সংবাদ

লালনের সেই সোনার মানুষ কই


নাসির উদ্দিন পাঠান
নাসির উদ্দিন পাঠান
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

লালনের সেই সোনার মানুষ কই

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মরমি সাধক ফকির লালন শাহের এই বাণী কেবল গানের পঙ্‌ক্তি নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা।

অথচ লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী মেলায় গিয়ে প্রশ্ন জেগেছে—লালনের গান ও উৎসব আছে, কিন্তু তার দর্শনের প্রতিফলন কোথায়?

এই প্রশ্নের সঙ্গে সোমবারের (১৯ অক্টোবর) উদ্বেগজনক ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সকালে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের পাশ থেকে একটি টাইম বোমা ও পেট্রলভর্তি দুটি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় মাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়।

যে আখড়াবাড়িতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বাণী শোনার কথা, সেখানে এমন বিপজ্জনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

গানের চেয়েও বড় জীবনদর্শন

ফকির লালন শাহ, যিনি লালন সাঁই নামেও পরিচিত, ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, বাউলগানের রচয়িতা ও মানবতাবাদী দার্শনিক। তার জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, তার জন্ম ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তিনি তিরোধান করেন।

লালনের গুরুত্ব শুধু তার গানের সুরে নয়, গানের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের পরিচয়, জাতপাতের বিভাজন এবং সামাজিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করেছেন।

তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, আত্মোপলব্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্তরের শুদ্ধতা। বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করা, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করা কিংবা নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব প্রবণতার বিপরীতে লালনের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং তার গান বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু লালনকে যথার্থভাবে বোঝার জন্য তার গান শোনাই যথেষ্ট নয়; গানের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করাও জরুরি।

দর্শনের চর্চা কোথায়

লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় বাউল, সাধক, ভক্ত, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলায় মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো দোষ নেই।

সাধুসঙ্গ

কিন্তু উৎসবের আকার বড় হলেই কি লালনের দর্শনের চর্চা বাড়ে? মেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, লালনের মানবতাবাদ, জাতপাতবিরোধী অবস্থান ও আত্মোপলব্ধির দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তার তুলনায় গান, দর্শনার্থীদের ভিড় ও বাণিজ্যিক তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান।

লালনের নামে মঞ্চ তৈরি করা সহজ; তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা কঠিন। তার গান গাওয়া সহজ; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করা কঠিন।

আখড়াবাড়ি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে গান ও উৎসবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ, দর্শনভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কত মানুষ এলেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ লালনের দর্শন বুঝলেন এবং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটালেন—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

লালনের মেলায় বাণিজ্য, মানুষের প্রতি দায় কতটুকু? তিরোধান দিবসের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন, খাবার, আবাসন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ব্যবসা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবের সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো কিংবা আবাসিক হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করতে করেছে।

মেলায় গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় এসব বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা কতটা মানবিক? লালনের দর্শন যদি আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেই প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শুধু তাঁর নামে উৎসব করলেই কি সেই দর্শনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হয়?

স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবে

লালনকে নিয়ে গবেষণা মানে শুধু তার জীবনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা গানের সুর বিশ্লেষণ নয়। তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে লালনের চিন্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।

লালন কেবল গানের মানুষ নন; তিনি প্রশ্ন করার মানুষ। তিনি প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তার দর্শনকে মঞ্চ, মাইক, একতারা কিংবা উৎসবের ব্যানারে আটকে রাখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হয় না।

লালনের গান গাইব, অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করব; তার মানবতার বাণী প্রচার করব, অথচ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাব না—এ কেমন লালনচর্চা?

সেই সোনার মানুষ কই?

ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা লালনকে কতটা ধারণ করি? গান হোক, উৎসব হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। লালনের দর্শন ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।

আখড়াবাড়িতে লেখক (বাম দিকে)।

১৯ অক্টোবরের ঘটনাটি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক, অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং মাজারে আগত সাধু-ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে এই দিনটি আমাদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যাক: লালনের স্মৃতিকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি? তার মানবতাবাদী আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা জীবন্ত?

উৎসবের আলো একসময় নিভে যাবে, মেলার দোকানপাট উঠে যাবে, দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু লালনের দর্শন কি তাদের সঙ্গে ফিরবে? তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে?

লালনের সেই ‘সোনার মানুষ’ কোনো বিশেষ পোশাকের মানুষ নন, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ নন। তিনি সেই মানুষ, যাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিকতা, বিবেক, ভালোবাসা ও অন্যের প্রতি সম্মান। তাই এত মানুষের ভিড়ে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—লালন মেলায় সেই সোনার মানুষ কই?

লালনের নামে উৎসব হোক, গান হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক। কিন্তু তার দর্শন বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে, আচরণে ও সমাজে। কারণ লালনকে স্মরণ করার চেয়ে তাকে ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


লালনের সেই সোনার মানুষ কই

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মরমি সাধক ফকির লালন শাহের এই বাণী কেবল গানের পঙ্‌ক্তি নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা।

অথচ লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী মেলায় গিয়ে প্রশ্ন জেগেছে—লালনের গান ও উৎসব আছে, কিন্তু তার দর্শনের প্রতিফলন কোথায়?

এই প্রশ্নের সঙ্গে সোমবারের (১৯ অক্টোবর) উদ্বেগজনক ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সকালে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের পাশ থেকে একটি টাইম বোমা ও পেট্রলভর্তি দুটি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় মাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়।

যে আখড়াবাড়িতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বাণী শোনার কথা, সেখানে এমন বিপজ্জনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

গানের চেয়েও বড় জীবনদর্শন

ফকির লালন শাহ, যিনি লালন সাঁই নামেও পরিচিত, ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, বাউলগানের রচয়িতা ও মানবতাবাদী দার্শনিক। তার জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, তার জন্ম ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তিনি তিরোধান করেন।

লালনের গুরুত্ব শুধু তার গানের সুরে নয়, গানের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের পরিচয়, জাতপাতের বিভাজন এবং সামাজিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করেছেন।

তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, আত্মোপলব্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্তরের শুদ্ধতা। বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করা, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করা কিংবা নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব প্রবণতার বিপরীতে লালনের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং তার গান বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু লালনকে যথার্থভাবে বোঝার জন্য তার গান শোনাই যথেষ্ট নয়; গানের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করাও জরুরি।

দর্শনের চর্চা কোথায়

লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় বাউল, সাধক, ভক্ত, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলায় মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো দোষ নেই।

সাধুসঙ্গ

কিন্তু উৎসবের আকার বড় হলেই কি লালনের দর্শনের চর্চা বাড়ে? মেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, লালনের মানবতাবাদ, জাতপাতবিরোধী অবস্থান ও আত্মোপলব্ধির দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তার তুলনায় গান, দর্শনার্থীদের ভিড় ও বাণিজ্যিক তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান।

লালনের নামে মঞ্চ তৈরি করা সহজ; তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা কঠিন। তার গান গাওয়া সহজ; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করা কঠিন।

আখড়াবাড়ি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে গান ও উৎসবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ, দর্শনভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কত মানুষ এলেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ লালনের দর্শন বুঝলেন এবং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটালেন—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

লালনের মেলায় বাণিজ্য, মানুষের প্রতি দায় কতটুকু? তিরোধান দিবসের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন, খাবার, আবাসন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ব্যবসা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবের সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো কিংবা আবাসিক হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করতে করেছে।

মেলায় গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় এসব বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা কতটা মানবিক? লালনের দর্শন যদি আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেই প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শুধু তাঁর নামে উৎসব করলেই কি সেই দর্শনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হয়?

স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবে

লালনকে নিয়ে গবেষণা মানে শুধু তার জীবনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা গানের সুর বিশ্লেষণ নয়। তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে লালনের চিন্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।

লালন কেবল গানের মানুষ নন; তিনি প্রশ্ন করার মানুষ। তিনি প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তার দর্শনকে মঞ্চ, মাইক, একতারা কিংবা উৎসবের ব্যানারে আটকে রাখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হয় না।

লালনের গান গাইব, অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করব; তার মানবতার বাণী প্রচার করব, অথচ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাব না—এ কেমন লালনচর্চা?

সেই সোনার মানুষ কই?

ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা লালনকে কতটা ধারণ করি? গান হোক, উৎসব হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। লালনের দর্শন ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।

আখড়াবাড়িতে লেখক (বাম দিকে)।

১৯ অক্টোবরের ঘটনাটি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক, অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং মাজারে আগত সাধু-ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে এই দিনটি আমাদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যাক: লালনের স্মৃতিকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি? তার মানবতাবাদী আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা জীবন্ত?

উৎসবের আলো একসময় নিভে যাবে, মেলার দোকানপাট উঠে যাবে, দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু লালনের দর্শন কি তাদের সঙ্গে ফিরবে? তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে?

লালনের সেই ‘সোনার মানুষ’ কোনো বিশেষ পোশাকের মানুষ নন, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ নন। তিনি সেই মানুষ, যাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিকতা, বিবেক, ভালোবাসা ও অন্যের প্রতি সম্মান। তাই এত মানুষের ভিড়ে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—লালন মেলায় সেই সোনার মানুষ কই?

লালনের নামে উৎসব হোক, গান হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক। কিন্তু তার দর্শন বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে, আচরণে ও সমাজে। কারণ লালনকে স্মরণ করার চেয়ে তাকে ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত