প্রথম পর্ব: সেতারার মৃত্যু
এক
লাশটা
উপুড় হয়ে আছে| চেহারাটা
ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না|
তারপরও আঁধারিয়া গ্রামের মধ্যপাড়ার রব্বান শেখ তার ছোট্ট
নৌকাটা নিয়ে গোমতী নদীর
ধারে কুনো জাল দিয়ে
মাছ ধরতে এসে লাশটা
চিনে ফেলল| সে চিৎকার করে
বলে উঠল, ‘কেডা আছো গো,
দেইখা যাও| লাশ পাওয়া
গেছে গো...!’
প্রকৃতির
নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোরের সূর্যটা
সবে আগুনের টকটকে লাল গোলার মতো
করে আঁধারিয়া গ্রামের পুবের উঁচু তালগাছটার গা
বেয়ে উঠছে| নরম-শীতল বাতাস
বইছে দক্ষিণের দুয়ার ভেঙে— শন শন, শন
শন| গোমতী নদীর জল ও
উত্তরের জোয়ারের জল মিলে যুগপৎ
শব্দ করছে— কল কল, কল
কল| সাধারণত এ সময় ডাহুক
ডাকে না| কিন্তু এ
মুহূর্তে ডাহুকের ডাক আসছে— কোয়াক
কোয়াক, কোয়াক কোয়াক| ডাহুকের ডাকে কেমন আর্তনাদের
সুর| নদীর পাড়ের একটা
বাঁশের উঁচু কঞ্চিতে একটা
দাঁড়কাক গা ফুলিয়ে বসে
আছে| কাকটার ধ্যান জলের দিকে|
গোমতীর
জল ও জোয়ারের জল
একাকার হয়ে গেলেও নদীর
পাড় ঘেঁষা বুইদ্দার বিলের জমিগুলোতে ধানের সবুজ ডগাগুলো তখনও
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে
আছে| সেই ধানী জমির
ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যায় পেতে যাওয়া জাল
নৌকায় টেনে টেনে তুলছে
কোনো কোনো গৃহস্থ| সুদিনে
ধানী জমিতে কামলা দেওয়ার পাশাপাশি জোয়ারের মওসুমে নৌকা বেয়ে মাছ
ধরা তাদের বাড়তি আয়| ওরা জালের
মাছ সকালের মীরবহরি বাজারে বিক্রি করে| বেশি মাছ
পেলে কেউ কেউ উপজেলা
সদরেও নিয়ে যায়| ওরা
শুধু আইলের ফাঁকে ফাঁকে পেতে যাওয়া জালেই
মাছ ধরে না| কেউ
কেউ দলবেঁধে গোমতীর স্রোতের ভেতর বড় ডিঙি
নৌকা নিয়ে জাল ফেলে|
কেউ আবার ছোট্ট কোষা
নৌকা নিয়েই কুনোজাল ফেলে গোমতীর মাছ
ধরে|
রব্বান
শেখ কারও সাড়া না
পেয়ে লাশটা আবার দেখল| লাশটা
জলের ওপর দুলছে দক্ষিণের
কোড়ে, ঘের দেওয়া কচুরিপানার
ফাঁকে| হাত-পা এমনভাবে
মেলে দেওয়া যে তাতে মনে
হচ্ছে, কোনো যুবতী মহিলা
উপুড় হয়ে সাঁতার কাটতে
কাটতে যেন লাশ হয়েছে|
পরনের শাড়িটা ঢেউয়ের দুলুনিতে একবার উরুর ওপর উঠছে,
আরেকবার হাঁটুতে নেমে আসছে| চুলগুলো
তখনও খোঁপা করা| জল গিলতে
গিলতে লাশ ফুলে উঠে
গায়ের ব্লাউজটা কেমন কামড়ে ধরেছে|
রব্বান
শেখ আবার ডাক দিল,
‘ও-ও, কেউ কি
শুনতাছ না? লাশ পাওয়া
গেছে...’|
কচুরিপানার
ঘের দেওয়া কোড়ের ওপাশ থেকে করিম
মিয়া গলা বাড়াল, ‘কী
পাওয়া গেছে, মাছ? কত বড়?’
রব্বান
শেখ বলল, ‘না না, লাশ’|
‘লাশ,
কার লাশ?’
‘মনসুর
পাগলার বউয়ের লাশ’|
করিম
মিয়া নৌকা নিয়ে এগিয়ে
আসতে আসতে বলল, ‘কও
কী!’
রব্বান
শেখ বলল, ‘হ, হ, দেইখা
যাও’|
করিম
মিয়া কোড়ের ঘেরের কাছাকাছি নৌকাটা আনতেই লাশটার ওপর তার চোখে
পড়ল| লাশ দেখেই সে
আঁতকে উঠে বলল, ‘হায়
মা’বুদ’| পরক্ষণই তার চোখ গিয়ে
পড়ল লাশের উরু ও পরনের
শাড়িটার সংযোগস্থলে| তার চোখ স্থির
হয়ে গেল|
রব্বান
শেখ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে
বলল, ‘মনসুর পাগলা কই কই গিয়া
তার বউয়ের লাশ খুঁজতাছে| আর
লাশটা ভাইসা উঠছে এইখানে, কোড়ের
পাড়’|
করিম
মিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হ, তাই তো!’
বলেই সে লাশের উরুর
দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল| সে
লাশের ওপর থেকে দৃষ্টি
সরিয়ে রব্বান মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কিন্তুক আমার একটা কথা’|
রব্বান
মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’
‘লাশটা
তো উল্টাইয়া রইছে| চেহারা দেখা যাইতাছে না|
‘তয়
কী হইছে?’
‘তুমি
কেমনে বুঝলা, এই লাশটা যে
মনসুর পাগলার বউয়ের?
‘ও,
হেইডা তো ঠিক কইছ|
তাইলে এই লাশটা কার?
‘অন্য
কারোর তো হইতে পারে’|
‘আমার
মনে হইতাছে, লাশটা মনসুর পাগলার বউয়েরই| শরীরের গঠন দেখতাছ না?’
করিম
মিয়া আবার লাশের দিকে
তাকাল| লাশটা ভরাট শরীরের| এটা
শুধু নদীর জল খেয়ে
ফুলে উঠেছে বলে নয়| মনসুর
পাগলার বউ সেতারা বেগমকে
সে বহুবার দেখেছে| পাশাপাশি পাড়ার মানুষ তারা| ভরাট শরীরে নিয়ে
যখন পাড়ে, গোপাটে ও বাড়ির ধারে
থপথপ করে হাঁটত, তখন
আপনা থেকেই দৃষ্টি আটকে যেত| সেতারা
বেগম হাসতও বেশ— খলবল, খলবল|
মাঝেমধ্যে দেখা যেত, গোপাটে
বা বুইদ্দার খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভুঁইয়া
বাড়ির আনিসের সঙ্গে কথা বলছে| খালের
এপার আর ওপার| বুইদ্দার
খালটা সরু| সুদিন এলে
শুকিয়ে যায়| বর্ষার মওসুমে
যদিও জোয়ারের জলে ফুলে-ফেঁপে
ওঠে|
করিম
মিয়া তারপরও দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা,
মানলাম এই লাশটা মনসুর
পাগলার বউয়ের| কিন্তুক মনসুর পাগলার বউ তো ডুবছে
মোল্লাকান্দি গেরামের ভাটিতে| হেই পুনোয়ারার বটগাছটার
কাছে| লাশ তাইলে এক
মাইল উজাইয়া এইখানে আইলো কেমন?’
রব্বান
শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে সায়
দিয়ে বলল, ‘করিম ভাই, কথাডা
তো তুমি ঠিক কইছ|
লাশ তো উজাইয়া আইবার
পারে না| তাইলে?’
করিম
মিয়া বলল, ‘রব্বান মিয়া, একটা কাম করতে
পারি| চলো, লাশটা বৈঠা
দিয়া ঠেইলা উল্টাইয়া দেখি’|
রব্বান
শেখ বলল, ‘হ, দেখতে পারি|
লাশটা চিৎ কইরা দিলেই
তো চেহারাডা দেখতে পারমু’|
করিম
মিয়া বলল, ‘আইচ্ছা, তুমি নৌকাটা আগাইয়া
লইয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া
ধাক্কা দাও| আমি এদিক
দিয়া বৈঠায় ঠেলা দিতাছি’|
রব্বান
মিয়া বলল, ‘হেইডাই ভালা হইব’| বলেই
সে নৌকাটা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল|
লগি দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা
সরিয়ে সে নৌকাটা লাশের
অন্যপাশে নিয়ে এল|
করিম
মিয়া এপাশে নৌকাটা লাশের আরও কাছে নিয়ে
ˆবঠা দিয়ে ধাক্কা দিতেই
এক ধাক্কায় লাশটা চিৎ হয়ে গেল|
ওরা
দেখল, লাশ মনসুর পাগলার
বউ সেতারা বেগমেরই| সেতারা বেগম ডুবেছিল দু’দিন আগে, উঠতি
রাতে|
এই
সকালে যেমন গোমতী নদীটা
বেশ শান্ত, সেদিন এমন শান্ত ছিল
না| সেদিন নদীর ঢেউ ছিল
পাড় ভাঙা, খুঁটিতে আটকে থাকা ষাঁড়ের
মতো| এর আগের দিনই
বৃষ্টি হয়েছিল বেশ| সেই বৃষ্টির
জলে উজানের নদী ভাটিতে এসে
শব্দ তুলছিল গর্জনের মতো করে| একটার
পর একটা ঢেউ ভাঁজ
ভাঙছিল একে অপরের ওপর
ঝাপটে পড়ে| চারিদিকে ছিল
বাতাসের বিকট শব্দ— শোঁ
শোঁ, শোঁ শোঁ| রাতে
যেমন লোঙ্গার বিল, বুইদ্দার বিল
বা মরজার বিল থেকে মৃত
মানুষের আর্তনাদ আসে, তেমনই আর্তনাদ
আসছিল— কুঁ-ও-ও,
কুঁ-ও-ও, ওঁ-ও-ও| গোমতীর
ভাটিতে বর্ষার মওসুমে এমনিতেই জলের নিশানা থাকে
না| নদীতে উন্মাদনা থাকলে জোয়ারের জল যেন লাফিয়ে
চলে উচ্ছল তরুণীর ভোকাট্টা চলার মতো— তাধিন,
তাধিন, তাধিন|
এদিকে
মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলার মস্তানের মাজারের সঙ্গে মনসুর পাগলার আত্মার সম্পর্ক সেই ছোটবেলা ত্থেকে|
সেই নয়-দশ বছর
বয়স থেকে সে মস্তানের
মাজারে এসে পড়ে থাকে|
তার ওপর বছর শেষে
মাজারে ঔরস হলে তো
কোনো কথাই নেই| তার
ভোকাট্টা তাধিন তাধিন নাচ আরও বেড়ে
যায়| আগের দুই-তিন
দিন শামিয়ানা-প্যান্ডেল টানানো থেকে শুরু করে
মাজারে নতুন গিলাফ লাগানো|
উরসের দিন আগরাত ধরে
বাউলদের পালা দেখা| মাঝরাতে
রান্নাবান্নায় তদারকি করা| সকালে কলাপাতা
বিছিয়ে খিচুড়ি খাওয়া| ঘরে বউ আসার
পরও সে উরস কখনও
বাদ দেয়নি| তার প্রথম বউ
জুলেখা মাজারে আসতে চাইত না|
তারপরও সে জোর করে
নিয়ে আসত| দ্বিতীয় বউ
সেতারা বেগম অবশ্য নিজ
থেকেই উরসে আসত|
গত
পরশু দিন রাতে সেই
বটতলায় মস্তানের মাজারে উরস ছিল|
বর্ষাকালে
নদীর জল ও উত্তরের
জোয়ারের জল এক হয়ে
গেলে গোমতীর ভাটিতে বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার বিল
ও মরজার বিলকে কেন্দ্র করে যতগুলো গ্রাম
আছে, সেই কয়েকশো বছর
আগে থেকেই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে
নৌকা| আগে নৌকায় করেই
সবাইকে হোমনা বা দাউদকান্দি যেতে
হতো| দাউদকান্দি থেকে পরে ভাগ
হয়ে তিতাস নামে নতুন উপজেলা
হলে গৌরীপুর থেকে একটি সুন্দর
পাকা রাস্তা হয়েছে হোমনা ও মুরাদনগর অব্ধি|
সেই রাস্তা ধরে এখন বাস-টেম্পু-রিকশা অহরহ চলে| এতে
অনেক গ্রামের মানুষেরই নৌকার বাহন কমে গেছে|
কিন্তু আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দি, অনুতপুর ও ছড়িয়াকান্দিসহ আরও
কিছু গ্রাম গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে
বলে বাহন হিসেবে নৌকার
আধিক্য একটুও কমেনি| বিশেষ করে গরিব ও
গৃহস্থ ঘরগুলোতে মাছ ধরার জন্য
বা মীরবহরি হাটে আনাজপাতি বেচার
জন্য তাদের ছোট্ট একটা কোষা বা
ডিঙি নৌকা থাকবেই| যদিও
অনুতপুর থেকে একটা রাস্তার
কাজ চলছে| রাস্তাটা এরই মধ্যে মোল্লাকান্দির
কাছাকাছি চলে এসেছে| যে
হারে কাজ চলছে, এতে
দেখা যাবে নতুন রাস্তাটা
এক-দেড় বছরের মধ্যে
বুইদ্দার বিলের বুক চিরে মীরবহরি,
আঁধারিয়া, রায়তলা ও কদমতলি পেরিয়ে
গেছে| অবশ্য শুকনো মওসুম বা সুদিনে এই
ডোবা অঞ্চলের জীবন যাত্রা অনেকটাই
অন্যরকম হয়ে যায়|
মনসুর
পাগলার ঘরেও একটা নৌকা
আছে| নৌকাটা তার বাবার আমলের|
লোহাকাঠের| এখনও বেশ মজবুত|
মনসুর পাগলা অন্য কোনো কাজ
করুক আর না করুক,
প্রতিবছর একবার করে হলেও নৌকাটায়
আলকাতরা দেয়| দু-একটা
কাঠ নড়েচড়ে হয়ে গেলে মীরবহরি
বাজারের বিধু কর্মকারের কাছ
থেকে তারকাঁটা এনে ঠিক করে|
মনসুর
পাগলা সেই নৌকায় করেই
সেতারা বেগমকে নিয়ে পরশু সন্ধ্যায়
বাড়ি থেকে বের হয়|
বাড়ির পর গোপাট| গোপাট
লাগোয়া পুবে বুইদ্দার খাল|
সেই বুইদ্দার খাল ধরে দক্ষিণ
পাড়ার মুখ ছেড়ে উত্তর
পাড়া হয়ে কিছুক্ষণ গেলেই
গোমতী নদী| গোমতী নদী
ধরে ভাটির দিকে গেলে মোল্লাকান্দির
পুনোয়ারার বটতলা|
মনসুর
পাগলার সেতারা বেগমকে নিয়ে পুনোয়ারার বটতলার
কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী এক
স্রোতের ঘূর্ণিপাকে পড়ে তার নৌকাটা
একেবারে উল্টে যায়| উল্টে যাওয়া
নৌকা ধরে মনসুর পাগলা
কোনো মতে নিজেকে রক্ষা
করলেও বউকে সে রক্ষা
করতে পারেনি| সেতারা বেগম দু’বার
জলে ভেসে উঠে শাড়িতে
পেঁচিয়ে সেই যে ডুব
দেয়, আর ভাসেনি| নৌকা
ধরে ভাসতে ভাসতে মনসুর পাগলার সে কী আর্তনাদ
শুরু করে, ‘আ-আ-আ,
কেডা আছো গো, আমার
বউ গাঙে ডুইবা গেছে|
আ-আ-আ, কেডা
আছো...!’
মনসুর
পাগলার আর্তনাদ শুনে উরসের অনেক
মানুষ টর্চলাইট নিয়ে গাঙপাড়ে এসে
জমা হয়| কয়েকজন ঘাটে
বাঁধা দুটো নৌকা নিয়ে
এসে মনসুর পাগলা ও তার নৌকাটা
উদ্ধার করে| কিন্তু সিতারা
বেগমকে কেউ খুঁজে পায়
না|
তারপর
পরশুরাত ও গতকাল সারাদিন
মনসুর পাগলা আঁতিপাঁতি করে সেতারা বেগমের
লাশ খোঁজে! শুধু মনসুর পাগলাই
না, তিন গ্রাম পর
অনুতপুর থেকে সেতারা বেগমের
বাবা, জেঠা, ছোট ভাইসহ বেশ
কয়েকজন আসে লাশ খুঁজতে|
ভুঁইয়া বাড়ির আনিসও গতকাল মনসুর পাগলার সঙ্গে রাত অব্ধি লাশ
খুঁজে বেড়ায়| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, এমনকি মীরবহরির গ্রামের কেউ কেউ তাদের
সঙ্গে নৌকা নিয়ে লাশ
খুঁজতে বের হয়| কিন্তু
লাশ আর কেউ খুঁজে
পায়নি| গ্রামের কেউ কেউ বলতে
শুরু করে, লাশ বোয়াল
মাছে খেয়ে ফেলেছে| কেউ
বলে, লাশ ভাসতে ভাসতে
মেঘনার মোহনায় চলে গেছে...| ক্রমশ...
***

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
প্রথম পর্ব: সেতারার মৃত্যু
এক
লাশটা
উপুড় হয়ে আছে| চেহারাটা
ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না|
তারপরও আঁধারিয়া গ্রামের মধ্যপাড়ার রব্বান শেখ তার ছোট্ট
নৌকাটা নিয়ে গোমতী নদীর
ধারে কুনো জাল দিয়ে
মাছ ধরতে এসে লাশটা
চিনে ফেলল| সে চিৎকার করে
বলে উঠল, ‘কেডা আছো গো,
দেইখা যাও| লাশ পাওয়া
গেছে গো...!’
প্রকৃতির
নিস্তব্ধতা ভেঙে ভোরের সূর্যটা
সবে আগুনের টকটকে লাল গোলার মতো
করে আঁধারিয়া গ্রামের পুবের উঁচু তালগাছটার গা
বেয়ে উঠছে| নরম-শীতল বাতাস
বইছে দক্ষিণের দুয়ার ভেঙে— শন শন, শন
শন| গোমতী নদীর জল ও
উত্তরের জোয়ারের জল মিলে যুগপৎ
শব্দ করছে— কল কল, কল
কল| সাধারণত এ সময় ডাহুক
ডাকে না| কিন্তু এ
মুহূর্তে ডাহুকের ডাক আসছে— কোয়াক
কোয়াক, কোয়াক কোয়াক| ডাহুকের ডাকে কেমন আর্তনাদের
সুর| নদীর পাড়ের একটা
বাঁশের উঁচু কঞ্চিতে একটা
দাঁড়কাক গা ফুলিয়ে বসে
আছে| কাকটার ধ্যান জলের দিকে|
গোমতীর
জল ও জোয়ারের জল
একাকার হয়ে গেলেও নদীর
পাড় ঘেঁষা বুইদ্দার বিলের জমিগুলোতে ধানের সবুজ ডগাগুলো তখনও
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে
আছে| সেই ধানী জমির
ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যায় পেতে যাওয়া জাল
নৌকায় টেনে টেনে তুলছে
কোনো কোনো গৃহস্থ| সুদিনে
ধানী জমিতে কামলা দেওয়ার পাশাপাশি জোয়ারের মওসুমে নৌকা বেয়ে মাছ
ধরা তাদের বাড়তি আয়| ওরা জালের
মাছ সকালের মীরবহরি বাজারে বিক্রি করে| বেশি মাছ
পেলে কেউ কেউ উপজেলা
সদরেও নিয়ে যায়| ওরা
শুধু আইলের ফাঁকে ফাঁকে পেতে যাওয়া জালেই
মাছ ধরে না| কেউ
কেউ দলবেঁধে গোমতীর স্রোতের ভেতর বড় ডিঙি
নৌকা নিয়ে জাল ফেলে|
কেউ আবার ছোট্ট কোষা
নৌকা নিয়েই কুনোজাল ফেলে গোমতীর মাছ
ধরে|
রব্বান
শেখ কারও সাড়া না
পেয়ে লাশটা আবার দেখল| লাশটা
জলের ওপর দুলছে দক্ষিণের
কোড়ে, ঘের দেওয়া কচুরিপানার
ফাঁকে| হাত-পা এমনভাবে
মেলে দেওয়া যে তাতে মনে
হচ্ছে, কোনো যুবতী মহিলা
উপুড় হয়ে সাঁতার কাটতে
কাটতে যেন লাশ হয়েছে|
পরনের শাড়িটা ঢেউয়ের দুলুনিতে একবার উরুর ওপর উঠছে,
আরেকবার হাঁটুতে নেমে আসছে| চুলগুলো
তখনও খোঁপা করা| জল গিলতে
গিলতে লাশ ফুলে উঠে
গায়ের ব্লাউজটা কেমন কামড়ে ধরেছে|
রব্বান
শেখ আবার ডাক দিল,
‘ও-ও, কেউ কি
শুনতাছ না? লাশ পাওয়া
গেছে...’|
কচুরিপানার
ঘের দেওয়া কোড়ের ওপাশ থেকে করিম
মিয়া গলা বাড়াল, ‘কী
পাওয়া গেছে, মাছ? কত বড়?’
রব্বান
শেখ বলল, ‘না না, লাশ’|
‘লাশ,
কার লাশ?’
‘মনসুর
পাগলার বউয়ের লাশ’|
করিম
মিয়া নৌকা নিয়ে এগিয়ে
আসতে আসতে বলল, ‘কও
কী!’
রব্বান
শেখ বলল, ‘হ, হ, দেইখা
যাও’|
করিম
মিয়া কোড়ের ঘেরের কাছাকাছি নৌকাটা আনতেই লাশটার ওপর তার চোখে
পড়ল| লাশ দেখেই সে
আঁতকে উঠে বলল, ‘হায়
মা’বুদ’| পরক্ষণই তার চোখ গিয়ে
পড়ল লাশের উরু ও পরনের
শাড়িটার সংযোগস্থলে| তার চোখ স্থির
হয়ে গেল|
রব্বান
শেখ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে
বলল, ‘মনসুর পাগলা কই কই গিয়া
তার বউয়ের লাশ খুঁজতাছে| আর
লাশটা ভাইসা উঠছে এইখানে, কোড়ের
পাড়’|
করিম
মিয়া অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হ, তাই তো!’
বলেই সে লাশের উরুর
দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল| সে
লাশের ওপর থেকে দৃষ্টি
সরিয়ে রব্বান মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কিন্তুক আমার একটা কথা’|
রব্বান
মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’
‘লাশটা
তো উল্টাইয়া রইছে| চেহারা দেখা যাইতাছে না|
‘তয়
কী হইছে?’
‘তুমি
কেমনে বুঝলা, এই লাশটা যে
মনসুর পাগলার বউয়ের?
‘ও,
হেইডা তো ঠিক কইছ|
তাইলে এই লাশটা কার?
‘অন্য
কারোর তো হইতে পারে’|
‘আমার
মনে হইতাছে, লাশটা মনসুর পাগলার বউয়েরই| শরীরের গঠন দেখতাছ না?’
করিম
মিয়া আবার লাশের দিকে
তাকাল| লাশটা ভরাট শরীরের| এটা
শুধু নদীর জল খেয়ে
ফুলে উঠেছে বলে নয়| মনসুর
পাগলার বউ সেতারা বেগমকে
সে বহুবার দেখেছে| পাশাপাশি পাড়ার মানুষ তারা| ভরাট শরীরে নিয়ে
যখন পাড়ে, গোপাটে ও বাড়ির ধারে
থপথপ করে হাঁটত, তখন
আপনা থেকেই দৃষ্টি আটকে যেত| সেতারা
বেগম হাসতও বেশ— খলবল, খলবল|
মাঝেমধ্যে দেখা যেত, গোপাটে
বা বুইদ্দার খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভুঁইয়া
বাড়ির আনিসের সঙ্গে কথা বলছে| খালের
এপার আর ওপার| বুইদ্দার
খালটা সরু| সুদিন এলে
শুকিয়ে যায়| বর্ষার মওসুমে
যদিও জোয়ারের জলে ফুলে-ফেঁপে
ওঠে|
করিম
মিয়া তারপরও দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা,
মানলাম এই লাশটা মনসুর
পাগলার বউয়ের| কিন্তুক মনসুর পাগলার বউ তো ডুবছে
মোল্লাকান্দি গেরামের ভাটিতে| হেই পুনোয়ারার বটগাছটার
কাছে| লাশ তাইলে এক
মাইল উজাইয়া এইখানে আইলো কেমন?’
রব্বান
শেখ মাথা ঝাঁকিয়ে সায়
দিয়ে বলল, ‘করিম ভাই, কথাডা
তো তুমি ঠিক কইছ|
লাশ তো উজাইয়া আইবার
পারে না| তাইলে?’
করিম
মিয়া বলল, ‘রব্বান মিয়া, একটা কাম করতে
পারি| চলো, লাশটা বৈঠা
দিয়া ঠেইলা উল্টাইয়া দেখি’|
রব্বান
শেখ বলল, ‘হ, দেখতে পারি|
লাশটা চিৎ কইরা দিলেই
তো চেহারাডা দেখতে পারমু’|
করিম
মিয়া বলল, ‘আইচ্ছা, তুমি নৌকাটা আগাইয়া
লইয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া
ধাক্কা দাও| আমি এদিক
দিয়া বৈঠায় ঠেলা দিতাছি’|
রব্বান
মিয়া বলল, ‘হেইডাই ভালা হইব’| বলেই
সে নৌকাটা কচুরিপানার ঘেরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল|
লগি দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা
সরিয়ে সে নৌকাটা লাশের
অন্যপাশে নিয়ে এল|
করিম
মিয়া এপাশে নৌকাটা লাশের আরও কাছে নিয়ে
ˆবঠা দিয়ে ধাক্কা দিতেই
এক ধাক্কায় লাশটা চিৎ হয়ে গেল|
ওরা
দেখল, লাশ মনসুর পাগলার
বউ সেতারা বেগমেরই| সেতারা বেগম ডুবেছিল দু’দিন আগে, উঠতি
রাতে|
এই
সকালে যেমন গোমতী নদীটা
বেশ শান্ত, সেদিন এমন শান্ত ছিল
না| সেদিন নদীর ঢেউ ছিল
পাড় ভাঙা, খুঁটিতে আটকে থাকা ষাঁড়ের
মতো| এর আগের দিনই
বৃষ্টি হয়েছিল বেশ| সেই বৃষ্টির
জলে উজানের নদী ভাটিতে এসে
শব্দ তুলছিল গর্জনের মতো করে| একটার
পর একটা ঢেউ ভাঁজ
ভাঙছিল একে অপরের ওপর
ঝাপটে পড়ে| চারিদিকে ছিল
বাতাসের বিকট শব্দ— শোঁ
শোঁ, শোঁ শোঁ| রাতে
যেমন লোঙ্গার বিল, বুইদ্দার বিল
বা মরজার বিল থেকে মৃত
মানুষের আর্তনাদ আসে, তেমনই আর্তনাদ
আসছিল— কুঁ-ও-ও,
কুঁ-ও-ও, ওঁ-ও-ও| গোমতীর
ভাটিতে বর্ষার মওসুমে এমনিতেই জলের নিশানা থাকে
না| নদীতে উন্মাদনা থাকলে জোয়ারের জল যেন লাফিয়ে
চলে উচ্ছল তরুণীর ভোকাট্টা চলার মতো— তাধিন,
তাধিন, তাধিন|
এদিকে
মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটতলার মস্তানের মাজারের সঙ্গে মনসুর পাগলার আত্মার সম্পর্ক সেই ছোটবেলা ত্থেকে|
সেই নয়-দশ বছর
বয়স থেকে সে মস্তানের
মাজারে এসে পড়ে থাকে|
তার ওপর বছর শেষে
মাজারে ঔরস হলে তো
কোনো কথাই নেই| তার
ভোকাট্টা তাধিন তাধিন নাচ আরও বেড়ে
যায়| আগের দুই-তিন
দিন শামিয়ানা-প্যান্ডেল টানানো থেকে শুরু করে
মাজারে নতুন গিলাফ লাগানো|
উরসের দিন আগরাত ধরে
বাউলদের পালা দেখা| মাঝরাতে
রান্নাবান্নায় তদারকি করা| সকালে কলাপাতা
বিছিয়ে খিচুড়ি খাওয়া| ঘরে বউ আসার
পরও সে উরস কখনও
বাদ দেয়নি| তার প্রথম বউ
জুলেখা মাজারে আসতে চাইত না|
তারপরও সে জোর করে
নিয়ে আসত| দ্বিতীয় বউ
সেতারা বেগম অবশ্য নিজ
থেকেই উরসে আসত|
গত
পরশু দিন রাতে সেই
বটতলায় মস্তানের মাজারে উরস ছিল|
বর্ষাকালে
নদীর জল ও উত্তরের
জোয়ারের জল এক হয়ে
গেলে গোমতীর ভাটিতে বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার বিল
ও মরজার বিলকে কেন্দ্র করে যতগুলো গ্রাম
আছে, সেই কয়েকশো বছর
আগে থেকেই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে
নৌকা| আগে নৌকায় করেই
সবাইকে হোমনা বা দাউদকান্দি যেতে
হতো| দাউদকান্দি থেকে পরে ভাগ
হয়ে তিতাস নামে নতুন উপজেলা
হলে গৌরীপুর থেকে একটি সুন্দর
পাকা রাস্তা হয়েছে হোমনা ও মুরাদনগর অব্ধি|
সেই রাস্তা ধরে এখন বাস-টেম্পু-রিকশা অহরহ চলে| এতে
অনেক গ্রামের মানুষেরই নৌকার বাহন কমে গেছে|
কিন্তু আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দি, অনুতপুর ও ছড়িয়াকান্দিসহ আরও
কিছু গ্রাম গোমতী নদীর একেবারে ভাটিতে
বলে বাহন হিসেবে নৌকার
আধিক্য একটুও কমেনি| বিশেষ করে গরিব ও
গৃহস্থ ঘরগুলোতে মাছ ধরার জন্য
বা মীরবহরি হাটে আনাজপাতি বেচার
জন্য তাদের ছোট্ট একটা কোষা বা
ডিঙি নৌকা থাকবেই| যদিও
অনুতপুর থেকে একটা রাস্তার
কাজ চলছে| রাস্তাটা এরই মধ্যে মোল্লাকান্দির
কাছাকাছি চলে এসেছে| যে
হারে কাজ চলছে, এতে
দেখা যাবে নতুন রাস্তাটা
এক-দেড় বছরের মধ্যে
বুইদ্দার বিলের বুক চিরে মীরবহরি,
আঁধারিয়া, রায়তলা ও কদমতলি পেরিয়ে
গেছে| অবশ্য শুকনো মওসুম বা সুদিনে এই
ডোবা অঞ্চলের জীবন যাত্রা অনেকটাই
অন্যরকম হয়ে যায়|
মনসুর
পাগলার ঘরেও একটা নৌকা
আছে| নৌকাটা তার বাবার আমলের|
লোহাকাঠের| এখনও বেশ মজবুত|
মনসুর পাগলা অন্য কোনো কাজ
করুক আর না করুক,
প্রতিবছর একবার করে হলেও নৌকাটায়
আলকাতরা দেয়| দু-একটা
কাঠ নড়েচড়ে হয়ে গেলে মীরবহরি
বাজারের বিধু কর্মকারের কাছ
থেকে তারকাঁটা এনে ঠিক করে|
মনসুর
পাগলা সেই নৌকায় করেই
সেতারা বেগমকে নিয়ে পরশু সন্ধ্যায়
বাড়ি থেকে বের হয়|
বাড়ির পর গোপাট| গোপাট
লাগোয়া পুবে বুইদ্দার খাল|
সেই বুইদ্দার খাল ধরে দক্ষিণ
পাড়ার মুখ ছেড়ে উত্তর
পাড়া হয়ে কিছুক্ষণ গেলেই
গোমতী নদী| গোমতী নদী
ধরে ভাটির দিকে গেলে মোল্লাকান্দির
পুনোয়ারার বটতলা|
মনসুর
পাগলার সেতারা বেগমকে নিয়ে পুনোয়ারার বটতলার
কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী এক
স্রোতের ঘূর্ণিপাকে পড়ে তার নৌকাটা
একেবারে উল্টে যায়| উল্টে যাওয়া
নৌকা ধরে মনসুর পাগলা
কোনো মতে নিজেকে রক্ষা
করলেও বউকে সে রক্ষা
করতে পারেনি| সেতারা বেগম দু’বার
জলে ভেসে উঠে শাড়িতে
পেঁচিয়ে সেই যে ডুব
দেয়, আর ভাসেনি| নৌকা
ধরে ভাসতে ভাসতে মনসুর পাগলার সে কী আর্তনাদ
শুরু করে, ‘আ-আ-আ,
কেডা আছো গো, আমার
বউ গাঙে ডুইবা গেছে|
আ-আ-আ, কেডা
আছো...!’
মনসুর
পাগলার আর্তনাদ শুনে উরসের অনেক
মানুষ টর্চলাইট নিয়ে গাঙপাড়ে এসে
জমা হয়| কয়েকজন ঘাটে
বাঁধা দুটো নৌকা নিয়ে
এসে মনসুর পাগলা ও তার নৌকাটা
উদ্ধার করে| কিন্তু সিতারা
বেগমকে কেউ খুঁজে পায়
না|
তারপর
পরশুরাত ও গতকাল সারাদিন
মনসুর পাগলা আঁতিপাঁতি করে সেতারা বেগমের
লাশ খোঁজে! শুধু মনসুর পাগলাই
না, তিন গ্রাম পর
অনুতপুর থেকে সেতারা বেগমের
বাবা, জেঠা, ছোট ভাইসহ বেশ
কয়েকজন আসে লাশ খুঁজতে|
ভুঁইয়া বাড়ির আনিসও গতকাল মনসুর পাগলার সঙ্গে রাত অব্ধি লাশ
খুঁজে বেড়ায়| আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, এমনকি মীরবহরির গ্রামের কেউ কেউ তাদের
সঙ্গে নৌকা নিয়ে লাশ
খুঁজতে বের হয়| কিন্তু
লাশ আর কেউ খুঁজে
পায়নি| গ্রামের কেউ কেউ বলতে
শুরু করে, লাশ বোয়াল
মাছে খেয়ে ফেলেছে| কেউ
বলে, লাশ ভাসতে ভাসতে
মেঘনার মোহনায় চলে গেছে...| ক্রমশ...
***

আপনার মতামত লিখুন