ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের বড় বিক্ষোভ। যুদ্ধ-চালিত জ্বালানি সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন ও শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা আর ‘প্রজন্মগত সংঘাতে’ পুড়ছে ইউরোপ। ফ্রান্সের একটি স্কুল থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ মুহূর্তের মধ্যে স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে একদিনেই ৫ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছে। যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১২০০-এর বেশি মানুষ আটক হয়েছে।
যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম
ইউরোপের বর্তমান ক্ষোভের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ট্রিগার হলো জ্বালানির দাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের জেরে হরমুজ প্রণালীর তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ইউরোপের ডিজেল বাজারে। ইতালিতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২.৩০ ইউরোর বেশি হয়ে যায়। রাশিয়ার জ্বালানি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইউরোপ ব্যয়বহুল মার্কিন এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ কেবল অজুহাত। সরকারগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল ব্যয় বাড়িয়েছে, যার অর্থ আসছে কল্যাণমূলক খাত থেকে কেটে নিয়ে। ‘যুদ্ধরাষ্ট্রের’ জন্য টাকা জোগাড় করতে ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ সংকুচিত হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকট
করোনা-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি ৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তিন বছরের সর্বোচ্চ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ আবাসন সংকট।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় তাকে উচ্ছেদ করা হয়, যিনি পরে হাসপাতালে মারা যান। এই ঘটনা স্পেনজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। নির্বাচনের ডাক পর্যন্ত দিতে হয়। পর্তুগালে তরুণরা প্ল্যাকার্ড হাতে নেমেছেন। তাদের স্লোগান—‘৫০ বছরের আগে বাবা-মায়ের বাড়ি ছাড়তে চাই’।
শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের বিরুদ্ধে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভাঙাচোরা বাথরুম এবং গরমে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ক্লাস করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা স্কুল অবরোধ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ‘পারকোরসুপ’ প্ল্যাটফর্মের জটিলতাও তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
প্রবীণতন্ত্র
বিক্ষোভের গভীরতম কারণটি হলো জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। ইউরোপের জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের বড় অংশ আটকে আছে প্রবীণদের হাতে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম ভ্লান্ডাস এটিকে বলেছেন ‘জেরোনটোনমিয়া’। একটি গণতান্ত্রিকভাবে টিকিয়ে রাখা অর্থনৈতিক স্থবিরতা, যেখানে প্রবীণদের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা রক্ষা করতে গিয়ে তরুণদের শিক্ষা, আবাসন ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়ছে।
ফ্রান্সে পেনশন খাতে সরকারি ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ চলে। অথচ তরুণদের বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। স্পেনে এই হার ২২ শতাংশের বেশি। তরুণরা মনে করছেন, যে সিস্টেমটি তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিল, সেটিই এখন তাদের পায়ে শিকল পড়ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিক্ষোভ আসলে ‘একটি নির্দিষ্ট আকারে আটকে যাওয়া অর্থনৈতিক পাই’ নিয়ে প্রজন্মের লড়াই।
মূলত, ইউরোপের তরুণরা কেবল জ্বালানির দাম বা একটি বাড়িভাড়ার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি। তারা একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নামছে। যেখানে তাদের শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ সুযোগ সঙ্কুচিত করা হচ্ছে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের সুবিধা রক্ষার জন্য।

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের বড় বিক্ষোভ। যুদ্ধ-চালিত জ্বালানি সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন ও শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা আর ‘প্রজন্মগত সংঘাতে’ পুড়ছে ইউরোপ। ফ্রান্সের একটি স্কুল থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ মুহূর্তের মধ্যে স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে একদিনেই ৫ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছে। যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১২০০-এর বেশি মানুষ আটক হয়েছে।
যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম
ইউরোপের বর্তমান ক্ষোভের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ট্রিগার হলো জ্বালানির দাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের জেরে হরমুজ প্রণালীর তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ইউরোপের ডিজেল বাজারে। ইতালিতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২.৩০ ইউরোর বেশি হয়ে যায়। রাশিয়ার জ্বালানি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইউরোপ ব্যয়বহুল মার্কিন এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ কেবল অজুহাত। সরকারগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল ব্যয় বাড়িয়েছে, যার অর্থ আসছে কল্যাণমূলক খাত থেকে কেটে নিয়ে। ‘যুদ্ধরাষ্ট্রের’ জন্য টাকা জোগাড় করতে ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ সংকুচিত হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকট
করোনা-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি ৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তিন বছরের সর্বোচ্চ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ আবাসন সংকট।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় তাকে উচ্ছেদ করা হয়, যিনি পরে হাসপাতালে মারা যান। এই ঘটনা স্পেনজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। নির্বাচনের ডাক পর্যন্ত দিতে হয়। পর্তুগালে তরুণরা প্ল্যাকার্ড হাতে নেমেছেন। তাদের স্লোগান—‘৫০ বছরের আগে বাবা-মায়ের বাড়ি ছাড়তে চাই’।
শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের বিরুদ্ধে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভাঙাচোরা বাথরুম এবং গরমে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ক্লাস করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা স্কুল অবরোধ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ‘পারকোরসুপ’ প্ল্যাটফর্মের জটিলতাও তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
প্রবীণতন্ত্র
বিক্ষোভের গভীরতম কারণটি হলো জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। ইউরোপের জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের বড় অংশ আটকে আছে প্রবীণদের হাতে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম ভ্লান্ডাস এটিকে বলেছেন ‘জেরোনটোনমিয়া’। একটি গণতান্ত্রিকভাবে টিকিয়ে রাখা অর্থনৈতিক স্থবিরতা, যেখানে প্রবীণদের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা রক্ষা করতে গিয়ে তরুণদের শিক্ষা, আবাসন ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়ছে।
ফ্রান্সে পেনশন খাতে সরকারি ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ চলে। অথচ তরুণদের বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। স্পেনে এই হার ২২ শতাংশের বেশি। তরুণরা মনে করছেন, যে সিস্টেমটি তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিল, সেটিই এখন তাদের পায়ে শিকল পড়ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিক্ষোভ আসলে ‘একটি নির্দিষ্ট আকারে আটকে যাওয়া অর্থনৈতিক পাই’ নিয়ে প্রজন্মের লড়াই।
মূলত, ইউরোপের তরুণরা কেবল জ্বালানির দাম বা একটি বাড়িভাড়ার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি। তারা একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নামছে। যেখানে তাদের শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ সুযোগ সঙ্কুচিত করা হচ্ছে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের সুবিধা রক্ষার জন্য।

আপনার মতামত লিখুন