ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে মামলা করার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইজিপি। কিন্তু চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কেন থামছে না অর্থ আদায়? রাজনৈতিক আশ্রয়, ভয়ের সংস্কৃতি, দুর্বল তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনার বয়রায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না, সাক্ষ্য দিতেও ভয় পান। এ বাধা দূর করতে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তবে নতুন আইন করার উদ্যোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি তো আগে থেকেই অপরাধ। তাহলে বিদ্যমান আইন দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? নতুন আইনে পুলিশের কী ক্ষমতা বাড়বে? আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কী হবে?
চাঁদাবাজি অপরাধ, আইনও আছে
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি নতুন কোনো অপরাধ নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ থেকে ৩৮৯ ধারায় ভয় দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান জামানত দিতে বাধ্য করলে তা চাঁদাবাজির অপরাধ হতে পারে। ৩৮৪ ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধের জন্য পরবর্তী ধারাগুলোতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন সরকারের আইনভান্ডারে রয়েছে।
চাঁদাবাজি কেন থামছে না
চাঁদাবাজির বিস্তার বোঝার জন্য শুধু অপরাধীর সংখ্যা বা মামলা গণনা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে এবং কেন তা ভাঙা কঠিন। রাজধানীতে চাঁদাবাজির ধরন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফুটপাতের দোকান, বাজার, পরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও প্রতিদিন দোকানপ্রতি টাকা নেওয়া হয়, কোথাও মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসায়ী বা বাজার থেকে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকার বরাতে বলা হয়, রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হিসেবে ১২৮০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪৮ জনকে সশস্ত্র অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজনের সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধীর সংখ্যা নয়।
এ ধরনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, চাঁদাবাজি সব সময় বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধীর কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ভয়ভীতি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার কিংবা সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব সংযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে।
ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না কেন
চাঁদাবাজির অভিযোগ না করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিরাপত্তার ভয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, মারধর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগের পরও যদি ভুক্তভোগীকে একই এলাকায় থাকতে ও ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে তাঁর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধের আশঙ্কা। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন থাকবে কি না, তদন্তের খবর অভিযুক্তের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব প্রশ্নও ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা। অভিযোগ করার পরও যদি অপরাধীকে আটক করা না হয়, মামলা এগোয় না কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার ফিরে এসে অর্থ দাবি করেন, তাহলে অন্য ভুক্তভোগীরাও নীরব থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পুলিশকে নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের সুযোগ দেওয়া কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুলিশকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন আইনে কী থাকা জরুরি
আইজিপি যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তার বিস্তারিত খসড়া বা চূড়ান্ত আইন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কার্যকর আইন তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট শর্ত
পুলিশ কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে, তা আইনে পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও, অডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও নিয়ম থাকা দরকার।
২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা
ভুক্তভোগীকে অভিযোগ করতে বাধ্য করা যাবে না; আবার তিনি অভিযোগ না করলেও তার নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিচয় গোপন রাখা, হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আদালতে সাক্ষ্য বা তদন্তের প্রয়োজনে পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন হলে কী সুরক্ষা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।
৩. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ
চাঁদাবাজির সঙ্গে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলে তার পরিচয় যেন তদন্তে বাধা না হয়। একইভাবে, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতিপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত প্রমাণ, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও আইনি দায়। প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিকে সহজে গ্রেপ্তার করা—দুই ধরনের বৈষম্যই আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।
৪. পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো
ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়লে পুলিশের উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রও বাড়বে। এটি চাঁদাবাজি দমনে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসায়িক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগত শর্ত মানতে হবে; অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
৫. অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা
চাঁদা সংগ্রহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না। তদন্তে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অপরাধের সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আইনসম্মত তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।
তালিকা আছে, তবু ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বাস্তবতাও দেখা জরুরি। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।
এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা আর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এক নয়। তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় যেন আইন প্রয়োগে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কমিউনিটি পুলিশিং নতুন ঝুঁকি?
আইজিপি জানিয়েছেন, কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল ধারণা হলো, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সহায়তা এবং পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সীমা স্পষ্ট না থাকলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই ব্যবস্থাকে নিজেদের বিরোধীদের চাপে রাখা কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে যে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই আরও জটিল হতে পারে।
তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যদের নিয়োগ বা অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড, দায়িত্ব, আচরণবিধি, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া দরকার। তাঁদের কোনো আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও তদারকিও থাকতে হবে।
চাঁদাবাজি বন্ধের আসল পরীক্ষা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে। তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট যাই হোক, চাঁদাবাজি দমনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পুলিশের কার্যকারিতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজন ভুক্তভোগী নিরাপদে অভিযোগ করতে পারছেন, কতটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, কতজন অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে এবং বিচার শেষে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন কি না—এসবও দেখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাঁদাবাজি বন্ধের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও।
নতুন আইন যদি ভুক্তভোগীর নীরবতার বাধা দূর করে, পুলিশের তদন্তকে তথ্য-প্রমাণনির্ভর করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয়, প্রভাবশালীরা সুরক্ষা পান কিংবা পুলিশি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের পরীক্ষা নতুন আইন পাসের দিন নয়; পরীক্ষা হবে সেই দিন, যেদিন একজন সাধারণ দোকানি, পরিবহনশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও নিরাপদে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে মামলা করার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইজিপি। কিন্তু চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কেন থামছে না অর্থ আদায়? রাজনৈতিক আশ্রয়, ভয়ের সংস্কৃতি, দুর্বল তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনার বয়রায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না, সাক্ষ্য দিতেও ভয় পান। এ বাধা দূর করতে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তবে নতুন আইন করার উদ্যোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি তো আগে থেকেই অপরাধ। তাহলে বিদ্যমান আইন দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? নতুন আইনে পুলিশের কী ক্ষমতা বাড়বে? আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কী হবে?
