সংবাদ

সিন্ডিকেটের কবলে কোরবানির চামড়ার বাজার


আহম্মেদ ইয়াসিন
আহম্মেদ ইয়াসিন
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

সিন্ডিকেটের কবলে কোরবানির চামড়ার বাজার

কোরবানির পশুর চামড়া একসময় ছিল দেশের মাদ্রাসাগুলোর অন্যতম প্রধান এবং নিশ্চিত আয়ের উৎস। বিশেষ করে এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের পড়াশোনা ও ভরণপোষণের খরচ আসত এই চামড়া বিক্রির টাকা থেকে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই চামড়াই এখন মাদ্রাসাগুলোর জন্য বড় ধরনের লোকসান ও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা।

​মাদ্রাসা শিক্ষকদের অভিযোগ, গত এক দশকে চামড়ার বাজারে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের দিকে কোরবানির যে চামড়া বাজারে তিন থেকে চার হাজার টাকায় অনায়াসে বিক্রি হতো, বর্তমানে সেই একই মানের চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকায়। লবণের দাম, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ বাড়লেও চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে মাদ্রাসাগুলো।

​চামড়া সংগ্রহের সাথে যুক্ত শিক্ষকরা জানান, প্রতিবছর কোরবানির আগে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। সরকার নির্ধারিত মূল্যে কোনো ফড়িয়া বা আড়তদার চামড়া কিনতে চান না। ​চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজির কথা উল্লেখ করে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন: ​"কোরবানির দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চামড়ার কিছুটা দাম থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। সন্ধ্যার পর দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, আর গভীর রাতে আরও কমে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কোরবানির পরের দিন অনেক ক্ষেত্রে চামড়ার কোনো দামই থাকে না। বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া দিয়ে দিতে হয়।"

​চামড়া সংগ্রহকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, চামড়ার বাজারে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও কারসাজির কারণেই চামড়ার প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের সংগ্রহকারীরা। প্রান্তিক বিক্রেতা ও মাদ্রাসাগুলোকে জিম্মি করে এই সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানিয়েছেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

​অনেক মাদ্রাসা শিক্ষক আক্ষেপ করে জানান, আগে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ছিল মাদ্রাসার বার্ষিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই অর্থ দিয়ে সারাবছর গরিব ও এতিম ছাত্রদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও পড়াশোনাসহ বিভিন্ন খরচ চালানো হতো। কিন্তু বর্তমানে চামড়ার বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক মাদ্রাসাই আর এই আয়ের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম। বর্তমানে কেউ কেউ কেবল মানবিক দিক বিবেচনায় এবং ঐতিহ্য রক্ষায় চামড়া সংগ্রহ করলেও, তা থেকে যে সামান্য অর্থ আসে, তা দিয়ে খরচ তো ওঠেই না, উল্টো ছাত্রদের মধ্যেই নামমাত্র বণ্টন করে দিতে হয়।

​সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কোরবানির দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একেকটি মাদ্রাসা গড়ে চার থেকে পাঁচশ’ বা তারও বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। অনেক বড় মাদ্রাসার সঙ্গে বিভিন্ন ট্যানারির সরাসরি চুক্তি থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চামড়ার টাকা সময়মতো পাওয়া যায় না। বকেয়া টাকা আদায় করতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এছাড়া, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্যানারিতে চামড়া পৌঁছাতে না পারলে বা লবণ দিতে দেরি হলে চামড়ার দাম এক ধাক্কায় অর্ধেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

​এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি:

​চামড়ার একটি নির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং স্থায়ী মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ​বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে। ​সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

​সংশ্লিষ্টরা জানান, চামড়ার বাজার এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি থাকলে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর ওপর।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


সিন্ডিকেটের কবলে কোরবানির চামড়ার বাজার

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

কোরবানির পশুর চামড়া একসময় ছিল দেশের মাদ্রাসাগুলোর অন্যতম প্রধান এবং নিশ্চিত আয়ের উৎস। বিশেষ করে এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের পড়াশোনা ও ভরণপোষণের খরচ আসত এই চামড়া বিক্রির টাকা থেকে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই চামড়াই এখন মাদ্রাসাগুলোর জন্য বড় ধরনের লোকসান ও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা।

​মাদ্রাসা শিক্ষকদের অভিযোগ, গত এক দশকে চামড়ার বাজারে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের দিকে কোরবানির যে চামড়া বাজারে তিন থেকে চার হাজার টাকায় অনায়াসে বিক্রি হতো, বর্তমানে সেই একই মানের চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকায়। লবণের দাম, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ বাড়লেও চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে মাদ্রাসাগুলো।

​চামড়া সংগ্রহের সাথে যুক্ত শিক্ষকরা জানান, প্রতিবছর কোরবানির আগে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। সরকার নির্ধারিত মূল্যে কোনো ফড়িয়া বা আড়তদার চামড়া কিনতে চান না। ​চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজির কথা উল্লেখ করে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন: ​"কোরবানির দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চামড়ার কিছুটা দাম থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। সন্ধ্যার পর দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, আর গভীর রাতে আরও কমে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কোরবানির পরের দিন অনেক ক্ষেত্রে চামড়ার কোনো দামই থাকে না। বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া দিয়ে দিতে হয়।"

​চামড়া সংগ্রহকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, চামড়ার বাজারে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও কারসাজির কারণেই চামড়ার প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের সংগ্রহকারীরা। প্রান্তিক বিক্রেতা ও মাদ্রাসাগুলোকে জিম্মি করে এই সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানিয়েছেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

​অনেক মাদ্রাসা শিক্ষক আক্ষেপ করে জানান, আগে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ছিল মাদ্রাসার বার্ষিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই অর্থ দিয়ে সারাবছর গরিব ও এতিম ছাত্রদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও পড়াশোনাসহ বিভিন্ন খরচ চালানো হতো। কিন্তু বর্তমানে চামড়ার বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক মাদ্রাসাই আর এই আয়ের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম। বর্তমানে কেউ কেউ কেবল মানবিক দিক বিবেচনায় এবং ঐতিহ্য রক্ষায় চামড়া সংগ্রহ করলেও, তা থেকে যে সামান্য অর্থ আসে, তা দিয়ে খরচ তো ওঠেই না, উল্টো ছাত্রদের মধ্যেই নামমাত্র বণ্টন করে দিতে হয়।

​সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কোরবানির দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একেকটি মাদ্রাসা গড়ে চার থেকে পাঁচশ’ বা তারও বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। অনেক বড় মাদ্রাসার সঙ্গে বিভিন্ন ট্যানারির সরাসরি চুক্তি থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চামড়ার টাকা সময়মতো পাওয়া যায় না। বকেয়া টাকা আদায় করতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এছাড়া, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্যানারিতে চামড়া পৌঁছাতে না পারলে বা লবণ দিতে দেরি হলে চামড়ার দাম এক ধাক্কায় অর্ধেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

​এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি:

​চামড়ার একটি নির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং স্থায়ী মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ​বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে। ​সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

​সংশ্লিষ্টরা জানান, চামড়ার বাজার এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি থাকলে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর ওপর।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত