একটি মরদেহেরও দুটি পরিণতি হতে পারে-একটি তার সৎকার, অন্যটি তার মৃত্যুর সত্য উদ্ঘাটন। প্রথমটি সম্পন্ন হলেই দ্বিতীয়টির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া কোনো কোনো মরদেহ পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হয়, অথচ তার মৃত্যুর রহস্য থেকে যায় অন্ধকারে। যে মানুষটির একদিন নাম ছিল, ঠিকানা ছিল, ছিল আপনজন। মৃত্যুর পর তার পরিচয়টুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে কোথাও হয়তো একটি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, আর কোনো অপরাধের সঙ্গে তার মৃত্যুর যোগ থাকলে আড়ালে থেকে যায় অপরাধী।
সম্প্রতি প্রথম আলোয় (২৩ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত নদ-নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের একটি প্রতিবেদন এসব প্রশ্নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৪৩০টি। সব মিলিয়ে পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৪। এর মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। একই সময়ে এসব ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি মৃত্যু হত্যাকাণ্ডের ফল নয়। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও অন্যান্য কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা, বছরের পর বছর মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়ার তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিষয়টি তাই শুধু অপরাধের খবর হিসেবে দেখার নয়-মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও ভাবার।
মৃত্যুর পরও কেন হারিয়ে যাবে মানুষের পরিচয়?
পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পেছনে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং কীভাবে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে করা সাধারণ ডায়েরি, উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা জরুরি। এমন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারবে। একই সঙ্গে পরিচয় শনাক্তের জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একটি পরিবার তার স্বজনের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেও শোকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। তাই পরিচয়হীন মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হত্যা মামলা হলেই কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়। একটি মামলায় সত্য উদ্ঘাটন, প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধী শনাক্তকরণ, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার সম্পন্ন করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচয়হীন মরদেহের ক্ষেত্রে তদন্তের জটিলতা আরও বেশি। মরদেহে পচন ধরলে আলামত নষ্ট হতে পারে। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। আবার যে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি সেখানেই ঘটেছে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধীরা এক স্থানে হত্যা করে অন্য স্থানে মরদেহ ফেলে দিতে পারে। ফলে তদন্তকারীদের বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোতে হয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব হত্যা মামলার অগ্রগতি কতটা? কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কতটি মামলায় বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং কতজন অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন? প্রথম আলোর আলোচ্য প্রতিবেদনে এসব মামলার চূড়ান্ত পরিণতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তাই অনুমানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্যগুলো চাওয়াই যুক্তিসংগত।
কারণ, মামলা হওয়ার পর কী ঘটছে, সেটি জানা জনস্বার্থের বিষয়। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার কারণ কী, আলামতের অভাবে তদন্ত আটকে থাকলে সেই সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যায়, আর দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি কী-এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
এখানে তদন্তকারী সংস্থার কাজকে আগাম ব্যর্থ বলা উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের কাজের জটিলতা স্বীকার করেই প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানানো জরুরি। ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ তদন্তকারীর সমন্বয় ছাড়া অনেক জটিল অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন কঠিন হতে পারে।
নদীকে অপরাধ আড়াল করার জায়গা হতে দেওয়া যাবে না
নৌ পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে এবং নিজেদের আড়াল করতে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর স্রোতে মরদেহ দূরে চলে যেতে পারে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে পচন ধরে আলামত নষ্ট হতে পারে। অপরাধীরা এই বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে-এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব সামনে আসে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার, মামলা দায়ের ও তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধীরা যাতে নদীপথকে মরদেহ গোপন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। তবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।
প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার, ডিএনএ বিশ্লেষণের সুযোগ এবং দক্ষ জনবল থাকলে পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্ত করা ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। কোনো মরদেহ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বিকল্প বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং তাদের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি পরিবার যখন তার স্বজনকে খুঁজছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতা যেন তার দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে না দেয়।
এসব উদ্যোগের কোনোটিই একা সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধের সুযোগ কমানো, পরিচয় শনাক্ত করা এবং তদন্তকে এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ হতে পারে।
অপরাধের খবর যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়
প্রতিদিন নানা ধরনের অপরাধের খবর সামনে আসে। আমরা ক্ষুব্ধ হই, শোক প্রকাশ করি, অপরাধীর শাস্তি দাবি করি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। এভাবে ভয়াবহ ঘটনাও একসময় আমাদের কাছে পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে-এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে সব ধরনের অপরাধের প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন মৃত্যুর ধরন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য তথ্য, হত্যা মামলার অগ্রগতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা। আবেগের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তবেই সমস্যার প্রকৃত চেহারা বোঝা এবং কার্যকর সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
সবশেষে, নদীতে ভেসে ওঠা একটি মরদেহ আমাদের সামনে তিনটি মৌলিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, হত্যার ঘটনা প্রমাণিত হলে অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য তদন্তকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব দুর্বলতা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
নদীতে কতটি মরদেহ উদ্ধার হলো, শুধু সেই হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়। জরুরি হলো, কতজনের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া গেল, কতটি মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হলো এবং এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নদীতে ভেসে ওঠা প্রতিটি মরদেহ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
একটি মরদেহেরও দুটি পরিণতি হতে পারে-একটি তার সৎকার, অন্যটি তার মৃত্যুর সত্য উদ্ঘাটন। প্রথমটি সম্পন্ন হলেই দ্বিতীয়টির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া কোনো কোনো মরদেহ পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হয়, অথচ তার মৃত্যুর রহস্য থেকে যায় অন্ধকারে। যে মানুষটির একদিন নাম ছিল, ঠিকানা ছিল, ছিল আপনজন। মৃত্যুর পর তার পরিচয়টুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে কোথাও হয়তো একটি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, আর কোনো অপরাধের সঙ্গে তার মৃত্যুর যোগ থাকলে আড়ালে থেকে যায় অপরাধী।
সম্প্রতি প্রথম আলোয় (২৩ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত নদ-নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের একটি প্রতিবেদন এসব প্রশ্নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৪৩০টি। সব মিলিয়ে পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৪। এর মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। একই সময়ে এসব ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি মৃত্যু হত্যাকাণ্ডের ফল নয়। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও অন্যান্য কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা, বছরের পর বছর মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়ার তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিষয়টি তাই শুধু অপরাধের খবর হিসেবে দেখার নয়-মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও ভাবার।
মৃত্যুর পরও কেন হারিয়ে যাবে মানুষের পরিচয়?
পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পেছনে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং কীভাবে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে করা সাধারণ ডায়েরি, উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা জরুরি। এমন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারবে। একই সঙ্গে পরিচয় শনাক্তের জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একটি পরিবার তার স্বজনের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেও শোকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। তাই পরিচয়হীন মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হত্যা মামলা হলেই কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়। একটি মামলায় সত্য উদ্ঘাটন, প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধী শনাক্তকরণ, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার সম্পন্ন করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচয়হীন মরদেহের ক্ষেত্রে তদন্তের জটিলতা আরও বেশি। মরদেহে পচন ধরলে আলামত নষ্ট হতে পারে। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। আবার যে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি সেখানেই ঘটেছে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধীরা এক স্থানে হত্যা করে অন্য স্থানে মরদেহ ফেলে দিতে পারে। ফলে তদন্তকারীদের বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোতে হয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব হত্যা মামলার অগ্রগতি কতটা? কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কতটি মামলায় বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং কতজন অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন? প্রথম আলোর আলোচ্য প্রতিবেদনে এসব মামলার চূড়ান্ত পরিণতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তাই অনুমানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্যগুলো চাওয়াই যুক্তিসংগত।
কারণ, মামলা হওয়ার পর কী ঘটছে, সেটি জানা জনস্বার্থের বিষয়। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার কারণ কী, আলামতের অভাবে তদন্ত আটকে থাকলে সেই সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যায়, আর দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি কী-এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
এখানে তদন্তকারী সংস্থার কাজকে আগাম ব্যর্থ বলা উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের কাজের জটিলতা স্বীকার করেই প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানানো জরুরি। ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ তদন্তকারীর সমন্বয় ছাড়া অনেক জটিল অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন কঠিন হতে পারে।
নদীকে অপরাধ আড়াল করার জায়গা হতে দেওয়া যাবে না
নৌ পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে এবং নিজেদের আড়াল করতে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর স্রোতে মরদেহ দূরে চলে যেতে পারে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে পচন ধরে আলামত নষ্ট হতে পারে। অপরাধীরা এই বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে-এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব সামনে আসে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার, মামলা দায়ের ও তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধীরা যাতে নদীপথকে মরদেহ গোপন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। তবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।
প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার, ডিএনএ বিশ্লেষণের সুযোগ এবং দক্ষ জনবল থাকলে পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্ত করা ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। কোনো মরদেহ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বিকল্প বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং তাদের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি পরিবার যখন তার স্বজনকে খুঁজছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতা যেন তার দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে না দেয়।
এসব উদ্যোগের কোনোটিই একা সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধের সুযোগ কমানো, পরিচয় শনাক্ত করা এবং তদন্তকে এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ হতে পারে।
অপরাধের খবর যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়
প্রতিদিন নানা ধরনের অপরাধের খবর সামনে আসে। আমরা ক্ষুব্ধ হই, শোক প্রকাশ করি, অপরাধীর শাস্তি দাবি করি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। এভাবে ভয়াবহ ঘটনাও একসময় আমাদের কাছে পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে-এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে সব ধরনের অপরাধের প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন মৃত্যুর ধরন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য তথ্য, হত্যা মামলার অগ্রগতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা। আবেগের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তবেই সমস্যার প্রকৃত চেহারা বোঝা এবং কার্যকর সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
সবশেষে, নদীতে ভেসে ওঠা একটি মরদেহ আমাদের সামনে তিনটি মৌলিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, হত্যার ঘটনা প্রমাণিত হলে অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য তদন্তকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব দুর্বলতা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
নদীতে কতটি মরদেহ উদ্ধার হলো, শুধু সেই হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়। জরুরি হলো, কতজনের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া গেল, কতটি মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হলো এবং এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নদীতে ভেসে ওঠা প্রতিটি মরদেহ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন