সংবাদ

কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা


অরূপরতন চৌধুরী
অরূপরতন চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম

কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা
দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।

হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব আরাধনার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।

বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ—প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্য। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে যেন নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।

দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বাড়িয়ে তোলে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বেদনাও অনুভূত হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকে।

দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সমকালীন বিভিন্ন বিষয় শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও বড় ক্ষেত্র।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই বন্ধন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সী একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীরূপে সম্মান জানিয়ে পূজা করা হয়। ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য নিবেদন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।

কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গেও এই আচার গভীরভাবে যুক্ত। অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় যেমন দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা, তেমনি নারীশক্তির মর্যাদা স্বীকার করাও এর তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

কুমারী পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়। এরপর ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। এই আচার স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দেওয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী কেবল মমতা ও স্নেহের প্রতীক নন; তিনি শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনারও প্রতীক। তাই কুমারী পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার বৃহত্তর বার্তাও বহন করে।

তবে কুমারী পূজার প্রতীকী তাৎপর্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনেও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা যায়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পূজার মঞ্চে কন্যাশিশুকে দেবীরূপে সম্মান জানানো আর দৈনন্দিন জীবনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও অবহেলা দূর করার মধ্য দিয়েই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।

দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি ও বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।

দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েক দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আবার এসো মা।’ এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে শেখায়। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রাণের উৎসব, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান।

মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, আর তাঁর বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো। অশুভ ও বিভেদ দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রেরণা জোগাক এই উৎসব। দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনেও। বিজয়ার বিদায়বেলায় আমাদের প্রত্যাশা হোক—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন সবার। এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। আর কুমারী পূজা নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার। এই পূজার শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনেও ধারণ করতে হবে—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অশুভকে পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল চেতনা সার্থক হতে পারে। এই চেতনাই বাঙালির দুর্গাপূজাকে যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে রাখবে।

[লেখক: ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।

হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব আরাধনার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।

বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ—প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্য। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে যেন নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।

দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বাড়িয়ে তোলে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বেদনাও অনুভূত হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকে।

দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সমকালীন বিভিন্ন বিষয় শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও বড় ক্ষেত্র।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই বন্ধন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সী একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীরূপে সম্মান জানিয়ে পূজা করা হয়। ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য নিবেদন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।

কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গেও এই আচার গভীরভাবে যুক্ত। অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় যেমন দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা, তেমনি নারীশক্তির মর্যাদা স্বীকার করাও এর তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

কুমারী পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়। এরপর ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। এই আচার স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দেওয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী কেবল মমতা ও স্নেহের প্রতীক নন; তিনি শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনারও প্রতীক। তাই কুমারী পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার বৃহত্তর বার্তাও বহন করে।

তবে কুমারী পূজার প্রতীকী তাৎপর্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনেও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা যায়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পূজার মঞ্চে কন্যাশিশুকে দেবীরূপে সম্মান জানানো আর দৈনন্দিন জীবনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও অবহেলা দূর করার মধ্য দিয়েই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।

দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি ও বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।

দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েক দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আবার এসো মা।’ এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে শেখায়। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রাণের উৎসব, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান।

মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, আর তাঁর বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো। অশুভ ও বিভেদ দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রেরণা জোগাক এই উৎসব। দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনেও। বিজয়ার বিদায়বেলায় আমাদের প্রত্যাশা হোক—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন সবার। এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। আর কুমারী পূজা নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার। এই পূজার শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনেও ধারণ করতে হবে—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অশুভকে পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল চেতনা সার্থক হতে পারে। এই চেতনাই বাঙালির দুর্গাপূজাকে যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে রাখবে।

[লেখক: ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত