আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও নানা কর্মসূচি চলছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নের নামে কাজ করছে। দেশি-বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থও আসছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে কতটা পৌঁছেছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে অন্যরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি।
এ অবস্থায় আদিবাসীদের নিজেদেরই সামনে আসতে হবে। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও জ্ঞানকে সমন্বিত করে বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তাদের আরও সংগঠিত হতে হবে। অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে কোনো জনগোষ্ঠীর স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যেও আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদিবাসীদের দেশের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আদিবাসীদের উন্নয়নে তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকেরাও বহুবার বলেছেন, তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত না করে দারিদ্র্য বিমোচন বা উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমেও আদিবাসীদের বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমি দখল, নির্যাতন, উচ্ছেদসহ নানা ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় তা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে না। ফলে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সীমিত। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা তার অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গেই সম্পর্কিত।
আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির আইনগত অধিকার, বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার, ছিন্নমূলদের পুনর্বাসন, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, প্রতিটি জেলায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নির্যাতন বন্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, পৃথক মন্ত্রণালয় এবং ভূমি অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা। এসব দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অবস্থান প্রয়োজন।
দুঃখজনক হলো, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের কথা বললেও পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে আদিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আদিবাসীদের উন্নয়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি তাদের নাগরিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। তাদের উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহণ করে তাদের বাইরে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাদের নিজেদের অংশগ্রহণেই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও পরিচয় রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যই দেশের শক্তি। তাই আদিবাসীদের পিছিয়ে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে। লোকদেখানো বক্তব্য নয়, আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই এখন প্রয়োজন।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও নানা কর্মসূচি চলছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নের নামে কাজ করছে। দেশি-বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থও আসছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে কতটা পৌঁছেছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে অন্যরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি।
এ অবস্থায় আদিবাসীদের নিজেদেরই সামনে আসতে হবে। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও জ্ঞানকে সমন্বিত করে বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তাদের আরও সংগঠিত হতে হবে। অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে কোনো জনগোষ্ঠীর স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যেও আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদিবাসীদের দেশের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আদিবাসীদের উন্নয়নে তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকেরাও বহুবার বলেছেন, তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত না করে দারিদ্র্য বিমোচন বা উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমেও আদিবাসীদের বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমি দখল, নির্যাতন, উচ্ছেদসহ নানা ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় তা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে না। ফলে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সীমিত। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা তার অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গেই সম্পর্কিত।
আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির আইনগত অধিকার, বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার, ছিন্নমূলদের পুনর্বাসন, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, প্রতিটি জেলায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নির্যাতন বন্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, পৃথক মন্ত্রণালয় এবং ভূমি অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা। এসব দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অবস্থান প্রয়োজন।
দুঃখজনক হলো, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের কথা বললেও পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে আদিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আদিবাসীদের উন্নয়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি তাদের নাগরিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। তাদের উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহণ করে তাদের বাইরে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাদের নিজেদের অংশগ্রহণেই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও পরিচয় রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যই দেশের শক্তি। তাই আদিবাসীদের পিছিয়ে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে। লোকদেখানো বক্তব্য নয়, আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই এখন প্রয়োজন।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন