সংবাদ

প্রসঙ্গ: যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা


সিরাজ প্রামাণিক
সিরাজ প্রামাণিক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ পিএম

প্রসঙ্গ: যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা

সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?

ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় প্রেরণ করেন। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের জন্য নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে দেখা গেল—

সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে তারা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি—যারা এসেছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়। চিকিৎসা সনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন। তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই। এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।

এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?

১. ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি স্তরে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।

২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণই অনুসরণযোগ্য (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।

৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে পরীক্ষিত করা হয় না, তখন আদালত এ ধরনের সাক্ষ্যকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে অবশ্যই সমর্থনযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাসও প্রদান করা (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।

আইন আরও বলে—একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা নিজেই স্বার্থযুক্ত সাক্ষী; স্বতন্ত্র ও নিষ্কলঙ্ক প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তার ওপর নির্ভর করা যায় না (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।

৪. যদি সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে বস্তুগত অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি থাকে, তাহলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন এবং খালাস পান (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।

৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সন্দেহের চোখে দেখে। ধরে নেওয়া হয়, এই বিলম্বের সময়টি মামলার কাহিনি সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।

৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য—যেমন তালাকের ঘটনা—সম্পূর্ণরূপে অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও, যদি তা যুক্তিসংগতভাবে সত্য হতে পারে বলে মনে হয়, তাহলে গোটা রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ওপর তার প্রভাব পড়ে এবং আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।

৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহ নয়, বরং যুক্তিসংগত সন্দেহের ভিত্তিতেই আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী (৭ বিএলডি ২৬৫, আপিল বিভাগ)।

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


প্রসঙ্গ: যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?

ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় প্রেরণ করেন। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের জন্য নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে দেখা গেল—

সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে তারা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি—যারা এসেছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়। চিকিৎসা সনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন। তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই। এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।

এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?

১. ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি স্তরে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।

২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণই অনুসরণযোগ্য (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।

৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে পরীক্ষিত করা হয় না, তখন আদালত এ ধরনের সাক্ষ্যকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে অবশ্যই সমর্থনযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাসও প্রদান করা (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।

আইন আরও বলে—একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা নিজেই স্বার্থযুক্ত সাক্ষী; স্বতন্ত্র ও নিষ্কলঙ্ক প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তার ওপর নির্ভর করা যায় না (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।

৪. যদি সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে বস্তুগত অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি থাকে, তাহলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন এবং খালাস পান (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।

৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সন্দেহের চোখে দেখে। ধরে নেওয়া হয়, এই বিলম্বের সময়টি মামলার কাহিনি সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।

৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য—যেমন তালাকের ঘটনা—সম্পূর্ণরূপে অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও, যদি তা যুক্তিসংগতভাবে সত্য হতে পারে বলে মনে হয়, তাহলে গোটা রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ওপর তার প্রভাব পড়ে এবং আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।

৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহ নয়, বরং যুক্তিসংগত সন্দেহের ভিত্তিতেই আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী (৭ বিএলডি ২৬৫, আপিল বিভাগ)।

[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত