সংবাদ

কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা


শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ পিএম

কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কোনো একটি উপজেলার কথা ভাবুন। পাঁচজন শিক্ষিত তরুণ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা পাঁচটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা না করে নিজেরাই একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলবেন। একজন উৎপাদন দেখবেন, একজন কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করবেন, একজন হিসাব ও অর্থায়ন সামলাবেন, একজন বিক্রয় ও বিপণন দেখবেন এবং অন্যজন খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন। এই পাঁচজন যদি নিজেদের পুঁজি, শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনতে পারেন, তাহলে একটি ছোট উদ্যোগই একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থান এবং শতাধিক কৃষকের বাজার তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আলোচনা সাধারণত একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন তরুণের পক্ষে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ, কারখানা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, হিসাব রাখা এবং বাজার তৈরি করা কঠিন। চার-পাঁচজন মিলে কাজ করলে পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি ও দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। এখানে ‘সমবায়’ বলতে শুধু আইনগত সমবায় সমিতি বোঝানো হচ্ছে না। উদ্যোগটি নিবন্ধিত সমবায়, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা শেয়ারভিত্তিক কোম্পানি—যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোতে হতে পারে। মূল বিষয় হলো সম্মিলিত মালিকানা ও দায়িত্ব।

তবে বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা শুরু করা গেলেও শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করতে হবে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কার কত মালিকানা থাকবে, কে পূর্ণকালীন কাজ করবেন, কে বেতন পাবেন, মুনাফা কীভাবে বণ্টিত হবে, বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছেড়ে যেতে চাইলে কী হবে। পাঁচজন মালিক হলেও প্রতিদিনের কারখানা পরিচালনার জন্য একজনকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। পাঁচজন পাঁচ ধরনের নির্দেশ দিলে ভালো ব্যবসাও দ্রুত সমস্যায় পড়তে পারে।

বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমে টমেটো, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম কমে যায় এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। অথচ একই কৃষিপণ্য শুকিয়ে, রান্না করে, পিউরি, চাটনি, আচার, পাউডার বা অন্য মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করলে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ কৃষকের কমমূল্যের মৌসুমি পণ্যই হতে পারে তরুণদের শিল্পের কাঁচামাল।

ধরা যাক, পাঁচজন তরুণ একটি বহুমুখী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ এক কোটি টাকা ধরা যেতে পারে। পাঁচজন প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা করে দিলে নিজস্ব মূলধন হবে ৫০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণসহ উপযুক্ত ব্যবসায়িক অর্থায়ন থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে প্রথমবারের উদ্যোক্তার জন্য পুরো এক কোটি টাকা দিয়ে শুরু করাই একমাত্র পথ নয়। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে বাজার তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ।

এক কোটি টাকার সব অর্থ ভবন ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয় করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ১০–১৫ লাখ টাকা কারখানার স্থান, শেড ও প্রাথমিক অবকাঠামো; ৩০–৩৫ লাখ টাকা ওয়াশিং, কাটিং, ড্রায়ার, কুকিং কেটলি, মিক্সিং, ফিলিং ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি; ৮–১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ, পানি, গুদাম ও অন্যান্য ইউটিলিটি; ৫–৭ লাখ টাকা পরীক্ষাগার, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা যেতে পারে। ব্র্যান্ড, প্যাকেজিং উন্নয়ন, নিবন্ধন ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তত ২৫–৩০ লাখ টাকা কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা রাখা। কারণ কারখানা তৈরি হওয়ার পর কাঁচামাল, প্যাকেট, বেতন, পরিবহন ও বিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন নগদ অর্থ দরকার হবে। এগুলো কেবল উদাহরণমূলক হিসাব; প্রকৃত বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কোটেশন নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

একটি মাত্র মৌসুমি পণ্যের জন্য কারখানা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ভালো। শীতকালে টমেটো থেকে শুকনো টমেটো, টমেটো ফ্লেক্স বা পাউডার; আমের মৌসুমে ম্যাঙ্গো চাটনি, আচার ও শুকনো আম; অন্য সময়ে আনারস, কলা বা কাঁঠাল শুকিয়ে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি বছরের বেশি সময় ব্যবহৃত হবে এবং একটি পণ্যের বাজার খারাপ হলে অন্য পণ্য ব্যবসাকে সহায়তা করবে।

সান-ড্রাইড বা নিয়ন্ত্রিতভাবে শুকানো টমেটো একটি ভালো উদাহরণ। মৌসুমে কম দামে টমেটো সংগ্রহ করে প্রথমে বাছাই ও ধোয়া হবে। এরপর সমান আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—টমেটোর অধিকাংশই পানি। ১০ কেজি তাজা টমেটো থেকে হয়তো প্রায় ০.৭ থেকে ১.২ কেজি শুকনো পণ্য পাওয়া যেতে পারে; প্রকৃত ফলন জাত, পরিপক্বতা, বাছাইয়ের ক্ষতি এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করবে।

ধরা যাক ১০ হাজার কেজি টমেটো প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে কেনা হলো। কাঁচামালের দাম হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যদি ৮৫০ কেজি বিক্রয়যোগ্য শুকনো টমেটো পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কাঁচা টমেটোর খরচই প্রতি কেজি শুকনো পণ্যে প্রায় ১৪১ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম, শুকানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, পানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, পরীক্ষাগার, কারখানার স্থায়ী খরচ, বিক্রয় কমিশন এবং অর্থায়নের ব্যয় যোগ হবে। সব মিলিয়ে যদি প্রতি কেজির প্রকৃত খরচ ৩০০–৪০০ টাকা হয়, তাহলে বাজারে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে বড় মুনাফা হবে—এমন ধারণা করা ভুল। বাজার ৭০০, ৮০০ বা ১,০০০ টাকা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আগে পরীক্ষা করতে হবে।

ম্যাঙ্গো চাটনির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শুধু আম, চিনি ও মসলার দাম যোগ করলেই উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় না। বোতল, ঢাকনা, লেবেল, কার্টন, শ্রম, রান্নার জ্বালানি, পানি, মান পরীক্ষা, পরিবহন, পরিবেশকের কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার মার্জিনও রয়েছে। ধরুন ৫০০ গ্রামের একটি বোতল চাটনির সম্পূর্ণ কারখানা-পর্যায়ের খরচ ১০০ টাকা। উৎপাদক ১২৫–১৩০ টাকায় পরিবেশককে দিলে এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে ১৬০–১৮০ টাকায় বিক্রি হলে উৎপাদক, পরিবেশক ও দোকানদার—সবার জন্য ব্যবসাটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি ১২০ টাকার বেশি দিতে না চান, তাহলে পণ্যটি যত ভালোই হোক, ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করতে হবে।

এই কারণেই কারখানা তৈরির আগে বাজার পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাঁচজন তরুণ প্রথমেই লাখ লাখ প্যাকেট উৎপাদন না করে ৫০০ বা ১,০০০ প্যাকেট শুকনো টমেটো এবং কয়েকশ বোতল চাটনি তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, অনলাইন ক্রেতা এবং পরিবারের কাছে বিক্রি করে জানতে হবে—স্বাদ কেমন, প্যাকেটের আকার ঠিক আছে কি না, কত দাম দিতে রাজি এবং দ্বিতীয়বার কিনতে চান কি না। বাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ একটি পণ্যের জন্য ৩০ লাখ টাকার মেশিন কেনার কোনো অর্থ নেই।

কারখানার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সস্তা জমি দেখলে হবে না। আশপাশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আছে কি না, কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত কারখানায় আনা যায় কি না, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে কি না, শ্রমিক পাওয়া যায় কি না এবং ঢাকা বা অন্য বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা কেমন—সব বিবেচনা করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পরিবহন ও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি দুটিই কমানো সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তা শুরু থেকেই ব্যবসার কেন্দ্রে থাকতে হবে। ছোট কারখানা মানেই নিম্নমানের কারখানা নয়। নিরাপদ পানি, কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও প্রস্তুত পণ্যের পৃথক প্রবাহ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার লিখিত পদ্ধতি, তাপমাত্রা ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ব্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। শুকনো পণ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ও পানির সক্রিয়তা এবং চাটনি বা সসে পিএইচ, অম্লতা ও তাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পণ্যভেদে বাংলাদেশের প্রযোজ্য খাদ্য আইন, মান, নিবন্ধন ও লেবেলিংয়ের শর্তও মেনে চলতে হবে।

একইভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো পণ্য দুর্বল প্যাকেটে দিলে আর্দ্রতা ঢুকে মান নষ্ট হতে পারে। আবার অতি ব্যয়বহুল প্যাকেজিং করলে পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার—কোন অঞ্চলের কাঁচামাল, কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পণ্যটির বিশেষত্ব কী। প্রথমে স্থানীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট ও অনলাইন বিক্রিতে অবস্থান তৈরি করে পরে বড় শহর ও রপ্তানির দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।

আর্থিক পরিকল্পনায় ব্রেক-ইভেন বোঝাও জরুরি। ধরুন কারখানার বেতন, ভাড়া, প্রশাসন, রক্ষণাবেক্ষণ, সুদসহ বছরে স্থায়ী ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিক্রয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিক্রয়ের ৩০ শতাংশ স্থায়ী খরচ মেটাতে থাকে। তাহলে আনুমানিক ব্রেক-ইভেন বিক্রয় হবে বছরে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এর পরের বিক্রয় থেকেই প্রকৃত পরিচালন মুনাফার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি টমেটোর দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে, উৎপাদন ফলন কমলে বা বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হলে ব্যবসাটি টিকবে কি না—আগেই হিসাব করা দরকার।

এই মডেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুবিধা হলো এর প্রভাব পাঁচজন মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট কারখানায় ১০–১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং মৌসুমে আরও ২০–৩০ জন কাজ পেতে পারেন। কয়েক ডজন বা শতাধিক কৃষক নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন। পরিবহনকারী, প্যাকেজিং সরবরাহকারী, পরিবেশক ও দোকানদারও এই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হন। বাছাই, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও প্রশাসনিক কাজে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানেরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে শুরুতেই বড় হওয়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথমে ৫–১০ লাখ টাকার পরীক্ষামূলক উৎপাদন, তারপর ২৫–৫০ লাখ টাকার ছোট ইউনিট এবং বাজার ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল হলে এক কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগ—এটি অনেক বেশি নিরাপদ পথ। প্রথম বছরের সাফল্য কোটি টাকার মুনাফা নয়; বরং এমন দুই-তিনটি পণ্য তৈরি করা, যা ক্রেতা একবার কেনার পর আবার কিনতে চান।

আমরা তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, ‘চাকরি পেয়েছ?’ হয়তো এখন আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—‘তোমরা পাঁচজন মিলে কী তৈরি করতে পারো?’ বাংলাদেশের কৃষি আছে, কাঁচামাল আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন প্রয়োজন এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় আনা।

আজ পাঁচজন তরুণের একটি ছোট শুকনো টমেটো, ম্যাঙ্গো চাটনি বা ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারজ্ঞান এবং সততার সঙ্গে পরিচালিত হলে সেই ছোট উদ্যোগই একদিন একটি জাতীয় খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই হয়তো লেখা হবে বড় কোনো করপোরেট ভবনে নয়—একটি উপজেলার ছোট কারখানায়, পাঁচজন তরুণের সম্মিলিত স্বপ্ন দিয়ে।

[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের কোনো একটি উপজেলার কথা ভাবুন। পাঁচজন শিক্ষিত তরুণ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা পাঁচটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা না করে নিজেরাই একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলবেন। একজন উৎপাদন দেখবেন, একজন কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করবেন, একজন হিসাব ও অর্থায়ন সামলাবেন, একজন বিক্রয় ও বিপণন দেখবেন এবং অন্যজন খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন। এই পাঁচজন যদি নিজেদের পুঁজি, শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনতে পারেন, তাহলে একটি ছোট উদ্যোগই একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থান এবং শতাধিক কৃষকের বাজার তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আলোচনা সাধারণত একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন তরুণের পক্ষে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ, কারখানা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, হিসাব রাখা এবং বাজার তৈরি করা কঠিন। চার-পাঁচজন মিলে কাজ করলে পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি ও দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। এখানে ‘সমবায়’ বলতে শুধু আইনগত সমবায় সমিতি বোঝানো হচ্ছে না। উদ্যোগটি নিবন্ধিত সমবায়, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা শেয়ারভিত্তিক কোম্পানি—যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোতে হতে পারে। মূল বিষয় হলো সম্মিলিত মালিকানা ও দায়িত্ব।

তবে বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা শুরু করা গেলেও শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করতে হবে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কার কত মালিকানা থাকবে, কে পূর্ণকালীন কাজ করবেন, কে বেতন পাবেন, মুনাফা কীভাবে বণ্টিত হবে, বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছেড়ে যেতে চাইলে কী হবে। পাঁচজন মালিক হলেও প্রতিদিনের কারখানা পরিচালনার জন্য একজনকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। পাঁচজন পাঁচ ধরনের নির্দেশ দিলে ভালো ব্যবসাও দ্রুত সমস্যায় পড়তে পারে।

বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমে টমেটো, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম কমে যায় এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। অথচ একই কৃষিপণ্য শুকিয়ে, রান্না করে, পিউরি, চাটনি, আচার, পাউডার বা অন্য মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করলে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ কৃষকের কমমূল্যের মৌসুমি পণ্যই হতে পারে তরুণদের শিল্পের কাঁচামাল।

ধরা যাক, পাঁচজন তরুণ একটি বহুমুখী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ এক কোটি টাকা ধরা যেতে পারে। পাঁচজন প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা করে দিলে নিজস্ব মূলধন হবে ৫০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণসহ উপযুক্ত ব্যবসায়িক অর্থায়ন থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে প্রথমবারের উদ্যোক্তার জন্য পুরো এক কোটি টাকা দিয়ে শুরু করাই একমাত্র পথ নয়। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে বাজার তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ।

এক কোটি টাকার সব অর্থ ভবন ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয় করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ১০–১৫ লাখ টাকা কারখানার স্থান, শেড ও প্রাথমিক অবকাঠামো; ৩০–৩৫ লাখ টাকা ওয়াশিং, কাটিং, ড্রায়ার, কুকিং কেটলি, মিক্সিং, ফিলিং ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি; ৮–১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ, পানি, গুদাম ও অন্যান্য ইউটিলিটি; ৫–৭ লাখ টাকা পরীক্ষাগার, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা যেতে পারে। ব্র্যান্ড, প্যাকেজিং উন্নয়ন, নিবন্ধন ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তত ২৫–৩০ লাখ টাকা কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা রাখা। কারণ কারখানা তৈরি হওয়ার পর কাঁচামাল, প্যাকেট, বেতন, পরিবহন ও বিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন নগদ অর্থ দরকার হবে। এগুলো কেবল উদাহরণমূলক হিসাব; প্রকৃত বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কোটেশন নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

একটি মাত্র মৌসুমি পণ্যের জন্য কারখানা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ভালো। শীতকালে টমেটো থেকে শুকনো টমেটো, টমেটো ফ্লেক্স বা পাউডার; আমের মৌসুমে ম্যাঙ্গো চাটনি, আচার ও শুকনো আম; অন্য সময়ে আনারস, কলা বা কাঁঠাল শুকিয়ে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি বছরের বেশি সময় ব্যবহৃত হবে এবং একটি পণ্যের বাজার খারাপ হলে অন্য পণ্য ব্যবসাকে সহায়তা করবে।

সান-ড্রাইড বা নিয়ন্ত্রিতভাবে শুকানো টমেটো একটি ভালো উদাহরণ। মৌসুমে কম দামে টমেটো সংগ্রহ করে প্রথমে বাছাই ও ধোয়া হবে। এরপর সমান আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—টমেটোর অধিকাংশই পানি। ১০ কেজি তাজা টমেটো থেকে হয়তো প্রায় ০.৭ থেকে ১.২ কেজি শুকনো পণ্য পাওয়া যেতে পারে; প্রকৃত ফলন জাত, পরিপক্বতা, বাছাইয়ের ক্ষতি এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করবে।

ধরা যাক ১০ হাজার কেজি টমেটো প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে কেনা হলো। কাঁচামালের দাম হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যদি ৮৫০ কেজি বিক্রয়যোগ্য শুকনো টমেটো পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কাঁচা টমেটোর খরচই প্রতি কেজি শুকনো পণ্যে প্রায় ১৪১ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম, শুকানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, পানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, পরীক্ষাগার, কারখানার স্থায়ী খরচ, বিক্রয় কমিশন এবং অর্থায়নের ব্যয় যোগ হবে। সব মিলিয়ে যদি প্রতি কেজির প্রকৃত খরচ ৩০০–৪০০ টাকা হয়, তাহলে বাজারে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে বড় মুনাফা হবে—এমন ধারণা করা ভুল। বাজার ৭০০, ৮০০ বা ১,০০০ টাকা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আগে পরীক্ষা করতে হবে।

ম্যাঙ্গো চাটনির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শুধু আম, চিনি ও মসলার দাম যোগ করলেই উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় না। বোতল, ঢাকনা, লেবেল, কার্টন, শ্রম, রান্নার জ্বালানি, পানি, মান পরীক্ষা, পরিবহন, পরিবেশকের কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার মার্জিনও রয়েছে। ধরুন ৫০০ গ্রামের একটি বোতল চাটনির সম্পূর্ণ কারখানা-পর্যায়ের খরচ ১০০ টাকা। উৎপাদক ১২৫–১৩০ টাকায় পরিবেশককে দিলে এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে ১৬০–১৮০ টাকায় বিক্রি হলে উৎপাদক, পরিবেশক ও দোকানদার—সবার জন্য ব্যবসাটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি ১২০ টাকার বেশি দিতে না চান, তাহলে পণ্যটি যত ভালোই হোক, ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করতে হবে।

এই কারণেই কারখানা তৈরির আগে বাজার পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাঁচজন তরুণ প্রথমেই লাখ লাখ প্যাকেট উৎপাদন না করে ৫০০ বা ১,০০০ প্যাকেট শুকনো টমেটো এবং কয়েকশ বোতল চাটনি তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, অনলাইন ক্রেতা এবং পরিবারের কাছে বিক্রি করে জানতে হবে—স্বাদ কেমন, প্যাকেটের আকার ঠিক আছে কি না, কত দাম দিতে রাজি এবং দ্বিতীয়বার কিনতে চান কি না। বাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ একটি পণ্যের জন্য ৩০ লাখ টাকার মেশিন কেনার কোনো অর্থ নেই।

কারখানার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সস্তা জমি দেখলে হবে না। আশপাশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আছে কি না, কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত কারখানায় আনা যায় কি না, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে কি না, শ্রমিক পাওয়া যায় কি না এবং ঢাকা বা অন্য বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা কেমন—সব বিবেচনা করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পরিবহন ও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি দুটিই কমানো সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তা শুরু থেকেই ব্যবসার কেন্দ্রে থাকতে হবে। ছোট কারখানা মানেই নিম্নমানের কারখানা নয়। নিরাপদ পানি, কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও প্রস্তুত পণ্যের পৃথক প্রবাহ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার লিখিত পদ্ধতি, তাপমাত্রা ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ব্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। শুকনো পণ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ও পানির সক্রিয়তা এবং চাটনি বা সসে পিএইচ, অম্লতা ও তাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পণ্যভেদে বাংলাদেশের প্রযোজ্য খাদ্য আইন, মান, নিবন্ধন ও লেবেলিংয়ের শর্তও মেনে চলতে হবে।

একইভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো পণ্য দুর্বল প্যাকেটে দিলে আর্দ্রতা ঢুকে মান নষ্ট হতে পারে। আবার অতি ব্যয়বহুল প্যাকেজিং করলে পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার—কোন অঞ্চলের কাঁচামাল, কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পণ্যটির বিশেষত্ব কী। প্রথমে স্থানীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট ও অনলাইন বিক্রিতে অবস্থান তৈরি করে পরে বড় শহর ও রপ্তানির দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।

আর্থিক পরিকল্পনায় ব্রেক-ইভেন বোঝাও জরুরি। ধরুন কারখানার বেতন, ভাড়া, প্রশাসন, রক্ষণাবেক্ষণ, সুদসহ বছরে স্থায়ী ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিক্রয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিক্রয়ের ৩০ শতাংশ স্থায়ী খরচ মেটাতে থাকে। তাহলে আনুমানিক ব্রেক-ইভেন বিক্রয় হবে বছরে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এর পরের বিক্রয় থেকেই প্রকৃত পরিচালন মুনাফার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি টমেটোর দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে, উৎপাদন ফলন কমলে বা বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হলে ব্যবসাটি টিকবে কি না—আগেই হিসাব করা দরকার।

এই মডেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুবিধা হলো এর প্রভাব পাঁচজন মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট কারখানায় ১০–১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং মৌসুমে আরও ২০–৩০ জন কাজ পেতে পারেন। কয়েক ডজন বা শতাধিক কৃষক নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন। পরিবহনকারী, প্যাকেজিং সরবরাহকারী, পরিবেশক ও দোকানদারও এই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হন। বাছাই, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও প্রশাসনিক কাজে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানেরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে শুরুতেই বড় হওয়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথমে ৫–১০ লাখ টাকার পরীক্ষামূলক উৎপাদন, তারপর ২৫–৫০ লাখ টাকার ছোট ইউনিট এবং বাজার ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল হলে এক কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগ—এটি অনেক বেশি নিরাপদ পথ। প্রথম বছরের সাফল্য কোটি টাকার মুনাফা নয়; বরং এমন দুই-তিনটি পণ্য তৈরি করা, যা ক্রেতা একবার কেনার পর আবার কিনতে চান।

আমরা তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, ‘চাকরি পেয়েছ?’ হয়তো এখন আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—‘তোমরা পাঁচজন মিলে কী তৈরি করতে পারো?’ বাংলাদেশের কৃষি আছে, কাঁচামাল আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন প্রয়োজন এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় আনা।

আজ পাঁচজন তরুণের একটি ছোট শুকনো টমেটো, ম্যাঙ্গো চাটনি বা ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারজ্ঞান এবং সততার সঙ্গে পরিচালিত হলে সেই ছোট উদ্যোগই একদিন একটি জাতীয় খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই হয়তো লেখা হবে বড় কোনো করপোরেট ভবনে নয়—একটি উপজেলার ছোট কারখানায়, পাঁচজন তরুণের সম্মিলিত স্বপ্ন দিয়ে।

[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত