ইশারা ভাষায় সমান অধিকার নিশ্চিত হোক
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। ইশারা ভাষার ব্যবহার ও স্বীকৃতি বাড়ানো, শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের মানবাধিকার ঘোষণা’। একই সঙ্গে ২১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ। এ বছর বিশ্ব বধির ফেডারেশনের ৭৫ বছর এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ২০ বছর পূর্তিও হচ্ছে।শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মৌলিক অধিকার অন্য সবার মতোই। তাদের অধিকার কারও দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনে তাঁদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। ইশারা ভাষা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মপ্রকাশের ভাষা।ইশারা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রোমে বিশ্বের ২৫টি শ্রবণপ্রতিবন্ধী সংগঠনের সমন্বয়ে বিশ্ব বধির ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সংগঠনটি ইশারা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের কাছে ২৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করে। ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য এরও আগে ১৯৫৮ সালে বিশ্ব বধির ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রথম আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ পালিত হয়েছিল।ইশারা ভাষা কোনো বিকল্প বা অসম্পূর্ণ ভাষা নয়। এর নিজস্ব ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার রয়েছে। উচ্চারিত ভাষার সঙ্গে এর গঠনগত পার্থক্য থাকলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা। মুখের অভিব্যক্তি ও দেহভঙ্গিও এ ভাষায় অর্থ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ইশারা ভাষা প্রচলিত। আবার ভিন্ন ভাষার ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষাও ব্যবহৃত হয়। ইশারা ভাষার বিকাশ শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করেনি, ভাষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রযুক্তির বিকাশেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণশক্তি হ্রাসের সমস্যায় ভুগতে পারে। তাদের মধ্যে ৭০ কোটির বেশি মানুষের শ্রবণ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য শ্রবণশক্তি পরীক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শ্রবণসহায়ক যন্ত্র এবং ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য হলেও যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তা শিক্ষা ও কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণপ্রতিবন্ধকতার শিকার। জন্মগত কারণ ছাড়াও বয়স, কানের বিভিন্ন রোগ, কানে ময়লা জমা, অতিরিক্ত শব্দ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শ্রবণশক্তি কমতে পারে। নগর জীবনের অতিরিক্ত শব্দও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। কিন্তু দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বধিরতার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারও অনেকের জন্য ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়।বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৮৯৩ সালে কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ে বাংলা ইশারা ভাষার চর্চার সূচনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর ব্যবহার ও বিকাশ নতুনভাবে এগোয়। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা বাংলা ইশারা ভাষার একটি অভিধান প্রকাশ করে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগেও ইশারা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। এসব উদ্যোগ শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও শ্রবণক্ষম মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।তবে বাস্তব চিত্র এখনও সন্তোষজনক নয়। দেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, চাঁদপুর, সিলেট ও ঝিনাইদহে আটটি বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৭২০ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুর তুলনায় এ সুযোগ খুবই সীমিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়ের অভাব প্রকট। ফলে অনেক শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্য। ইশারা ভাষা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান কম। অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইশারা ভাষায় যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গিয়ে কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। শুধু বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইশারা ভাষার শিক্ষক, প্রশিক্ষিত দোভাষী ও সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর; ট্রেজারার, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]