বাংলা
ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ
সাধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবারিত আকাশ|
বাঙালি জাতির আত্মিক মুক্তি ও মানসিক দীনতা
পরিহার পথে তাঁর সৃষ্টি,
বৈচিত্র্যে ভরপুর| নিজের সৃষ্টির মতো, তাঁর ব্যক্তিজীবনও
ছিল বর্ণিল ঘটনার উচ্চস্বরগামের আরোহী| প্রতিভাবান এ কবির অন্যতম
ˆবশিষ্ট্য ছিল, কোনো কিছু
অবলোকনের পর তার মধ্যে
সৃষ্টির প্রেরণায় মেতে ওঠার মাদকতা|
এক্ষেত্রে নারী ভূমিকার কথা
বলা বাহুল্য| রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ঝর্নাতলায় স্নাত হতে ভিড় করেছেন
যুগান্তরের পিঠে অগণিত মানব-মানবী| এ সকল মানুষের
সম্পর্কের সুর গোধূলি বেলার
পান্থ পাখির কাকলির মতো রাঙিয়েছে কবি
মনের ভেতর-বাহির| অজস্র
মানুষের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার রমণী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোও
(১৮৮৯-১৯৭৯) মোহময় মুগ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে
অনুরাগের ঝড় তুলেছিলেন| যে
প্রকম্পণের অনুরণন তাঁর ভাবনা সৃজন
প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ
করে|
রবীন্দ্রনাথের
সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অনুরাগ সৃষ্টির গল্পটি বড় রোমান্টিক ও
বেদনাময়| আর্জেন্টিনার কবি ওকাম্পোর সঙ্গে
রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানের ব্যবধান ছিল কয়েক হাজার
মাইল| রবীন্দ্রনাথ থেকে ২৯ বছরের
ছোট ওকাম্পোর স্থানিক ও বয়েসের দূরত্ব
তাঁদের মিতালীতে কোনো প্রভাব ফেলেনি|
ওকাম্পো জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারে
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন আয়ার্সে| বাল্যকাল তাঁর কেটেছে আভিজাত্যের
পেলব হাওয়া মেখে| তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের মতো ওকাম্পোও ছিলেন
প্রচণ্ড মেধাবী সাহিত্যিক| উদিত যৌবনে বন্ধুত্ব
গড়েছেন একাধিক পছন্দের পুরুষের সঙ্গে| মদির মাতাল চোখে
নানা পুরুষ পাশে ভিড়লেও ঘর
বাঁধেন মোনাকো এস্ত্রাদার সঙ্গে| কিন্তু ঘরে পছন্দের পুরুষের
অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চোখ পড়ে
স্বামীর দূর সম্পর্কের ভাই
মার্তিনেসের ওপর|
মার্তিনেসের
সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যে
ওকাম্পো তাকে নিয়ে উড়াল
দেন অজানা পথে| কপালে সাংসার
জীবনের সুখ না থাকায়
প্রেমিকের ঘরেও অশান্তির অনল
দাউ দাউ করে জ্বলে
ওঠে| দিশেহারা হয়ে পড়েন ভিক্টোরিয়া
ওকাম্পো| স্পর্শকাতর এমনি মুহূর্তে রবীন্দ্ররাথের
লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে|
১৯১৪ সাল বিখ্যাত সাহিত্যিক
অঁন্দ্রে জিদের হাত হয়ে তাঁর
হাতে আসে ফরাসি ভাষায়
অনূদিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ| বইটি পড়ে বিস্ময়ে
বিমুগ্ধ হন ওকাম্পো| যন্ত্রণাদগ্ধ
জীবনে গীতাঞ্জলির কবিতা ওকাম্পোকে নতুন জীবনের সন্ধান
দেয়| প্রেমিকের নির্যাতনে কাতর ওকাম্পো গভীর
রাতে পড়তে থাকেন, ‘বিপদে
মোরে রক্ষা করো, এ নহে
মোর প্রার্থনা’ কবিতা| পুরো কবিতা শেষ
করে অজানা শক্তিতে জেগে ওঠেন তিনি|
ভিক্টোরিয়ার মনে হতে থাকে
দূর অজানা থেকে অদ্ভুত আলোর
শিহরন তাঁর মধ্যে প্রবেশ
করছে|
ব্যথিত
জীবনে মুক্তি নিঃশ্বাস নেবার বাতায়ন খুলে যায় তাঁর
সামনে| রূপবর্তী ভিক্টোরিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন
গীতাঞ্জলির প্রতিটি কবিতার অন্তর্নিহিত বাণী ব্যঞ্জনার অর্থের
ওপর| আস্তে-ধীরে ওকাম্পোর মনের
অনুভাবনা অজানা পুলকে কথা কয়ে ওঠে
এ কাব্যের রচয়িতার ওপর| এতেই শেষ
নয় ওকাম্পো মনে মনে বলতে
থাকেন, ‘কবি আপনি কি
স্বপ্নদ্রষ্টা? আপনি কি মানুষের
মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ছাড়পত্র অর্জন
করেছেন প্রবল তিতিক্ষা ও ত্যাগের মাধ্যমে?
না হলে কী করে
আপনি আমার হৃদয়বাহিত বেদনার
কথা এইভাবে আপনার লেখনির মাধ্যমে জ্ঞাপন করলেন|’১ ব্যস বিনি
সুতার মালা গাঁথা শুরু
হলো বিদেশিনী সুনয়নার|
স্বপ্নময়
প্রার্থিত জীবনের প্রতিকূলে অন্ধকারে ভরে ওঠা বিদুষী
এ নারীর বাস্তবজীবন দুলতে থাকে কল্পনাতীত দুর্ভাবনায়|
মানসিক অস্থিরতায় মনে মনে তাই
কামনার বীজ বুনেন, ‘এমন
কোনো পুরুষের সন্ধান পাব না, যিনি
হবেন আমার রাত আকাশের
ধ্রুবতারা| যাঁর হাতে হাত
রেখে আমি অনায়াসে পার
হব স্বর্গের উদ্যান|’২ ব্যাকুল পিয়াসে
বাউরি মনে ভিক্টোরিয়া নিবিড়ভাবে
চোখ রাখলেন আরেকটি কবিতায়, ‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন
আশা করি, ঘটে ঘাটে
ঘুরব না আর ভাসিয়ে
আমার জীর্ণ তরী|’ ওকাম্পোর চর্ম চোখে কাঙ্ক্ষিত
পুরুষকে দেখবার প্রত্যাশা এবার হৃদয়ের
না বলা কথা মন্থনের
সায়রে অবগাহন করে| লাস্যময়ী নারী
যখন হৃদয় বীণাতে বাজিয়ে
যাচ্ছেন, ‘যে পথ দিয়ে
গেছো চলে, সেই পথে
চেয়ে একা বসে থাকি
হে’ গীত| প্রাচ্যে ঠিক
সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ নানা
সমস্যায় পড়ে একেবারে বিপর্যস্ত
ও বিধ্বস্ত| আর্থিক সমস্যা তাঁর ক্রমশ বেড়ে
চলছে| আসছে নানা দেশ
থেকে বক্তৃতার আমন্ত্রণ| কিন্তু কবির কোনো কিছুই
ভালো লাগছে না| মন যেন
কার পানে চেয়ে থাকে
তাঁর অহর্নিশ|
জীবন
পথের প্রাপ্ত-বেদনা শিল্পীর মনে সৃষ্টি চেতনায়
উর্বরতা দেয়| কথাশিল্পী কথার
আল্পনায় প্রকাশ করেন শিল্পিত সত্য|
প্রেয়সী ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক সম্পর্ক জানার পথে তাই কবি
জীবনের বিফল প্রতিবেশ অবলোকন
গুরুত্ববহ| মাতৃস্নেহ বঞ্চিত রবীন্দ্রনাথ বেদনাগ্রস্ত ছিলেন বাল্যকাল থেকে| অবচেতন মনের এ বেদনা
তাঁকে নিঃসঙ্গ করেছিল| এই মর্মন্তুদ যাতনা
তাঁর সৃষ্টি প্রেরণার উৎস| ছোটবেলা থেকে
ভাই-বোনদের মতো মাকে তিনি
কাছে পাননি| এ বঞ্চনার ভার
বহন করেছেন আমৃত্যু| মাকে কাছে না
পাবার কারণও ছিল সঙ্গত| কবির
জন্মের সময় মা সারদা
দেবীর বয়স ছিল ৩৫
বছর| রবীন্দ্রনাথের জন্মের দু’বছরের মধ্যে
পঞ্চদশ সন্তান বুধেন্দ্রর জন্ম হয়| দু’বছর আগে পৃথিবীতে
আসেন ভাই সৌমেন্দ্রনাথ| সাংসারিক
চাপে মায়ের আদর করার সময়
নেই সন্তানদের| এ সম্পর্কে বড়
ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বলেন, ‘মার কাছে আমরা
বেশিক্ষণ থাকতাম না|’৩
ছেলে-বেলায় মায়ের হাতে নয়, গৃহকর্মীদের
যত্নে বেড়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ|
মায়ের আদরের অভাবটা যেন তাঁর সঙ্গী
ছিল অনুক্ষণ| এর জন্য একটা
আক্ষেপও মনের গহিনে লালন
করতেন তিনি| প্রসঙ্গটি নিয়ে তিনি আত্মজীবনীতে
লেখেন, ‘যখনকার যেটি সহজ প্রাপ্য
তখন সেটি না জুটিলে
মানুষ কাঙ্গাল হয়ে দাঁড়ায়|’৪
মানসিকভাবে তাই মেয়েদের অনুরাগের
ওপর রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল তরুণ্যের প্রথম
প্রহর থেকে| তবে তার এই
তৃষ্ণা কদাচিৎও চোখে প্রকাশ পেত
না| অনুরাগ নিবেদনে তিনি কোনো দিন
কারো কাছে নিজে থেকে
ধরা দেননি|
জীবন
পথে কোনো রূপবতী তাঁর
সান্নিধ্যে এলে তিনি মুখ
ফিরিয়ে নিতেন তা নয়| সে
অপ্সরার স্পর্শ তাঁর অন্তরে সাড়া
জাগালেও তিনি সীমানা ভাঙতে
প্রস্তুত ছিলেন না| পথে চলতে
কভু চকিতে কারো সাথে দেখা
হলে তিনি উদাসীনতা দেখাতেন
না| রবীন্দ্রনাথ ১৭ বছর বয়েসে
বিলেত যাত্রা করেন| যাত্রা পথে মারাঠা কন্যা
সুন্দরী আনা তরখড়ের সঙ্গে
পরিচয় ঘটে| অপরূপা বিলাত
ফেরত এ কন্যা ভালবাসার
অকৃত্রিম মায়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথের
কাছে আসেন| কবি নিজে তরখড়ের
ভালোবাসার সান্নিধ্যে অবগাহন করলেও বিচ্ছেদেরে সীমানা টেনে বিদেশ যাত্রা
করেন|
আনা
তাঁর জীবনে একান্তভাবে না থাকলেও তাঁকে
হৃদয়ে বহন করেছেন গভীরভাবে|
আনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সে মেয়েটিকে আমি
ভুলিনি বা তার সে
আকর্ষণ কে কখনো লঘু
লেভেল মেরে খাটো করে
দেখিনি কোনোদিন|’৫ নানা ঘটনার
চড়াই উতরাই পেরিয়ে জীবন সামনে ধায়
রবীন্দ্রনাথের| ১৯১৩ সালে তিনি
পৌঁছে যান খ্যতির শিখরে|
গলায় একের পর এক
পরতে থাকেন বিজয় মালা| ঠিক
এই সময়ে জীবন নদীতে
পদ্মা-যমুনার ভাঙ্গা-গড়া শুরু হয়
তাঁর ইতিহাস সৃষ্টির অঙ্গীকারে|
১৯১৩
সালের পর থেকে সারা
ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব পরিভ্রমণ
শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের| ৬০
থেকে ৭২ বছর এ
এক যুগ ছিল তাঁর
বিশ্ব ভ্রমণের মাহেন্দ্রক্ষণ| ‘রবীন্দ্রনাথ ভারতের বাইরে গেছেন ১২ বার| এই
১২ বারের মধ্যে আমেরিকায় পাঁচবার, জাপানে চারবার, ইউরোপে দুবার, আর কেবল ইংল্যান্ডে
গেছেন প্রথম জীবনের দুবারসহ ৮ বার|’৬
গেছেন সিংহল, ইরান, ইরাক, চীন, বার্মা, মালয়েশিয়া,
থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া| জাহাজে
চড়ে বহু-নগরীতে একাধিকবার
গেছেন এশিয়া কিংবা ইউরোপ| ঠিক এ পথ
ধরে মিলিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার বিদুষী বন্ধু ওকাম্পোর সঙ্গে| রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য নোবেল প্রাপ্তির পর কাছের মানুষই
তাঁকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ক্ষত-বিক্ষত করতে
শুরু করে| একই সময়ে
ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বেদনার সঙ্গে যোগ হয় প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের নৃশংতা| মানবতা হননের নৃত্য-উল্লাস কবির সংবেদনশীল অন্তরে
সৃষ্টি করে দারুণ দহন
জ্বালা| কবি ব্যথাভরা হৃদয়ে
লিখলেন, ‘শতাব্দীর সৃর্য আজি রক্তমেঘ মাঝে
অস্ত গেল|’ চারদিকের বিষাক্ত বায়ুর প্রবল প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন|
বুকের
ভেতরের ব্যথাকে কাগজে বুকে টেনে পুত্র
রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার
ইচ্ছে আমাকে তাড়না করছে| মনে হয়েছে, আমার
দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে
না| আমার জীনটা যেন
আগাগোড়া ব্যর্থ|’৭ বিপর্যস্ত মানসিক
এ অবস্থায় মৃত্যু ঘটে কবির প্রিয়কন্যা
মাধবী লতার| শোকে সাগরে পতিত
হন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ| বেদনার বেলাভূমিতে দেখা হলো রানু
অধিকারী নামের কান্তিময়ী রমণীর সঙ্গে| ভারাক্রান্ত মনের বেদনা প্রশমিত
না হতেই রানু হারিয়ে
যান কবির হৃদয় আঙিনা
থেকে| অথৈ দুঃখের গহিন
গাঙে কূল উপচানো ঢেউ
ভাঙছে আর ভাঙছে কবির
জীবনে| হৃদয় বীণায় রবীন্দ্র
হৃদয়ে তখন বাউলের করুণ
বিউগলের সুরে বেজে চলেছে,
‘পথ চলাতে ক্লান্তি আসে, ক্লান্তি নামের
স্রোতে, তবু থামিস নে
তুই, ওরে পথিক, পথ
চলার এই দুঃখে|’ বিড়ম্বনাময়
জীবনের এমনি দুর্বিষহ মুহূর্তে
কবি আমন্ত্রণ পান পেরু থেকে|
ঠিক এখানেই কবির জীবনের ভিক্টোরিয়ান
ইতিহাস সৃষ্টির শুভ সূচনার আবাহন|
তথ্যসূত্র:
১.
সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা: ১৮৬, আকাশ প্রকাশন
২০২০
২.
প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা ১৮৮
৩.
ভট্টাচার্য সূধন অমিত্র, ব্যথিত
কবির অনুরাগ কথা, ২০২১, কলকাতা
৪.
প্রাগুপ্ত, ঐ
৫.
প্রাগুপ্ত, ঐ
৬.
মোমেন আবুল, রবীন্দ্রনাথ বিকল্পহীন, পৃষ্ঠা-৭৯, ইউপিএল, ঢাকা-২০১৬
৭.
সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা-১৯০, আকাশ প্রকাশন-২০২০
***

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
বাংলা
ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ
সাধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবারিত আকাশ|
বাঙালি জাতির আত্মিক মুক্তি ও মানসিক দীনতা
পরিহার পথে তাঁর সৃষ্টি,
বৈচিত্র্যে ভরপুর| নিজের সৃষ্টির মতো, তাঁর ব্যক্তিজীবনও
ছিল বর্ণিল ঘটনার উচ্চস্বরগামের আরোহী| প্রতিভাবান এ কবির অন্যতম
ˆবশিষ্ট্য ছিল, কোনো কিছু
অবলোকনের পর তার মধ্যে
সৃষ্টির প্রেরণায় মেতে ওঠার মাদকতা|
এক্ষেত্রে নারী ভূমিকার কথা
বলা বাহুল্য| রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ঝর্নাতলায় স্নাত হতে ভিড় করেছেন
যুগান্তরের পিঠে অগণিত মানব-মানবী| এ সকল মানুষের
সম্পর্কের সুর গোধূলি বেলার
পান্থ পাখির কাকলির মতো রাঙিয়েছে কবি
মনের ভেতর-বাহির| অজস্র
মানুষের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার রমণী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোও
(১৮৮৯-১৯৭৯) মোহময় মুগ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে
অনুরাগের ঝড় তুলেছিলেন| যে
প্রকম্পণের অনুরণন তাঁর ভাবনা সৃজন
প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ
করে|
রবীন্দ্রনাথের
সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অনুরাগ সৃষ্টির গল্পটি বড় রোমান্টিক ও
বেদনাময়| আর্জেন্টিনার কবি ওকাম্পোর সঙ্গে
রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানের ব্যবধান ছিল কয়েক হাজার
মাইল| রবীন্দ্রনাথ থেকে ২৯ বছরের
ছোট ওকাম্পোর স্থানিক ও বয়েসের দূরত্ব
তাঁদের মিতালীতে কোনো প্রভাব ফেলেনি|
ওকাম্পো জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারে
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন আয়ার্সে| বাল্যকাল তাঁর কেটেছে আভিজাত্যের
পেলব হাওয়া মেখে| তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের মতো ওকাম্পোও ছিলেন
প্রচণ্ড মেধাবী সাহিত্যিক| উদিত যৌবনে বন্ধুত্ব
গড়েছেন একাধিক পছন্দের পুরুষের সঙ্গে| মদির মাতাল চোখে
নানা পুরুষ পাশে ভিড়লেও ঘর
বাঁধেন মোনাকো এস্ত্রাদার সঙ্গে| কিন্তু ঘরে পছন্দের পুরুষের
অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চোখ পড়ে
স্বামীর দূর সম্পর্কের ভাই
মার্তিনেসের ওপর|
মার্তিনেসের
সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যে
ওকাম্পো তাকে নিয়ে উড়াল
দেন অজানা পথে| কপালে সাংসার
জীবনের সুখ না থাকায়
প্রেমিকের ঘরেও অশান্তির অনল
দাউ দাউ করে জ্বলে
ওঠে| দিশেহারা হয়ে পড়েন ভিক্টোরিয়া
ওকাম্পো| স্পর্শকাতর এমনি মুহূর্তে রবীন্দ্ররাথের
লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে|
১৯১৪ সাল বিখ্যাত সাহিত্যিক
অঁন্দ্রে জিদের হাত হয়ে তাঁর
হাতে আসে ফরাসি ভাষায়
অনূদিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ| বইটি পড়ে বিস্ময়ে
বিমুগ্ধ হন ওকাম্পো| যন্ত্রণাদগ্ধ
জীবনে গীতাঞ্জলির কবিতা ওকাম্পোকে নতুন জীবনের সন্ধান
দেয়| প্রেমিকের নির্যাতনে কাতর ওকাম্পো গভীর
রাতে পড়তে থাকেন, ‘বিপদে
মোরে রক্ষা করো, এ নহে
মোর প্রার্থনা’ কবিতা| পুরো কবিতা শেষ
করে অজানা শক্তিতে জেগে ওঠেন তিনি|
ভিক্টোরিয়ার মনে হতে থাকে
দূর অজানা থেকে অদ্ভুত আলোর
শিহরন তাঁর মধ্যে প্রবেশ
করছে|
ব্যথিত
জীবনে মুক্তি নিঃশ্বাস নেবার বাতায়ন খুলে যায় তাঁর
সামনে| রূপবর্তী ভিক্টোরিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন
গীতাঞ্জলির প্রতিটি কবিতার অন্তর্নিহিত বাণী ব্যঞ্জনার অর্থের
ওপর| আস্তে-ধীরে ওকাম্পোর মনের
অনুভাবনা অজানা পুলকে কথা কয়ে ওঠে
এ কাব্যের রচয়িতার ওপর| এতেই শেষ
নয় ওকাম্পো মনে মনে বলতে
থাকেন, ‘কবি আপনি কি
স্বপ্নদ্রষ্টা? আপনি কি মানুষের
মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ছাড়পত্র অর্জন
করেছেন প্রবল তিতিক্ষা ও ত্যাগের মাধ্যমে?
না হলে কী করে
আপনি আমার হৃদয়বাহিত বেদনার
কথা এইভাবে আপনার লেখনির মাধ্যমে জ্ঞাপন করলেন|’১ ব্যস বিনি
সুতার মালা গাঁথা শুরু
হলো বিদেশিনী সুনয়নার|
স্বপ্নময়
প্রার্থিত জীবনের প্রতিকূলে অন্ধকারে ভরে ওঠা বিদুষী
এ নারীর বাস্তবজীবন দুলতে থাকে কল্পনাতীত দুর্ভাবনায়|
মানসিক অস্থিরতায় মনে মনে তাই
কামনার বীজ বুনেন, ‘এমন
কোনো পুরুষের সন্ধান পাব না, যিনি
হবেন আমার রাত আকাশের
ধ্রুবতারা| যাঁর হাতে হাত
রেখে আমি অনায়াসে পার
হব স্বর্গের উদ্যান|’২ ব্যাকুল পিয়াসে
বাউরি মনে ভিক্টোরিয়া নিবিড়ভাবে
চোখ রাখলেন আরেকটি কবিতায়, ‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন
আশা করি, ঘটে ঘাটে
ঘুরব না আর ভাসিয়ে
আমার জীর্ণ তরী|’ ওকাম্পোর চর্ম চোখে কাঙ্ক্ষিত
পুরুষকে দেখবার প্রত্যাশা এবার হৃদয়ের
না বলা কথা মন্থনের
সায়রে অবগাহন করে| লাস্যময়ী নারী
যখন হৃদয় বীণাতে বাজিয়ে
যাচ্ছেন, ‘যে পথ দিয়ে
গেছো চলে, সেই পথে
চেয়ে একা বসে থাকি
হে’ গীত| প্রাচ্যে ঠিক
সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ নানা
সমস্যায় পড়ে একেবারে বিপর্যস্ত
ও বিধ্বস্ত| আর্থিক সমস্যা তাঁর ক্রমশ বেড়ে
চলছে| আসছে নানা দেশ
থেকে বক্তৃতার আমন্ত্রণ| কিন্তু কবির কোনো কিছুই
ভালো লাগছে না| মন যেন
কার পানে চেয়ে থাকে
তাঁর অহর্নিশ|
জীবন
পথের প্রাপ্ত-বেদনা শিল্পীর মনে সৃষ্টি চেতনায়
উর্বরতা দেয়| কথাশিল্পী কথার
আল্পনায় প্রকাশ করেন শিল্পিত সত্য|
প্রেয়সী ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক সম্পর্ক জানার পথে তাই কবি
জীবনের বিফল প্রতিবেশ অবলোকন
গুরুত্ববহ| মাতৃস্নেহ বঞ্চিত রবীন্দ্রনাথ বেদনাগ্রস্ত ছিলেন বাল্যকাল থেকে| অবচেতন মনের এ বেদনা
তাঁকে নিঃসঙ্গ করেছিল| এই মর্মন্তুদ যাতনা
তাঁর সৃষ্টি প্রেরণার উৎস| ছোটবেলা থেকে
ভাই-বোনদের মতো মাকে তিনি
কাছে পাননি| এ বঞ্চনার ভার
বহন করেছেন আমৃত্যু| মাকে কাছে না
পাবার কারণও ছিল সঙ্গত| কবির
জন্মের সময় মা সারদা
দেবীর বয়স ছিল ৩৫
বছর| রবীন্দ্রনাথের জন্মের দু’বছরের মধ্যে
পঞ্চদশ সন্তান বুধেন্দ্রর জন্ম হয়| দু’বছর আগে পৃথিবীতে
আসেন ভাই সৌমেন্দ্রনাথ| সাংসারিক
চাপে মায়ের আদর করার সময়
নেই সন্তানদের| এ সম্পর্কে বড়
ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বলেন, ‘মার কাছে আমরা
বেশিক্ষণ থাকতাম না|’৩
ছেলে-বেলায় মায়ের হাতে নয়, গৃহকর্মীদের
যত্নে বেড়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ|
মায়ের আদরের অভাবটা যেন তাঁর সঙ্গী
ছিল অনুক্ষণ| এর জন্য একটা
আক্ষেপও মনের গহিনে লালন
করতেন তিনি| প্রসঙ্গটি নিয়ে তিনি আত্মজীবনীতে
লেখেন, ‘যখনকার যেটি সহজ প্রাপ্য
তখন সেটি না জুটিলে
মানুষ কাঙ্গাল হয়ে দাঁড়ায়|’৪
মানসিকভাবে তাই মেয়েদের অনুরাগের
ওপর রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল তরুণ্যের প্রথম
প্রহর থেকে| তবে তার এই
তৃষ্ণা কদাচিৎও চোখে প্রকাশ পেত
না| অনুরাগ নিবেদনে তিনি কোনো দিন
কারো কাছে নিজে থেকে
ধরা দেননি|
জীবন
পথে কোনো রূপবতী তাঁর
সান্নিধ্যে এলে তিনি মুখ
ফিরিয়ে নিতেন তা নয়| সে
অপ্সরার স্পর্শ তাঁর অন্তরে সাড়া
জাগালেও তিনি সীমানা ভাঙতে
প্রস্তুত ছিলেন না| পথে চলতে
কভু চকিতে কারো সাথে দেখা
হলে তিনি উদাসীনতা দেখাতেন
না| রবীন্দ্রনাথ ১৭ বছর বয়েসে
বিলেত যাত্রা করেন| যাত্রা পথে মারাঠা কন্যা
সুন্দরী আনা তরখড়ের সঙ্গে
পরিচয় ঘটে| অপরূপা বিলাত
ফেরত এ কন্যা ভালবাসার
অকৃত্রিম মায়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথের
কাছে আসেন| কবি নিজে তরখড়ের
ভালোবাসার সান্নিধ্যে অবগাহন করলেও বিচ্ছেদেরে সীমানা টেনে বিদেশ যাত্রা
করেন|
আনা
তাঁর জীবনে একান্তভাবে না থাকলেও তাঁকে
হৃদয়ে বহন করেছেন গভীরভাবে|
আনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সে মেয়েটিকে আমি
ভুলিনি বা তার সে
আকর্ষণ কে কখনো লঘু
লেভেল মেরে খাটো করে
দেখিনি কোনোদিন|’৫ নানা ঘটনার
চড়াই উতরাই পেরিয়ে জীবন সামনে ধায়
রবীন্দ্রনাথের| ১৯১৩ সালে তিনি
পৌঁছে যান খ্যতির শিখরে|
গলায় একের পর এক
পরতে থাকেন বিজয় মালা| ঠিক
এই সময়ে জীবন নদীতে
পদ্মা-যমুনার ভাঙ্গা-গড়া শুরু হয়
তাঁর ইতিহাস সৃষ্টির অঙ্গীকারে|
১৯১৩
সালের পর থেকে সারা
ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব পরিভ্রমণ
শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের| ৬০
থেকে ৭২ বছর এ
এক যুগ ছিল তাঁর
বিশ্ব ভ্রমণের মাহেন্দ্রক্ষণ| ‘রবীন্দ্রনাথ ভারতের বাইরে গেছেন ১২ বার| এই
১২ বারের মধ্যে আমেরিকায় পাঁচবার, জাপানে চারবার, ইউরোপে দুবার, আর কেবল ইংল্যান্ডে
গেছেন প্রথম জীবনের দুবারসহ ৮ বার|’৬
গেছেন সিংহল, ইরান, ইরাক, চীন, বার্মা, মালয়েশিয়া,
থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া| জাহাজে
চড়ে বহু-নগরীতে একাধিকবার
গেছেন এশিয়া কিংবা ইউরোপ| ঠিক এ পথ
ধরে মিলিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার বিদুষী বন্ধু ওকাম্পোর সঙ্গে| রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য নোবেল প্রাপ্তির পর কাছের মানুষই
তাঁকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ক্ষত-বিক্ষত করতে
শুরু করে| একই সময়ে
ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বেদনার সঙ্গে যোগ হয় প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের নৃশংতা| মানবতা হননের নৃত্য-উল্লাস কবির সংবেদনশীল অন্তরে
সৃষ্টি করে দারুণ দহন
জ্বালা| কবি ব্যথাভরা হৃদয়ে
লিখলেন, ‘শতাব্দীর সৃর্য আজি রক্তমেঘ মাঝে
অস্ত গেল|’ চারদিকের বিষাক্ত বায়ুর প্রবল প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন|
বুকের
ভেতরের ব্যথাকে কাগজে বুকে টেনে পুত্র
রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার
ইচ্ছে আমাকে তাড়না করছে| মনে হয়েছে, আমার
দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে
না| আমার জীনটা যেন
আগাগোড়া ব্যর্থ|’৭ বিপর্যস্ত মানসিক
এ অবস্থায় মৃত্যু ঘটে কবির প্রিয়কন্যা
মাধবী লতার| শোকে সাগরে পতিত
হন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ| বেদনার বেলাভূমিতে দেখা হলো রানু
অধিকারী নামের কান্তিময়ী রমণীর সঙ্গে| ভারাক্রান্ত মনের বেদনা প্রশমিত
না হতেই রানু হারিয়ে
যান কবির হৃদয় আঙিনা
থেকে| অথৈ দুঃখের গহিন
গাঙে কূল উপচানো ঢেউ
ভাঙছে আর ভাঙছে কবির
জীবনে| হৃদয় বীণায় রবীন্দ্র
হৃদয়ে তখন বাউলের করুণ
বিউগলের সুরে বেজে চলেছে,
‘পথ চলাতে ক্লান্তি আসে, ক্লান্তি নামের
স্রোতে, তবু থামিস নে
তুই, ওরে পথিক, পথ
চলার এই দুঃখে|’ বিড়ম্বনাময়
জীবনের এমনি দুর্বিষহ মুহূর্তে
কবি আমন্ত্রণ পান পেরু থেকে|
ঠিক এখানেই কবির জীবনের ভিক্টোরিয়ান
ইতিহাস সৃষ্টির শুভ সূচনার আবাহন|
তথ্যসূত্র:
১.
সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা: ১৮৬, আকাশ প্রকাশন
২০২০
২.
প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা ১৮৮
৩.
ভট্টাচার্য সূধন অমিত্র, ব্যথিত
কবির অনুরাগ কথা, ২০২১, কলকাতা
৪.
প্রাগুপ্ত, ঐ
৫.
প্রাগুপ্ত, ঐ
৬.
মোমেন আবুল, রবীন্দ্রনাথ বিকল্পহীন, পৃষ্ঠা-৭৯, ইউপিএল, ঢাকা-২০১৬
৭.
সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা-১৯০, আকাশ প্রকাশন-২০২০
***

আপনার মতামত লিখুন