সংবাদ

এআই: আমরা ফিরছি অতীতে, বিশ্ব বানাচ্ছে ভবিষ্যৎ


ইসরাফিল মাসুম
ইসরাফিল মাসুম
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০২ পিএম

এআই: আমরা ফিরছি অতীতে, বিশ্ব বানাচ্ছে ভবিষ্যৎ
আমরা কি এআই দিয়ে শুধু অতীতের ছবি বানাব, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বানাব?

কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের ছবি আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের আদলে তৈরি করছেন। পুরোনো পোশাক, পুরোনো চুলের স্টাইল, ফিল্ম ক্যামেরার আবহ - কয়েক সেকেন্ডেই বর্তমানের মানুষ ফিরে যাচ্ছেন অতীতে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও এই রেট্রো এআই ফটো ট্রেন্ড নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।

ছবিগুলো সুন্দর, মজার এবং নিরীহ বিনোদন। প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ আনন্দ নেবে - এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এই ছোট্ট ট্রেন্ডটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: আমাদের কাছে এআই কি শেষ পর্যন্ত আরেকটি বিনোদনের খেলনাই হয়ে থাকবে?

কারণ ঠিক যে সময়ে আমরা এআই দিয়ে অতীতে ফিরে যাচ্ছি, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগামী দশকগুলোর অর্থনীতি, শিল্প, চিকিৎসা, পরিবহন ও কর্মক্ষেত্র নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। সমস্যাটি ছবি নয়; সমস্যাটি আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।

এআই শুধু ছবি বানানোর প্রযুক্তি নয়

আজকের এআই শুধু ছবি, ভিডিও বা মজার কনটেন্ট তৈরির প্রযুক্তি নয়। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, চিকিৎসাবিজ্ঞান, নতুন ওষুধ আবিষ্কার, মেশিন ভিশন, রোবোটিকস, ব্যাংকিং, অ্যাগ্রিকালচার, লজিস্টিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এডুকেশন - প্রায় প্রতিটি খাতে এআই মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।

অটোনোমাস গাড়ি এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়। ২০২৬ সালে ওয়েমো অরল্যান্ডো-সহ কয়েকটি মার্কিন শহরে ফুললি অটোনোমাস রাইড-হেইলিং সার্ভিস সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছে। কারখানায় রোবট মানুষের পাশে কাজ করছে, ওয়্যারহাউসে অটোমেটেড সিস্টেম পণ্য সরাচ্ছে, আর নলেজ ওয়ার্কে এআই মানুষের প্রোডাক্টিভিটি বহুগুণ বাড়াচ্ছে।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বড় অর্থনীতিগুলো এখন এআই চিপ, মডেল, রোবোটিকস, ডেটা সেন্টার, অটোনোমাস ট্রান্সপোর্টেশন এবং ইন্টেলিজেন্ট সফটওয়্যারের বাজারে নেতৃত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায়। আর আমাদের সামাজিক আলোচনার বড় অংশ যদি আটকে থাকে “এআই দিয়ে আমাকে নব্বইয়ের দশকে দেখতে কেমন লাগে” - তাহলে প্রযুক্তিগত ব্যবধান আরও বড় হবে।

আমরা আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় হারিয়েছি

বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ছোট ব্যবসা তৈরি হয়েছে, উদ্যোক্তারা বাজার পেয়েছেন, মানুষ দ্রুত তথ্য পাচ্ছেন। কিন্তু এর অন্য দিকটিও স্পষ্ট। বছরের পর বছর কখনো ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যক্তিগত জীবন, কখনো ভাইরাল কনট্রোভার্সি, কখনো সেলিব্রিটি বা পারিবারিক ঘটনার মতো বিষয় আমাদের বিপুল কালেকটিভ অ্যাটেনশন দখল করে রেখেছে। একটি ট্রেন্ড শেষ হয়েছে, আরেকটি এসেছে।

কিন্তু প্রযুক্তিগত বিপ্লব কাউকে অপেক্ষা করে না। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যখন রিসার্চ, সেমিকন্ডাক্টর, এআই মডেল, রোবোটিকস এবং অটোমেশনে বিনিয়োগ করেছে, তখন আমাদেরও একই গতিতে দক্ষতা, গবেষণা ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি করার কথা ছিল। এআই রেভল্যুশনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আমাদের তরুণেরা

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান ইতোমধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী টারশিয়ারি-এডুকেটেড বা বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষের আনএমপ্লয়মেন্ট রেট ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ - শিক্ষার স্তরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

একই সময়ে এআই এমন অনেক কাজ দ্রুত বদলে দিচ্ছে, যেগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা গত এক দশকে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে জায়গা তৈরি করেছিলেন। বেসিক গ্রাফিক ডিজাইন, সাধারণ ওয়েবসাইট ওয়ার্ক, এসইও কনটেন্ট, ট্রান্সলেশন, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট কিংবা রিপিটেটিভ ডিজিটাল টাস্ক - এসব ক্ষেত্রে এআই একজন দক্ষ কর্মীর প্রোডাক্টিভিটি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

এর অর্থ ফ্রিল্যান্সিং শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং লো-স্কিল ফ্রিল্যান্সিংয়ের অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। যে ফ্রিল্যান্সার এআই ব্যবহার করতে জানবে, অটোমেশন তৈরি করতে পারবে, অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার সলিউশন, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা এআই এজেন্ট নিয়ে কাজ করতে পারবে - তার মূল্য বাড়বে। কিন্তু একই স্কিল সেট নিয়ে দীর্ঘদিন স্থির থাকলে বাজার কঠিন হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, আবার প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ কাজ ডিসপ্লেসমেন্টের মুখে পড়তে পারে। একই রিপোর্ট বলছে, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে বদলে যেতে পারে।

তাই ভয় পাওয়ার সঠিক বাক্যটি “এআই সব চাকরি নিয়ে নেবে” নয়। আরও বাস্তব বাক্য হলো - এআই জানা মানুষ এআই না-জানা মানুষের কাজ নিয়ে নেবে; এআই-দক্ষ দেশ এআই-অদক্ষ দেশের বাজার নিয়ে নেবে।

গার্মেন্টস: অটোমেশন থামানো নয়, অটোমেশনের মালিক হওয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং অটোমেশন দ্রুত এগোচ্ছে। কাটিং, ইন্সপেকশন, সর্টিং, প্যাকেজিং ও ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্টে অটোমেশন এবং রোবোটিকসের ব্যবহার বাড়ছে। ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন ও সলিডারিডাডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পর্যবেক্ষিত প্রোডাকশন প্রসেসে অটোমেশনের সঙ্গে মোট ওয়ার্কফোর্স রিকোয়ারমেন্ট প্রায় ৩০.৫৮ শতাংশ কমার চিত্র পাওয়া গেছে; সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কম দক্ষতার কাজগুলোতে।

অটোমেশন বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। অন্য দেশ অটোমেশন ব্যবহার করে দ্রুত, কম খরচে ও কম ভুলে উৎপাদন করলে আমরা শুধু চিপ লেবার দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারব না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অটোমেশনের মালিক হওয়া - বাংলাদেশি তরুণরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এআই বানাবে, রোবট মেইনটেইন করবে, মেশিন ভিশন সিস্টেম তৈরি করবে, অটোমেটেড কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং স্মার্ট সাপ্লাই চেইন পরিচালনা করবে।

প্রবাসী শ্রমবাজারও চিরদিন একই থাকবে না

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ড্রাইভার, ক্লিনার, ওয়্যারহাউস ওয়ার্কার, ডেলিভারি ওয়ার্কার, কনস্ট্রাকশন সাপোর্ট এবং নানা ম্যানুয়াল প্রফেশনে কাজ করেন। এসব কাজ আগামীকালই শেষ হয়ে যাবে - এ কথা অবাস্তব। কিন্তু অটোনোমাস ভেহিকল, রোবোটিক ক্লিনিং, ওয়্যারহাউস অটোমেশন এবং সার্ভিস রোবোটিকস যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বা ২০ বছরের শ্রমবাজার আজকের মতো থাকবে - এ ধারণাও নিরাপদ নয়।

তাই আমাদের প্রবাসী কর্মীদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু বর্তমানের কাজ শেখালে চলবে না। ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি, অটোমেশন সুপারভিশন, রোবোটিকস মেইনটেন্যান্স, স্মার্ট লজিস্টিকস, হেলথকেয়ার টেকনোলজি এবং এআই-অ্যাসিস্টেড প্রফেশনের দিকে তাদের প্রস্তুত করতে হবে।

বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটেও এআই হতে পারে সমাধানের অংশ

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অথচ এআইকে আমরা খুব কমই এসব জাতীয় সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করি। এআই দিয়ে ইলেকট্রিসিটি ডিমান্ড ফোরকাস্ট, গ্রিড অ্যানোমালি ডিটেকশন, প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনার্জি অপটিমাইজেশন, রিনিউএবল এনার্জি ফোরকাস্টিং এবং জিওলজিক্যাল বা সিসমিক ডেটা অ্যানালাইসিস উন্নত করা সম্ভব।

অর্থাৎ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা পুরোনো দিনের ছবি বানাচ্ছি, একই প্রযুক্তি আমাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানেও ব্যবহার করা যায়। আমাদের প্রয়োজন বাংলাদেশের সমস্যার জন্য বাংলাদেশের এআই রিসার্চ - কৃষি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গার্মেন্টস, বাংলা ভাষা এবং সরকারি সেবায়।

এআইয়ের প্রতিটি ব্যবহারেরও একটি মূল্য আছে

এআই কোনো জাদু নয়। প্রতিটি বড় এআই রিকোয়েস্টের পেছনে ডেটা সেন্টার, জিপিইউ, ইলেকট্রিসিটি এবং কুলিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাজ করে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির এনার্জি অ্যান্ড এআই বিশ্লেষণ অনুযায়ী গ্লোবাল ডেটা-সেন্টার ইলেকট্রিসিটি কনজাম্পশন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণের বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে; এআই এই বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালকদের একটি।

এ তথ্যের মানে এআই দিয়ে আনন্দ করা নিষিদ্ধ - এটা নয়। প্রশ্ন হলো, এই অসাধারণ কম্পিউটেশনাল পাওয়ার থেকে আমরা কতটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভ্যালু তৈরি করছি। একটি এআই যদি কৃষকের ফসল বাঁচায়, ফ্যাক্টরির এনার্জি ওয়েস্ট কমায়, ছাত্রকে শেখায়, রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে কিংবা একজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক কাজ করতে সক্ষম করে - তাহলে একই প্রযুক্তি জাতীয় উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের মস্তিষ্ক

আমরা প্রায়ই বলি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু মাটির নিচে নয়; আমাদের মানুষের মস্তিষ্কও একটি ন্যাশনাল রিসোর্স। ধরা যাক, এক কোটি তরুণ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ের মাত্র এক ঘণ্টা কমিয়ে সেই সময় এআই, প্রোগ্রামিং, ইংলিশ, রোবোটিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এন্টারপ্রেনারশিপ কিংবা নিজের প্রফেশনের অ্যাডভান্সড স্কিল শেখে। এক বছরে সেটি দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৫ কোটি ঘণ্টা লার্নিং টাইম।

এই হিসাবটি কোনো অর্থনৈতিক মডেল নয়; এটি অপরচুনিটি কস্ট বোঝানোর একটি সরল উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সময় নিতে পারে, আবার এআই সেই সময়ের মূল্য বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগও দিতে পারে। সিদ্ধান্ত আমাদের।

এআই বন্ধ নয়, এআইয়ের ব্যবহার বদলাতে হবে

আমি এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকের ছবি বানানো বন্ধ করার কথা বলছি না। ফেসবুক বন্ধ করার কথাও বলছি না। একটি ছবি বানান, বন্ধুদের দেখান, আনন্দ করুন। তারপর নিজের কাছে আরেকটি প্রশ্ন করুন: এই এআই দিয়ে আমি আমার ভবিষ্যতের জন্য কী বানালাম?

একটি নতুন স্কিল? একটি সফটওয়্যার? একটি বিজনেস? একটি রিসার্চ প্রজেক্ট? একটি অটোমেশন? একটি ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস? একটি বাংলা এআই প্রোডাক্ট? নাকি শুধু আরেকটি ফেসবুক পোস্ট?

বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে এআই লিটারেসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রি-ওরিয়েন্টেড এআই রিসার্চ, ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিংয়ে হাই-ভ্যালু স্কিল, শিল্পে অটোমেশন রিস্কিলিং এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব এআই ইকোসিস্টেম - এই পাঁচটি দিককে এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে আনা দরকার।

এবার আমাদের ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করার সময়

বাংলাদেশ একসময় শ্রম রপ্তানি করেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পরে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল সার্ভিস এক্সপোর্ট করেছে। এআই রেভল্যুশন আমাদের সামনে আরেকটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করা।

বাংলাদেশের তরুণরা যদি এআই ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার, রোবোটিকস স্পেশালিস্ট, সাইবারসিকিউরিটি এক্সপার্ট, এআই এন্টারপ্রেনার এবং অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট হিসেবে তৈরি হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা শুধু প্রবাসী শ্রম কিংবা তৈরি পোশাক থেকে আসবে না; আমাদের মেধা, টেকনোলজি, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এবং এআই প্রোডাক্ট থেকেও আসবে।

বাংলাদেশের জন্য এআই যদি শুধু বিনোদনের খেলনা হয়ে থাকে, তবে আমরা হয়তো অনেক সুন্দর ছবি তৈরি করব, কিন্তু নতুন অর্থনীতি তৈরি করতে পারব না। আর পৃথিবী আমাদের জন্য থেমে থাকবে না।

আজ আমরা এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকে ফিরে যাচ্ছি। অন্যদিকে পৃথিবী এআই দিয়ে ২০৩৫, ২০৪০ কিংবা ২০৫০ সালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকের সামনে আজ প্রশ্নটি থাকা উচিত - আমরা কি এআই দিয়ে শুধু অতীতের ছবি বানাব, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বানাব?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনই।

[লেখক: এআই গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


এআই: আমরা ফিরছি অতীতে, বিশ্ব বানাচ্ছে ভবিষ্যৎ

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের ছবি আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের আদলে তৈরি করছেন। পুরোনো পোশাক, পুরোনো চুলের স্টাইল, ফিল্ম ক্যামেরার আবহ - কয়েক সেকেন্ডেই বর্তমানের মানুষ ফিরে যাচ্ছেন অতীতে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও এই রেট্রো এআই ফটো ট্রেন্ড নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।

ছবিগুলো সুন্দর, মজার এবং নিরীহ বিনোদন। প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ আনন্দ নেবে - এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এই ছোট্ট ট্রেন্ডটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: আমাদের কাছে এআই কি শেষ পর্যন্ত আরেকটি বিনোদনের খেলনাই হয়ে থাকবে?

কারণ ঠিক যে সময়ে আমরা এআই দিয়ে অতীতে ফিরে যাচ্ছি, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগামী দশকগুলোর অর্থনীতি, শিল্প, চিকিৎসা, পরিবহন ও কর্মক্ষেত্র নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। সমস্যাটি ছবি নয়; সমস্যাটি আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।

এআই শুধু ছবি বানানোর প্রযুক্তি নয়

আজকের এআই শুধু ছবি, ভিডিও বা মজার কনটেন্ট তৈরির প্রযুক্তি নয়। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, চিকিৎসাবিজ্ঞান, নতুন ওষুধ আবিষ্কার, মেশিন ভিশন, রোবোটিকস, ব্যাংকিং, অ্যাগ্রিকালচার, লজিস্টিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এডুকেশন - প্রায় প্রতিটি খাতে এআই মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।

অটোনোমাস গাড়ি এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়। ২০২৬ সালে ওয়েমো অরল্যান্ডো-সহ কয়েকটি মার্কিন শহরে ফুললি অটোনোমাস রাইড-হেইলিং সার্ভিস সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছে। কারখানায় রোবট মানুষের পাশে কাজ করছে, ওয়্যারহাউসে অটোমেটেড সিস্টেম পণ্য সরাচ্ছে, আর নলেজ ওয়ার্কে এআই মানুষের প্রোডাক্টিভিটি বহুগুণ বাড়াচ্ছে।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বড় অর্থনীতিগুলো এখন এআই চিপ, মডেল, রোবোটিকস, ডেটা সেন্টার, অটোনোমাস ট্রান্সপোর্টেশন এবং ইন্টেলিজেন্ট সফটওয়্যারের বাজারে নেতৃত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায়। আর আমাদের সামাজিক আলোচনার বড় অংশ যদি আটকে থাকে “এআই দিয়ে আমাকে নব্বইয়ের দশকে দেখতে কেমন লাগে” - তাহলে প্রযুক্তিগত ব্যবধান আরও বড় হবে।

আমরা আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় হারিয়েছি

বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ছোট ব্যবসা তৈরি হয়েছে, উদ্যোক্তারা বাজার পেয়েছেন, মানুষ দ্রুত তথ্য পাচ্ছেন। কিন্তু এর অন্য দিকটিও স্পষ্ট। বছরের পর বছর কখনো ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যক্তিগত জীবন, কখনো ভাইরাল কনট্রোভার্সি, কখনো সেলিব্রিটি বা পারিবারিক ঘটনার মতো বিষয় আমাদের বিপুল কালেকটিভ অ্যাটেনশন দখল করে রেখেছে। একটি ট্রেন্ড শেষ হয়েছে, আরেকটি এসেছে।

কিন্তু প্রযুক্তিগত বিপ্লব কাউকে অপেক্ষা করে না। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যখন রিসার্চ, সেমিকন্ডাক্টর, এআই মডেল, রোবোটিকস এবং অটোমেশনে বিনিয়োগ করেছে, তখন আমাদেরও একই গতিতে দক্ষতা, গবেষণা ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি করার কথা ছিল। এআই রেভল্যুশনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আমাদের তরুণেরা

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান ইতোমধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী টারশিয়ারি-এডুকেটেড বা বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষের আনএমপ্লয়মেন্ট রেট ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ - শিক্ষার স্তরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

একই সময়ে এআই এমন অনেক কাজ দ্রুত বদলে দিচ্ছে, যেগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা গত এক দশকে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে জায়গা তৈরি করেছিলেন। বেসিক গ্রাফিক ডিজাইন, সাধারণ ওয়েবসাইট ওয়ার্ক, এসইও কনটেন্ট, ট্রান্সলেশন, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট কিংবা রিপিটেটিভ ডিজিটাল টাস্ক - এসব ক্ষেত্রে এআই একজন দক্ষ কর্মীর প্রোডাক্টিভিটি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

এর অর্থ ফ্রিল্যান্সিং শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং লো-স্কিল ফ্রিল্যান্সিংয়ের অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। যে ফ্রিল্যান্সার এআই ব্যবহার করতে জানবে, অটোমেশন তৈরি করতে পারবে, অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার সলিউশন, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা এআই এজেন্ট নিয়ে কাজ করতে পারবে - তার মূল্য বাড়বে। কিন্তু একই স্কিল সেট নিয়ে দীর্ঘদিন স্থির থাকলে বাজার কঠিন হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, আবার প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ কাজ ডিসপ্লেসমেন্টের মুখে পড়তে পারে। একই রিপোর্ট বলছে, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে বদলে যেতে পারে।

তাই ভয় পাওয়ার সঠিক বাক্যটি “এআই সব চাকরি নিয়ে নেবে” নয়। আরও বাস্তব বাক্য হলো - এআই জানা মানুষ এআই না-জানা মানুষের কাজ নিয়ে নেবে; এআই-দক্ষ দেশ এআই-অদক্ষ দেশের বাজার নিয়ে নেবে।

গার্মেন্টস: অটোমেশন থামানো নয়, অটোমেশনের মালিক হওয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং অটোমেশন দ্রুত এগোচ্ছে। কাটিং, ইন্সপেকশন, সর্টিং, প্যাকেজিং ও ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্টে অটোমেশন এবং রোবোটিকসের ব্যবহার বাড়ছে। ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন ও সলিডারিডাডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পর্যবেক্ষিত প্রোডাকশন প্রসেসে অটোমেশনের সঙ্গে মোট ওয়ার্কফোর্স রিকোয়ারমেন্ট প্রায় ৩০.৫৮ শতাংশ কমার চিত্র পাওয়া গেছে; সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কম দক্ষতার কাজগুলোতে।

অটোমেশন বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। অন্য দেশ অটোমেশন ব্যবহার করে দ্রুত, কম খরচে ও কম ভুলে উৎপাদন করলে আমরা শুধু চিপ লেবার দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারব না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অটোমেশনের মালিক হওয়া - বাংলাদেশি তরুণরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এআই বানাবে, রোবট মেইনটেইন করবে, মেশিন ভিশন সিস্টেম তৈরি করবে, অটোমেটেড কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং স্মার্ট সাপ্লাই চেইন পরিচালনা করবে।

প্রবাসী শ্রমবাজারও চিরদিন একই থাকবে না

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ড্রাইভার, ক্লিনার, ওয়্যারহাউস ওয়ার্কার, ডেলিভারি ওয়ার্কার, কনস্ট্রাকশন সাপোর্ট এবং নানা ম্যানুয়াল প্রফেশনে কাজ করেন। এসব কাজ আগামীকালই শেষ হয়ে যাবে - এ কথা অবাস্তব। কিন্তু অটোনোমাস ভেহিকল, রোবোটিক ক্লিনিং, ওয়্যারহাউস অটোমেশন এবং সার্ভিস রোবোটিকস যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বা ২০ বছরের শ্রমবাজার আজকের মতো থাকবে - এ ধারণাও নিরাপদ নয়।

তাই আমাদের প্রবাসী কর্মীদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু বর্তমানের কাজ শেখালে চলবে না। ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি, অটোমেশন সুপারভিশন, রোবোটিকস মেইনটেন্যান্স, স্মার্ট লজিস্টিকস, হেলথকেয়ার টেকনোলজি এবং এআই-অ্যাসিস্টেড প্রফেশনের দিকে তাদের প্রস্তুত করতে হবে।

বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটেও এআই হতে পারে সমাধানের অংশ

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অথচ এআইকে আমরা খুব কমই এসব জাতীয় সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করি। এআই দিয়ে ইলেকট্রিসিটি ডিমান্ড ফোরকাস্ট, গ্রিড অ্যানোমালি ডিটেকশন, প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনার্জি অপটিমাইজেশন, রিনিউএবল এনার্জি ফোরকাস্টিং এবং জিওলজিক্যাল বা সিসমিক ডেটা অ্যানালাইসিস উন্নত করা সম্ভব।

অর্থাৎ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা পুরোনো দিনের ছবি বানাচ্ছি, একই প্রযুক্তি আমাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানেও ব্যবহার করা যায়। আমাদের প্রয়োজন বাংলাদেশের সমস্যার জন্য বাংলাদেশের এআই রিসার্চ - কৃষি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গার্মেন্টস, বাংলা ভাষা এবং সরকারি সেবায়।

এআইয়ের প্রতিটি ব্যবহারেরও একটি মূল্য আছে

এআই কোনো জাদু নয়। প্রতিটি বড় এআই রিকোয়েস্টের পেছনে ডেটা সেন্টার, জিপিইউ, ইলেকট্রিসিটি এবং কুলিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাজ করে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির এনার্জি অ্যান্ড এআই বিশ্লেষণ অনুযায়ী গ্লোবাল ডেটা-সেন্টার ইলেকট্রিসিটি কনজাম্পশন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণের বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে; এআই এই বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালকদের একটি।

এ তথ্যের মানে এআই দিয়ে আনন্দ করা নিষিদ্ধ - এটা নয়। প্রশ্ন হলো, এই অসাধারণ কম্পিউটেশনাল পাওয়ার থেকে আমরা কতটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভ্যালু তৈরি করছি। একটি এআই যদি কৃষকের ফসল বাঁচায়, ফ্যাক্টরির এনার্জি ওয়েস্ট কমায়, ছাত্রকে শেখায়, রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে কিংবা একজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক কাজ করতে সক্ষম করে - তাহলে একই প্রযুক্তি জাতীয় উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের মস্তিষ্ক

আমরা প্রায়ই বলি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু মাটির নিচে নয়; আমাদের মানুষের মস্তিষ্কও একটি ন্যাশনাল রিসোর্স। ধরা যাক, এক কোটি তরুণ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ের মাত্র এক ঘণ্টা কমিয়ে সেই সময় এআই, প্রোগ্রামিং, ইংলিশ, রোবোটিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এন্টারপ্রেনারশিপ কিংবা নিজের প্রফেশনের অ্যাডভান্সড স্কিল শেখে। এক বছরে সেটি দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৫ কোটি ঘণ্টা লার্নিং টাইম।

এই হিসাবটি কোনো অর্থনৈতিক মডেল নয়; এটি অপরচুনিটি কস্ট বোঝানোর একটি সরল উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সময় নিতে পারে, আবার এআই সেই সময়ের মূল্য বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগও দিতে পারে। সিদ্ধান্ত আমাদের।

এআই বন্ধ নয়, এআইয়ের ব্যবহার বদলাতে হবে

আমি এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকের ছবি বানানো বন্ধ করার কথা বলছি না। ফেসবুক বন্ধ করার কথাও বলছি না। একটি ছবি বানান, বন্ধুদের দেখান, আনন্দ করুন। তারপর নিজের কাছে আরেকটি প্রশ্ন করুন: এই এআই দিয়ে আমি আমার ভবিষ্যতের জন্য কী বানালাম?

একটি নতুন স্কিল? একটি সফটওয়্যার? একটি বিজনেস? একটি রিসার্চ প্রজেক্ট? একটি অটোমেশন? একটি ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস? একটি বাংলা এআই প্রোডাক্ট? নাকি শুধু আরেকটি ফেসবুক পোস্ট?

বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে এআই লিটারেসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রি-ওরিয়েন্টেড এআই রিসার্চ, ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিংয়ে হাই-ভ্যালু স্কিল, শিল্পে অটোমেশন রিস্কিলিং এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব এআই ইকোসিস্টেম - এই পাঁচটি দিককে এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে আনা দরকার।

এবার আমাদের ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করার সময়

বাংলাদেশ একসময় শ্রম রপ্তানি করেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পরে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল সার্ভিস এক্সপোর্ট করেছে। এআই রেভল্যুশন আমাদের সামনে আরেকটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করা।

বাংলাদেশের তরুণরা যদি এআই ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার, রোবোটিকস স্পেশালিস্ট, সাইবারসিকিউরিটি এক্সপার্ট, এআই এন্টারপ্রেনার এবং অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট হিসেবে তৈরি হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা শুধু প্রবাসী শ্রম কিংবা তৈরি পোশাক থেকে আসবে না; আমাদের মেধা, টেকনোলজি, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এবং এআই প্রোডাক্ট থেকেও আসবে।

বাংলাদেশের জন্য এআই যদি শুধু বিনোদনের খেলনা হয়ে থাকে, তবে আমরা হয়তো অনেক সুন্দর ছবি তৈরি করব, কিন্তু নতুন অর্থনীতি তৈরি করতে পারব না। আর পৃথিবী আমাদের জন্য থেমে থাকবে না।

আজ আমরা এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকে ফিরে যাচ্ছি। অন্যদিকে পৃথিবী এআই দিয়ে ২০৩৫, ২০৪০ কিংবা ২০৫০ সালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকের সামনে আজ প্রশ্নটি থাকা উচিত - আমরা কি এআই দিয়ে শুধু অতীতের ছবি বানাব, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বানাব?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনই।

[লেখক: এআই গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত