সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যা : ০১

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:১০ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন


প্রথম পর্ব: সেতারার মৃত্যু

 

এক

লাশটা উপুড় হয়ে আছে| চেহারাটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না| তারপরও আঁধারিয়া গ্রামের মধ্যপাড়ার রব্বান শেখ তার ছোট্ট নৌকাটা নিয়ে গোমতী নদীর ধারে কুনো জাল দিয়ে মাছ ধরতে এসে লাশটা চিনে ফেলল| সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কেডা আছো গো, দেইখা যাও| লাশ পাওয়া গেছে গো...!’

প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোরের সূর্যটা সবে আগুনের টকটকে লাল গোলার মতো করে আঁধারিয়া গ্রামের পুবের উঁচু তালগাছটার গা বেয়ে উঠছে| নরম-শীতল বাতাস বইছে দক্ষিণের দুয়ার ভেঙেশন শন, শন শন| গোমতী নদীর জল উত্তরের জোয়ারের জল মিলে যুগপৎ শব্দ করছেকল কল, কল কল| সাধারণত সময় ডাহুক ডাকে না| কিন্তু মুহূর্তে ডাহুকের ডাক আসছেকোয়াক কোয়াক, কোয়াক কোয়াক| ডাহুকের ডাকে কেমন আর্তনাদের সুর| নদীর পাড়ের একটা বাঁশের উঁচু কঞ্চিতে একটা দাঁড়কাক গা ফুলিয়ে বসে আছে| কাকটার ধ্যান জলের দিকে|

গোমতীর জল জোয়ারের জল একাকার হয়ে গেলেও নদীর পাড় ঘেঁষা বুইদ্দার বিলের জমিগুলোতে ধানের সবুজ ডগাগুলো তখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে| সেই ধানী জমির ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যায় পেতে যাওয়া জাল নৌকায় টেনে টেনে তুলছে কোনো কোনো গৃহস্থ| সুদিনে ধানী জমিতে কামলা দেওয়ার পাশাপাশি জোয়ারের মওসুমে নৌকা বেয়ে মাছ ধরা তাদের বাড়তি আয়| ওরা জালের মাছ সকালের মীরবহরি বাজারে বিক্রি করে| বেশি মাছ পেলে কেউ কেউ উপজেলা সদরেও নিয়ে যায়| ওরা শুধু আইলের ফাঁকে ফাঁকে পেতে যাওয়া জালেই মাছ ধরে না| কেউ কেউ দলবেঁধে গোমতীর স্রোতের ভেতর বড় ডিঙি নৌকা নিয়ে জাল ফেলে| কেউ আবার ছোট্ট কোষা নৌকা নিয়েই কুনোজাল ফেলে গোমতীর মাছ ধরে|

রব্বান শেখ কারও সাড়া না পেয়ে লাশটা আবার দেখল| লাশটা জলের ওপর দুলছে দক্ষিণের কোড়ে, ঘের দেওয়া কচুরিপানার ফাঁকে| হাত-পা এমনভাবে মেলে দেওয়া যে তাতে মনে হচ্ছে, কোনো যুবতী মহিলা উপুড় হয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে যেন লাশ হয়েছে| পরনের শাড়িটা ঢেউয়ের দুলুনিতে একবার উরুর ওপর উঠছে, আরেকবার হাঁটুতে নেমে আসছে| চুলগুলো তখনও খোঁপা করা| জল গিলতে গিলতে লাশ ফুলে উঠে গায়ের ব্লাউজটা কেমন কামড়ে ধরেছে|

রব্বান শেখ আবার ডাক দিল, ‘-, কেউ কি শুনতাছ না? লাশ পাওয়া গেছে...’|

কচুরিপানার ঘের দেওয়া কোড়ের ওপাশ থেকে করিম মিয়া গলা বাড়াল, ‘কী পাওয়া গেছে, মাছ? কত বড়?’

রব্বান শেখ বলল, ‘না না, লাশ’|

লাশ, কার লাশ?’

মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ’|

করিম মিয়া নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘কও কী!’

রব্বান শেখ বলল, ‘, , দেইখা যাও’|

করিম মিয়া কোড়ের ঘেরের কাছাকাছি নৌকাটা আনতেই লাশটার ওপর তার চোখে পড়ল| লাশ দেখেই সে আঁতকে উঠে বলল, ‘হায় মাবুদ’| পরক্ষণই তার চোখ গিয়ে পড়ল লাশের উরু পরনের শাড়িটার সংযোগস্থলে| তার চোখ স্থির হয়ে গেল|

রব্বান শেখ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘মনসুর পাগলা কই কই গিয়া তার বউয়ের লাশ খুঁজতাছে| আর লাশটা ভাইসা উঠছে এইখানে, কোড়ের পাড়’|

করিম মিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘, তাই তো!’ বলেই সে লাশের উরুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল| সে লাশের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রব্বান মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তুক আমার একটা কথা’|

রব্বান মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’

লাশটা তো উল্টাইয়া রইছে| চেহারা দেখা যাইতাছে না|

তয় কী হইছে?’

তুমি কেমনে বুঝলা, এই লাশটা যে মনসুর পাগলার বউয়ের?

, হেইডা তো ঠিক কইছ| তাইলে এই লাশটা কার?

অন্য কারোর তো হইতে পারে’|

আমার মনে হইতাছে, লাশটা মনসুর পাগলার বউয়েরই| শরীরের গঠন দেখতাছ না?’

করিম মিয়া আবার লাশের দিকে তাকাল| লাশটা ভরাট শরীরের| এটা শুধু নদীর জল খেয়ে ফুলে উঠেছে বলে নয়| মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমকে সে বহুবার দেখেছে| পাশাপাশি পাড়ার মানুষ তারা| ভরাট শরীরে নিয়ে যখন পাড়ে, গোপাটে বাড়ির ধারে থপথপ করে হাঁটত, তখন আপনা থেকেই দৃষ্টি আটকে যেত| সেতারা বেগম হাসতও বেশখলবল, খলবল| মাঝেমধ্যে দেখা যেত, গোপাটে বা বুইদ্দার খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভুঁইয়া বাড়ির আনিসের সঙ্গে কথা বলছে| খালের এপার আর ওপার| বুইদ্দার খালটা সরু| সুদিন এলে শুকিয়ে যায়| বর্ষার মওসুমে যদিও জোয়ারের জলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে|

করিম মিয়া তারপরও দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, মানলাম এই লাশটা মনসুর পাগলার বউয়ের| কিন্তুক মনসুর পাগলার বউ তো ডুবছে মোল্লাকান্দি গেরামের ভাটিতে| হেই পুনোয়ারার বটগাছটার কাছে| লাশ তাইলে এক মাইল উজাইয়া এইখানে আইলো কেমন?’

রব্বান শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘করিম ভাই, কথাডা তো তুমি ঠিক কইছ| লাশ তো উজাইয়া আইবার পারে না| তাইলে?’

করিম মিয়া বলল, ‘রব্বান মিয়া, একটা কাম করতে পারি| চলো, লাশটা বৈঠা দিয়া ঠেইলা উল্টাইয়া দেখি’|

রব্বান শেখ বলল, ‘, দেখতে পারি| লাশটা চিৎ কইরা দিলেই তো চেহারাডা দেখতে পারমু’|

করিম মিয়া বলল, ‘আইচ্ছা, তুমি নৌকাটা আগাইয়া লইয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া ধাক্কা দাও| আমি এদিক দিয়া বৈঠায় ঠেলা দিতাছি’|

রব্বান মিয়া বলল, ‘হেইডাই ভালা হইব’| বলেই সে নৌকাটা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল| লগি দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরিয়ে সে নৌকাটা লাশের অন্যপাশে নিয়ে এল|

করিম মিয়া এপাশে নৌকাটা লাশের আরও কাছে নিয়ে ˆবঠা দিয়ে ধাক্কা দিতেই এক ধাক্কায় লাশটা চিৎ হয়ে গেল|

ওরা দেখল, লাশ মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমেরই| সেতারা বেগম ডুবেছিল দুদিন আগে, উঠতি রাতে|

এই সকালে যেমন গোমতী নদীটা বেশ শান্ত, সেদিন এমন শান্ত ছিল না| সেদিন নদীর ঢেউ ছিল পাড় ভাঙা, খুঁটিতে আটকে থাকা ষাঁড়ের মতো| এর আগের দিনই বৃষ্টি হয়েছিল বেশ| সেই বৃষ্টির জলে উজানের নদী ভাটিতে এসে শব্দ তুলছিল গর্জনের মতো করে| একটার পর একটা ঢেউ ভাঁজ ভাঙছিল একে অপরের ওপর ঝাপটে পড়ে| চারিদিকে ছিল বাতাসের বিকট শব্দশোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ| রাতে যেমন লোঙ্গার বিল, বুইদ্দার বিল বা মরজার বিল থেকে মৃত মানুষের আর্তনাদ আসে, তেমনই আর্তনাদ আসছিলকুঁ--, কুঁ--, ওঁ--| গোমতীর ভাটিতে বর্ষার মওসুমে এমনিতেই জলের নিশানা থাকে না| নদীতে উন্মাদনা থাকলে জোয়ারের জল যেন লাফিয়ে চলে উচ্ছল তরুণীর ভোকাট্টা চলার মতোতাধিন, তাধিন, তাধিন|

এদিকে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলার মস্তানের মাজারের সঙ্গে মনসুর পাগলার আত্মার সম্পর্ক সেই ছোটবেলা ত্থেকে| সেই নয়-দশ বছর বয়স থেকে সে মস্তানের মাজারে এসে পড়ে থাকে| তার ওপর বছর শেষে মাজারে ঔরস হলে তো কোনো কথাই নেই| তার ভোকাট্টা তাধিন তাধিন নাচ আরও বেড়ে যায়| আগের দুই-তিন দিন শামিয়ানা-প্যান্ডেল টানানো থেকে শুরু করে মাজারে নতুন গিলাফ লাগানো| উরসের দিন আগরাত ধরে বাউলদের পালা দেখা| মাঝরাতে রান্নাবান্নায় তদারকি করা| সকালে কলাপাতা বিছিয়ে খিচুড়ি খাওয়া| ঘরে বউ আসার পরও সে উরস কখনও বাদ দেয়নি| তার প্রথম বউ জুলেখা মাজারে আসতে চাইত না| তারপরও সে জোর করে নিয়ে আসত| দ্বিতীয় বউ সেতারা বেগম অবশ্য নিজ থেকেই উরসে আসত|

গত পরশু দিন রাতে সেই বটতলায় মস্তানের মাজারে উরস ছিল|

বর্ষাকালে নদীর জল উত্তরের জোয়ারের জল এক হয়ে গেলে গোমতীর ভাটিতে বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার বিল মরজার বিলকে কেন্দ্র করে যতগুলো গ্রাম আছে, সেই কয়েকশো বছর আগে থেকেই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা| আগে নৌকায় করেই সবাইকে হোমনা বা দাউদকান্দি যেতে হতো| দাউদকান্দি থেকে পরে ভাগ হয়ে তিতাস নামে নতুন উপজেলা হলে গৌরীপুর থেকে একটি সুন্দর পাকা রাস্তা হয়েছে হোমনা মুরাদনগর অব্ধি| সেই রাস্তা ধরে এখন বাস-টেম্পু-রিকশা অহরহ চলে| এতে অনেক গ্রামের মানুষেরই নৌকার বাহন কমে গেছে| কিন্তু আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দি, অনুতপুর ছড়িয়াকান্দিসহ আরও কিছু গ্রাম গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে বলে বাহন হিসেবে নৌকার আধিক্য একটুও কমেনি| বিশেষ করে গরিব গৃহস্থ ঘরগুলোতে মাছ ধরার জন্য বা মীরবহরি হাটে আনাজপাতি বেচার জন্য তাদের ছোট্ট একটা কোষা বা ডিঙি নৌকা থাকবেই| যদিও অনুতপুর থেকে একটা রাস্তার কাজ চলছে| রাস্তাটা এরই মধ্যে মোল্লাকান্দির কাছাকাছি চলে এসেছে| যে হারে কাজ চলছে, এতে দেখা যাবে নতুন রাস্তাটা এক-দেড় বছরের মধ্যে বুইদ্দার বিলের বুক চিরে মীরবহরি, আঁধারিয়া, রায়তলা কদমতলি পেরিয়ে গেছে| অবশ্য শুকনো মওসুম বা সুদিনে এই ডোবা অঞ্চলের জীবন যাত্রা অনেকটাই অন্যরকম হয়ে যায়|

মনসুর পাগলার ঘরেও একটা নৌকা আছে| নৌকাটা তার বাবার আমলের| লোহাকাঠের| এখনও বেশ মজবুত| মনসুর পাগলা অন্য কোনো কাজ করুক আর না করুক, প্রতিবছর একবার করে হলেও নৌকাটায় আলকাতরা দেয়| দু-একটা কাঠ নড়েচড়ে হয়ে গেলে মীরবহরি বাজারের বিধু কর্মকারের কাছ থেকে তারকাঁটা এনে ঠিক করে|

মনসুর পাগলা সেই নৌকায় করেই সেতারা বেগমকে নিয়ে পরশু সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়| বাড়ির পর গোপাট| গোপাট লাগোয়া পুবে বুইদ্দার খাল| সেই বুইদ্দার খাল ধরে দক্ষিণ পাড়ার মুখ ছেড়ে উত্তর পাড়া হয়ে কিছুক্ষণ গেলেই গোমতী নদী| গোমতী নদী ধরে ভাটির দিকে গেলে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলা|

মনসুর পাগলার সেতারা বেগমকে নিয়ে পুনোয়ারার বটতলার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী এক স্রোতের ঘূর্ণিপাকে পড়ে তার নৌকাটা একেবারে উল্টে যায়| উল্টে যাওয়া নৌকা ধরে মনসুর পাগলা কোনো মতে নিজেকে রক্ষা করলেও বউকে সে রক্ষা করতে পারেনি| সেতারা বেগম দুবার জলে ভেসে উঠে শাড়িতে পেঁচিয়ে সেই যে ডুব দেয়, আর ভাসেনি| নৌকা ধরে ভাসতে ভাসতে মনসুর পাগলার সে কী আর্তনাদ শুরু করে, ‘--, কেডা আছো গো, আমার বউ গাঙে ডুইবা গেছে| --, কেডা আছো...!’

মনসুর পাগলার আর্তনাদ শুনে উরসের অনেক মানুষ টর্চলাইট নিয়ে গাঙপাড়ে এসে জমা হয়| কয়েকজন ঘাটে বাঁধা দুটো নৌকা নিয়ে এসে মনসুর পাগলা তার নৌকাটা উদ্ধার করে| কিন্তু সিতারা বেগমকে কেউ খুঁজে পায় না|

তারপর পরশুরাত গতকাল সারাদিন মনসুর পাগলা আঁতিপাঁতি করে সেতারা বেগমের লাশ খোঁজে! শুধু মনসুর পাগলাই না, তিন গ্রাম পর অনুতপুর থেকে সেতারা বেগমের বাবা, জেঠা, ছোট ভাইসহ বেশ কয়েকজন আসে লাশ খুঁজতে| ভুঁইয়া বাড়ির আনিসও গতকাল মনসুর পাগলার সঙ্গে রাত অব্ধি লাশ খুঁজে বেড়ায়| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, এমনকি মীরবহরির গ্রামের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে নৌকা নিয়ে লাশ খুঁজতে বের হয়| কিন্তু লাশ আর কেউ খুঁজে পায়নি| গ্রামের কেউ কেউ বলতে শুরু করে, লাশ বোয়াল মাছে খেয়ে ফেলেছে| কেউ বলে, লাশ ভাসতে ভাসতে মেঘনার মোহনায় চলে গেছে...| ক্রমশ...

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image


প্রথম পর্ব: সেতারার মৃত্যু

 

এক

লাশটা উপুড় হয়ে আছে| চেহারাটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না| তারপরও আঁধারিয়া গ্রামের মধ্যপাড়ার রব্বান শেখ তার ছোট্ট নৌকাটা নিয়ে গোমতী নদীর ধারে কুনো জাল দিয়ে মাছ ধরতে এসে লাশটা চিনে ফেলল| সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কেডা আছো গো, দেইখা যাও| লাশ পাওয়া গেছে গো...!’

প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোরের সূর্যটা সবে আগুনের টকটকে লাল গোলার মতো করে আঁধারিয়া গ্রামের পুবের উঁচু তালগাছটার গা বেয়ে উঠছে| নরম-শীতল বাতাস বইছে দক্ষিণের দুয়ার ভেঙেশন শন, শন শন| গোমতী নদীর জল উত্তরের জোয়ারের জল মিলে যুগপৎ শব্দ করছেকল কল, কল কল| সাধারণত সময় ডাহুক ডাকে না| কিন্তু মুহূর্তে ডাহুকের ডাক আসছেকোয়াক কোয়াক, কোয়াক কোয়াক| ডাহুকের ডাকে কেমন আর্তনাদের সুর| নদীর পাড়ের একটা বাঁশের উঁচু কঞ্চিতে একটা দাঁড়কাক গা ফুলিয়ে বসে আছে| কাকটার ধ্যান জলের দিকে|

গোমতীর জল জোয়ারের জল একাকার হয়ে গেলেও নদীর পাড় ঘেঁষা বুইদ্দার বিলের জমিগুলোতে ধানের সবুজ ডগাগুলো তখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে| সেই ধানী জমির ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যায় পেতে যাওয়া জাল নৌকায় টেনে টেনে তুলছে কোনো কোনো গৃহস্থ| সুদিনে ধানী জমিতে কামলা দেওয়ার পাশাপাশি জোয়ারের মওসুমে নৌকা বেয়ে মাছ ধরা তাদের বাড়তি আয়| ওরা জালের মাছ সকালের মীরবহরি বাজারে বিক্রি করে| বেশি মাছ পেলে কেউ কেউ উপজেলা সদরেও নিয়ে যায়| ওরা শুধু আইলের ফাঁকে ফাঁকে পেতে যাওয়া জালেই মাছ ধরে না| কেউ কেউ দলবেঁধে গোমতীর স্রোতের ভেতর বড় ডিঙি নৌকা নিয়ে জাল ফেলে| কেউ আবার ছোট্ট কোষা নৌকা নিয়েই কুনোজাল ফেলে গোমতীর মাছ ধরে|

রব্বান শেখ কারও সাড়া না পেয়ে লাশটা আবার দেখল| লাশটা জলের ওপর দুলছে দক্ষিণের কোড়ে, ঘের দেওয়া কচুরিপানার ফাঁকে| হাত-পা এমনভাবে মেলে দেওয়া যে তাতে মনে হচ্ছে, কোনো যুবতী মহিলা উপুড় হয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে যেন লাশ হয়েছে| পরনের শাড়িটা ঢেউয়ের দুলুনিতে একবার উরুর ওপর উঠছে, আরেকবার হাঁটুতে নেমে আসছে| চুলগুলো তখনও খোঁপা করা| জল গিলতে গিলতে লাশ ফুলে উঠে গায়ের ব্লাউজটা কেমন কামড়ে ধরেছে|

রব্বান শেখ আবার ডাক দিল, ‘-, কেউ কি শুনতাছ না? লাশ পাওয়া গেছে...’|

কচুরিপানার ঘের দেওয়া কোড়ের ওপাশ থেকে করিম মিয়া গলা বাড়াল, ‘কী পাওয়া গেছে, মাছ? কত বড়?’

রব্বান শেখ বলল, ‘না না, লাশ’|

লাশ, কার লাশ?’

মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ’|

করিম মিয়া নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘কও কী!’

রব্বান শেখ বলল, ‘, , দেইখা যাও’|

করিম মিয়া কোড়ের ঘেরের কাছাকাছি নৌকাটা আনতেই লাশটার ওপর তার চোখে পড়ল| লাশ দেখেই সে আঁতকে উঠে বলল, ‘হায় মাবুদ’| পরক্ষণই তার চোখ গিয়ে পড়ল লাশের উরু পরনের শাড়িটার সংযোগস্থলে| তার চোখ স্থির হয়ে গেল|

রব্বান শেখ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘মনসুর পাগলা কই কই গিয়া তার বউয়ের লাশ খুঁজতাছে| আর লাশটা ভাইসা উঠছে এইখানে, কোড়ের পাড়’|

করিম মিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘, তাই তো!’ বলেই সে লাশের উরুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল| সে লাশের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রব্বান মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তুক আমার একটা কথা’|

রব্বান মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’

লাশটা তো উল্টাইয়া রইছে| চেহারা দেখা যাইতাছে না|

তয় কী হইছে?’

তুমি কেমনে বুঝলা, এই লাশটা যে মনসুর পাগলার বউয়ের?

, হেইডা তো ঠিক কইছ| তাইলে এই লাশটা কার?

অন্য কারোর তো হইতে পারে’|

আমার মনে হইতাছে, লাশটা মনসুর পাগলার বউয়েরই| শরীরের গঠন দেখতাছ না?’

করিম মিয়া আবার লাশের দিকে তাকাল| লাশটা ভরাট শরীরের| এটা শুধু নদীর জল খেয়ে ফুলে উঠেছে বলে নয়| মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমকে সে বহুবার দেখেছে| পাশাপাশি পাড়ার মানুষ তারা| ভরাট শরীরে নিয়ে যখন পাড়ে, গোপাটে বাড়ির ধারে থপথপ করে হাঁটত, তখন আপনা থেকেই দৃষ্টি আটকে যেত| সেতারা বেগম হাসতও বেশখলবল, খলবল| মাঝেমধ্যে দেখা যেত, গোপাটে বা বুইদ্দার খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভুঁইয়া বাড়ির আনিসের সঙ্গে কথা বলছে| খালের এপার আর ওপার| বুইদ্দার খালটা সরু| সুদিন এলে শুকিয়ে যায়| বর্ষার মওসুমে যদিও জোয়ারের জলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে|

করিম মিয়া তারপরও দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, মানলাম এই লাশটা মনসুর পাগলার বউয়ের| কিন্তুক মনসুর পাগলার বউ তো ডুবছে মোল্লাকান্দি গেরামের ভাটিতে| হেই পুনোয়ারার বটগাছটার কাছে| লাশ তাইলে এক মাইল উজাইয়া এইখানে আইলো কেমন?’

রব্বান শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘করিম ভাই, কথাডা তো তুমি ঠিক কইছ| লাশ তো উজাইয়া আইবার পারে না| তাইলে?’

করিম মিয়া বলল, ‘রব্বান মিয়া, একটা কাম করতে পারি| চলো, লাশটা বৈঠা দিয়া ঠেইলা উল্টাইয়া দেখি’|

রব্বান শেখ বলল, ‘, দেখতে পারি| লাশটা চিৎ কইরা দিলেই তো চেহারাডা দেখতে পারমু’|

করিম মিয়া বলল, ‘আইচ্ছা, তুমি নৌকাটা আগাইয়া লইয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া ধাক্কা দাও| আমি এদিক দিয়া বৈঠায় ঠেলা দিতাছি’|

রব্বান মিয়া বলল, ‘হেইডাই ভালা হইব’| বলেই সে নৌকাটা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল| লগি দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরিয়ে সে নৌকাটা লাশের অন্যপাশে নিয়ে এল|

করিম মিয়া এপাশে নৌকাটা লাশের আরও কাছে নিয়ে ˆবঠা দিয়ে ধাক্কা দিতেই এক ধাক্কায় লাশটা চিৎ হয়ে গেল|

ওরা দেখল, লাশ মনসুর পাগলার বউ সেতারা বেগমেরই| সেতারা বেগম ডুবেছিল দুদিন আগে, উঠতি রাতে|

এই সকালে যেমন গোমতী নদীটা বেশ শান্ত, সেদিন এমন শান্ত ছিল না| সেদিন নদীর ঢেউ ছিল পাড় ভাঙা, খুঁটিতে আটকে থাকা ষাঁড়ের মতো| এর আগের দিনই বৃষ্টি হয়েছিল বেশ| সেই বৃষ্টির জলে উজানের নদী ভাটিতে এসে শব্দ তুলছিল গর্জনের মতো করে| একটার পর একটা ঢেউ ভাঁজ ভাঙছিল একে অপরের ওপর ঝাপটে পড়ে| চারিদিকে ছিল বাতাসের বিকট শব্দশোঁ শোঁ, শোঁ শোঁ| রাতে যেমন লোঙ্গার বিল, বুইদ্দার বিল বা মরজার বিল থেকে মৃত মানুষের আর্তনাদ আসে, তেমনই আর্তনাদ আসছিলকুঁ--, কুঁ--, ওঁ--| গোমতীর ভাটিতে বর্ষার মওসুমে এমনিতেই জলের নিশানা থাকে না| নদীতে উন্মাদনা থাকলে জোয়ারের জল যেন লাফিয়ে চলে উচ্ছল তরুণীর ভোকাট্টা চলার মতোতাধিন, তাধিন, তাধিন|

এদিকে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলার মস্তানের মাজারের সঙ্গে মনসুর পাগলার আত্মার সম্পর্ক সেই ছোটবেলা ত্থেকে| সেই নয়-দশ বছর বয়স থেকে সে মস্তানের মাজারে এসে পড়ে থাকে| তার ওপর বছর শেষে মাজারে ঔরস হলে তো কোনো কথাই নেই| তার ভোকাট্টা তাধিন তাধিন নাচ আরও বেড়ে যায়| আগের দুই-তিন দিন শামিয়ানা-প্যান্ডেল টানানো থেকে শুরু করে মাজারে নতুন গিলাফ লাগানো| উরসের দিন আগরাত ধরে বাউলদের পালা দেখা| মাঝরাতে রান্নাবান্নায় তদারকি করা| সকালে কলাপাতা বিছিয়ে খিচুড়ি খাওয়া| ঘরে বউ আসার পরও সে উরস কখনও বাদ দেয়নি| তার প্রথম বউ জুলেখা মাজারে আসতে চাইত না| তারপরও সে জোর করে নিয়ে আসত| দ্বিতীয় বউ সেতারা বেগম অবশ্য নিজ থেকেই উরসে আসত|

গত পরশু দিন রাতে সেই বটতলায় মস্তানের মাজারে উরস ছিল|

বর্ষাকালে নদীর জল উত্তরের জোয়ারের জল এক হয়ে গেলে গোমতীর ভাটিতে বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার বিল মরজার বিলকে কেন্দ্র করে যতগুলো গ্রাম আছে, সেই কয়েকশো বছর আগে থেকেই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা| আগে নৌকায় করেই সবাইকে হোমনা বা দাউদকান্দি যেতে হতো| দাউদকান্দি থেকে পরে ভাগ হয়ে তিতাস নামে নতুন উপজেলা হলে গৌরীপুর থেকে একটি সুন্দর পাকা রাস্তা হয়েছে হোমনা মুরাদনগর অব্ধি| সেই রাস্তা ধরে এখন বাস-টেম্পু-রিকশা অহরহ চলে| এতে অনেক গ্রামের মানুষেরই নৌকার বাহন কমে গেছে| কিন্তু আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দি, অনুতপুর ছড়িয়াকান্দিসহ আরও কিছু গ্রাম গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে বলে বাহন হিসেবে নৌকার আধিক্য একটুও কমেনি| বিশেষ করে গরিব গৃহস্থ ঘরগুলোতে মাছ ধরার জন্য বা মীরবহরি হাটে আনাজপাতি বেচার জন্য তাদের ছোট্ট একটা কোষা বা ডিঙি নৌকা থাকবেই| যদিও অনুতপুর থেকে একটা রাস্তার কাজ চলছে| রাস্তাটা এরই মধ্যে মোল্লাকান্দির কাছাকাছি চলে এসেছে| যে হারে কাজ চলছে, এতে দেখা যাবে নতুন রাস্তাটা এক-দেড় বছরের মধ্যে বুইদ্দার বিলের বুক চিরে মীরবহরি, আঁধারিয়া, রায়তলা কদমতলি পেরিয়ে গেছে| অবশ্য শুকনো মওসুম বা সুদিনে এই ডোবা অঞ্চলের জীবন যাত্রা অনেকটাই অন্যরকম হয়ে যায়|

মনসুর পাগলার ঘরেও একটা নৌকা আছে| নৌকাটা তার বাবার আমলের| লোহাকাঠের| এখনও বেশ মজবুত| মনসুর পাগলা অন্য কোনো কাজ করুক আর না করুক, প্রতিবছর একবার করে হলেও নৌকাটায় আলকাতরা দেয়| দু-একটা কাঠ নড়েচড়ে হয়ে গেলে মীরবহরি বাজারের বিধু কর্মকারের কাছ থেকে তারকাঁটা এনে ঠিক করে|

মনসুর পাগলা সেই নৌকায় করেই সেতারা বেগমকে নিয়ে পরশু সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়| বাড়ির পর গোপাট| গোপাট লাগোয়া পুবে বুইদ্দার খাল| সেই বুইদ্দার খাল ধরে দক্ষিণ পাড়ার মুখ ছেড়ে উত্তর পাড়া হয়ে কিছুক্ষণ গেলেই গোমতী নদী| গোমতী নদী ধরে ভাটির দিকে গেলে মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলা|

মনসুর পাগলার সেতারা বেগমকে নিয়ে পুনোয়ারার বটতলার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী এক স্রোতের ঘূর্ণিপাকে পড়ে তার নৌকাটা একেবারে উল্টে যায়| উল্টে যাওয়া নৌকা ধরে মনসুর পাগলা কোনো মতে নিজেকে রক্ষা করলেও বউকে সে রক্ষা করতে পারেনি| সেতারা বেগম দুবার জলে ভেসে উঠে শাড়িতে পেঁচিয়ে সেই যে ডুব দেয়, আর ভাসেনি| নৌকা ধরে ভাসতে ভাসতে মনসুর পাগলার সে কী আর্তনাদ শুরু করে, ‘--, কেডা আছো গো, আমার বউ গাঙে ডুইবা গেছে| --, কেডা আছো...!’

মনসুর পাগলার আর্তনাদ শুনে উরসের অনেক মানুষ টর্চলাইট নিয়ে গাঙপাড়ে এসে জমা হয়| কয়েকজন ঘাটে বাঁধা দুটো নৌকা নিয়ে এসে মনসুর পাগলা তার নৌকাটা উদ্ধার করে| কিন্তু সিতারা বেগমকে কেউ খুঁজে পায় না|

তারপর পরশুরাত গতকাল সারাদিন মনসুর পাগলা আঁতিপাঁতি করে সেতারা বেগমের লাশ খোঁজে! শুধু মনসুর পাগলাই না, তিন গ্রাম পর অনুতপুর থেকে সেতারা বেগমের বাবা, জেঠা, ছোট ভাইসহ বেশ কয়েকজন আসে লাশ খুঁজতে| ভুঁইয়া বাড়ির আনিসও গতকাল মনসুর পাগলার সঙ্গে রাত অব্ধি লাশ খুঁজে বেড়ায়| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, এমনকি মীরবহরির গ্রামের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে নৌকা নিয়ে লাশ খুঁজতে বের হয়| কিন্তু লাশ আর কেউ খুঁজে পায়নি| গ্রামের কেউ কেউ বলতে শুরু করে, লাশ বোয়াল মাছে খেয়ে ফেলেছে| কেউ বলে, লাশ ভাসতে ভাসতে মেঘনার মোহনায় চলে গেছে...| ক্রমশ...

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত