সংবাদ

প্রবন্ধ

ওকাম্পোর সান্নিধ্য ও রবীন্দ্রনাথের ভাবান্তর


নূর-ই আলম সিদ্দিকী
নূর-ই আলম সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:০৯ এএম

ওকাম্পোর সান্নিধ্য ও রবীন্দ্রনাথের ভাবান্তর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



 

বাংলা ভাষা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবারিত আকাশ| বাঙালি জাতির আত্মিক মুক্তি মানসিক দীনতা পরিহার পথে তাঁর সৃষ্টি, বৈচিত্র্যে ভরপুর| নিজের সৃষ্টির মতো, তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল বর্ণিল ঘটনার উচ্চস্বরগামের আরোহী| প্রতিভাবান কবির অন্যতম ˆবশিষ্ট্য ছিল, কোনো কিছু অবলোকনের পর তার মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণায় মেতে ওঠার মাদকতা| এক্ষেত্রে নারী ভূমিকার কথা বলা বাহুল্য| রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ঝর্নাতলায় স্নাত হতে ভিড় করেছেন যুগান্তরের পিঠে অগণিত মানব-মানবী| সকল মানুষের সম্পর্কের সুর গোধূলি বেলার পান্থ পাখির কাকলির মতো রাঙিয়েছে কবি মনের ভেতর-বাহির| অজস্র মানুষের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার রমণী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোও (১৮৮৯-১৯৭৯) মোহময় মুগ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে অনুরাগের ঝড় তুলেছিলেন| যে প্রকম্পণের অনুরণন তাঁর ভাবনা সৃজন প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করে|

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অনুরাগ সৃষ্টির গল্পটি বড় রোমান্টিক বেদনাময়| আর্জেন্টিনার কবি ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানের ব্যবধান ছিল কয়েক হাজার মাইল| রবীন্দ্রনাথ থেকে ২৯ বছরের ছোট ওকাম্পোর স্থানিক বয়েসের দূরত্ব তাঁদের মিতালীতে কোনো প্রভাব ফেলেনি| ওকাম্পো জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন আয়ার্সে| বাল্যকাল তাঁর কেটেছে আভিজাত্যের পেলব হাওয়া মেখে| তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের মতো ওকাম্পোও ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী সাহিত্যিক| উদিত যৌবনে বন্ধুত্ব গড়েছেন একাধিক পছন্দের পুরুষের সঙ্গে| মদির মাতাল চোখে নানা পুরুষ পাশে ভিড়লেও ঘর বাঁধেন মোনাকো এস্ত্রাদার সঙ্গে| কিন্তু ঘরে পছন্দের পুরুষের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চোখ পড়ে স্বামীর দূর সম্পর্কের ভাই মার্তিনেসের ওপর|

মার্তিনেসের সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যে ওকাম্পো তাকে নিয়ে উড়াল দেন অজানা পথে| কপালে সাংসার জীবনের সুখ না থাকায় প্রেমিকের ঘরেও অশান্তির অনল দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে| দিশেহারা হয়ে পড়েন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো| স্পর্শকাতর এমনি মুহূর্তে রবীন্দ্ররাথের লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে| ১৯১৪ সাল বিখ্যাত সাহিত্যিক অঁন্দ্রে জিদের হাত হয়ে তাঁর হাতে আসে ফরাসি ভাষায় অনূদিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ| বইটি পড়ে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হন ওকাম্পো| যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনে গীতাঞ্জলির কবিতা ওকাম্পোকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়| প্রেমিকের নির্যাতনে কাতর ওকাম্পো গভীর রাতে পড়তে থাকেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, নহে মোর প্রার্থনাকবিতা| পুরো কবিতা শেষ করে অজানা শক্তিতে জেগে ওঠেন তিনি| ভিক্টোরিয়ার মনে হতে থাকে দূর অজানা থেকে অদ্ভুত আলোর শিহরন তাঁর মধ্যে প্রবেশ করছে|

ব্যথিত জীবনে মুক্তি নিঃশ্বাস নেবার বাতায়ন খুলে যায় তাঁর সামনে| রূপবর্তী ভিক্টোরিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন গীতাঞ্জলির প্রতিটি কবিতার অন্তর্নিহিত বাণী ব্যঞ্জনার অর্থের ওপর| আস্তে-ধীরে ওকাম্পোর মনের অনুভাবনা অজানা পুলকে কথা কয়ে ওঠে কাব্যের রচয়িতার ওপর| এতেই শেষ নয় ওকাম্পো মনে মনে বলতে থাকেন, ‘কবি আপনি কি স্বপ্নদ্রষ্টা? আপনি কি মানুষের মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ছাড়পত্র অর্জন করেছেন প্রবল তিতিক্ষা ত্যাগের মাধ্যমে? না হলে কী করে আপনি আমার হৃদয়বাহিত বেদনার কথা এইভাবে আপনার লেখনির মাধ্যমে জ্ঞাপন করলেন|’ ব্যস বিনি সুতার মালা গাঁথা শুরু হলো বিদেশিনী সুনয়নার|

স্বপ্নময় প্রার্থিত জীবনের প্রতিকূলে অন্ধকারে ভরে ওঠা বিদুষী নারীর বাস্তবজীবন দুলতে থাকে কল্পনাতীত দুর্ভাবনায়| মানসিক অস্থিরতায় মনে মনে তাই কামনার বীজ বুনেন, ‘এমন কোনো পুরুষের সন্ধান পাব না, যিনি হবেন আমার রাত আকাশের ধ্রুবতারা| যাঁর হাতে হাত রেখে আমি অনায়াসে পার হব স্বর্গের উদ্যান|’ ব্যাকুল পিয়াসে বাউরি মনে ভিক্টোরিয়া নিবিড়ভাবে চোখ রাখলেন আরেকটি কবিতায়, ‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি, ঘটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী|’ ওকাম্পোর চর্ম চোখে কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে দেখবার প্রত্যাশা এবার  হৃদয়ের না বলা কথা মন্থনের সায়রে অবগাহন করে| লাস্যময়ী নারী যখন হৃদয় বীণাতে বাজিয়ে যাচ্ছেন, ‘যে পথ দিয়ে গেছো চলে, সেই পথে চেয়ে একা বসে থাকি হেগীত| প্রাচ্যে ঠিক সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ নানা সমস্যায় পড়ে একেবারে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত| আর্থিক সমস্যা তাঁর ক্রমশ বেড়ে চলছে| আসছে নানা দেশ থেকে বক্তৃতার আমন্ত্রণ| কিন্তু কবির কোনো কিছুই ভালো লাগছে না| মন যেন কার পানে চেয়ে থাকে তাঁর অহর্নিশ|

জীবন পথের প্রাপ্ত-বেদনা শিল্পীর মনে সৃষ্টি চেতনায় উর্বরতা দেয়| কথাশিল্পী কথার আল্পনায় প্রকাশ করেন শিল্পিত সত্য| প্রেয়সী ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক সম্পর্ক জানার পথে তাই কবি জীবনের বিফল প্রতিবেশ অবলোকন গুরুত্ববহ| মাতৃস্নেহ বঞ্চিত রবীন্দ্রনাথ বেদনাগ্রস্ত ছিলেন বাল্যকাল থেকে| অবচেতন মনের বেদনা তাঁকে নিঃসঙ্গ করেছিল| এই মর্মন্তুদ যাতনা তাঁর সৃষ্টি প্রেরণার উৎস| ছোটবেলা থেকে ভাই-বোনদের মতো মাকে তিনি কাছে পাননি| বঞ্চনার ভার বহন করেছেন আমৃত্যু| মাকে কাছে না পাবার কারণও ছিল সঙ্গত| কবির জন্মের সময় মা সারদা দেবীর বয়স ছিল ৩৫ বছর| রবীন্দ্রনাথের জন্মের দুবছরের মধ্যে পঞ্চদশ সন্তান বুধেন্দ্রর জন্ম হয়| দুবছর আগে পৃথিবীতে আসেন ভাই সৌমেন্দ্রনাথ| সাংসারিক চাপে মায়ের আদর করার সময় নেই সন্তানদের| সম্পর্কে বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বলেন, ‘মার কাছে আমরা বেশিক্ষণ থাকতাম না|’

ছেলে-বেলায় মায়ের হাতে নয়, গৃহকর্মীদের যত্নে বেড়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ| মায়ের আদরের অভাবটা যেন তাঁর সঙ্গী ছিল অনুক্ষণ| এর জন্য একটা আক্ষেপও মনের গহিনে লালন করতেন তিনি| প্রসঙ্গটি নিয়ে তিনি আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘যখনকার যেটি সহজ প্রাপ্য তখন সেটি না জুটিলে মানুষ কাঙ্গাল হয়ে দাঁড়ায়|’ মানসিকভাবে তাই মেয়েদের অনুরাগের ওপর রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল তরুণ্যের প্রথম প্রহর থেকে| তবে তার এই তৃষ্ণা কদাচিৎও চোখে প্রকাশ পেত না| অনুরাগ নিবেদনে তিনি কোনো দিন কারো কাছে নিজে থেকে ধরা দেননি|

জীবন পথে কোনো রূপবতী তাঁর সান্নিধ্যে এলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন তা নয়| সে অপ্সরার স্পর্শ তাঁর অন্তরে সাড়া জাগালেও তিনি সীমানা ভাঙতে প্রস্তুত ছিলেন না| পথে চলতে কভু চকিতে কারো সাথে দেখা হলে তিনি উদাসীনতা দেখাতেন না| রবীন্দ্রনাথ ১৭ বছর বয়েসে বিলেত যাত্রা করেন| যাত্রা পথে মারাঠা কন্যা সুন্দরী আনা তরখড়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে| অপরূপা বিলাত ফেরত কন্যা ভালবাসার অকৃত্রিম মায়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে আসেন| কবি নিজে তরখড়ের ভালোবাসার সান্নিধ্যে অবগাহন করলেও বিচ্ছেদেরে সীমানা টেনে বিদেশ যাত্রা করেন|

আনা তাঁর জীবনে একান্তভাবে না থাকলেও তাঁকে হৃদয়ে বহন করেছেন গভীরভাবে| আনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সে মেয়েটিকে আমি ভুলিনি বা তার সে আকর্ষণ কে কখনো লঘু লেভেল মেরে খাটো করে দেখিনি কোনোদিন|’ নানা ঘটনার চড়াই উতরাই পেরিয়ে জীবন সামনে ধায় রবীন্দ্রনাথের| ১৯১৩ সালে তিনি পৌঁছে যান খ্যতির শিখরে| গলায় একের পর এক পরতে থাকেন বিজয় মালা| ঠিক এই সময়ে জীবন নদীতে পদ্মা-যমুনার ভাঙ্গা-গড়া শুরু হয় তাঁর ইতিহাস সৃষ্টির অঙ্গীকারে|

১৯১৩ সালের পর থেকে সারা ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব পরিভ্রমণ শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের| ৬০ থেকে ৭২ বছর এক যুগ ছিল তাঁর বিশ্ব ভ্রমণের মাহেন্দ্রক্ষণ| ‘রবীন্দ্রনাথ ভারতের বাইরে গেছেন ১২ বার| এই ১২ বারের মধ্যে আমেরিকায় পাঁচবার, জাপানে চারবার, ইউরোপে দুবার, আর কেবল ইংল্যান্ডে গেছেন প্রথম জীবনের দুবারসহ বার|’ গেছেন সিংহল, ইরান, ইরাক, চীন, বার্মা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া| জাহাজে চড়ে বহু-নগরীতে একাধিকবার গেছেন এশিয়া কিংবা ইউরোপ| ঠিক পথ ধরে মিলিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার বিদুষী বন্ধু ওকাম্পোর সঙ্গে| রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য নোবেল প্রাপ্তির পর কাছের মানুষই তাঁকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ক্ষত-বিক্ষত করতে শুরু করে| একই সময়ে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বেদনার সঙ্গে যোগ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংতা| মানবতা হননের নৃত্য-উল্লাস কবির সংবেদনশীল অন্তরে সৃষ্টি করে দারুণ দহন জ্বালা| কবি ব্যথাভরা হৃদয়ে লিখলেন, ‘শতাব্দীর সৃর্য আজি রক্তমেঘ মাঝে অস্ত গেল|’ চারদিকের বিষাক্ত বায়ুর প্রবল প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন|

বুকের ভেতরের ব্যথাকে কাগজে বুকে টেনে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছে আমাকে তাড়না করছে| মনে হয়েছে, আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে না| আমার জীনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ|’ বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় মৃত্যু ঘটে কবির প্রিয়কন্যা মাধবী লতার| শোকে সাগরে পতিত হন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ| বেদনার বেলাভূমিতে দেখা হলো রানু অধিকারী নামের কান্তিময়ী রমণীর সঙ্গে| ভারাক্রান্ত মনের বেদনা প্রশমিত না হতেই রানু হারিয়ে যান কবির হৃদয় আঙিনা থেকে| অথৈ দুঃখের গহিন গাঙে কূল উপচানো ঢেউ ভাঙছে আর ভাঙছে কবির জীবনে| হৃদয় বীণায় রবীন্দ্র হৃদয়ে তখন বাউলের করুণ বিউগলের সুরে বেজে চলেছে, ‘পথ চলাতে ক্লান্তি আসে, ক্লান্তি নামের স্রোতে, তবু থামিস নে তুই, ওরে পথিক, পথ চলার এই দুঃখে|’ বিড়ম্বনাময় জীবনের এমনি দুর্বিষহ মুহূর্তে কবি আমন্ত্রণ পান পেরু থেকে| ঠিক এখানেই কবির জীবনের ভিক্টোরিয়ান ইতিহাস সৃষ্টির শুভ সূচনার আবাহন|

 

তথ্যসূত্র:

. সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা: ১৮৬, আকাশ প্রকাশন ২০২০

. প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা ১৮৮

. ভট্টাচার্য সূধন অমিত্র, ব্যথিত কবির অনুরাগ কথা, ২০২১, কলকাতা

. প্রাগুপ্ত,

. প্রাগুপ্ত,

. মোমেন আবুল, রবীন্দ্রনাথ বিকল্পহীন, পৃষ্ঠা-৭৯, ইউপিএল, ঢাকা-২০১৬

. সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা-১৯০, আকাশ প্রকাশন-২০২০

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


ওকাম্পোর সান্নিধ্য ও রবীন্দ্রনাথের ভাবান্তর

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image



 

বাংলা ভাষা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবারিত আকাশ| বাঙালি জাতির আত্মিক মুক্তি মানসিক দীনতা পরিহার পথে তাঁর সৃষ্টি, বৈচিত্র্যে ভরপুর| নিজের সৃষ্টির মতো, তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল বর্ণিল ঘটনার উচ্চস্বরগামের আরোহী| প্রতিভাবান কবির অন্যতম ˆবশিষ্ট্য ছিল, কোনো কিছু অবলোকনের পর তার মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণায় মেতে ওঠার মাদকতা| এক্ষেত্রে নারী ভূমিকার কথা বলা বাহুল্য| রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ঝর্নাতলায় স্নাত হতে ভিড় করেছেন যুগান্তরের পিঠে অগণিত মানব-মানবী| সকল মানুষের সম্পর্কের সুর গোধূলি বেলার পান্থ পাখির কাকলির মতো রাঙিয়েছে কবি মনের ভেতর-বাহির| অজস্র মানুষের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার রমণী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোও (১৮৮৯-১৯৭৯) মোহময় মুগ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে অনুরাগের ঝড় তুলেছিলেন| যে প্রকম্পণের অনুরণন তাঁর ভাবনা সৃজন প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করে|

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অনুরাগ সৃষ্টির গল্পটি বড় রোমান্টিক বেদনাময়| আর্জেন্টিনার কবি ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানের ব্যবধান ছিল কয়েক হাজার মাইল| রবীন্দ্রনাথ থেকে ২৯ বছরের ছোট ওকাম্পোর স্থানিক বয়েসের দূরত্ব তাঁদের মিতালীতে কোনো প্রভাব ফেলেনি| ওকাম্পো জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন আয়ার্সে| বাল্যকাল তাঁর কেটেছে আভিজাত্যের পেলব হাওয়া মেখে| তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের মতো ওকাম্পোও ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী সাহিত্যিক| উদিত যৌবনে বন্ধুত্ব গড়েছেন একাধিক পছন্দের পুরুষের সঙ্গে| মদির মাতাল চোখে নানা পুরুষ পাশে ভিড়লেও ঘর বাঁধেন মোনাকো এস্ত্রাদার সঙ্গে| কিন্তু ঘরে পছন্দের পুরুষের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চোখ পড়ে স্বামীর দূর সম্পর্কের ভাই মার্তিনেসের ওপর|

মার্তিনেসের সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যে ওকাম্পো তাকে নিয়ে উড়াল দেন অজানা পথে| কপালে সাংসার জীবনের সুখ না থাকায় প্রেমিকের ঘরেও অশান্তির অনল দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে| দিশেহারা হয়ে পড়েন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো| স্পর্শকাতর এমনি মুহূর্তে রবীন্দ্ররাথের লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে| ১৯১৪ সাল বিখ্যাত সাহিত্যিক অঁন্দ্রে জিদের হাত হয়ে তাঁর হাতে আসে ফরাসি ভাষায় অনূদিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ| বইটি পড়ে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হন ওকাম্পো| যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনে গীতাঞ্জলির কবিতা ওকাম্পোকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়| প্রেমিকের নির্যাতনে কাতর ওকাম্পো গভীর রাতে পড়তে থাকেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, নহে মোর প্রার্থনাকবিতা| পুরো কবিতা শেষ করে অজানা শক্তিতে জেগে ওঠেন তিনি| ভিক্টোরিয়ার মনে হতে থাকে দূর অজানা থেকে অদ্ভুত আলোর শিহরন তাঁর মধ্যে প্রবেশ করছে|

ব্যথিত জীবনে মুক্তি নিঃশ্বাস নেবার বাতায়ন খুলে যায় তাঁর সামনে| রূপবর্তী ভিক্টোরিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন গীতাঞ্জলির প্রতিটি কবিতার অন্তর্নিহিত বাণী ব্যঞ্জনার অর্থের ওপর| আস্তে-ধীরে ওকাম্পোর মনের অনুভাবনা অজানা পুলকে কথা কয়ে ওঠে কাব্যের রচয়িতার ওপর| এতেই শেষ নয় ওকাম্পো মনে মনে বলতে থাকেন, ‘কবি আপনি কি স্বপ্নদ্রষ্টা? আপনি কি মানুষের মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ছাড়পত্র অর্জন করেছেন প্রবল তিতিক্ষা ত্যাগের মাধ্যমে? না হলে কী করে আপনি আমার হৃদয়বাহিত বেদনার কথা এইভাবে আপনার লেখনির মাধ্যমে জ্ঞাপন করলেন|’ ব্যস বিনি সুতার মালা গাঁথা শুরু হলো বিদেশিনী সুনয়নার|

স্বপ্নময় প্রার্থিত জীবনের প্রতিকূলে অন্ধকারে ভরে ওঠা বিদুষী নারীর বাস্তবজীবন দুলতে থাকে কল্পনাতীত দুর্ভাবনায়| মানসিক অস্থিরতায় মনে মনে তাই কামনার বীজ বুনেন, ‘এমন কোনো পুরুষের সন্ধান পাব না, যিনি হবেন আমার রাত আকাশের ধ্রুবতারা| যাঁর হাতে হাত রেখে আমি অনায়াসে পার হব স্বর্গের উদ্যান|’ ব্যাকুল পিয়াসে বাউরি মনে ভিক্টোরিয়া নিবিড়ভাবে চোখ রাখলেন আরেকটি কবিতায়, ‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি, ঘটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী|’ ওকাম্পোর চর্ম চোখে কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে দেখবার প্রত্যাশা এবার  হৃদয়ের না বলা কথা মন্থনের সায়রে অবগাহন করে| লাস্যময়ী নারী যখন হৃদয় বীণাতে বাজিয়ে যাচ্ছেন, ‘যে পথ দিয়ে গেছো চলে, সেই পথে চেয়ে একা বসে থাকি হেগীত| প্রাচ্যে ঠিক সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ নানা সমস্যায় পড়ে একেবারে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত| আর্থিক সমস্যা তাঁর ক্রমশ বেড়ে চলছে| আসছে নানা দেশ থেকে বক্তৃতার আমন্ত্রণ| কিন্তু কবির কোনো কিছুই ভালো লাগছে না| মন যেন কার পানে চেয়ে থাকে তাঁর অহর্নিশ|

জীবন পথের প্রাপ্ত-বেদনা শিল্পীর মনে সৃষ্টি চেতনায় উর্বরতা দেয়| কথাশিল্পী কথার আল্পনায় প্রকাশ করেন শিল্পিত সত্য| প্রেয়সী ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক সম্পর্ক জানার পথে তাই কবি জীবনের বিফল প্রতিবেশ অবলোকন গুরুত্ববহ| মাতৃস্নেহ বঞ্চিত রবীন্দ্রনাথ বেদনাগ্রস্ত ছিলেন বাল্যকাল থেকে| অবচেতন মনের বেদনা তাঁকে নিঃসঙ্গ করেছিল| এই মর্মন্তুদ যাতনা তাঁর সৃষ্টি প্রেরণার উৎস| ছোটবেলা থেকে ভাই-বোনদের মতো মাকে তিনি কাছে পাননি| বঞ্চনার ভার বহন করেছেন আমৃত্যু| মাকে কাছে না পাবার কারণও ছিল সঙ্গত| কবির জন্মের সময় মা সারদা দেবীর বয়স ছিল ৩৫ বছর| রবীন্দ্রনাথের জন্মের দুবছরের মধ্যে পঞ্চদশ সন্তান বুধেন্দ্রর জন্ম হয়| দুবছর আগে পৃথিবীতে আসেন ভাই সৌমেন্দ্রনাথ| সাংসারিক চাপে মায়ের আদর করার সময় নেই সন্তানদের| সম্পর্কে বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বলেন, ‘মার কাছে আমরা বেশিক্ষণ থাকতাম না|’

ছেলে-বেলায় মায়ের হাতে নয়, গৃহকর্মীদের যত্নে বেড়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ| মায়ের আদরের অভাবটা যেন তাঁর সঙ্গী ছিল অনুক্ষণ| এর জন্য একটা আক্ষেপও মনের গহিনে লালন করতেন তিনি| প্রসঙ্গটি নিয়ে তিনি আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘যখনকার যেটি সহজ প্রাপ্য তখন সেটি না জুটিলে মানুষ কাঙ্গাল হয়ে দাঁড়ায়|’ মানসিকভাবে তাই মেয়েদের অনুরাগের ওপর রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা ছিল তরুণ্যের প্রথম প্রহর থেকে| তবে তার এই তৃষ্ণা কদাচিৎও চোখে প্রকাশ পেত না| অনুরাগ নিবেদনে তিনি কোনো দিন কারো কাছে নিজে থেকে ধরা দেননি|

জীবন পথে কোনো রূপবতী তাঁর সান্নিধ্যে এলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন তা নয়| সে অপ্সরার স্পর্শ তাঁর অন্তরে সাড়া জাগালেও তিনি সীমানা ভাঙতে প্রস্তুত ছিলেন না| পথে চলতে কভু চকিতে কারো সাথে দেখা হলে তিনি উদাসীনতা দেখাতেন না| রবীন্দ্রনাথ ১৭ বছর বয়েসে বিলেত যাত্রা করেন| যাত্রা পথে মারাঠা কন্যা সুন্দরী আনা তরখড়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে| অপরূপা বিলাত ফেরত কন্যা ভালবাসার অকৃত্রিম মায়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে আসেন| কবি নিজে তরখড়ের ভালোবাসার সান্নিধ্যে অবগাহন করলেও বিচ্ছেদেরে সীমানা টেনে বিদেশ যাত্রা করেন|

আনা তাঁর জীবনে একান্তভাবে না থাকলেও তাঁকে হৃদয়ে বহন করেছেন গভীরভাবে| আনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সে মেয়েটিকে আমি ভুলিনি বা তার সে আকর্ষণ কে কখনো লঘু লেভেল মেরে খাটো করে দেখিনি কোনোদিন|’ নানা ঘটনার চড়াই উতরাই পেরিয়ে জীবন সামনে ধায় রবীন্দ্রনাথের| ১৯১৩ সালে তিনি পৌঁছে যান খ্যতির শিখরে| গলায় একের পর এক পরতে থাকেন বিজয় মালা| ঠিক এই সময়ে জীবন নদীতে পদ্মা-যমুনার ভাঙ্গা-গড়া শুরু হয় তাঁর ইতিহাস সৃষ্টির অঙ্গীকারে|

১৯১৩ সালের পর থেকে সারা ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব পরিভ্রমণ শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের| ৬০ থেকে ৭২ বছর এক যুগ ছিল তাঁর বিশ্ব ভ্রমণের মাহেন্দ্রক্ষণ| ‘রবীন্দ্রনাথ ভারতের বাইরে গেছেন ১২ বার| এই ১২ বারের মধ্যে আমেরিকায় পাঁচবার, জাপানে চারবার, ইউরোপে দুবার, আর কেবল ইংল্যান্ডে গেছেন প্রথম জীবনের দুবারসহ বার|’ গেছেন সিংহল, ইরান, ইরাক, চীন, বার্মা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া| জাহাজে চড়ে বহু-নগরীতে একাধিকবার গেছেন এশিয়া কিংবা ইউরোপ| ঠিক পথ ধরে মিলিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার বিদুষী বন্ধু ওকাম্পোর সঙ্গে| রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য নোবেল প্রাপ্তির পর কাছের মানুষই তাঁকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ক্ষত-বিক্ষত করতে শুরু করে| একই সময়ে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বেদনার সঙ্গে যোগ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংতা| মানবতা হননের নৃত্য-উল্লাস কবির সংবেদনশীল অন্তরে সৃষ্টি করে দারুণ দহন জ্বালা| কবি ব্যথাভরা হৃদয়ে লিখলেন, ‘শতাব্দীর সৃর্য আজি রক্তমেঘ মাঝে অস্ত গেল|’ চারদিকের বিষাক্ত বায়ুর প্রবল প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন|

বুকের ভেতরের ব্যথাকে কাগজে বুকে টেনে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছে আমাকে তাড়না করছে| মনে হয়েছে, আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে না| আমার জীনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ|’ বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় মৃত্যু ঘটে কবির প্রিয়কন্যা মাধবী লতার| শোকে সাগরে পতিত হন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ| বেদনার বেলাভূমিতে দেখা হলো রানু অধিকারী নামের কান্তিময়ী রমণীর সঙ্গে| ভারাক্রান্ত মনের বেদনা প্রশমিত না হতেই রানু হারিয়ে যান কবির হৃদয় আঙিনা থেকে| অথৈ দুঃখের গহিন গাঙে কূল উপচানো ঢেউ ভাঙছে আর ভাঙছে কবির জীবনে| হৃদয় বীণায় রবীন্দ্র হৃদয়ে তখন বাউলের করুণ বিউগলের সুরে বেজে চলেছে, ‘পথ চলাতে ক্লান্তি আসে, ক্লান্তি নামের স্রোতে, তবু থামিস নে তুই, ওরে পথিক, পথ চলার এই দুঃখে|’ বিড়ম্বনাময় জীবনের এমনি দুর্বিষহ মুহূর্তে কবি আমন্ত্রণ পান পেরু থেকে| ঠিক এখানেই কবির জীবনের ভিক্টোরিয়ান ইতিহাস সৃষ্টির শুভ সূচনার আবাহন|

 

তথ্যসূত্র:

. সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা: ১৮৬, আকাশ প্রকাশন ২০২০

. প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা ১৮৮

. ভট্টাচার্য সূধন অমিত্র, ব্যথিত কবির অনুরাগ কথা, ২০২১, কলকাতা

. প্রাগুপ্ত,

. প্রাগুপ্ত,

. মোমেন আবুল, রবীন্দ্রনাথ বিকল্পহীন, পৃষ্ঠা-৭৯, ইউপিএল, ঢাকা-২০১৬

. সেন পৃথ্বীরাজ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, পৃষ্ঠা-১৯০, আকাশ প্রকাশন-২০২০

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত