সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ০২

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

দুই.

বেলা খানিকটা বাড়তেই শুধু আঁধারিয়া গ্রামের মানুষই নয়, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি ও ছড়িয়াকান্দি গ্রাম থেকে বেশ কিছু মানুষ রহমত হাজামের বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে| রহমত হাজামের বাড়িটা আঁধারিয়া গ্রামের উত্তর পাড়ার একেবারে উত্তরে, গোমতী নদীর কোড়ের পাড়ের কাছাকাছি| বাড়ির উঁচু ভিটে থেকে কোড়ের পাড়ের কচুরিপানার ঘেরটা স্পষ্টই দেখা যায়|

রহমত হাজামের বাড়িতে বউ-ঝিয়ারিরাই জড়ো হয়েছে বেশি| ব্যাটাছেলেরা সবাই জোয়ারের জলে কোমর ভিজিয়ে কোড়ের পাড় অব্দি নেমে গেছে| বেশ কয়েকটা নৌকাও ভিড়েছে সেখানে| সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে| কেউ কেউ নৌকার গলুইতে এমনিই বসে আছে| গলুইতে বসে চোখ বড় করে লাশ দেখছে| কিন্তু লাশ নৌকায় ওঠানোর নাম নিচ্ছে না কেউ|

অবশ্য ওদের এই লাশ না ওঠানোর দুটো কারণ দাঁড়িয়েছে| প্রথম কারণটা ছালেক মেম্বর| সে তার সাঙ্গপাঙ্গসহ বড় ডিঙি নৌকাটা নিয়ে এসে বলেছে, ‘খবরদার, কেউ লাশে হাত দিবা না| গাঙে ডুইবা মরছে| লাশে হাত দিলে মামলা হইব| পুলিশের মামলা|’

ছালেক মেম্বর এরই মধ্যে তার মোবাইল থেকে থানায় ফোন দিয়েছে| থানার এক উপপরিদর্শকের সঙ্গে তার বেশ সখ্য| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি বা মীরবহরি গ্রামে মামলা সম্পর্কিত কোনো ব্যাপার ঘটলে সে থানার সেই উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদকে ফোন করে| আর জুনায়েদ আহমেদও তাকে বেশ গুরুত্ব দেয়| এখন সে মেম্বর, কিন্তু ভবিষ্যতে চেয়ারম্যান হওয়ার একটা নিশ্চয়তা তার মধ্যে কাজ করছে| আশাপাশের গ্রামগুলোতে সে সেভাবেই লোকবল নিয়ে এগোচ্ছে| গ্রাম থেকে বিভিন্নভাবে টাকাপয়সার ধান্দা করছেও বেশ|

মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ নিয়ে এখন এই হুমকি-ধামকি করার মধ্যে ছালেক মে¤^রের সেই একই মতলব কাজ করছে| এই লাশ নিয়ে যদি পুলিশের সঙ্গে মিলে দুটো পয়সা ধান্দা করা যায়? তবে এটা সে জানে, মনসুর পাগলা বা তার মা কমলা খাতুনের কাছ থেকে সে খুব বেশি টাকাপয়সা খসাতে পারবে না| তারপরও ভাবল, দেখা যাক না কী হয়! মনসুর পাগলার আগের বউ জুলেখাও জলে ডুবে মরেছে| তবে জুলেখা মরেছে দুই গাঁও দক্ষিণে, বাপের বাড়ির কাছে, কানুর বিলে| আর সেতারা বেগম মরল বাড়ির কাছেই| গোমতী নদীর ঢলু জলের পাকে পড়ে|

ছালেক মেম্বরের মনে টাকাপয়সার লোভটা মাথাচাড়া দিত না যদি মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ ভাটিতে কোথাও ভেসে উঠত| সেতারা বেগমের লাশ ভাটিতে ডুবে উজিয়ে এসেছে এই আঁধারিয়া গ্রামে| মনসুর পাগলার বাড়িও এই আঁধারিয়া গ্রামেই|

অবশ্য শুধু ছালেক মেম্বরই নয়, গোমতীর কোড়ের পাড়ে এখন যতগুলো মানুষ এসে জমা হয়েছে, সবার মনে সেই একই সন্দেহ দানা বাঁধছে| ব্যাটাছেলেরা এই সন্দেহ থেকে কখনও সেতারার লাশ দেখছে, কখনও গোমতীর দিঘল স্রোত দেখছে| রহমত হাজামের বাড়িতে যে বউ-ঝিয়ারিরা এসেছে, ওরা খড়ের মাড়ায় ল্যাপ্টা মেরে বসে থাকা একে অপরকে একই কথাই জিজ্ঞেস করছে| পিড়িতে বসা সবচেয়ে বয়স্ক ছমিরন নেছা পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে গল্প শুরু করে দিয়েছে, ‘আরে তোমাগোরে কী কমু, ব্যাপারি বাড়ির এই রকম একটা লাশ এই গেরামে উজাইয়া আইছিল বহুদিন আগেও একবার| হেইডা বিটিশ আমলে| আমি তহন ছোড আছিলাম| লাল পাগড়িওয়ালা পুলিশ আইসা এই কোড়ের পাড় থাইকা লাশটা উঠাইয়া লইয়া গেছিল| ওই লাশটা কার আছিল জানো, মনসুর পাগলার পর-দাদি মতিরন বিবির লাশ| ভাটি-গেরাম ছল্লাকান্দি বাপের বাড়িত যাওয়নের সময় গাঙে ডুইবা মরছিল| কিন্তুক লাশ হইয়া দুই দিন পর হেই মতিরন বিবি ছল্লাকান্দি থাইকা গাঙ ধইরা আমাগো এই গেরামে আবার উজাইয়া আইছিল| এরপর কত কিচ্ছা-কাহিনি গো!’

পাশের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কী কিচ্ছা-কাহিনি, কও না, দাদি|’

ছমিরন নেছা বলল, ‘আর কইয়ো না| মতিরন বিবিরে কবর দেওয়ার হইছিল আমাগো এই গেরামের কবরস্থানে| ছল্লাকান্দি নেয় নাই| হেইডাই কাল হইছিল| পরে দেখা যাইত, হেয় কারও বাড়ির গোপাটে, কারও বাড়ির পিছদোরে আইসা দাঁড়াইয়া থাকে| আর তেঁতুল গাছ পাইলে তো কোনো কথাই নাই| মানুষরে খালি ডর দেখিইত|

পাশের আরেকজন অল্পবয়স্ক যুবতী জিজ্ঞেস করল, কী ডর দেখাইত তো, বুজি?

ছমিরন নেছা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কী ডর দেখাইত বুঝতাছস না, মরা মানুষ আর জ্বীন-ভূত কী ডর দেখায়?’

অন্য আরেক মধ্যবয়স্কা মহিলা অল্পবয়স্ক যুবতীটাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আরে থাম| বুজিরে কইতে দে| ও বুজি, তুমি কও তো, হের পর কী হইল?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘মতিরন বিবি একটা খারাপ কাম করত|’

‘কী খারাপ কাম?’

‘হেয় গেরামের ছোড ছোড পোলাপানগুলারে ধইরা-ধইরা নিয়া গাঙে চুবাইয়া চুবাইয়া মারত| কয়েকদিন পর পর দেখা যাইত পোলাপানগুলার লাশ গাঙে ভাসতাছে|’

পাশের অন্য এক অল্পবয়সী যুবতী বলে উঠল, ‘কও কী, দাদি!’

ছমিরন নেছা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘হ, আমি হেছাই কইতাছি| একদিন দুপুর বেলা কী হইল, আমি গেছিলাম গোপাট থাইকা ছাগল আনতে| সুদিন মাস আছিল| হেই মতিরন বিবি আমার সামনে আইসা দাঁড়াইল| আমার হাত খাবলা দিয়া ধইরা কয়, ‘আয় ছেমড়ি, তোরে লইয়া গাঙের পাড় যামু...|’ আমি তো পরথমে ডরাইয়া যাই| পরে  সাহস কইরা চিল্লান দেই আর ঝাটকা মাইরা হাত ছুডাইয়া নেই| বাপজান কাছেই আছিল| আমার চিল্লান শুইনা দৌড়াইয়া আইয়া দেখে কেউ নাই| আমিও চোখ ঘুরাইয়া দেখি মতিরন বিবি উধাও!’

এবার কয়েকজন মহিলা একত্রে ভয়ের গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘তারপর আর এই ঘটনা ঘটে নাই| মতিরন বিবিরা ভূত হইয়া একবার হাইরা গেলে আর ফিরা আসে না| আমারে গাঙের পাড় নিতে পারে নাই| হেয় হাইরা গেছে| এই হাইরা গিয়া হেয় মাইনা নিতে পারে নাই| তারপর আর কোনোদিন মতিরন বিবি আমাগো গেরামে আসে নাই| কিন্তুক আমার কথা হইল অন্য|’

পাশের যুবতী মহিলাটা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার অন্য কী কথা, দাদি?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘আমার অখন ডরটা কি জানো, সেতারা বেগম যদি মতিরন বিবির মতন আমাগো গেরামে আইসা পোলাপাইনদের ধইরা নিয়া গাঙে চুবাইয়া মারে? হেয় তো ব্যাপারি বাড়ির বউ গো!’

খড়ের মাড়ার আশেপাশের সবাই ছমিরন নেছার এই কথা শুনে আঁতকে উঠল| কেউ কেউ বলে উঠল, ‘হায় মা’বুদ, অখন কী হইব? আমাগো পোলাপানের লগে যদি এমনডা হয়?’

ছমিরন নেছা উদাস গলায় বলল, ‘ব্যাপারিবাড়ির বৌগুলান এমনই| মনসুর পাগলার মা’রে দেখো না, কেমন ঠ্যাডা মাইরা তাকাইয়া থাকে| কোনো কথা কয় না| অখন দেখো, কী হয়! সেতারা বেগম ছাড়বো না, আমি কইলাম, হেয় সইত্য সইত্য ছাড়ব না...!’

ছমিরন নেছার এ কথা শুনে মহিলারা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দিল|

মুখ চাওয়া-চাওয়ি রহমত হাজামের বাড়িতে আসা মহিলাদের মধ্যেই নয়, কোড়ের পাড়ের কচুরিপানার ঘেরের কাছে যারা নৌকা নিয়ে এসেছে বা কোমর জল ভেঙে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যেও| পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে, ওরা আসছে, এই ভয় খামাখাই অনেকের ভেতরটা হিম হয়ে গেছে| এদের মধ্যে দু-একজন কোনো কারণ ছাড়াই আস্তে আস্তে সটকেও পড়েছে|

এদিকে করিম মিয়া ও রব্বান শেখ বেশ ভয়ে আছে| ব্যাপারটা সে মোটেও এড়িয়ে যেতে পারছে না| সেতারা বেগমের উপুড় হওয়া লাশটা ওরা দু’জন ˆবঠা দিয়ে ঠেলে চিৎ করেছে, এটা এখানে যারা এসেছে সবাই জানে| ওরা নিজ থেকেই বলেছে| কিন্তু লাশে হাত দিলে পুলিশের মামলা হবে, নানান ঝামেলা হবে, এটা ওরা ভাবেনি| তাই ওরা এখন নিজেদের চুল মনে মনে নিজেরা ছিঁড়ছে|

দুটো নৌকা পাশাপাশি রেখে রব্বান শেখ ফিসফিস করে বলল, ‘করিম ভাই, কন দেখি, বড় মুশকিল তো হইয়া গেল|’

করিম মিয়া বলল, ‘আমিও তাই ভাবতাছি| ভাব দেখানের লাইগা সবাইরে কইলাম, সেতারা লাশ আমরাই পরথম দেখছি| আমরাই লাশ উল্টাইয়া চেহারা চিনছি| অখন তো মিছা কথাও কওয়া যাইব না|’

‘হাছাই কি পুলিশের মামলা হইব?’

‘হইতেও পারে|’

‘এখন তাইলে কী করমু?’

করিম মিয়া একটু চুপ হয়ে গিয়ে কী ভেবে বলল, ‘ছালেক মে¤^রের লগে কথা কইতে পারি| আমাগো ওয়ার্ডের মে¤^র|’

রব্বান শেখ সায় দিয়ে বলল, ‘হ, করিম ভাই, তুমি ঠিক কইছ| দরকার হইলে তার পায়ে ধরমু|’

করিম মিয়া বলল, ‘তাইলে চলো| হের নাওয়ে উইঠা কথা কই|’

রব্বান শেখ বলল, ‘আইচ্ছা, চলো|’

ওরা দু’জন তাদের ছোট্ট নৌকা দুটো নিয়ে ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটার আশাপাশে ঘুরঘুর শুরু করল| কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না| ছালেক মেম্বর তার চ্যাপ্টা মোবাইলে কারও সঙ্গে বলছে|

কিছুক্ষণ পর ছালেক মেম্বরের ফোনে কথা বলা শেষ হতেই ওরা সুযোগ বুঝে নিজেদের নৌকা ছেড়ে একে একে ছালেক মেম্বরের ডিঙিতে লাফিয়ে উঠে গেল|

নৌকাটা ওদের ভারে দুলে উঠতেই ছালেক মেম্বর ব্যস্ত গলায় বলল, ‘কী করতাছ, কী করতাছ? আমার নৌকাটা ডুবাইয়া ফেলবা তো|’

করিম মিয়া উপুড় হয়ে বসে ছালেক মেম্বরের পা ধরে বলল, ‘মেম্বর সাব, আপনার লগে একটা কথা কইতে আইছি| আমাগো একটা ভুল হইয়া গেছে|’

ছালেক মেম্বর বুঝতে না পেরে খানিকটা লাফিয়ে সরে যেতে যেতে বলল, ‘আরে, আরে, পা ধরতাছ ক্যান? পা ছাড়ো| কী কথা কইবা, কও|’

‘আমাগো কথা পুলিশরে কইয়েন না|’

‘আগে কইবা তো, তোমরা কী ভুল করছ?’

করিম মিয়া বলল, ‘আমি আর রব্বান মিইলা মনসুর পাগলার বউয়ের লাশটা পানির ওপর চিৎ করাইছি| আগে উপুড় হইয়া আছিল|’

ছালেক মেম্বর বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তয়?’

রব্বান শেখ বলল, ‘একটা বিনতি আছে| আপনে তো একটু আগে কইলেন, লাশরে যাতে কেউ হাত না দেয়| পুলিশ কেস হইব| আমরা তো লাশরে হাত দিছি|’

ছালেক মেম্বর মৃদু হাসল| পরক্ষণই চেহারাটা খানিকটা কঠিন করে ফেলল| একটু কেশে বলল, ‘বুঝতে পারতাছি| আইচ্ছা, পুলিশরে কমু না| তোমরা হইলা গিয়া আমার ওয়ার্ডের| পুলিশরে কি তোমাগো কথা কইতে পারি?’

রব্বান শেখ গদগদ গলায় বলল, ‘হ, আমরা একই ওয়ার্ডের| আমরাই তো আপনেরে ভোট দিছিলাম|’

ছালেক মেম্বর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, জানি| তয় একটা কথা|’

রব্বান শেখ জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা, মেম্বর সাব?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘পুলিশ লাশ লইয়া যাইবার পর তোমরা দুইজন আমার বাড়িতে গিয়া আমার লগে দেখা করবা|’

রব্বান শেখ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, মেম্বর সাব?’

ছালেক মেম্বর তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, ‘হেইডা কি তোমাগোরে কইয়া দিতে হইব? পুলিশ আওয়নের আগে তোমরা লাশে হাত দিছো| বুঝতেই পারতাছ, ক্যান কইতাছি|’

করিম মিয়া বলল, ‘হ হ, মেম্বর সাব, বুঝতে পারতাছি| রব্বান, মেম্বর সাব ঠিক কইছে| আমরা দেখা করমু নে|’

রব্বান শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ হ, আইচ্ছা| অবিশ্যই দেখা করমু নে|’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘ঠিক আছে, তোমরা তোমাগো নৌকায় যাও| একটু পরে পুলিশ আইয়া পড়ব|’

রব্বান শেখ ও করিম মিয়া সায় দিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, আইচ্ছাৎ|’ বলেই ওরা যার যার নৌকায় উঠে গেল|

এদিকে সেতারা বেগমের লাশ নৌকায় না ওঠানোর দ্বিতীয় কারণটা হলো, মনসুর পাগলার এখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি| মনসুর পাগলা এলে সে এই ছালেক মেম্বর বা কারও কথা শুনত না| সে আসলে একমাত্র আনিসকে বাদে গ্রামের কারও কথাই শোনে না| আর শোনে মস্তানের মাজারের দু-একজন খাদেমের কথা| সে বরাবরই নিজের মতো চলে, নিজের মতো কথা বলে| এরই মধ্যে আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার রুহুল আমিন সেতারা বেগমের লাশের খবর নিয়ে মনসুর পাগলার বাড়িতে গিয়েছিল| মনসুর পাগলা তখন বাড়িতে ছিল না| মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন সিতারা বেগমের লাশের খবর শুনে শীতল চোখে তাকিয়ে বলে, ‘ও, হেই কথা...|’

কমলা খাতুন এর বেশি একটা কথাও বলেনি| এখন পর্যন্ত কোড়ের পাড়ে আসার নামও নেয়নি| মনসুর পাগলার আগের বউ জুলেখা যখন মারা যায়, সে একই কাজ করেছিল| সে লাশটা পর্যন্ত দেখতে যায়নি| 

তিন.

মন খারাপ থাকলেই মনসুর পাগলা মস্তানের দরগায় চলে যায়| সারাদিন সেখানে পড়ে থাকে| কখনও দুই-তিনদিন, কখনও এক-দুই সপ্তাহের জন্য বাড়িতে আসে না| দরগায় যে তবারুক পড়ে সেগুলো খেয়েই সেখানে দিন কাটায়| কোনো কোনো সন্ধ্যায় মাজারের খাদেমরা খিচুড়ি চড়ায়| তখন সে হাত-পা ছড়িয়ে খাদেমদের সঙ্গে খিচুড়ি খায়|

মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনের অবশ্য ছেলের এসব বিষয় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই| বাড়িতে ছেলে এলে রান্না করে খাওয়ায়, কোনো উচ্চবাচ্য করে না| ছেলে বাড়িতে না থাকলে নিজের জন্যই শুধু রান্না করে, ছেলের অপেক্ষায় থাকে না| এমনকি ছেলে দিনের পর দিন বাড়িতে না এলেও কাউকে দিয়ে একটু খবর নেয় না| শীতকালে ছেলের পাগলামি বেড়ে যায়| মাঝরাতে পুকুরে ঠাণ্ডা জলে নেমে গিয়ে সকাল অব্দি পুকুরে সাঁতার কাটে| গ্রামের মানুষ যখন মোটা-মোটা কাপড় গায়ে দিয়ে এমনিতেই শীতে থরথর করে কাঁপে, পুকুরের ঠাণ্ডা জলে মনসুর পাগলার তখন কিছুই হয় না| এটা শুধু একদিন-দু’দিন নয়, শীতকাল এলে প্রায় রাতেই সে এটা করে| মা হিসেবে কমলা খাতুন এ নিয়ে একটুও বিচলিত হয় না| ঘরে যখন ছেলেবউ থাকে তখনই যা একটু সমস্যা হয়|

মস্তানের মাজারে আজ এখন পর্যন্ত কোনো তবারুক পড়েনি| মানতের টাকাপয়সাও না| সকাল থেকে মনসুর পাগলা কিচ্ছু খায়নি| মাজারে এলে সাধারণত সে সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসে না|

দুপুর হয়-হয় সময়টায় দরগার এক পুরোনো খাদেম ডেকে বলল, ‘পাগলা, আয়, আমার লগে চাইরটা খাইবি| সকাল থাইকা তো পেটে একটা দানাও পড়ে নাই|’

মনসুর পাগলা হেসে বলে, ‘হ হ, বড় বুক লাগছে| ভাইজান, আপনে খাওয়াইবেন?’

দরগার এই পুরোনো খাদেমের নাম, আজমত আলী| মনসুর পাগলাকে বেশ পছন্দ করে| সময়-সুযোগে সুখদুঃখের আলাপ করে| মনসুর পাগলা তাকে ভাইজান বলে ডাকে|

আজমত খাদেম হেসে বলল, ‘এই জন্যই তো তোরে ডাকতাছি|’

মনসুর পাগলাও হাসল, হে হে, হে হে| কোনো দ্বিরুক্তি না করে সে খাদেমের ঘরে গিয়ে ঢুকল| হাত ধুয়ে পিড়ি টেনে বসল|

আজমত খাদেম নিজেও একটা পিড়ি টেনে বসে মনসুর পাগলার দিকে একটা থালা বাড়িয়ে দিল|

মনসুর পাগলা থালাটা নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রান্ধিছেন আইজকা?’

আজমত খাদেম নিজের থালাটা নিতে নিতে বলল, ‘আমি কোনোকিছু রান্ধি নাই|’

‘তয়, খাওয়াইবেন কইলেন?’

‘তোরে খাওয়াইতে হইলে আমার আলাদা কইরা রান্ধন লাগব নাকি?’

মনসুর পাগলা আবার হাসল| বলল, ‘আমি হেইডা কই নাই তো|’

আজমত খাদেম বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি| এমনিই কইলাম| কাইলকা সইন্ধ্যাবেলা আমাগো মাজারের জন্যি ছলিমকান্দি গেরামের এক ভক্ত খিচুড়ি আর মইষের গোশত রাইন্ধ্যা নিয়া আইছিল| ডোবা বিলের মইষ| গোশতটা বড় স্বাদের| অনেকগুলা উপড়াইছে| তুই তো কাইল আসছ নাই| অখন তোরে মাজারে দেইখ্যাই ভাবলাম, হেই গোশত-খিচুড়ি দিয়া দুপুরে এক লগে খাই|’

মনসুর পাগলা আনন্দে গদগদ হয়ে বলল, ‘ভালা করছেন, ভালা করছেন| এতিমরে খাওয়াইলে এমনিতেই সওয়াব হয়|’

আজমত খাদেম হেসে বলল, ‘পাগলা, তুই তো বড় সেয়ানা| তোর বাপ মরছে কুড়ি বছরের ওপরে হইয়া গেছে| তুই নিজেরে অখনও এতিম কস?’

মনসুর পাগলা আরও জোরে শব্দ করে হেসে উঠল, হা হা, হা হা| হাসি থামাতে থামাতে বলল, ‘ভাইজান, আমি তো এতিমই| দুইদিন আগে আমার বউ গাঙে ডুইবা মইরা গেছে| বউয়ের লাশটা অখনও পাই নাই|’

আজমত খাদেম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হয় রে, তোর লাইগা আমার বড় মায়া হয়| তোর কপালে বউ টিকে না| আগের বউডা মরল পানিতে ডুইবা| এই বউডারও একই হাল হইল| পানিতে ডুইবা মরল|’

মনসুর পাগলা খাদেমের মুখে এ কথা শুনে মন খারাপ করে ফেলল| আস্তে করে বলল, ‘আপনে ঠিকই কইছেন, ভাইজান| আমার কপালডাই খারাপ| আমার বউ খালি পানিতে ডুইবা মইরা যায়|’

আজমত খাদেম একটা দুঃখের নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আর মন খারাপ কইরা লাভ নাই| অখন তোর এই বউডার লাশটা পাইলেই হয়| অন্তত জানাজা তো পড়ান যাইব| লাশের জানাজা না পড়ানো হইল, কবর না দিবার পারলে হাশরে আজাব হাজার গুণ বাইড়া যায়|’

মনসুর পাগলা আরও মন খারাপ করে ফেলল| বলল, ‘বউয়ের লাশটা তো কাইলকা কম খুঁজি নাই| হেই দিন রাইতেও খুঁজছি| পাই নাই তো| খুঁজতে খুঁজতে ছলিমকান্দি পর্যন্ত গেছিলাম| ভাইজান, আমার মনডা আরও খারাপ| বউডা গাঙে ডুবল, আর এইবারের ঔরসটাও দেখতে পারলাম না|’

আজমত খাদেম খিচুড়ি ও মহিষের গোশত থালায় বেড়ে দিতে দিতে বলল, ‘হইছে, অখন খা| বউডা মরছে অইডার জন্য মন খারাপ কর| ঔরসের লাইগা মন খারাপ কইরা লাভ নাই| এইখানে ঔরস প্রতিবছরই হয়|’

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, ভাইজান| ঔরস তো প্রতিবছরই হয়|’ বলেই সে গপগপ করে খিচুড়ি-গোশত খাওয়া শুরু করল| তার পেটে ক্ষুধায় যেন খরার চর পড়েছে|

আজমত খাদেম নিজের থালাটা টেনে নিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘পাগলা, আস্তে খা| গলায় আটকাইব|’

মনসুর পাগলা আবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, ভাইজান, হ|’

মনসুর পাগলা থালার খিচুরি-গোশত মাত্র আধাআধি খেয়েছে, ঠিক তখনই আরেক অল্পবয়সী খাদেম ঘরে ঢুকল| মনসুর পাগলাকে দেখেই বলল, ‘আরে পাগলা, তুই এইখানে? সক্কালবেলা মীরবহরি বাজারে যাওয়নের সময় তোরে মাজারে দেইখা গেলাম| অখন আইসা দেখি নাই| তোরে আমি খুঁজতাছি|’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, খুঁজতাছ?’

‘মীরবহরি বাজারে শুনলাম, তোর বউয়ের লাশ নাকি তগো গেরামে কোড়ের পাড়ে ভাইসা উঠছে|’

‘কও কী, কও কী?’

‘আমি ঠিকই কইছি| খবরটা সইত্য|’

‘আমার বউয়ের লাশ ভাইসা উঠছে, আরে, আমার বউয়ের লাশ ভাইসা উঠছে’— বলতে বলতে খাবার শেষ না করেই মনসুর পাগলা থালাটা ঠেলে লাফিয়ে উঠল|

আজমত খাদেম বলল, ‘আরে পাগলা, খাওয়নডা শেষ কইরা যা|’

মনসুর পাগলা আজমত খাদেমের কথা গা করল না| ডেরা থেকে বের হয় সে দৌড়ে পুনোয়ারার ঘাটপাড়ের দিকে ছুটল| ঘাটপাড়ে তার নৌকাটা একটা শক্ত খুঁটিতে বাঁধা|

মনসুর পাগলা খুঁটি থেকে নৌকাটা কোনো মতে খুলে জোরছে গোমতীর উজানের দিকে ˆবঠা বাইতে শুরু করল| নৌকাটা তীর গতিতে চলতে শুরু করল স্রোতের বিপরীতে সরু রেখা করে| মনসুর পাগলার বয়স ত্রিশ-একত্রিশ বছর হলেও সে এখনও তাগড়া জোয়ানের মতো চলে| তার শরীরে শক্তিও বেশ| পেশিগুলো যেন নিজ থেকেই ফুলে আছে|

পুনোয়ারার বটতলা থেকে আঁধারিয়া গ্রামের কোড়ের পাড় খুব বেশি দূরে নয়| বড়জোর এক কিলোমিটার হবে| খানিকটা বেশিও হতে পারে| আজ নদীতে স্রোতের বেগ কম| যদিও ভরাটবান চারিদিকে| মনসুর পাগলা অল্পক্ষণের মধ্যেই কোড়ের পাড় চলে এল| কোড়ের পাড়ে এসে সে দেখল, চার-পাঁচটা নৌকা কাছেই স্থির হয়ে জলে ওপর ভাসছে| কিছু ব্যাটাছেলে জোয়ারের জলে কোমর অব্দি ভেঙে কাছেই দাঁড়িয়ে আছে| খানিকটা দূরে বোরো ধানের জমির সীমানা ঘেঁষে রহমত হাজামের বাড়ি যেখানে, সেখানটায় অনেক মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে|

মনসুর পাগলার নৌকাটা কোড়ের পাড়ে ভিড়তেই ছালেক মেম্বর গলা বাড়িয়ে বলল, ‘হেই পাগলা, তুই আইছস| কই আছিলি?’

মনসুর পাগলা হাঁপ ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি মস্তানের দরগাতে আছিলাম|’

ছালেক মেম্বর একটু কটাক্ষ করে বলল, ‘তোর কামই তো ওইটা| শোন, তোর বউয়ের লাশ পাওয়া গেছে, হেইডা তো জানস?’

‘হ, হেই খবর পাইয়া তো আইলাম|’

‘তয় ভালা কথা| তুই অখন তোর বউয়ের লাশে হাত দিবি না|’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘পুলিশরে খবর দেওয়া হইছে| তুই তোর বউয়ের লাশে হাত দিলে পুলিশের মামলা হইব|’

মনসুর পাগলা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী কও, পুলিশের মামলা হইব ক্যান? আমার বউ তো পানিতে ডুইবা মরছে| হেরে তো কেউ মারে নাই?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘তোর বউরে মারে নাই, হেইডা ক্যামনে বুঝমু? তোর নাও ডুবছে পুনোয়ারা বটগাছের কাছে| লাশ ভাইসা উঠছে এই কোড়ের পাড়ে| লাশ উজাইয়া আইল ক্যামনে?’

‘অইডা আমি কেমনে কমু? তুমি লাশরে জিগাও|’

‘লাশরে জিগাইমু মানে, লাশ কি কথা কইতে পারে?’

‘তাইলে আমারে জিগাও ক্যান?’

‘আমি তো কই, তুই তোর বউরে চুবাইয়া মারছস|’

মনসুর পাগলা এবার একটু ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘দেখো মেম্বর, উল্টাপাল্টা কথা কইবা না| আমার বউয়ের লাশ কই?’

ছালেক মে¤^র মনসুর পাগলার এ কথার জবাব না দিয়ে আবারও জোর দিয়ে বলল, ‘পাগলা, তোর বউয়ের লাশ কই, অইডা খুঁইজা লাভ নাই| পুলিশ না আসা পর্যন্ত ধরতে পারবি না| তাইলে কিন্তু তোর খবর আছে, কইয়া দিলাম|’

মনসুর পাগলা বলল, ‘পুলিশের মামলা হইলে হইব| আমি পুলিশরে ডরাই না| আমার বউয়ের লাশটা কই, হেইডা কও|’

দক্ষিণ পাড়ার মধু মিয়া কাছেই একটা নৌকায় ছিল| সে আঙুল দিয়ে লাশটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই তো, ঘেরের ভিতরে| তুমি কি দেখতাছ না?’

মনসুর পাগলা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর তাকিয়ে সেতারা বেগমের লাশটা দেখামাত্রই বলল, ‘হ, হ, দেখতাছি| আমার বউয়ের লাশটা দেখতাছি|’ বলেই সে নৌকা ছেড়ে জলে লাফিয়ে পড়ল|

যদিও গোমতী বেয়ে উঠে আসা উত্তরের জোয়ারের জল এখানটায় বেশ| তবে গোমতীর সেই গভীরতা এখানে নেই| এখানে এখন কোথাও বুক, কোথাও কোমর অব্দি জল| মনসুর পাগলার সাঁতার কাটার প্রয়োজন নেই| জল আর কচুরিপানা ঠেলেই সে হেঁটেই যেতে পারে| কিন্তু সে তাড়াতাড়ির জন্য সাঁতরে সেতারা বেগমের লাশের দিকে এগিয়ে গেল| কাছাকাছি গিয়ে ফুলে ওঠা সেতারা লাশটা ঝাপটে ধরে চিৎকার করে উঠল, ‘আমার বউয়ের লাশ, আমার বউয়ের লাশ!’

ছালেক মেম্বর আবার উঁচু গলায় বলল, ‘পাগলা, তোরে কিন্তু আবার কইতাছি| তোর বউয়ের লাশ ধরতাছস| পুলিশ আইতাছে কিন্তুক|’

মনসুর পাগলা ছালেক মেম্বরের কথায় একেবারে গা করল না| সে সেতারা বেগমের লাশটা জলের মধ্যে আড়াআড়ি ধরে টেনে এনে একাই নৌকায় টেনে তুলল| কারও সাহায্য পর্যন্ত চাইল না|

ছালেক মেম্বর এবার জোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘তুই কামডা ঠিক করস নাই| তুই আমার কথা শুনস নাই| নৌকায় তুলছস ভালা কথা| এখান থাইকা এক পা-ও নড়বি না| নইলে তোরে কিন্তু আমার লোক দিয়া পিটাইমু|’

মনসুর পাগলা দৃঢ় গলায় বলল, ‘তোমার যা ইচ্ছা তাই করো গিয়ে| আমার বউরে আমি বাড়িত লইয়া যামু| কারো হুকুম মানমু না| আর তুমি হুকুম দেওয়ার কেডা, মেম্বর? আমি তোমারে ডরাই না|’

ছালেক মেম্বর মাথা ঝাঁকিয়ে আরও রাগী গলায় বলল, ‘দাঁড়া, পুলিশ আসুক| তোরে পুলিশরে দিয়া এমন পিটান পিটাইমু, বাপের নাম ভুইলা যাইবি| তুই আমারে চিনস নাই!’

মনসুর পাগলা ছালেক মেম্বরের কথার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে নৌকায় উঠে ˆবঠা ফেলে জোরে লগি ঠেলা শুরু করল|

সেতারা বেগমের লাশটা নৌকায় ঠিকমতো জায়গা হয়নি| একটা পা গলুইয়ে লম্বা হয়ে পড়ে থাকলেও আরেকটা পা গলুই থেকে ঝুলছে| একটা হাত মুঠো করা, অন্য হাতটা জলের ওপর নৌকা চলার দুলুনিতে দুলছে| মনে হচ্ছে সেতারা বেগমের হাতটা যেন দুলছে না, কাউকে অমোঘ আহ্বানে ডাকছে| মনসুর পাগলা ঠিক বুঝতে পারল না, সিতারা বেগম কাকে হাত ইশারায় ডাকছে| তাকে তো?

মনসুর পাগলা আরও জোরে লগি ঠেলা শুরু করল| সে ভাবল, লাশের আবার হাত ইশারা কী?
ক্রমশ...

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image


(পূর্ব প্রকাশের পর)

দুই.

বেলা খানিকটা বাড়তেই শুধু আঁধারিয়া গ্রামের মানুষই নয়, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি ও ছড়িয়াকান্দি গ্রাম থেকে বেশ কিছু মানুষ রহমত হাজামের বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে| রহমত হাজামের বাড়িটা আঁধারিয়া গ্রামের উত্তর পাড়ার একেবারে উত্তরে, গোমতী নদীর কোড়ের পাড়ের কাছাকাছি| বাড়ির উঁচু ভিটে থেকে কোড়ের পাড়ের কচুরিপানার ঘেরটা স্পষ্টই দেখা যায়|

রহমত হাজামের বাড়িতে বউ-ঝিয়ারিরাই জড়ো হয়েছে বেশি| ব্যাটাছেলেরা সবাই জোয়ারের জলে কোমর ভিজিয়ে কোড়ের পাড় অব্দি নেমে গেছে| বেশ কয়েকটা নৌকাও ভিড়েছে সেখানে| সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে| কেউ কেউ নৌকার গলুইতে এমনিই বসে আছে| গলুইতে বসে চোখ বড় করে লাশ দেখছে| কিন্তু লাশ নৌকায় ওঠানোর নাম নিচ্ছে না কেউ|

অবশ্য ওদের এই লাশ না ওঠানোর দুটো কারণ দাঁড়িয়েছে| প্রথম কারণটা ছালেক মেম্বর| সে তার সাঙ্গপাঙ্গসহ বড় ডিঙি নৌকাটা নিয়ে এসে বলেছে, ‘খবরদার, কেউ লাশে হাত দিবা না| গাঙে ডুইবা মরছে| লাশে হাত দিলে মামলা হইব| পুলিশের মামলা|’

ছালেক মেম্বর এরই মধ্যে তার মোবাইল থেকে থানায় ফোন দিয়েছে| থানার এক উপপরিদর্শকের সঙ্গে তার বেশ সখ্য| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি বা মীরবহরি গ্রামে মামলা সম্পর্কিত কোনো ব্যাপার ঘটলে সে থানার সেই উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদকে ফোন করে| আর জুনায়েদ আহমেদও তাকে বেশ গুরুত্ব দেয়| এখন সে মেম্বর, কিন্তু ভবিষ্যতে চেয়ারম্যান হওয়ার একটা নিশ্চয়তা তার মধ্যে কাজ করছে| আশাপাশের গ্রামগুলোতে সে সেভাবেই লোকবল নিয়ে এগোচ্ছে| গ্রাম থেকে বিভিন্নভাবে টাকাপয়সার ধান্দা করছেও বেশ|

মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ নিয়ে এখন এই হুমকি-ধামকি করার মধ্যে ছালেক মে¤^রের সেই একই মতলব কাজ করছে| এই লাশ নিয়ে যদি পুলিশের সঙ্গে মিলে দুটো পয়সা ধান্দা করা যায়? তবে এটা সে জানে, মনসুর পাগলা বা তার মা কমলা খাতুনের কাছ থেকে সে খুব বেশি টাকাপয়সা খসাতে পারবে না| তারপরও ভাবল, দেখা যাক না কী হয়! মনসুর পাগলার আগের বউ জুলেখাও জলে ডুবে মরেছে| তবে জুলেখা মরেছে দুই গাঁও দক্ষিণে, বাপের বাড়ির কাছে, কানুর বিলে| আর সেতারা বেগম মরল বাড়ির কাছেই| গোমতী নদীর ঢলু জলের পাকে পড়ে|

ছালেক মেম্বরের মনে টাকাপয়সার লোভটা মাথাচাড়া দিত না যদি মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ ভাটিতে কোথাও ভেসে উঠত| সেতারা বেগমের লাশ ভাটিতে ডুবে উজিয়ে এসেছে এই আঁধারিয়া গ্রামে| মনসুর পাগলার বাড়িও এই আঁধারিয়া গ্রামেই|

অবশ্য শুধু ছালেক মেম্বরই নয়, গোমতীর কোড়ের পাড়ে এখন যতগুলো মানুষ এসে জমা হয়েছে, সবার মনে সেই একই সন্দেহ দানা বাঁধছে| ব্যাটাছেলেরা এই সন্দেহ থেকে কখনও সেতারার লাশ দেখছে, কখনও গোমতীর দিঘল স্রোত দেখছে| রহমত হাজামের বাড়িতে যে বউ-ঝিয়ারিরা এসেছে, ওরা খড়ের মাড়ায় ল্যাপ্টা মেরে বসে থাকা একে অপরকে একই কথাই জিজ্ঞেস করছে| পিড়িতে বসা সবচেয়ে বয়স্ক ছমিরন নেছা পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে গল্প শুরু করে দিয়েছে, ‘আরে তোমাগোরে কী কমু, ব্যাপারি বাড়ির এই রকম একটা লাশ এই গেরামে উজাইয়া আইছিল বহুদিন আগেও একবার| হেইডা বিটিশ আমলে| আমি তহন ছোড আছিলাম| লাল পাগড়িওয়ালা পুলিশ আইসা এই কোড়ের পাড় থাইকা লাশটা উঠাইয়া লইয়া গেছিল| ওই লাশটা কার আছিল জানো, মনসুর পাগলার পর-দাদি মতিরন বিবির লাশ| ভাটি-গেরাম ছল্লাকান্দি বাপের বাড়িত যাওয়নের সময় গাঙে ডুইবা মরছিল| কিন্তুক লাশ হইয়া দুই দিন পর হেই মতিরন বিবি ছল্লাকান্দি থাইকা গাঙ ধইরা আমাগো এই গেরামে আবার উজাইয়া আইছিল| এরপর কত কিচ্ছা-কাহিনি গো!’

পাশের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কী কিচ্ছা-কাহিনি, কও না, দাদি|’

ছমিরন নেছা বলল, ‘আর কইয়ো না| মতিরন বিবিরে কবর দেওয়ার হইছিল আমাগো এই গেরামের কবরস্থানে| ছল্লাকান্দি নেয় নাই| হেইডাই কাল হইছিল| পরে দেখা যাইত, হেয় কারও বাড়ির গোপাটে, কারও বাড়ির পিছদোরে আইসা দাঁড়াইয়া থাকে| আর তেঁতুল গাছ পাইলে তো কোনো কথাই নাই| মানুষরে খালি ডর দেখিইত|

পাশের আরেকজন অল্পবয়স্ক যুবতী জিজ্ঞেস করল, কী ডর দেখাইত তো, বুজি?

ছমিরন নেছা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কী ডর দেখাইত বুঝতাছস না, মরা মানুষ আর জ্বীন-ভূত কী ডর দেখায়?’

অন্য আরেক মধ্যবয়স্কা মহিলা অল্পবয়স্ক যুবতীটাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আরে থাম| বুজিরে কইতে দে| ও বুজি, তুমি কও তো, হের পর কী হইল?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘মতিরন বিবি একটা খারাপ কাম করত|’

‘কী খারাপ কাম?’

‘হেয় গেরামের ছোড ছোড পোলাপানগুলারে ধইরা-ধইরা নিয়া গাঙে চুবাইয়া চুবাইয়া মারত| কয়েকদিন পর পর দেখা যাইত পোলাপানগুলার লাশ গাঙে ভাসতাছে|’

পাশের অন্য এক অল্পবয়সী যুবতী বলে উঠল, ‘কও কী, দাদি!’

ছমিরন নেছা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘হ, আমি হেছাই কইতাছি| একদিন দুপুর বেলা কী হইল, আমি গেছিলাম গোপাট থাইকা ছাগল আনতে| সুদিন মাস আছিল| হেই মতিরন বিবি আমার সামনে আইসা দাঁড়াইল| আমার হাত খাবলা দিয়া ধইরা কয়, ‘আয় ছেমড়ি, তোরে লইয়া গাঙের পাড় যামু...|’ আমি তো পরথমে ডরাইয়া যাই| পরে  সাহস কইরা চিল্লান দেই আর ঝাটকা মাইরা হাত ছুডাইয়া নেই| বাপজান কাছেই আছিল| আমার চিল্লান শুইনা দৌড়াইয়া আইয়া দেখে কেউ নাই| আমিও চোখ ঘুরাইয়া দেখি মতিরন বিবি উধাও!’

এবার কয়েকজন মহিলা একত্রে ভয়ের গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘তারপর আর এই ঘটনা ঘটে নাই| মতিরন বিবিরা ভূত হইয়া একবার হাইরা গেলে আর ফিরা আসে না| আমারে গাঙের পাড় নিতে পারে নাই| হেয় হাইরা গেছে| এই হাইরা গিয়া হেয় মাইনা নিতে পারে নাই| তারপর আর কোনোদিন মতিরন বিবি আমাগো গেরামে আসে নাই| কিন্তুক আমার কথা হইল অন্য|’

পাশের যুবতী মহিলাটা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার অন্য কী কথা, দাদি?’

ছমিরন নেছা বলল, ‘আমার অখন ডরটা কি জানো, সেতারা বেগম যদি মতিরন বিবির মতন আমাগো গেরামে আইসা পোলাপাইনদের ধইরা নিয়া গাঙে চুবাইয়া মারে? হেয় তো ব্যাপারি বাড়ির বউ গো!’

খড়ের মাড়ার আশেপাশের সবাই ছমিরন নেছার এই কথা শুনে আঁতকে উঠল| কেউ কেউ বলে উঠল, ‘হায় মা’বুদ, অখন কী হইব? আমাগো পোলাপানের লগে যদি এমনডা হয়?’

ছমিরন নেছা উদাস গলায় বলল, ‘ব্যাপারিবাড়ির বৌগুলান এমনই| মনসুর পাগলার মা’রে দেখো না, কেমন ঠ্যাডা মাইরা তাকাইয়া থাকে| কোনো কথা কয় না| অখন দেখো, কী হয়! সেতারা বেগম ছাড়বো না, আমি কইলাম, হেয় সইত্য সইত্য ছাড়ব না...!’

ছমিরন নেছার এ কথা শুনে মহিলারা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দিল|

মুখ চাওয়া-চাওয়ি রহমত হাজামের বাড়িতে আসা মহিলাদের মধ্যেই নয়, কোড়ের পাড়ের কচুরিপানার ঘেরের কাছে যারা নৌকা নিয়ে এসেছে বা কোমর জল ভেঙে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যেও| পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে, ওরা আসছে, এই ভয় খামাখাই অনেকের ভেতরটা হিম হয়ে গেছে| এদের মধ্যে দু-একজন কোনো কারণ ছাড়াই আস্তে আস্তে সটকেও পড়েছে|

এদিকে করিম মিয়া ও রব্বান শেখ বেশ ভয়ে আছে| ব্যাপারটা সে মোটেও এড়িয়ে যেতে পারছে না| সেতারা বেগমের উপুড় হওয়া লাশটা ওরা দু’জন ˆবঠা দিয়ে ঠেলে চিৎ করেছে, এটা এখানে যারা এসেছে সবাই জানে| ওরা নিজ থেকেই বলেছে| কিন্তু লাশে হাত দিলে পুলিশের মামলা হবে, নানান ঝামেলা হবে, এটা ওরা ভাবেনি| তাই ওরা এখন নিজেদের চুল মনে মনে নিজেরা ছিঁড়ছে|

দুটো নৌকা পাশাপাশি রেখে রব্বান শেখ ফিসফিস করে বলল, ‘করিম ভাই, কন দেখি, বড় মুশকিল তো হইয়া গেল|’

করিম মিয়া বলল, ‘আমিও তাই ভাবতাছি| ভাব দেখানের লাইগা সবাইরে কইলাম, সেতারা লাশ আমরাই পরথম দেখছি| আমরাই লাশ উল্টাইয়া চেহারা চিনছি| অখন তো মিছা কথাও কওয়া যাইব না|’

‘হাছাই কি পুলিশের মামলা হইব?’

‘হইতেও পারে|’

‘এখন তাইলে কী করমু?’

করিম মিয়া একটু চুপ হয়ে গিয়ে কী ভেবে বলল, ‘ছালেক মে¤^রের লগে কথা কইতে পারি| আমাগো ওয়ার্ডের মে¤^র|’

রব্বান শেখ সায় দিয়ে বলল, ‘হ, করিম ভাই, তুমি ঠিক কইছ| দরকার হইলে তার পায়ে ধরমু|’

করিম মিয়া বলল, ‘তাইলে চলো| হের নাওয়ে উইঠা কথা কই|’

রব্বান শেখ বলল, ‘আইচ্ছা, চলো|’

ওরা দু’জন তাদের ছোট্ট নৌকা দুটো নিয়ে ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটার আশাপাশে ঘুরঘুর শুরু করল| কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না| ছালেক মেম্বর তার চ্যাপ্টা মোবাইলে কারও সঙ্গে বলছে|

কিছুক্ষণ পর ছালেক মেম্বরের ফোনে কথা বলা শেষ হতেই ওরা সুযোগ বুঝে নিজেদের নৌকা ছেড়ে একে একে ছালেক মেম্বরের ডিঙিতে লাফিয়ে উঠে গেল|

নৌকাটা ওদের ভারে দুলে উঠতেই ছালেক মেম্বর ব্যস্ত গলায় বলল, ‘কী করতাছ, কী করতাছ? আমার নৌকাটা ডুবাইয়া ফেলবা তো|’

করিম মিয়া উপুড় হয়ে বসে ছালেক মেম্বরের পা ধরে বলল, ‘মেম্বর সাব, আপনার লগে একটা কথা কইতে আইছি| আমাগো একটা ভুল হইয়া গেছে|’

ছালেক মেম্বর বুঝতে না পেরে খানিকটা লাফিয়ে সরে যেতে যেতে বলল, ‘আরে, আরে, পা ধরতাছ ক্যান? পা ছাড়ো| কী কথা কইবা, কও|’

‘আমাগো কথা পুলিশরে কইয়েন না|’

‘আগে কইবা তো, তোমরা কী ভুল করছ?’

করিম মিয়া বলল, ‘আমি আর রব্বান মিইলা মনসুর পাগলার বউয়ের লাশটা পানির ওপর চিৎ করাইছি| আগে উপুড় হইয়া আছিল|’

ছালেক মেম্বর বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তয়?’

রব্বান শেখ বলল, ‘একটা বিনতি আছে| আপনে তো একটু আগে কইলেন, লাশরে যাতে কেউ হাত না দেয়| পুলিশ কেস হইব| আমরা তো লাশরে হাত দিছি|’

ছালেক মেম্বর মৃদু হাসল| পরক্ষণই চেহারাটা খানিকটা কঠিন করে ফেলল| একটু কেশে বলল, ‘বুঝতে পারতাছি| আইচ্ছা, পুলিশরে কমু না| তোমরা হইলা গিয়া আমার ওয়ার্ডের| পুলিশরে কি তোমাগো কথা কইতে পারি?’

রব্বান শেখ গদগদ গলায় বলল, ‘হ, আমরা একই ওয়ার্ডের| আমরাই তো আপনেরে ভোট দিছিলাম|’

ছালেক মেম্বর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, জানি| তয় একটা কথা|’

রব্বান শেখ জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা, মেম্বর সাব?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘পুলিশ লাশ লইয়া যাইবার পর তোমরা দুইজন আমার বাড়িতে গিয়া আমার লগে দেখা করবা|’

রব্বান শেখ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, মেম্বর সাব?’

ছালেক মেম্বর তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, ‘হেইডা কি তোমাগোরে কইয়া দিতে হইব? পুলিশ আওয়নের আগে তোমরা লাশে হাত দিছো| বুঝতেই পারতাছ, ক্যান কইতাছি|’

করিম মিয়া বলল, ‘হ হ, মেম্বর সাব, বুঝতে পারতাছি| রব্বান, মেম্বর সাব ঠিক কইছে| আমরা দেখা করমু নে|’

রব্বান শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ হ, আইচ্ছা| অবিশ্যই দেখা করমু নে|’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘ঠিক আছে, তোমরা তোমাগো নৌকায় যাও| একটু পরে পুলিশ আইয়া পড়ব|’

রব্বান শেখ ও করিম মিয়া সায় দিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, আইচ্ছাৎ|’ বলেই ওরা যার যার নৌকায় উঠে গেল|

এদিকে সেতারা বেগমের লাশ নৌকায় না ওঠানোর দ্বিতীয় কারণটা হলো, মনসুর পাগলার এখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি| মনসুর পাগলা এলে সে এই ছালেক মেম্বর বা কারও কথা শুনত না| সে আসলে একমাত্র আনিসকে বাদে গ্রামের কারও কথাই শোনে না| আর শোনে মস্তানের মাজারের দু-একজন খাদেমের কথা| সে বরাবরই নিজের মতো চলে, নিজের মতো কথা বলে| এরই মধ্যে আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার রুহুল আমিন সেতারা বেগমের লাশের খবর নিয়ে মনসুর পাগলার বাড়িতে গিয়েছিল| মনসুর পাগলা তখন বাড়িতে ছিল না| মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন সিতারা বেগমের লাশের খবর শুনে শীতল চোখে তাকিয়ে বলে, ‘ও, হেই কথা...|’

কমলা খাতুন এর বেশি একটা কথাও বলেনি| এখন পর্যন্ত কোড়ের পাড়ে আসার নামও নেয়নি| মনসুর পাগলার আগের বউ জুলেখা যখন মারা যায়, সে একই কাজ করেছিল| সে লাশটা পর্যন্ত দেখতে যায়নি| 


তিন.

মন খারাপ থাকলেই মনসুর পাগলা মস্তানের দরগায় চলে যায়| সারাদিন সেখানে পড়ে থাকে| কখনও দুই-তিনদিন, কখনও এক-দুই সপ্তাহের জন্য বাড়িতে আসে না| দরগায় যে তবারুক পড়ে সেগুলো খেয়েই সেখানে দিন কাটায়| কোনো কোনো সন্ধ্যায় মাজারের খাদেমরা খিচুড়ি চড়ায়| তখন সে হাত-পা ছড়িয়ে খাদেমদের সঙ্গে খিচুড়ি খায়|

মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনের অবশ্য ছেলের এসব বিষয় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই| বাড়িতে ছেলে এলে রান্না করে খাওয়ায়, কোনো উচ্চবাচ্য করে না| ছেলে বাড়িতে না থাকলে নিজের জন্যই শুধু রান্না করে, ছেলের অপেক্ষায় থাকে না| এমনকি ছেলে দিনের পর দিন বাড়িতে না এলেও কাউকে দিয়ে একটু খবর নেয় না| শীতকালে ছেলের পাগলামি বেড়ে যায়| মাঝরাতে পুকুরে ঠাণ্ডা জলে নেমে গিয়ে সকাল অব্দি পুকুরে সাঁতার কাটে| গ্রামের মানুষ যখন মোটা-মোটা কাপড় গায়ে দিয়ে এমনিতেই শীতে থরথর করে কাঁপে, পুকুরের ঠাণ্ডা জলে মনসুর পাগলার তখন কিছুই হয় না| এটা শুধু একদিন-দু’দিন নয়, শীতকাল এলে প্রায় রাতেই সে এটা করে| মা হিসেবে কমলা খাতুন এ নিয়ে একটুও বিচলিত হয় না| ঘরে যখন ছেলেবউ থাকে তখনই যা একটু সমস্যা হয়|

মস্তানের মাজারে আজ এখন পর্যন্ত কোনো তবারুক পড়েনি| মানতের টাকাপয়সাও না| সকাল থেকে মনসুর পাগলা কিচ্ছু খায়নি| মাজারে এলে সাধারণত সে সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসে না|

দুপুর হয়-হয় সময়টায় দরগার এক পুরোনো খাদেম ডেকে বলল, ‘পাগলা, আয়, আমার লগে চাইরটা খাইবি| সকাল থাইকা তো পেটে একটা দানাও পড়ে নাই|’

মনসুর পাগলা হেসে বলে, ‘হ হ, বড় বুক লাগছে| ভাইজান, আপনে খাওয়াইবেন?’

দরগার এই পুরোনো খাদেমের নাম, আজমত আলী| মনসুর পাগলাকে বেশ পছন্দ করে| সময়-সুযোগে সুখদুঃখের আলাপ করে| মনসুর পাগলা তাকে ভাইজান বলে ডাকে|

আজমত খাদেম হেসে বলল, ‘এই জন্যই তো তোরে ডাকতাছি|’

মনসুর পাগলাও হাসল, হে হে, হে হে| কোনো দ্বিরুক্তি না করে সে খাদেমের ঘরে গিয়ে ঢুকল| হাত ধুয়ে পিড়ি টেনে বসল|

আজমত খাদেম নিজেও একটা পিড়ি টেনে বসে মনসুর পাগলার দিকে একটা থালা বাড়িয়ে দিল|

মনসুর পাগলা থালাটা নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রান্ধিছেন আইজকা?’

আজমত খাদেম নিজের থালাটা নিতে নিতে বলল, ‘আমি কোনোকিছু রান্ধি নাই|’

‘তয়, খাওয়াইবেন কইলেন?’

‘তোরে খাওয়াইতে হইলে আমার আলাদা কইরা রান্ধন লাগব নাকি?’

মনসুর পাগলা আবার হাসল| বলল, ‘আমি হেইডা কই নাই তো|’

আজমত খাদেম বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি| এমনিই কইলাম| কাইলকা সইন্ধ্যাবেলা আমাগো মাজারের জন্যি ছলিমকান্দি গেরামের এক ভক্ত খিচুড়ি আর মইষের গোশত রাইন্ধ্যা নিয়া আইছিল| ডোবা বিলের মইষ| গোশতটা বড় স্বাদের| অনেকগুলা উপড়াইছে| তুই তো কাইল আসছ নাই| অখন তোরে মাজারে দেইখ্যাই ভাবলাম, হেই গোশত-খিচুড়ি দিয়া দুপুরে এক লগে খাই|’

মনসুর পাগলা আনন্দে গদগদ হয়ে বলল, ‘ভালা করছেন, ভালা করছেন| এতিমরে খাওয়াইলে এমনিতেই সওয়াব হয়|’

আজমত খাদেম হেসে বলল, ‘পাগলা, তুই তো বড় সেয়ানা| তোর বাপ মরছে কুড়ি বছরের ওপরে হইয়া গেছে| তুই নিজেরে অখনও এতিম কস?’

মনসুর পাগলা আরও জোরে শব্দ করে হেসে উঠল, হা হা, হা হা| হাসি থামাতে থামাতে বলল, ‘ভাইজান, আমি তো এতিমই| দুইদিন আগে আমার বউ গাঙে ডুইবা মইরা গেছে| বউয়ের লাশটা অখনও পাই নাই|’

আজমত খাদেম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হয় রে, তোর লাইগা আমার বড় মায়া হয়| তোর কপালে বউ টিকে না| আগের বউডা মরল পানিতে ডুইবা| এই বউডারও একই হাল হইল| পানিতে ডুইবা মরল|’

মনসুর পাগলা খাদেমের মুখে এ কথা শুনে মন খারাপ করে ফেলল| আস্তে করে বলল, ‘আপনে ঠিকই কইছেন, ভাইজান| আমার কপালডাই খারাপ| আমার বউ খালি পানিতে ডুইবা মইরা যায়|’

আজমত খাদেম একটা দুঃখের নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আর মন খারাপ কইরা লাভ নাই| অখন তোর এই বউডার লাশটা পাইলেই হয়| অন্তত জানাজা তো পড়ান যাইব| লাশের জানাজা না পড়ানো হইল, কবর না দিবার পারলে হাশরে আজাব হাজার গুণ বাইড়া যায়|’

মনসুর পাগলা আরও মন খারাপ করে ফেলল| বলল, ‘বউয়ের লাশটা তো কাইলকা কম খুঁজি নাই| হেই দিন রাইতেও খুঁজছি| পাই নাই তো| খুঁজতে খুঁজতে ছলিমকান্দি পর্যন্ত গেছিলাম| ভাইজান, আমার মনডা আরও খারাপ| বউডা গাঙে ডুবল, আর এইবারের ঔরসটাও দেখতে পারলাম না|’

আজমত খাদেম খিচুড়ি ও মহিষের গোশত থালায় বেড়ে দিতে দিতে বলল, ‘হইছে, অখন খা| বউডা মরছে অইডার জন্য মন খারাপ কর| ঔরসের লাইগা মন খারাপ কইরা লাভ নাই| এইখানে ঔরস প্রতিবছরই হয়|’

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, ভাইজান| ঔরস তো প্রতিবছরই হয়|’ বলেই সে গপগপ করে খিচুড়ি-গোশত খাওয়া শুরু করল| তার পেটে ক্ষুধায় যেন খরার চর পড়েছে|

আজমত খাদেম নিজের থালাটা টেনে নিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘পাগলা, আস্তে খা| গলায় আটকাইব|’

মনসুর পাগলা আবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, ভাইজান, হ|’

মনসুর পাগলা থালার খিচুরি-গোশত মাত্র আধাআধি খেয়েছে, ঠিক তখনই আরেক অল্পবয়সী খাদেম ঘরে ঢুকল| মনসুর পাগলাকে দেখেই বলল, ‘আরে পাগলা, তুই এইখানে? সক্কালবেলা মীরবহরি বাজারে যাওয়নের সময় তোরে মাজারে দেইখা গেলাম| অখন আইসা দেখি নাই| তোরে আমি খুঁজতাছি|’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, খুঁজতাছ?’

‘মীরবহরি বাজারে শুনলাম, তোর বউয়ের লাশ নাকি তগো গেরামে কোড়ের পাড়ে ভাইসা উঠছে|’

‘কও কী, কও কী?’

‘আমি ঠিকই কইছি| খবরটা সইত্য|’

‘আমার বউয়ের লাশ ভাইসা উঠছে, আরে, আমার বউয়ের লাশ ভাইসা উঠছে’— বলতে বলতে খাবার শেষ না করেই মনসুর পাগলা থালাটা ঠেলে লাফিয়ে উঠল|

আজমত খাদেম বলল, ‘আরে পাগলা, খাওয়নডা শেষ কইরা যা|’

মনসুর পাগলা আজমত খাদেমের কথা গা করল না| ডেরা থেকে বের হয় সে দৌড়ে পুনোয়ারার ঘাটপাড়ের দিকে ছুটল| ঘাটপাড়ে তার নৌকাটা একটা শক্ত খুঁটিতে বাঁধা|

মনসুর পাগলা খুঁটি থেকে নৌকাটা কোনো মতে খুলে জোরছে গোমতীর উজানের দিকে ˆবঠা বাইতে শুরু করল| নৌকাটা তীর গতিতে চলতে শুরু করল স্রোতের বিপরীতে সরু রেখা করে| মনসুর পাগলার বয়স ত্রিশ-একত্রিশ বছর হলেও সে এখনও তাগড়া জোয়ানের মতো চলে| তার শরীরে শক্তিও বেশ| পেশিগুলো যেন নিজ থেকেই ফুলে আছে|

পুনোয়ারার বটতলা থেকে আঁধারিয়া গ্রামের কোড়ের পাড় খুব বেশি দূরে নয়| বড়জোর এক কিলোমিটার হবে| খানিকটা বেশিও হতে পারে| আজ নদীতে স্রোতের বেগ কম| যদিও ভরাটবান চারিদিকে| মনসুর পাগলা অল্পক্ষণের মধ্যেই কোড়ের পাড় চলে এল| কোড়ের পাড়ে এসে সে দেখল, চার-পাঁচটা নৌকা কাছেই স্থির হয়ে জলে ওপর ভাসছে| কিছু ব্যাটাছেলে জোয়ারের জলে কোমর অব্দি ভেঙে কাছেই দাঁড়িয়ে আছে| খানিকটা দূরে বোরো ধানের জমির সীমানা ঘেঁষে রহমত হাজামের বাড়ি যেখানে, সেখানটায় অনেক মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে|

মনসুর পাগলার নৌকাটা কোড়ের পাড়ে ভিড়তেই ছালেক মেম্বর গলা বাড়িয়ে বলল, ‘হেই পাগলা, তুই আইছস| কই আছিলি?’

মনসুর পাগলা হাঁপ ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি মস্তানের দরগাতে আছিলাম|’

ছালেক মেম্বর একটু কটাক্ষ করে বলল, ‘তোর কামই তো ওইটা| শোন, তোর বউয়ের লাশ পাওয়া গেছে, হেইডা তো জানস?’

‘হ, হেই খবর পাইয়া তো আইলাম|’

‘তয় ভালা কথা| তুই অখন তোর বউয়ের লাশে হাত দিবি না|’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘পুলিশরে খবর দেওয়া হইছে| তুই তোর বউয়ের লাশে হাত দিলে পুলিশের মামলা হইব|’

মনসুর পাগলা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী কও, পুলিশের মামলা হইব ক্যান? আমার বউ তো পানিতে ডুইবা মরছে| হেরে তো কেউ মারে নাই?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘তোর বউরে মারে নাই, হেইডা ক্যামনে বুঝমু? তোর নাও ডুবছে পুনোয়ারা বটগাছের কাছে| লাশ ভাইসা উঠছে এই কোড়ের পাড়ে| লাশ উজাইয়া আইল ক্যামনে?’

‘অইডা আমি কেমনে কমু? তুমি লাশরে জিগাও|’

‘লাশরে জিগাইমু মানে, লাশ কি কথা কইতে পারে?’

‘তাইলে আমারে জিগাও ক্যান?’

‘আমি তো কই, তুই তোর বউরে চুবাইয়া মারছস|’

মনসুর পাগলা এবার একটু ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘দেখো মেম্বর, উল্টাপাল্টা কথা কইবা না| আমার বউয়ের লাশ কই?’

ছালেক মে¤^র মনসুর পাগলার এ কথার জবাব না দিয়ে আবারও জোর দিয়ে বলল, ‘পাগলা, তোর বউয়ের লাশ কই, অইডা খুঁইজা লাভ নাই| পুলিশ না আসা পর্যন্ত ধরতে পারবি না| তাইলে কিন্তু তোর খবর আছে, কইয়া দিলাম|’

মনসুর পাগলা বলল, ‘পুলিশের মামলা হইলে হইব| আমি পুলিশরে ডরাই না| আমার বউয়ের লাশটা কই, হেইডা কও|’

দক্ষিণ পাড়ার মধু মিয়া কাছেই একটা নৌকায় ছিল| সে আঙুল দিয়ে লাশটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই তো, ঘেরের ভিতরে| তুমি কি দেখতাছ না?’

মনসুর পাগলা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর তাকিয়ে সেতারা বেগমের লাশটা দেখামাত্রই বলল, ‘হ, হ, দেখতাছি| আমার বউয়ের লাশটা দেখতাছি|’ বলেই সে নৌকা ছেড়ে জলে লাফিয়ে পড়ল|

যদিও গোমতী বেয়ে উঠে আসা উত্তরের জোয়ারের জল এখানটায় বেশ| তবে গোমতীর সেই গভীরতা এখানে নেই| এখানে এখন কোথাও বুক, কোথাও কোমর অব্দি জল| মনসুর পাগলার সাঁতার কাটার প্রয়োজন নেই| জল আর কচুরিপানা ঠেলেই সে হেঁটেই যেতে পারে| কিন্তু সে তাড়াতাড়ির জন্য সাঁতরে সেতারা বেগমের লাশের দিকে এগিয়ে গেল| কাছাকাছি গিয়ে ফুলে ওঠা সেতারা লাশটা ঝাপটে ধরে চিৎকার করে উঠল, ‘আমার বউয়ের লাশ, আমার বউয়ের লাশ!’

ছালেক মেম্বর আবার উঁচু গলায় বলল, ‘পাগলা, তোরে কিন্তু আবার কইতাছি| তোর বউয়ের লাশ ধরতাছস| পুলিশ আইতাছে কিন্তুক|’

মনসুর পাগলা ছালেক মেম্বরের কথায় একেবারে গা করল না| সে সেতারা বেগমের লাশটা জলের মধ্যে আড়াআড়ি ধরে টেনে এনে একাই নৌকায় টেনে তুলল| কারও সাহায্য পর্যন্ত চাইল না|

ছালেক মেম্বর এবার জোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘তুই কামডা ঠিক করস নাই| তুই আমার কথা শুনস নাই| নৌকায় তুলছস ভালা কথা| এখান থাইকা এক পা-ও নড়বি না| নইলে তোরে কিন্তু আমার লোক দিয়া পিটাইমু|’

মনসুর পাগলা দৃঢ় গলায় বলল, ‘তোমার যা ইচ্ছা তাই করো গিয়ে| আমার বউরে আমি বাড়িত লইয়া যামু| কারো হুকুম মানমু না| আর তুমি হুকুম দেওয়ার কেডা, মেম্বর? আমি তোমারে ডরাই না|’

ছালেক মেম্বর মাথা ঝাঁকিয়ে আরও রাগী গলায় বলল, ‘দাঁড়া, পুলিশ আসুক| তোরে পুলিশরে দিয়া এমন পিটান পিটাইমু, বাপের নাম ভুইলা যাইবি| তুই আমারে চিনস নাই!’

মনসুর পাগলা ছালেক মেম্বরের কথার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে নৌকায় উঠে ˆবঠা ফেলে জোরে লগি ঠেলা শুরু করল|

সেতারা বেগমের লাশটা নৌকায় ঠিকমতো জায়গা হয়নি| একটা পা গলুইয়ে লম্বা হয়ে পড়ে থাকলেও আরেকটা পা গলুই থেকে ঝুলছে| একটা হাত মুঠো করা, অন্য হাতটা জলের ওপর নৌকা চলার দুলুনিতে দুলছে| মনে হচ্ছে সেতারা বেগমের হাতটা যেন দুলছে না, কাউকে অমোঘ আহ্বানে ডাকছে| মনসুর পাগলা ঠিক বুঝতে পারল না, সিতারা বেগম কাকে হাত ইশারায় ডাকছে| তাকে তো?

মনসুর পাগলা আরও জোরে লগি ঠেলা শুরু করল| সে ভাবল, লাশের আবার হাত ইশারা কী?
ক্রমশ...

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত