে এবং পরে এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে জাফলং রাজবাড়ীর অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনাটি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় জাফলং রাজবাড়ীর গল্প পড়বে, বাস্তবে দেখার সুযোগ আর থাকবে না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত