সংবাদ

বোয়িং কেনার রাজনীতি


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

বোয়িং কেনার রাজনীতি
বোয়িং আকাশে উড়বে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির ডানা মেলবে তো?

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াুবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নতুন এই চুক্তি আগের চেয়ে বড়। গর বলেন, ‘বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে’। এই ঘোষণার পরই আবার আলোচনায় এলো বিমানের উড়োজাহাজ কেনার রাজনীতি।

স্মর্তব্য যে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতায় বসেই বিএনপি সরকার আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সার্জিও গর বলেছেন, নতুন চুক্তি আগের চেয়ে বড়। কিন্তু কত বড় তা কেউ প্রকাশ করছে না। প্রশ্ন হলো, বোয়িং কেনার প্রধান উদ্দেশ্য কি শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো? নাকি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কূটনীতিও এর পেছনে আছে?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার চাপকে অনেকে হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখে। বর্তমান বিশ্বে দুর্বলচিত্তের শাসকদের মনে আমেরিকা একটি আতঙ্ক তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। ভেনিজুয়েলার সরকারপ্রধানকে ডনাল্ড ট্রাম্প সস্ত্রীক অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গেছেন। তৃতীয় বিশ্বের সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও নতুন নয়। তাই আমেরিকা তুষ্ট থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা সহজ হয়। অনেকে বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল আমেরিকা, তাই তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে একটি চুক্তি করেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষাও ছিল, কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় সম্ভবত আমেরিকা মাথা ঘামায়নি।

নতুন করে আবার বোয়িং কেনার চুক্তি হওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে দেখা করার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির পেছনে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও ঘুরছে। শেখ হাসিনা তার প্রত্যাবর্তনের কথা না বললে হয়তো আমেরিকার এই বাণিজ্যিক তৎপরতা এতটা সামনে আসত না। সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফরকে অনেকে সেভাবেই দেখেছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে, তিনি এসেছিলেন মূলত ব্যবসার স্বার্থেই।

আমেরিকা বিএনপি সরকারের কোন দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে না তো?

এদিকে সাতাশটি দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বোয়িং কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, শুধু আমেরিকার বোয়িং নয়, ইউরোপের এয়ারবাসকেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দিতে হবে। একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। অথচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইউনূস সরকার ‘স্বচ্ছতা নেই, দাম বেশি’ বলে সেটা বাতিল করে। এখন কিন্তু বিএনপি সরকার টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি বোয়িং কেনার পথেই হাঁটছে। একই অজুহাতে এয়ারবাস বাতিল করে বোয়িং কেনা—এটা কি দ্বিমুখী নীতি নয়?

শুধু বোয়িং নয়, চুক্তির শর্ত মোতাবেক কৃষিপণ্যসহ আরও বহু জিনিস বেশি দরে বিনা টেন্ডারে আমেরিকা থেকে কিনতে হতে পারে। তার চেয়ে বড় কথা, চুক্তির শর্তে যদি বাংলাদেশের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হয়, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থের জন্য বুমেরাং। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় বাজার। আমেরিকার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি কেনে তারা। তারা যদি পাল্টা চাপ দেয়, তবে বিএনপি সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। দেশে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির, জ্বালানির তীব্র ক্রাইসিস, বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, কর্মহীন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ, মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর মব আতঙ্ক, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত। সরকার চলছে ঋণ নিয়ে। শুধু আমেরিকাকে তুষ্ট করলে হবে বলে মনে হয় না, দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা ও উত্তেজনার উচ্ছেদ না হলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন জটিল হয়ে যাবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বড় অংশ যদি বিদেশি চাপে ব্যয় হয়, তবে অভ্যন্তরীণ সংকট সরকার সামাল দেবে কীভাবে? বোয়িং আকাশে উড়বে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির ডানা মেলবে তো?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বোয়িং কেনার রাজনীতি

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াুবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নতুন এই চুক্তি আগের চেয়ে বড়। গর বলেন, ‘বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে’। এই ঘোষণার পরই আবার আলোচনায় এলো বিমানের উড়োজাহাজ কেনার রাজনীতি।

স্মর্তব্য যে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতায় বসেই বিএনপি সরকার আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সার্জিও গর বলেছেন, নতুন চুক্তি আগের চেয়ে বড়। কিন্তু কত বড় তা কেউ প্রকাশ করছে না। প্রশ্ন হলো, বোয়িং কেনার প্রধান উদ্দেশ্য কি শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো? নাকি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কূটনীতিও এর পেছনে আছে?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার চাপকে অনেকে হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখে। বর্তমান বিশ্বে দুর্বলচিত্তের শাসকদের মনে আমেরিকা একটি আতঙ্ক তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। ভেনিজুয়েলার সরকারপ্রধানকে ডনাল্ড ট্রাম্প সস্ত্রীক অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গেছেন। তৃতীয় বিশ্বের সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও নতুন নয়। তাই আমেরিকা তুষ্ট থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা সহজ হয়। অনেকে বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল আমেরিকা, তাই তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে একটি চুক্তি করেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষাও ছিল, কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় সম্ভবত আমেরিকা মাথা ঘামায়নি।

নতুন করে আবার বোয়িং কেনার চুক্তি হওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে দেখা করার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির পেছনে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও ঘুরছে। শেখ হাসিনা তার প্রত্যাবর্তনের কথা না বললে হয়তো আমেরিকার এই বাণিজ্যিক তৎপরতা এতটা সামনে আসত না। সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফরকে অনেকে সেভাবেই দেখেছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে, তিনি এসেছিলেন মূলত ব্যবসার স্বার্থেই।

আমেরিকা বিএনপি সরকারের কোন দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে না তো?

এদিকে সাতাশটি দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বোয়িং কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, শুধু আমেরিকার বোয়িং নয়, ইউরোপের এয়ারবাসকেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দিতে হবে। একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। অথচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইউনূস সরকার ‘স্বচ্ছতা নেই, দাম বেশি’ বলে সেটা বাতিল করে। এখন কিন্তু বিএনপি সরকার টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি বোয়িং কেনার পথেই হাঁটছে। একই অজুহাতে এয়ারবাস বাতিল করে বোয়িং কেনা—এটা কি দ্বিমুখী নীতি নয়?

শুধু বোয়িং নয়, চুক্তির শর্ত মোতাবেক কৃষিপণ্যসহ আরও বহু জিনিস বেশি দরে বিনা টেন্ডারে আমেরিকা থেকে কিনতে হতে পারে। তার চেয়ে বড় কথা, চুক্তির শর্তে যদি বাংলাদেশের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হয়, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থের জন্য বুমেরাং। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় বাজার। আমেরিকার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি কেনে তারা। তারা যদি পাল্টা চাপ দেয়, তবে বিএনপি সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। দেশে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির, জ্বালানির তীব্র ক্রাইসিস, বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, কর্মহীন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ, মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর মব আতঙ্ক, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত। সরকার চলছে ঋণ নিয়ে। শুধু আমেরিকাকে তুষ্ট করলে হবে বলে মনে হয় না, দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা ও উত্তেজনার উচ্ছেদ না হলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন জটিল হয়ে যাবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বড় অংশ যদি বিদেশি চাপে ব্যয় হয়, তবে অভ্যন্তরীণ সংকট সরকার সামাল দেবে কীভাবে? বোয়িং আকাশে উড়বে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির ডানা মেলবে তো?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত