সংবাদ

সাহিত্য

গোমতীকন্যা

প্রথম পর্ব: সেতারার মৃত্যু একলাশটা উপুড় হয়ে আছে| চেহারাটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না| তারপরও আঁধারিয়া গ্রামের মধ্যপাড়ার রব্বান শেখ তার ছোট্ট নৌকাটা নিয়ে গোমতী নদীর ধারে কুনো জাল দিয়ে মাছ ধরতে এসে লাশটা চিনে ফেলল| সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কেডা আছো গো, দেইখা যাও| লাশ পাওয়া গেছে গো...!’প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোরের সূর্যটা সবে আগুনের টকটকে লাল গোলার মতো করে আঁধারিয়া গ্রামের পুবের উঁচু তালগাছটার গা বেয়ে উঠছে| নরম-শীতল বাতাস বইছে দক্ষিণের দুয়ার ভেঙে— শন শন, শন শন| গোমতী নদীর জল ও উত্তরের জোয়ারের জল মিলে যুগপৎ শব্দ করছে— কল কল, কল কল| সাধারণত এ সময় ডাহুক ডাকে না| কিন্তু এ মুহূর্তে ডাহুকের ডাক আসছে— কোয়াক কোয়াক, কোয়াক কোয়াক| ডাহুকের ডাকে কেমন আর্তনাদের সুর| নদীর পাড়ের একটা বাঁশের উঁচু কঞ্চিতে একটা দাঁড়কাক গা ফুলিয়ে বসে আছে| কাকটার ধ্যান জলের দিকে|গোমতীর জল ও জোয়ারের জল একাকার হয়ে গেলেও নদীর পাড় ঘেঁষা বুইদ্দার বিলের জমিগুলোতে ধানের সবুজ ডগাগুলো তখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে| সেই ধানী জমির ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যায় পেতে যাওয়া জাল নৌকায় টেনে টেনে তুলছে কোনো কোনো গৃহস্থ| সুদিনে ধানী জমিতে কামলা দেওয়ার পাশাপাশি জোয়ারের মওসুমে নৌকা বেয়ে মাছ ধরা তাদের বাড়তি আয়| ওরা জালের মাছ সকালের মীরবহরি বাজারে বিক্রি করে| বেশি মাছ পেলে কেউ কেউ উপজেলা সদরেও নিয়ে যায়| ওরা শুধু আইলের ফাঁকে ফাঁকে পেতে যাওয়া জালেই মাছ ধরে না| কেউ কেউ দলবেঁধে গোমতীর স্রোতের ভেতর বড় ডিঙি নৌকা নিয়ে জাল ফেলে| কেউ আবার ছোট্ট কোষা নৌকা নিয়েই কুনোজাল ফেলে গোমতীর মাছ ধরে|রব্বান শেখ কারও সাড়া না পেয়ে লাশটা আবার দেখল| লাশটা জলের ওপর দুলছে দক্ষিণের কোড়ে, ঘের দেওয়া কচুরিপানার ফাঁকে| হাত-পা এমনভাবে মেলে দেওয়া যে তাতে মনে হচ্ছে, কোনো যুবতী মহিলা উপুড় হয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে যেন লাশ হয়েছে| পরনের শাড়িটা ঢেউয়ের দুলুনিতে একবার উরুর ওপর উঠছে, আরেকবার হাঁটুতে নেমে আসছে| চুলগুলো তখনও খোঁপা করা| জল গিলতে গিলতে লাশ ফুলে উঠে গায়ের ব্লাউজটা কেমন কামড়ে ধরেছে|রব্বান শেখ আবার ডাক দিল, ‘ও-ও, কেউ কি শুনতাছ না? লাশ পাওয়া গেছে...’|কচুরিপানার ঘের দেওয়া কোড়ের ওপাশ থেকে করিম মিয়া গলা বাড়াল, ‘কী পাওয়া গেছে, মাছ? কত বড়?’রব্বান শেখ বলল, ‘না না, লাশ’|‘লাশ, কার লাশ?’‘মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ’|করিম মিয়া নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘কও কী!’রব্বান শেখ বলল, ‘হ, হ, দেইখা যাও’|করিম মিয়া কোড়ের ঘেরের কাছাকাছি নৌকাটা আনতেই লাশটার ওপর তার চোখে পড়ল| লাশ দেখেই সে আঁতকে উঠে বলল, ‘হায় মা’বুদ’| পরক্ষণই তার চোখ গিয়ে পড়ল লাশের উরু ও পরনের শাড়িটার সংযোগস্থলে| তার চোখ স্থির হয়ে গেল|রব্বান শেখ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘মনসুর পাগলা কই কই গিয়া তার বউয়ের লাশ খুঁজতাছে| আর লাশটা ভাইসা উঠছে এইখানে, কোড়ের পাড়’|করিম মিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হ, তাই তো!’ বলেই সে লাশের উরুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল| সে লাশের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রব্বান মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তুক আমার একটা কথা’|রব্বান মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’‘লাশটা তো উল্টাইয়া রইছে| চেহারা দেখা যাইতাছে না|‘তয় কী হইছে?’‘তুমি কেমনে বুঝলা, এই লাশটা যে মনসুর পাগলার বউয়ের?‘ও, হেইডা তো ঠিক কইছ| তাইলে এই লাশটা কার?‘অন্য কারোর তো হইতে পারে’|‘আমার মনে হইতাছে, লাশটা মনসুর পাগলার বউয়েরই| শরীরের গঠন দেখতাছ না?’করিম মিয়া আবার লাশের দিকে তাকাল| লাশটা ভরাট শরীরের| এটা শুধু নদীর জল খেয়ে ফুলে উঠেছে বলে নয়| মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমকে সে বহুবার দেখেছে| পাশাপাশি পাড়ার মানুষ তারা| ভরাট শরীরে নিয়ে যখন পাড়ে, গোপাটে ও বাড়ির ধারে থপথপ করে হাঁটত, তখন আপনা থেকেই দৃষ্টি আটকে যেত| সেতারা বেগম হাসতও বেশ— খলবল, খলবল| মাঝেমধ্যে দেখা যেত, গোপাটে বা বুইদ্দার খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভুঁইয়া বাড়ির আনিসের সঙ্গে কথা বলছে| খালের এপার আর ওপার| বুইদ্দার খালটা সরু| সুদিন এলে শুকিয়ে যায়| বর্ষার মওসুমে যদিও জোয়ারের জলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে|করিম মিয়া তারপরও দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, মানলাম এই লাশটা মনসুর পাগলার বউয়ের| কিন্তুক মনসুর পাগলার বউ তো ডুবছে মোল্লাকান্দি গেরামের ভাটিতে| হেই পুনোয়ারার বটগাছটার কাছে| লাশ তাইলে এক মাইল উজাইয়া এইখানে আইলো কেমন?’রব্বান শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘করিম ভাই, কথাডা তো তুমি ঠিক কইছ| লাশ তো উজাইয়া আইবার পারে না| তাইলে?’করিম মিয়া বলল, ‘রব্বান মিয়া, একটা কাম করতে পারি| চলো, লাশটা বৈঠা দিয়া ঠেইলা উল্টাইয়া দেখি’|রব্বান শেখ বলল, ‘হ, দেখতে পারি| লাশটা চিৎ কইরা দিলেই তো চেহারাডা দেখতে পারমু’|করিম মিয়া বলল, ‘আইচ্ছা, তুমি নৌকাটা আগাইয়া লইয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া ধাক্কা দাও| আমি এদিক দিয়া বৈঠায় ঠেলা দিতাছি’|রব্বান মিয়া বলল, ‘হেইডাই ভালা হইব’| বলেই সে নৌকাটা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল| লগি দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরিয়ে সে নৌকাটা লাশের অন্যপাশে নিয়ে এল|করিম মিয়া এপাশে নৌকাটা লাশের আরও কাছে নিয়ে ˆবঠা দিয়ে ধাক্কা দিতেই এক ধাক্কায় লাশটা চিৎ হয়ে গেল|ওরা দেখল, লাশ মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমেরই| সেতারা বেগম ডুবেছিল দু’দিন আগে, উঠতি রাতে|এই সকালে যেমন গোমতী নদীটা বেশ শান্ত, সেদিন এমন শান্ত ছিল না| সেদিন নদীর ঢেউ ছিল পাড় ভাঙা, খুঁটিতে আটকে থাকা ষাঁড়ের মতো| এর আগের দিনই বৃষ্টি হয়েছিল বেশ| সেই বৃষ্টির জলে উজানের নদী ভাটিতে এসে শব্দ তুলছিল গর্জনের মতো করে| একটার পর একটা ঢেউ ভাঁজ ভাঙছিল একে অপরের ওপর ঝাপটে পড়ে| চারিদিকে ছিল বাতাসের বিকট শব্দ— শোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ| রাতে যেমন লোঙ্গার বিল, বুইদ্দার বিল বা মরজার বিল থেকে মৃত মানুষের আর্তনাদ আসে, তেমনই আর্তনাদ আসছিল— কুঁ-ও-ও, কুঁ-ও-ও, ওঁ-ও-ও| গোমতীর ভাটিতে বর্ষার মওসুমে এমনিতেই জলের নিশানা থাকে না| নদীতে উন্মাদনা থাকলে জোয়ারের জল যেন লাফিয়ে চলে উচ্ছল তরুণীর ভোকাট্টা চলার মতো— তাধিন, তাধিন, তাধিন|এদিকে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলার মস্তানের মাজারের সঙ্গে মনসুর পাগলার আত্মার সম্পর্ক সেই ছোটবেলা ত্থেকে| সেই নয়-দশ বছর বয়স থেকে সে মস্তানের মাজারে এসে পড়ে থাকে| তার ওপর বছর শেষে মাজারে ঔরস হলে তো কোনো কথাই নেই| তার ভোকাট্টা তাধিন তাধিন নাচ আরও বেড়ে যায়| আগের দুই-তিন দিন শামিয়ানা-প্যান্ডেল টানানো থেকে শুরু করে মাজারে নতুন গিলাফ লাগানো| উরসের দিন আগরাত ধরে বাউলদের পালা দেখা| মাঝরাতে রান্নাবান্নায় তদারকি করা| সকালে কলাপাতা বিছিয়ে খিচুড়ি খাওয়া| ঘরে বউ আসার পরও সে উরস কখনও বাদ দেয়নি| তার প্রথম বউ জুলেখা মাজারে আসতে চাইত না| তারপরও সে জোর করে নিয়ে আসত| দ্বিতীয় বউ সেতারা বেগম অবশ্য নিজ থেকেই উরসে আসত|গত পরশু দিন রাতে সেই বটতলায় মস্তানের মাজারে উরস ছিল|বর্ষাকালে নদীর জল ও উত্তরের জোয়ারের জল এক হয়ে গেলে গোমতীর ভাটিতে বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার বিল ও মরজার বিলকে কেন্দ্র করে যতগুলো গ্রাম আছে, সেই কয়েকশো বছর আগে থেকেই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা| আগে নৌকায় করেই সবাইকে হোমনা বা দাউদকান্দি যেতে হতো| দাউদকান্দি থেকে পরে ভাগ হয়ে তিতাস নামে নতুন উপজেলা হলে গৌরীপুর থেকে একটি সুন্দর পাকা রাস্তা হয়েছে হোমনা ও মুরাদনগর অব্ধি| সেই রাস্তা ধরে এখন বাস-টেম্পু-রিকশা অহরহ চলে| এতে অনেক গ্রামের মানুষেরই নৌকার বাহন কমে গেছে| কিন্তু আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দি, অনুতপুর ও ছড়িয়াকান্দিসহ আরও কিছু গ্রাম গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে বলে বাহন হিসেবে নৌকার আধিক্য একটুও কমেনি| বিশেষ করে গরিব ও গৃহস্থ ঘরগুলোতে মাছ ধরার জন্য বা মীরবহরি হাটে আনাজপাতি বেচার জন্য তাদের ছোট্ট একটা কোষা বা ডিঙি নৌকা থাকবেই| যদিও অনুতপুর থেকে একটা রাস্তার কাজ চলছে| রাস্তাটা এরই মধ্যে মোল্লাকান্দির কাছাকাছি চলে এসেছে| যে হারে কাজ চলছে, এতে দেখা যাবে নতুন রাস্তাটা এক-দেড় বছরের মধ্যে বুইদ্দার বিলের বুক চিরে মীরবহরি, আঁধারিয়া, রায়তলা ও কদমতলি পেরিয়ে গেছে| অবশ্য শুকনো মওসুম বা সুদিনে এই ডোবা অঞ্চলের জীবন যাত্রা অনেকটাই অন্যরকম হয়ে যায়|মনসুর পাগলার ঘরেও একটা নৌকা আছে| নৌকাটা তার বাবার আমলের| লোহাকাঠের| এখনও বেশ মজবুত| মনসুর পাগলা অন্য কোনো কাজ করুক আর না করুক, প্রতিবছর একবার করে হলেও নৌকাটায় আলকাতরা দেয়| দু-একটা কাঠ নড়েচড়ে হয়ে গেলে মীরবহরি বাজারের বিধু কর্মকারের কাছ থেকে তারকাঁটা এনে ঠিক করে|মনসুর পাগলা সেই নৌকায় করেই সেতারা বেগমকে নিয়ে পরশু সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়| বাড়ির পর গোপাট| গোপাট লাগোয়া পুবে বুইদ্দার খাল| সেই বুইদ্দার খাল ধরে দক্ষিণ পাড়ার মুখ ছেড়ে উত্তর পাড়া হয়ে কিছুক্ষণ গেলেই গোমতী নদী| গোমতী নদী ধরে ভাটির দিকে গেলে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলা|মনসুর পাগলার সেতারা বেগমকে নিয়ে পুনোয়ারার বটতলার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী এক স্রোতের ঘূর্ণিপাকে পড়ে তার নৌকাটা একেবারে উল্টে যায়| উল্টে যাওয়া নৌকা ধরে মনসুর পাগলা কোনো মতে নিজেকে রক্ষা করলেও বউকে সে রক্ষা করতে পারেনি| সেতারা বেগম দু’বার জলে ভেসে উঠে শাড়িতে পেঁচিয়ে সেই যে ডুব দেয়, আর ভাসেনি| নৌকা ধরে ভাসতে ভাসতে মনসুর পাগলার সে কী আর্তনাদ শুরু করে, ‘আ-আ-আ, কেডা আছো গো, আমার বউ গাঙে ডুইবা গেছে| আ-আ-আ, কেডা আছো...!’মনসুর পাগলার আর্তনাদ শুনে উরসের অনেক মানুষ টর্চলাইট নিয়ে গাঙপাড়ে এসে জমা হয়| কয়েকজন ঘাটে বাঁধা দুটো নৌকা নিয়ে এসে মনসুর পাগলা ও তার নৌকাটা উদ্ধার করে| কিন্তু সিতারা বেগমকে কেউ খুঁজে পায় না|তারপর পরশুরাত ও গতকাল সারাদিন মনসুর পাগলা আঁতিপাঁতি করে সেতারা বেগমের লাশ খোঁজে! শুধু মনসুর পাগলাই না, তিন গ্রাম পর অনুতপুর থেকে সেতারা বেগমের বাবা, জেঠা, ছোট ভাইসহ বেশ কয়েকজন আসে লাশ খুঁজতে| ভুঁইয়া বাড়ির আনিসও গতকাল মনসুর পাগলার সঙ্গে রাত অব্ধি লাশ খুঁজে বেড়ায়| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, এমনকি মীরবহরির গ্রামের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে নৌকা নিয়ে লাশ খুঁজতে বের হয়| কিন্তু লাশ আর কেউ খুঁজে পায়নি| গ্রামের কেউ কেউ বলতে শুরু করে, লাশ বোয়াল মাছে খেয়ে ফেলেছে| কেউ বলে, লাশ ভাসতে ভাসতে মেঘনার মোহনায় চলে গেছে...| ক্রমশ... ***

গোমতীকন্যা