বাংলাদেশের কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে কৃষকের চাহিদা, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজারের ধরন এবং কৃষির ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে কৃষক এখন শুধু পরামর্শ চান না; তিনি চান উন্নতমানের বীজ, সময়মতো সার, নির্ভরযোগ্য সেচ, আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য, পরামর্শ এবং দ্রুত সেবা।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসিকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। তাই এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা পূরণে বিএডিসির সংস্কার এখন আর উচ্চবিলাসী নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সুদীর্ঘ।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রজন্মের কৃষকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও গতিশীল বিএডিসি, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, মাঠের বাস্তবতা বুঝবে এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। বিএডিসির সংস্কার বলতে কোনোভাবেই শুধু জনবল কমানো, পদ বিলুপ্ত করা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো সংকুচিত করাকে বোঝানো উচিত নয়। বরং সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি বাড়ানো, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
কৃষির মতো মৌসুমনির্ভর ও জরুরি খাতে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বীজ, সার বা সেচের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্বও অনেক সময় একটি মৌসুমের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিএডিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ফলাফলভিত্তিক করা প্রয়োজন। বিএডিসির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল। এই শক্তি শুধু কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী, দক্ষ টেকনিশিয়ান, মাঠকর্মী, কারিগরি জনবল এবং কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গিয়ে এই জনবল যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা কোনো কাগুজে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সংস্কারের নামে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা বা অকার্যকর করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। অভিজ্ঞ জনবলকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের বিএডিসি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে সার সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে উদ্বেগ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বিএডিসির নন-ইউরিয়া সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও সরবরাহে বিএডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য হলো প্রয়োজনের সময়ে, প্রয়োজনীয় স্থানে, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়, জাহাজীকরণ, বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা বিলম্বও অনেক সময় উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনাতেও একইভাবে নতুন চিন্তার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল, উচ্চফলনশীল, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের প্লান্টিং ম্যাটেরিয়াল ও সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আধুনিক বীজ প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, বীজ পরীক্ষাগার, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কৃষকের হাতে শুধু বীজ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই বীজের মান, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বৃহৎ পরিসরে চারা সরবরাহ।
সেচ ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি, স্মার্ট সেচ, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য সেচ প্রযুক্তি।
বিএডিসির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রকৃত সক্ষমতার মূল্যায়ন হয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে সাংগঠনিক পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের শক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের বিএডিসির অন্যতম প্রধান সম্পদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। বিএডিসিতে সরকারি চাকরির মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএডিসিতে গ্র্যাচুইটি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কর্মীদের জন্য একটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি করে। তাই মানবসম্পদ সংস্কারের অংশ হিসেবে কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল থাকেন, তাহলে তাদের কর্মপ্রেরণা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও আরও শক্তিশালী হয়। এ কারণে বিএডিসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু পদসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন কাজের জন্য কত জনবল প্রয়োজন, কোন পর্যায়ে কী ধরনের কারিগরি দক্ষতা দরকার, মাঠপর্যায়ে কতটা ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, কোথায় নতুন পদ সৃষ্টি করা দরকার এবং কোথায় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএডিসিকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও সেচ পৌঁছানো মানে শুধু একটি সরকারি সেবা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িত। তাই বিএডিসির সংস্কার হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী। সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ কমানো নয়; প্রয়োজনীয় মানুষকে সঠিক কাজে, সঠিক দক্ষতায় এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার সঙ্গে কাজে লাগানো। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রক্ষা করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ জনশক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষকের প্রয়োজনকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো বিএডিসি কি পুরোনো কাঠামোর ভারবহন করে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে, নাকি সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে? উত্তরটি শুধু বিএডিসির জন্য নয়, দেশের কৃষির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি যদি আধুনিক হয়, কৃষক যদি পরিবর্তিত হন, প্রযুক্তি যদি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যায়, তাহলে কৃষির সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও একই গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও দূরদর্শী সংস্কারের। বিএডিসিকে ছোট করার সময় নয়—এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ, অভিজ্ঞতানির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল করে গড়ে তোলার সময় এখন। পুরোনো কাঠামোয় ভবিষ্যতের কৃষি নয়; প্রয়োজন ভবিষ্যতের কৃষির জন্য নতুন বিএডিসি।
[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)]

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে কৃষকের চাহিদা, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজারের ধরন এবং কৃষির ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে কৃষক এখন শুধু পরামর্শ চান না; তিনি চান উন্নতমানের বীজ, সময়মতো সার, নির্ভরযোগ্য সেচ, আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য, পরামর্শ এবং দ্রুত সেবা।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসিকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। তাই এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা পূরণে বিএডিসির সংস্কার এখন আর উচ্চবিলাসী নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সুদীর্ঘ।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রজন্মের কৃষকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও গতিশীল বিএডিসি, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, মাঠের বাস্তবতা বুঝবে এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। বিএডিসির সংস্কার বলতে কোনোভাবেই শুধু জনবল কমানো, পদ বিলুপ্ত করা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো সংকুচিত করাকে বোঝানো উচিত নয়। বরং সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি বাড়ানো, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
কৃষির মতো মৌসুমনির্ভর ও জরুরি খাতে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বীজ, সার বা সেচের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্বও অনেক সময় একটি মৌসুমের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিএডিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ফলাফলভিত্তিক করা প্রয়োজন। বিএডিসির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল। এই শক্তি শুধু কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী, দক্ষ টেকনিশিয়ান, মাঠকর্মী, কারিগরি জনবল এবং কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গিয়ে এই জনবল যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা কোনো কাগুজে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সংস্কারের নামে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা বা অকার্যকর করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। অভিজ্ঞ জনবলকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের বিএডিসি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে সার সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে উদ্বেগ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বিএডিসির নন-ইউরিয়া সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও সরবরাহে বিএডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য হলো প্রয়োজনের সময়ে, প্রয়োজনীয় স্থানে, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়, জাহাজীকরণ, বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা বিলম্বও অনেক সময় উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনাতেও একইভাবে নতুন চিন্তার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল, উচ্চফলনশীল, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের প্লান্টিং ম্যাটেরিয়াল ও সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আধুনিক বীজ প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, বীজ পরীক্ষাগার, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কৃষকের হাতে শুধু বীজ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই বীজের মান, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বৃহৎ পরিসরে চারা সরবরাহ।
সেচ ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি, স্মার্ট সেচ, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য সেচ প্রযুক্তি।
বিএডিসির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রকৃত সক্ষমতার মূল্যায়ন হয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে সাংগঠনিক পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের শক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের বিএডিসির অন্যতম প্রধান সম্পদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। বিএডিসিতে সরকারি চাকরির মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএডিসিতে গ্র্যাচুইটি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কর্মীদের জন্য একটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি করে। তাই মানবসম্পদ সংস্কারের অংশ হিসেবে কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল থাকেন, তাহলে তাদের কর্মপ্রেরণা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও আরও শক্তিশালী হয়। এ কারণে বিএডিসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু পদসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন কাজের জন্য কত জনবল প্রয়োজন, কোন পর্যায়ে কী ধরনের কারিগরি দক্ষতা দরকার, মাঠপর্যায়ে কতটা ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, কোথায় নতুন পদ সৃষ্টি করা দরকার এবং কোথায় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএডিসিকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও সেচ পৌঁছানো মানে শুধু একটি সরকারি সেবা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িত। তাই বিএডিসির সংস্কার হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী। সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ কমানো নয়; প্রয়োজনীয় মানুষকে সঠিক কাজে, সঠিক দক্ষতায় এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার সঙ্গে কাজে লাগানো। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রক্ষা করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ জনশক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষকের প্রয়োজনকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো বিএডিসি কি পুরোনো কাঠামোর ভারবহন করে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে, নাকি সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে? উত্তরটি শুধু বিএডিসির জন্য নয়, দেশের কৃষির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি যদি আধুনিক হয়, কৃষক যদি পরিবর্তিত হন, প্রযুক্তি যদি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যায়, তাহলে কৃষির সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও একই গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও দূরদর্শী সংস্কারের। বিএডিসিকে ছোট করার সময় নয়—এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ, অভিজ্ঞতানির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল করে গড়ে তোলার সময় এখন। পুরোনো কাঠামোয় ভবিষ্যতের কৃষি নয়; প্রয়োজন ভবিষ্যতের কৃষির জন্য নতুন বিএডিসি।
[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)]

আপনার মতামত লিখুন