চাঁদাবাজি অপরাধ, আইনও আছে
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি নতুন কোনো অপরাধ নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ থেকে ৩৮৯ ধারায় ভয় দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান জামানত দিতে বাধ্য করলে তা চাঁদাবাজির অপরাধ হতে পারে। ৩৮৪ ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধের জন্য পরবর্তী ধারাগুলোতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন সরকারের আইনভান্ডারে রয়েছে।
চাঁদাবাজি কেন থামছে না
চাঁদাবাজির বিস্তার বোঝার জন্য শুধু অপরাধীর সংখ্যা বা মামলা গণনা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে এবং কেন তা ভাঙা কঠিন। রাজধানীতে চাঁদাবাজির ধরন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফুটপাতের দোকান, বাজার, পরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও প্রতিদিন দোকানপ্রতি টাকা নেওয়া হয়, কোথাও মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসায়ী বা বাজার থেকে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকার বরাতে বলা হয়, রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হিসেবে ১২৮০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪৮ জনকে সশস্ত্র অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজনের সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধীর সংখ্যা নয়।
এ ধরনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, চাঁদাবাজি সব সময় বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধীর কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ভয়ভীতি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার কিংবা সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব সংযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে।
ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না কেন
চাঁদাবাজির অভিযোগ না করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিরাপত্তার ভয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, মারধর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগের পরও যদি ভুক্তভোগীকে একই এলাকায় থাকতে ও ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে তাঁর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধের আশঙ্কা। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন থাকবে কি না, তদন্তের খবর অভিযুক্তের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব প্রশ্নও ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা। অভিযোগ করার পরও যদি অপরাধীকে আটক করা না হয়, মামলা এগোয় না কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার ফিরে এসে অর্থ দাবি করেন, তাহলে অন্য ভুক্তভোগীরাও নীরব থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পুলিশকে নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের সুযোগ দেওয়া কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুলিশকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন আইনে কী থাকা জরুরি
আইজিপি যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তার বিস্তারিত খসড়া বা চূড়ান্ত আইন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কার্যকর আইন তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট শর্ত
পুলিশ কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে, তা আইনে পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও, অডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও নিয়ম থাকা দরকার।
২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা
ভুক্তভোগীকে অভিযোগ করতে বাধ্য করা যাবে না; আবার তিনি অভিযোগ না করলেও তার নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিচয় গোপন রাখা, হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আদালতে সাক্ষ্য বা তদন্তের প্রয়োজনে পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন হলে কী সুরক্ষা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।
৩. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ
চাঁদাবাজির সঙ্গে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলে তার পরিচয় যেন তদন্তে বাধা না হয়। একইভাবে, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতিপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত প্রমাণ, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও আইনি দায়। প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিকে সহজে গ্রেপ্তার করা—দুই ধরনের বৈষম্যই আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।
৪. পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো
ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়লে পুলিশের উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রও বাড়বে। এটি চাঁদাবাজি দমনে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসায়িক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগত শর্ত মানতে হবে; অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
৫. অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা
চাঁদা সংগ্রহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না। তদন্তে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অপরাধের সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আইনসম্মত তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।
তালিকা আছে, তবু ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বাস্তবতাও দেখা জরুরি। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।
এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা আর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এক নয়। তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় যেন আইন প্রয়োগে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কমিউনিটি পুলিশিং নতুন ঝুঁকি?
আইজিপি জানিয়েছেন, কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল ধারণা হলো, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সহায়তা এবং পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সীমা স্পষ্ট না থাকলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই ব্যবস্থাকে নিজেদের বিরোধীদের চাপে রাখা কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে যে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই আরও জটিল হতে পারে।
তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যদের নিয়োগ বা অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড, দায়িত্ব, আচরণবিধি, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া দরকার। তাঁদের কোনো আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও তদারকিও থাকতে হবে।
চাঁদাবাজি বন্ধের আসল পরীক্ষা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে। তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট যাই হোক, চাঁদাবাজি দমনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পুলিশের কার্যকারিতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজন ভুক্তভোগী নিরাপদে অভিযোগ করতে পারছেন, কতটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, কতজন অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে এবং বিচার শেষে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন কি না—এসবও দেখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাঁদাবাজি বন্ধের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও।
নতুন আইন যদি ভুক্তভোগীর নীরবতার বাধা দূর করে, পুলিশের তদন্তকে তথ্য-প্রমাণনির্ভর করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয়, প্রভাবশালীরা সুরক্ষা পান কিংবা পুলিশি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের পরীক্ষা নতুন আইন পাসের দিন নয়; পরীক্ষা হবে সেই দিন, যেদিন একজন সাধারণ দোকানি, পরিবহনশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও নিরাপদে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

আপনার মতামত লিখুন