সংবাদ

মতামত

বাবার পরিচয়ে কি সন্তানের চাকরি আটকানো যায়

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও শুধু পরিবারের কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও অনেক প্রার্থী এমন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের জন্য এক যুগ আগের একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। সে রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, প্রার্থীকে বিচার করতে হবে তার নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও পূর্ববৃত্তান্ত দিয়ে, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা দিয়ে নয়।শাহনাজ খাতুন ও মো. রাজশ খান ৩২তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অংশ নেন। শাহনাজ ছিলেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের সহকারী সার্জন পদের প্রার্থী, রাজশ সড়ক ও জনপথ ক্যাডারের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের প্রার্থী। তাদের বাবা মো. হাসান আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সম্মানী ভাতা পেতেন।দুজনই প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর সরকার ১ হাজার ৬১৯ জনের নিয়োগের যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, তাতে তাদের নাম বা রোল নম্বর ছিল না।পরে তারা জানতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের একটি গোপনীয় প্রতিবেদন তাদের নিয়োগ আটকে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাদের বাবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। অথচ দুই প্রার্থীর নিজেদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো মামলাও ছিল না।এরপর তারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট পিটিশন নম্বর ৪৮২ ও ৪৮৩/২০১৪)।প্রার্থীদের আইনজীবী মোহাম্মদ জিশান হায়দার দুটি যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথমত, নাম বাদ দেওয়ার আগে প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি, বক্তব্য শোনার সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, বাবার কারণে সন্তানকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৯(১) অনুচ্ছেদের (সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা) পরিপন্থী। তার মতে, সরকার প্রার্থীর উপযুক্ততা যাচাই করতে পারে, তবে সেই যাচাইয়ের যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে প্রার্থীর নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নুসরাত জাহান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-এর ওপর নির্ভর করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সরাসরি নিয়োগের আগে প্রার্থীর পূর্ববৃত্তান্ত যাচাই বাধ্যতামূলক এবং এনএসআইয়ের প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া যায়নি। তারা আরও বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পেলেই নিয়োগ পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার তৈরি হয় না।বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ৪ জুন রায় দেন। আদালত প্রথমেই দেখেন, প্রার্থীদের পরীক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। বাবার বিষয়ে প্রতিবেদনের কথা সরকার জবাবি হলফনামায় কাগজপত্র দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকারও করেনি। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারির একটি অফিস আদেশে এনএসআই ১৮ জন প্রার্থীর বিষয়ে "পুনঃ আপত্তি" জানিয়েছিল, কিন্তু এই দুজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা সেখানে বলা হয়নি।এরপর আদালত বিধিমালার ৩(৩)(খ) বিধির ভাষা বিশ্লেষণ করেন। বিধিটি বলছে, নির্বাচিত ব্যক্তির পূর্ববৃত্তান্ত উপযুক্ত সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে তাকে প্রজাতন্ত্রের চাকরির অনুপযুক্ত মনে না হলে তবেই নিয়োগ দেওয়া যাবে। আদালতের ব্যাখ্যায়, যাচাইয়ের বিষয় হলেন প্রার্থী নিজে, তার পরিবারের অন্য কেউ নন।সরকার এমন কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি যে প্রার্থীরা নিজেরা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়িত। তাই আদালত বলে, বাবা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বা তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন, শুধু এই কারণে সন্তানদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলা সন্তানের পূর্ববৃত্তান্ত হয়ে যায় না।আদালত গাজী জসিমউদ্দিন বনাম বাংলাদেশ (৫০ ডিএলআর ৩১) মামলার নীতি অনুসরণ করেন। সে মামলায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সরকারকে যুক্তিসংগত নিয়োগবিধি, পরীক্ষা বা যোগ্যতা নির্ধারণে বাধা দেয় না। তবে সেই শর্ত হতে হবে যুক্তিসংগত, স্বেচ্ছাচারমুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযুক্ততার সঙ্গে যৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত। কেবল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে আলাদা করে বাদ দিলে এবং একই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করলে বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে।একই সূত্রে বাংলাদেশ বনাম মো. মতিয়ার রহমান (১৯৮২ বিএলডি (এডি) ১০৯) মামলার নীতিও উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই তার সুচিন্তিত মতামত সরকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।অর্থাৎ প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন অতীত, দেশের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সততা ও শৃঙ্খলা যাচাই করা বৈধ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা স্বেচ্ছাচারী বৈষম্য বৈধ নয়।হাইকোর্ট দুটি রুলই চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে দুই আবেদনকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত না করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনত অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শাহনাজ খাতুনকে সহকারী সার্জন এবং মো. রাজশ খানকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়টি ৩ সিএলআর (এইচসিডি) ২০১৫-তে প্রকাশিত।এই রায় বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার প্রেক্ষাপটে দেওয়া। তবে এর ভিত্তি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ, যা প্রজাতন্ত্রের সব চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সহকারী শিক্ষকের পদও তার বাইরে নয়। তাই যারা সব ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও শুধু বাবা-মা বা স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মামলার কারণে বাদ পড়েছেন, তাদের সামনে আইনি পথ খোলা আছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

বাবার পরিচয়ে কি সন্তানের চাকরি আটকানো যায়