সংবাদ

আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই


শেখর ভট্টাচার্য
শেখর ভট্টাচার্য
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ পিএম

আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই
আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো

রবিবারের ভোরের সূর্য, চোখ মেলে তাকালেই মনটা আঁকুপাঁকু করে উঠত। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারের জন্য। সকাল দশটায় খেলাঘর আসরের আবৃত্তি প্রশিক্ষণ। আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, অসমাপ্ত গল্প সমাপ্তকরণ আরও কত কিছু। কত অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করেছি কিন্তু যে সমাজে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি সে সমাজের অসমাপ্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর পথটি মনে হয় অনন্তে মিলিয়ে গেছে।

আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে শরীরচর্চা বিশেষ করে ব্রতচারী নৃত্য। “চল কোদাল চালাই, ভুলে মনের বালাই, ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই...।” এই ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় গুরুসদয় দত্ত, যার বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জের বীরগ্রামে, সে তথ্য জানা ছিল না। তাঁর গৌরবময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম। ব্রতচারী নৃত্যে অংশগ্রহণ করেই আনন্দ। ছন্দে, ছন্দে শরীরচর্চা, দেহ মনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের শৈশবে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, শাপলার মেলা ছিল দারুণ সক্রিয়। শহরের এ পাড়ায় খেলাঘর তো অন্য পাড়ায় কচিকাঁচার মেলা। এভাবে চাঁদের হাট, শাপলার মেলা সহ নাম না জানা অনেক শিশু, কিশোর সংগঠন সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সব শিশুদের জন্য দ্বার অবারিত। সৃজনশীল কিছু শেখার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ দেনা-পাওনার বাইরের বিষয়। বাণিজ্য তখনো প্রবেশ করতে পারেনি এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে। যারা শেখাতেন তারা মনে করতেন পরের প্রজন্মকে তৈরি করে যাওয়া তাদের কর্তব্য। যারা শিখত তারা প্রাণের আনন্দে মনপ্রাণ ঢেলে দিত সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

ষাট, সত্তর এমন কী আশির দশক পর্যন্ত এসব শিশু সংগঠনের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এরকম সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল আমাদের দেশে। শৈশব-কৈশোরের কোনো না কোনো পর্বে এইসব শিশু-কিশোর সংগঠনের কোনোটার সদস্য কিংবা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন না, এরকম মানুষের সংখ্যাও প্রগতিশীল, সংস্কৃতিলগ্ন সমাজে খুব কম ছিল বলে মনে করি। বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, উত্থান এবং জাতিগঠনের পেছনে এই সংগঠনসমূহ ও তাদের সভ্যদের গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। অথচ এখনকার শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি মাঝবয়সীদেরও অনেকেই এই সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব ও তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে একেবারেই অবগত নয় বলেই আমার ধারণা। এর কারণ, বাস্তবে এখন আর এই সংগঠনগুলোর তেমন কোনো জোরালো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

খেলাঘরের মূল স্লোগান ছিল, “আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই।” শিশুদের জন্য এত সুন্দর এবং যথাযথ স্লোগান খুব কম শুনেছি। আনন্দময় শৈশব না থাকলে কী হয়। সমাজ সুস্থ থাকে না। সমাজ অসুস্থ এবং অস্থির থাকলে শিশুরা দায়িত্বহীন, বিকল মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে বাড়তে থাকে। সচেতন মানুষেরা কী কিছুটা টের পাচ্ছেন। হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থেকে জীবন ধারণ তো দূরের কথা, কোথায় কোন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ছোট, ছোট শিশুরা সে খবর, রাষ্ট্র, সমাজ কেউ জানে না। আর একটি বিষয় ভাবলে অবাক হতে হয়, নাগরিক সমাজ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো নির্লিপ্ত, উদাসীন। উদাসীন মানুষ কিংবা সমাজ, সংগঠনের মনের কথা পাঠ করা খুব কঠিন। এই যে অগণন শিশু নানা ভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, এর জন্য জোরালো, দলবদ্ধ প্রতিবাদ কর্ণকুহরে এখনও পৌঁছেনি। আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থুস্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। বড় ভয় হয়, আমাদের এগোনোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে।

শৈশব থেকে যে শিশু সৃষ্টিশীলতার বিকাশের অবাধ সুযোগ পেয়ে থাকে সে শিশু আকাশের মতো বড় হয়ে ওঠে। ওই যে সুনির্মল কুমার বসুর অসাধারণ সেই কবিতা, “আকাশ আমায় শিক্ষা দিলে উদার হতে ভাইরে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে।” জীবনের শুরুতেই উদার মনোবৃত্তি ধারণ করে সবার কাছে শিক্ষা নিয়ে মানবিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার ব্রত ধারণ করা; সেই শিক্ষা এবং ব্রত কোথায়।

কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আমরা সবাই উল্টোরথে মনে হয় উল্টো পথেই চলছি।

সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা পাল্টেও গেছে, পাল্টে গেছে ভূগ্রাম। জীবনের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব’-বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি শিশুর শৈশব নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে চরম পর্যায়ে। এখানে চলছে সন্তানকে জোরজবরদস্তি করে কিছু একটা বানানোর অসম প্রতিযোগিতা। শহরের শিশুদের খেলার জায়গা নেই, তাই শিশুরা মুঠোফোন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাই তাদের সবকিছুই অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে ‘গ্লো কিডস : হাউ স্ক্রিন এডিকশন ইস হাইজেকিং আওয়ার কিডস অ্যান্ড হাউ টু ব্রেক দ্য ট্রেন্স’ নামে বই লিখেছেন মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট ও আসক্তি বিশেষজ্ঞ ড. নিকোলাস কারদারাস। তিনি স্ক্রিন এডিকশনকে ‘নতুন শতাব্দীর মাদক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রশ্ন হলো আমরা কী প্রযুক্তির বিকাশ রোধ করতে পারব। প্রযুক্তি তাঁর উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাবে, কোন কালেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চলার পথে কেউ বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। তাহলে কী করা প্রয়োজন প্রযুক্তির সংস্কৃতি সংলগ্ন ব্যবহারের পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি তো সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করছে। কোন পথে হাঁটলে “ঠাকুরমার ঝুলি”, রূপকথা, দস্যু বনহুর, হাসন, লালন এবং তাদের মানবিক বাণীকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশ করানো যায়। কীভাবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের গাজীর গানকে যুক্ত করা যায়। “নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগত ভরমিয়া দেখালাম একই মায়ের পুত” বিশ্বচরাচর ঘুরে আসলে এরকম মানবিক বাণী কী খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংযোগ না ঘটলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতায় এত বেশি যুক্ত রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো কঠিন হবে বলে মনে হয়।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই

প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

রবিবারের ভোরের সূর্য, চোখ মেলে তাকালেই মনটা আঁকুপাঁকু করে উঠত। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারের জন্য। সকাল দশটায় খেলাঘর আসরের আবৃত্তি প্রশিক্ষণ। আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, অসমাপ্ত গল্প সমাপ্তকরণ আরও কত কিছু। কত অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করেছি কিন্তু যে সমাজে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি সে সমাজের অসমাপ্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর পথটি মনে হয় অনন্তে মিলিয়ে গেছে।

আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে শরীরচর্চা বিশেষ করে ব্রতচারী নৃত্য। “চল কোদাল চালাই, ভুলে মনের বালাই, ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই...।” এই ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় গুরুসদয় দত্ত, যার বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জের বীরগ্রামে, সে তথ্য জানা ছিল না। তাঁর গৌরবময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম। ব্রতচারী নৃত্যে অংশগ্রহণ করেই আনন্দ। ছন্দে, ছন্দে শরীরচর্চা, দেহ মনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের শৈশবে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, শাপলার মেলা ছিল দারুণ সক্রিয়। শহরের এ পাড়ায় খেলাঘর তো অন্য পাড়ায় কচিকাঁচার মেলা। এভাবে চাঁদের হাট, শাপলার মেলা সহ নাম না জানা অনেক শিশু, কিশোর সংগঠন সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সব শিশুদের জন্য দ্বার অবারিত। সৃজনশীল কিছু শেখার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ দেনা-পাওনার বাইরের বিষয়। বাণিজ্য তখনো প্রবেশ করতে পারেনি এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে। যারা শেখাতেন তারা মনে করতেন পরের প্রজন্মকে তৈরি করে যাওয়া তাদের কর্তব্য। যারা শিখত তারা প্রাণের আনন্দে মনপ্রাণ ঢেলে দিত সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

ষাট, সত্তর এমন কী আশির দশক পর্যন্ত এসব শিশু সংগঠনের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এরকম সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল আমাদের দেশে। শৈশব-কৈশোরের কোনো না কোনো পর্বে এইসব শিশু-কিশোর সংগঠনের কোনোটার সদস্য কিংবা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন না, এরকম মানুষের সংখ্যাও প্রগতিশীল, সংস্কৃতিলগ্ন সমাজে খুব কম ছিল বলে মনে করি। বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, উত্থান এবং জাতিগঠনের পেছনে এই সংগঠনসমূহ ও তাদের সভ্যদের গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। অথচ এখনকার শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি মাঝবয়সীদেরও অনেকেই এই সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব ও তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে একেবারেই অবগত নয় বলেই আমার ধারণা। এর কারণ, বাস্তবে এখন আর এই সংগঠনগুলোর তেমন কোনো জোরালো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

খেলাঘরের মূল স্লোগান ছিল, “আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই।” শিশুদের জন্য এত সুন্দর এবং যথাযথ স্লোগান খুব কম শুনেছি। আনন্দময় শৈশব না থাকলে কী হয়। সমাজ সুস্থ থাকে না। সমাজ অসুস্থ এবং অস্থির থাকলে শিশুরা দায়িত্বহীন, বিকল মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে বাড়তে থাকে। সচেতন মানুষেরা কী কিছুটা টের পাচ্ছেন। হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থেকে জীবন ধারণ তো দূরের কথা, কোথায় কোন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ছোট, ছোট শিশুরা সে খবর, রাষ্ট্র, সমাজ কেউ জানে না। আর একটি বিষয় ভাবলে অবাক হতে হয়, নাগরিক সমাজ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো নির্লিপ্ত, উদাসীন। উদাসীন মানুষ কিংবা সমাজ, সংগঠনের মনের কথা পাঠ করা খুব কঠিন। এই যে অগণন শিশু নানা ভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, এর জন্য জোরালো, দলবদ্ধ প্রতিবাদ কর্ণকুহরে এখনও পৌঁছেনি। আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থুস্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। বড় ভয় হয়, আমাদের এগোনোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে।

শৈশব থেকে যে শিশু সৃষ্টিশীলতার বিকাশের অবাধ সুযোগ পেয়ে থাকে সে শিশু আকাশের মতো বড় হয়ে ওঠে। ওই যে সুনির্মল কুমার বসুর অসাধারণ সেই কবিতা, “আকাশ আমায় শিক্ষা দিলে উদার হতে ভাইরে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে।” জীবনের শুরুতেই উদার মনোবৃত্তি ধারণ করে সবার কাছে শিক্ষা নিয়ে মানবিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার ব্রত ধারণ করা; সেই শিক্ষা এবং ব্রত কোথায়।

কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আমরা সবাই উল্টোরথে মনে হয় উল্টো পথেই চলছি।

সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা পাল্টেও গেছে, পাল্টে গেছে ভূগ্রাম। জীবনের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব’-বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি শিশুর শৈশব নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে চরম পর্যায়ে। এখানে চলছে সন্তানকে জোরজবরদস্তি করে কিছু একটা বানানোর অসম প্রতিযোগিতা। শহরের শিশুদের খেলার জায়গা নেই, তাই শিশুরা মুঠোফোন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাই তাদের সবকিছুই অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে ‘গ্লো কিডস : হাউ স্ক্রিন এডিকশন ইস হাইজেকিং আওয়ার কিডস অ্যান্ড হাউ টু ব্রেক দ্য ট্রেন্স’ নামে বই লিখেছেন মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট ও আসক্তি বিশেষজ্ঞ ড. নিকোলাস কারদারাস। তিনি স্ক্রিন এডিকশনকে ‘নতুন শতাব্দীর মাদক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রশ্ন হলো আমরা কী প্রযুক্তির বিকাশ রোধ করতে পারব। প্রযুক্তি তাঁর উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাবে, কোন কালেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চলার পথে কেউ বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। তাহলে কী করা প্রয়োজন প্রযুক্তির সংস্কৃতি সংলগ্ন ব্যবহারের পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি তো সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করছে। কোন পথে হাঁটলে “ঠাকুরমার ঝুলি”, রূপকথা, দস্যু বনহুর, হাসন, লালন এবং তাদের মানবিক বাণীকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশ করানো যায়। কীভাবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের গাজীর গানকে যুক্ত করা যায়। “নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগত ভরমিয়া দেখালাম একই মায়ের পুত” বিশ্বচরাচর ঘুরে আসলে এরকম মানবিক বাণী কী খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংযোগ না ঘটলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতায় এত বেশি যুক্ত রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো কঠিন হবে বলে মনে হয়।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত