প্রবারণা পূর্ণিমার মৈত্রীতে আলোকিত হোক ধরণি
আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালিত হয়। প্রবারণা অর্থ হলো, একে অপরের কাছে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং মৈত্রীভাবাপন্ন চিত্ত নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, কারও প্রতি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই প্রবারণার মূল শিক্ষা। একইভাবে অন্যের ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত। আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণ করার শিক্ষা দেয় প্রবারণা।প্রবারণা পূর্ণিমার পর থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় দানোত্তম কঠিন চীবর দান। যেসব বিহারে ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেন, সেসব বিহারেই কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চুল কর্তন, তাবতিংস স্বর্গে মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা, ৬০ জন শিষ্যকে ধর্ম প্রচারে পাঠানো এবং স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে বুদ্ধের অবতরণ।চুল কাটা ও ফানুস উৎসবের উৎপত্তিবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ গৌতম অনোমা নদীর তীরে পৌঁছে প্রব্রজিত জীবন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রব্রজিত জীবনে চুলের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে নিজের চুল কাটেন এবং অধিষ্ঠান করেন, তার কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলে তা যেন মাটিতে পতিত না হয়। তিনি যদি জন্ম-জন্মান্তরে ত্রিশ পারমি পূর্ণ করে বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন, তবে সেই চুল আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক।কথিত আছে, সিদ্ধার্থের নিক্ষিপ্ত চুল দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্ণের পাত্রে করে তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে এই কেশধাতু স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবতারা এখনো এই চৈত্যের পূজা করেন। এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ঐতিহ্য থেকেই বৌদ্ধদের মধ্যে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানোর প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে ফানুস উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধবিহারগুলোতে সমবেত হন। এভাবেই ফানুস উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমাকে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।তাবতিংস স্বর্গে মাতার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনাবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তার সপ্তম বর্ষাবাস তাবতিংস স্বর্গে অতিবাহিত করেন। সেখানে পারিজাত বৃক্ষের নিচে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে বসে তিনি মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা দেন। তিন মাস ধরে দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি মাতাকে স্রোতাপত্তি মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত করেন বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধ মাতৃঋণ পরিশোধ ও কর্তব্য পালনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা সবার জন্য অনুকরণীয়।কথিত আছে, তাবতিংস স্বর্গে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধ দশ হাজার চক্রবাল থেকে আগত অসংখ্য দেবতা ও ব্রহ্মার উদ্দেশে সাত খণ্ডে বিভক্ত অভিধর্ম নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশনা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী এই দেশনার সমাপ্তি ঘটে বলে দিনটি অভিধর্ম দিবস হিসেবেও পরিচিত।স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে অবতরণভারতের শ্রাবস্তী থেকে প্রায় ৩০ যোজন দূরে সাংকাশ্য নগর অবস্থিত বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, মহামৌদগল্যায়ন স্থবিরের মাধ্যমে বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গ থেকে মহাপ্রবারণার দিন সাংকাশ্য নগরে অবতরণের কথা জানান। দেবরাজ ইন্দ্র তখন দৈব প্রভাবে সুবর্ণ, রৌপ্য ও মণিময় তিনটি সোপান নির্মাণ করেন। সোপানগুলোর পাদদেশ সাংকাশ্য নগরের দ্বারে এবং শীর্ষ সুমেরু পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করা হয়। দক্ষিণ দিকের সুবর্ণ সোপান দেবতাদের জন্য, বাম দিকের রৌপ্য সোপান মহাব্রহ্মাদের জন্য এবং মাঝের মণিময় সোপান বুদ্ধের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই অবতরণের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বুদ্ধের তিন মাসের বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়।ধর্ম প্রচারে বুদ্ধের নির্দেশনাপ্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও যুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, যশ ও তার ৫৪ জন সহচরসহ মোট ৬০ জন শিষ্যকে বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, বহু মানুষের হিত ও সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য এবং দেবতা, ব্রহ্মা ও মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ধর্ম প্রচার করতে হবে। তার নির্দেশনা ছিল, ধর্মের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে যেন কল্যাণ থাকে এবং তা যেন অর্থপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ হয়।বুদ্ধের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিষ্যরা বিভিন্ন দিকে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ যুগে যুগে ধর্ম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ধর্মসভা, গৃহস্থের বাড়ি, গ্রন্থ রচনা এবং আধুনিক সময়ে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বুদ্ধের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সদ্ধর্মের সংরক্ষণ ও প্রসারে তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বুদ্ধের মানবতাবাদী শিক্ষার চর্চা ও প্রয়োগের বিকল্প নেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই তার মহান দর্শন অনুসরণ, অনুধাবন ও অনুশীলনের মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে পারেন। প্রবারণা আমাদের আত্মশুদ্ধি, ক্ষমাশীলতা, মৈত্রী ও পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার সেই শিক্ষাই দেয়। এই পূর্ণিমার আলোয় মানুষের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূর হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও সম্প্রীতি।ভবতু সব্ব মঙ্গলং—সকলের মঙ্গল হোক।[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]