সংবাদ

মতামত

এবার কি নদী দখলকে বৈধতা দেওয়ার পালা

একটি নদী কীভাবে মরে যায়? শুধু তার পানিতে বিষ মিশলে, পয়োবর্জ্য পড়লে কিংবা শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে জলজ প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হলেই কি একটি নদীর মৃত্যু ঘটে? নাকি নদীর মৃত্যুর শুরু আরও আগে-যখন তার প্রবাহের জায়গা দখল হয়, তীরের উন্মুক্ত জমিতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠে, জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যায়, আর এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের সামনেই ধীরে ধীরে বদলে যায় প্রকৃতির মানচিত্র? বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দখল, দূষণ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। নদীর তীরবর্তী এলাকায় দখল কীভাবে বিস্তৃত হয়, জলাশয় কীভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক জলপথ কীভাবে জমির কাগজপত্রের বিতর্কে আটকে পড়ে-এসবের কিছু চিত্র সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে।২০২২ সালের ২২ অক্টোবর মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত আমার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’-তে কেরানীগঞ্জ, বছিলা, তারানগর, শ্যামলাপুর ও আশপাশের এলাকার এমনই কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সঙ্গে সংযুক্ত একটি জলপথকে ব্যক্তিমালিকানার জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। একই অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল টোটাইল বিলের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত থাকার পরও বিলটির একাংশে মাটি ফেলার কর্মকাণ্ড চলছিল।চার বছর পর সেই অভিজ্ঞতা আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। টোটাইল বিলের যে জলাধারকে একসময় সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত থাকতে দেখেছিলাম, সেটি এখন পুরোপুরি ভরাট। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, গেল ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন রাজধানীর বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ এবং ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।দুটি ঘটনা একই ধরনের নয়। একটি জলাশয় ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলার বাস্তবতা, অন্যটি ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের বিষয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি অভিন্ন: ঢাকার নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কী?নদীর শাখা যখন ব্যক্তিগত জমি২০২২ সালের অনুসন্ধানে শ্যামলাপুর মৌজায় গিয়ে এমন একটি জলপথের সন্ধান পাই, যেটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা খাল হিসেবে চিনতেন। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংযুক্ত এই জলপথ একসময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল। অথচ জায়গাটি জমি হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।২০২২ সালের আগের টোটাইল বিলের দৃশ্যমিরপুর থেকে আসা এক সম্ভাব্য ক্রেতা জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে যে জমি দেখানো হয়েছে, সেটি সরকারি খালের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও জায়গাটিকে খাল হিসেবে চিনতেন। কিন্তু ভূমি রেকর্ডে সেটি ‘জলা’ হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং ব্যক্তির নামে রেকর্ড ও খাজনা-খারিজের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের হাতে থাকা সিএস ও আরএস মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের অসংগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেছিলাম।একজন ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তির নামে থাকলেও মানচিত্রে সেটি খাল হিসেবে চিহ্নিত। আরেকজন সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, কাগজপত্র ঠিক মনে হলে রেকর্ড দেওয়া হয়; জমিটি নদী, খাল, বিল না অন্য কিছু, তা যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপের মানচিত্রের মধ্যে অসংগতি জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছিল। জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত পরিচয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, জরিপ, রেকর্ড এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অনুসন্ধানটি যে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একটি প্রাকৃতিক জলপথের পরিচয় ও ভূমি রেকর্ডের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সেটি যাচাই ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব কার? জমির কাগজে ব্যক্তির নাম উঠে গেলেই কোনো জলপথের প্রাকৃতিক পরিচয় মুছে যায় না। আবার কোনো জলপথের অস্তিত্ব রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে গেলে তার পরিবেশগত গুরুত্বও বিলীন হয়ে যায় না। এমন পরিস্থিতিতে শুধু জমি কেনাবেচার কাগজপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট নয়। জায়গাটি জলপ্রবাহের অংশ কি না, নদীর সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে কি না এবং প্রযোজ্য আইনে সেটি কীভাবে সংরক্ষিত-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।কারণ, জলপথের পরিচয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর যথাযথ যাচাই না হলে একদিকে যেমন প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ কঠিন হয়, অন্যদিকে তেমনি জলপ্রবাহের জায়গা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন বিরোধটি আর শুধু জমির কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর।ড্যাপে জলাশয়, বাস্তবে নির্মাণএকই অনুসন্ধানে আমরা গিয়েছিলাম শ্যামলাপুর এলাকার টোটাইল বিলে। প্রায় ৩০ বিঘা আয়তনের এই জলাধারটি তখন দখল ও ভরাটের চাপে ছিল। একদিকে স্থানীয়ভাবে জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তির ভরাট কার্যক্রম, অন্যদিকে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মাটি ফেলার তৎপরতা দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। অথচ তৎকালীন ড্যাপে বিলটিকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিলটি ভরাট করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জলাশয় রক্ষা ও ভরাট বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।কিন্তু অনুসন্ধানের সময় মাঠে যে বাস্তবতা দেখেছিলাম, তা ছিল উদ্বেগজনক। সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি জলাধারের অস্তিত্বই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিলের একটি অংশ ভরাটের কথা বলেছিলেন। জায়গাটির সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্কের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছিল। এসব বক্তব্যের আইনগত তাৎপর্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন হলেও, জলাশয়ের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ যে বাস্তব ছিল, তা আমাদের সরেজমিন অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছিল।এরপর সময় গড়িয়েছে, সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের বর্তমান বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে দেখা এবং আমার কাছে থাকা ছবিতে যে পরিস্থিতি ধরা পড়েছে, তাতে বিলটির পুরো এলাকাই ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে এখন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। যে জায়গায় একসময় জলাধার ছিল, যে জলাশয়কে পরিকল্পনায় সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে এখন নির্মাণের দৃশ্য।এটি শুধু একটি বিল হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা, প্রশাসনিক আশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি। ২০২২ সালে যখন ভরাটের তৎপরতা দেখেছিলাম, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ছিল। আজ সেই বিলের জায়গায় নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, সেই আশ্বাসের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? ভরাট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? নেওয়া হয়ে থাকলে তা সত্ত্বেও বিলটি কীভাবে পুরোপুরি ভরাট হলো?২০২২ সালে টোটাইল বিলপাড়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের আনাগোনানির্মাণকাজের অনুমোদন রয়েছে কি না, কোন নথি বা মালিকানার ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাই ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কিন্তু বিলটির ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্মাণকাজ চলার যে বাস্তবতা এখন দেখা যাচ্ছে, তা গুরুতর উদ্বেগের কারণ।কোনো জলাশয় পরিকল্পনায় সংরক্ষিত থাকার পরও যদি তা ভরাট হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু দখলকারীর সম্ভাব্য দায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নজরদারি, অনুমোদন এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই সংরক্ষণ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।সরকারের পরিবর্তন হয়, জলাশয়ের ভাগ্য বদলায় কি?নদী ও জলাভূমি রক্ষার প্রশ্নটি কোনো একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে যখন অনুসন্ধানটি করি, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের পরিণতি দেখায়, শুধু সরকারের পরিবর্তন ঘটলেই জলাশয় রক্ষার বাস্তবতা বদলে যায় না।কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সময় ঠিক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কার দায়িত্বে ঘাটতি ছিল-এসব নির্ধারণের জন্য নথি ও ঘটনাক্রম যাচাই জরুরি। তবে জলাশয়টি যখন ভরাট হয়ে নির্মাণকাজের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখন প্রয়োজন, বিলটি কীভাবে ধাপে ধাপে ভরাট হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছিল, কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সেগুলো কেন কার্যকর হয়নি-এসবের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান। জলাশয় রক্ষার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক সরকারের সাময়িক অঙ্গীকারের বিষয় হতে পারে না। এটি আইন, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দায়িত্ব। দখল প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও একমাত্রিক নয়। কোথাও ভূমি রেকর্ডের অসংগতি থাকতে পারে, কোথাও নজরদারির ঘাটতি, কোথাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্থানীয় প্রভাব বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা-ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো জলাশয়ের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে থাকলে প্রশাসনের কাছে জবাব চাওয়াই স্বাভাবিক। কোন কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কেন সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি এবং অবশিষ্ট জলাশয় রক্ষায় এখন কী করা সম্ভব-এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত।একটি জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পর দায় নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি দখল চলাকালীন তা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। আর যদি জলাশয় ভরাটের পর সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে শুধু নির্মাণকাজের বর্তমান বৈধতা যাচাই করাই যথেষ্ট নয়, কীভাবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাল, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত। নইলে প্রতিবারই নতুন সরকার নতুন প্রতিশ্রুতি দেবে, নতুন পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকবে, অথচ প্রকৃতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া জায়গাগুলো আর ফিরে আসবে না।এখন আবার ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বদলানোর প্রশ্নবণিক বার্তার ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্যাপের সংশোধনীতে রাজধানীর আইলবহর মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগে আগে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত জমিকে ভারী শিল্প এলাকার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা না থাকার বিধান যুক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে বন্যার পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টি তাই শুধু ভূমির শ্রেণিবিন্যাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি মৌলিক নীতি এখানে মনে রাখা প্রয়োজন। আর সেটা হল কোনো জমি খালি পড়ে আছে বলেই সেটি অনাবশ্যক নয়। বিশেষ করে নদীতীর, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকায় উন্মুক্ত জমি পানি ধারণ, পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এসব জমির কার্যকারিতা সব জায়গায় এক রকম নয়, তাই ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন বিবেচনার আগে স্থানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দরকার।শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে জানতে হবে, সেখানে শিল্প গড়ে উঠলে কী ধরনের পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হতে পারে, বন্যাপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থান ভারী শিল্পের জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। নদীটি দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের চাপ বহন করছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে পরিবেশগত বিধিবিধান, নদীর বর্তমান অবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ড্যাপের আরও একটি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, যেখানে ঝিলমিল ও পূর্বাচলে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন নেওয়ার শর্তে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ধরনের সুবিধার নগর পরিকল্পনাগত যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাবও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আবাসন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে নগরের ঘনত্ব, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সম্পর্ক রয়েছে।বদলে যেতে শুরু করে টোটাইল বিলের চিত্র।ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করলেই পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রস্তাবিত ব্যবহার প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।পরিকল্পনা সংশোধনের আগে জবাবদিহি চাইড্যাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সময়ের প্রয়োজনে সংশোধিত হতে পারে। নগরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিকল্পনার পর্যালোচনাও প্রয়োজন। কিন্তু সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নগরের বাস্তব সমস্যা সমাধান করা-প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করে জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া নয়।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেছেন, ড্যাপের বিধি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটির সুপারিশসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রস্তাবের উৎস, কারিগরি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। যদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও স্পষ্টভাবে জানা না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে প্রক্রিয়াগত অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার স্বার্থেই এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।একই সঙ্গে বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের আগে পানি প্রবাহ, পানি ধারণক্ষমতা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করা দরকার। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।টোটাইল বিলের অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে একসময় জলাশয় সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল, ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও ছিল। কিন্তু এখন বিলটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা থাকলেই প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকে না। সংরক্ষণের বিধান কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, নজরদারি ও জবাবদিহিও থাকতে হয়।অতীতের দখল ও ভরাটের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নতুন ভূমি ব্যবহারনীতি গ্রহণ করা হলে একই ধরনের ঝুঁকি আরও বড় পরিসরে তৈরি হতে পারে। যে শহর ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা, দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির চাপ বহন করছে, সেখানে অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থান ও জলপ্রবাহের পথের গুরুত্ব আরও বেশি করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ঢাকা বাঁচবে কীভাবে?নদী ও জলাশয় রক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন অবশিষ্ট জলাধারগুলোর সীমানা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। সরকারি মানচিত্র, ভূমি রেকর্ড, ড্যাপের শ্রেণিবিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখতে হবে-কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় ভরাট চলছে এবং কোথায় রেকর্ডের অসংগতি রয়েছে। এসব তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা গেলে দখল শনাক্ত করা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব নির্ধারণ সহজ হবে।দ্বিতীয়ত, দখল ও ভরাটের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অবৈধ দখল হয়ে যাওয়ার পর উচ্ছেদ অভিযান চালানোর চেয়ে দখল শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। এ জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি।তৃতীয়ত, ড্যাপের সর্বশেষ সংশোধনীগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে সেগুলোর কারিগরি ভিত্তি ও পরিবেশগত প্রভাব ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ কিংবা বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের সুযোগ দেওয়ার মতো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যুক্তি, সম্ভাব্য লাভ ও পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।চতুর্থত, টোটাইল বিলের মতো জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলোর পৃথক তদন্ত প্রয়োজন। বিলের সীমানা ও পূর্ববর্তী শ্রেণিবিন্যাস, জমির রেকর্ড, ভরাটের সময়কাল, নির্মাণকাজের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব, জলাশয়ের অবশিষ্টাংশ ও পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ২০২২ সালে ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’ প্রতিবেদন তৈরির সময় টোটাইল বিলের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আজও তার উত্তর খুঁজছি। একটি খালকে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা কীভাবে সম্ভব হয়? সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি বিলের ওপর ভরাটের চাপ তৈরি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ কেন নিশ্চিত করা যায় না? আর দীর্ঘদিনের দখল ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিজ্ঞতার পরও ভূমি ব্যবহারের নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্ব পায়?টোটাইল বিলের বর্তমান চিত্র এই প্রশ্নগুলোকে আরও জরুরি করে তুলেছে। যে জলাশয় একসময় ছিল, সেটি এখন ভরাট, সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিবর্তনের ছবি কেবল একটি জায়গার অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য দেখায় না, এটি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানও সামনে আনে। এখন প্রয়োজন, সেই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে যেন অন্য জলাশয়ের পরিণতিও একই না হয়, তা নিশ্চিত করা।এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নদী রক্ষার ঘোষণা কিংবা নতুন পরিকল্পনা-কোনোটিই যথেষ্ট নয়।২০২৬ সালে এসে টোটাইল বিলের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন।রূপ নিচ্ছে আবাসিক এলাকায়।বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: নদী হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হলেও তার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। জলাশয় হারালে শুধু জমির চেহারা বদলায় না, বদলে যায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল এবং মানুষের বসবাসের পরিবেশ। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় নগরবাসীকেই-জলাবদ্ধতা, দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার অবনতির মধ্য দিয়ে।উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। শিল্প, আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নের সিদ্ধান্তে জমির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ব্যবহারই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার পরিবেশগত মূল্যও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক জলাধার একবার হারিয়ে গেলে কেবল অর্থ ব্যয় করে তার আগের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। যে জলাশয় দখল ও ভরাট থেকে রক্ষা করা যায়নি, তার পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিয়ে নতুন করে নদীতীর ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অতীতের ব্যর্থতা আরও বড় পরিসরে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই রাষ্ট্রকে জবাব দিতে হবে-আগের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে, আর সেই শিক্ষা বাস্তব সিদ্ধান্তে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?ঢাকাকে বাঁচাতে হলে নদী ও জলাভূমিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে নয়, নগরকে টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনার সার্থকতা জমির শ্রেণি বদলানোর ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য প্রকৃতির প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে পারার মধ্যে। নইলে একদিন হয়তো মানচিত্রে খাল-বিলের নাম থাকবে, পুরোনো নথিতে নদীর শাখার অস্তিত্বও পাওয়া যাবে-কিন্তু বাস্তবে সেগুলো খুঁজে পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন প্রশ্নটি আর শুধু নদী বাঁচবে কি না, তা থাকবে না- প্রশ্ন হবে, নদী ছাড়া এই শহর আদৌ কত দিন বাসযোগ্য থাকবে?লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টিভি

এবার কি নদী দখলকে বৈধতা দেওয়ার পালা