‘চেকের স্বাক্ষর তো আপনারই, তাহলে টাকা দেন না কেন?’ এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত কক্ষে এই একটি প্রশ্নই বহু আসামিকে কোণঠাসা করে ফেলে। আইনের ১১৮ ও ১৩৯ ধারার ‘সংবিধিবদ্ধ অনুমান’ অনেক সময়ই বাদীর পক্ষে একচেটিয়া সুবিধা তৈরি করে। কিন্তু আসলেই কি তাই? শুধু একটি স্বাক্ষর থাকলেই কি যেকোনো ফাঁকা চেক আইনি বৈধতা পেয়ে যায়?
উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক কিছু যুগান্তকারী রায় এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন আর ফাঁকা চেকে নিজের ইচ্ছেমতো অংক বসিয়ে মামলা জিতে যাওয়া সহজ নয়।
স্বাক্ষর সঠিক, কিন্তু ভেতরের লেখা আলাদা?
আমাদের সমাজে ব্যবসা, ঋণ বা সিকিউরিটির নামে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর রাখার একটা ভয়াবহ কু-প্রথা রয়েছে। পরবর্তীতে শত্রুতা বা লোভের বশে সেই চেকে কোটি টাকা বসিয়ে মামলা ঠুকে দেয়া হয়।
এখানেই ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৬৩৬ (এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব) মামলাটি। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করে বলেছেন:
‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এন.আই অ্যাক্ট-এর ধারা ৩ (ই) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাবে না এবং অনুরূপ চেক আইনানুগভাবে বৈধ নয়। ‘অর্থাৎ, চেকটি যে আসামি নিজেই বাদীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়ার উদ্দেশে পূরণ করে দিয়েছেন তা বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে।
কেন অন্য হাতে লেখা?
অনেক সময় বাদী দাবি করেন, ‘আসামি লিখতে পারেন না বা অনুরোধ করেছেন, তাই আমি লিখেছি।’ কিন্তু উচ্চ আদালত এই খোঁড়া যুক্তিকে কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন। ৭৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪৪৭ (এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র) মামলায় আদালত পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। যদি চেকের হস্তাক্ষরে অসংগতি থাকে, তবে মামলার মোড় ঘুরে যাবে। বাদীকে আদালতে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে: কেন চেকটি ড্রয়ার (আসামি) নিজে পূরণ করেননি? অন্য কে এটি পূরণ করেছে? অন্যের পূরণের ক্ষেত্রে ড্রয়ারের লিখিত বা স্পষ্ট অনুমতি ছিল কি-না? বাদী যদি এই হস্তাক্ষরের ভিন্নতার কোনো সন্তোষজনক এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তবে মামলার মূল ভিত্তিই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এবং আসামি সরাসরি খালাস পাবেন।
চেকের বস্তুতগত পরিবর্তন:
এন.আই অ্যাক্টের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি দাতার সম্মতি ছাড়া পরবর্তীতে কোনো কাটাকাটি, ঘষামাজা বা এমন কোনো পরিবর্তন করা হয় যা চেকের মূল চরিত্র বদলে দেয় (যেমন: তারিখ বসানো বা টাকার অংক বাড়ানো), তবে সেই চেকটি আইনগতভাবে বাতিল হয়ে যায়। ফাঁকা চেকে পরবর্তীতে তারিখ বা অংক বসানোও এক ধরণের অবৈধ পরিবর্তন, যদি তা প্রমাণের সুযোগ আসামি পান।
ফরেনসিক পরীক্ষা ও ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ আসামির মৌলিক অধিকার
‘স্বাক্ষর আমার, কিন্তু ভেতরের লেখা ৫ বছর পরের!’ এই সত্যটি প্রমাণ করার বৈজ্ঞানিক উপায় কী? এখানেই আসে ফরেনসিক বা হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৩ (২) ধারা অনুযায়ী এই পরীক্ষা আসামির একটি আইনি অধিকার।
উপ-মহাদেশের সমাদৃত নজির ‘টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর’ (এআইআর ২০০৮ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০) এবং ‘কল্যাণী ভাস্কর’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে:
শুধু আইনের অনুমানের ওপর ভর করে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কেড়ে নেয়া যাবে না। চেকের কালি, হস্তাক্ষর এবং তা ভিন্ন সময়ে (যেমন ৫ বছর পর) পূরণ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে চেক ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অংশ। আদালত এই আবেদন সহজে খারিজ করতে পারেন না।
সন্দেহের সুবিধা কার?
মহামান্য আপিল বিভাগ ৭১ ডিএলআর (এডি)-তে (হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ) সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ফৌজদারি আইনের চিরন্তন সত্য হলো যেকোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বা অসংগতির সুবিধা পাবেন আসামি।
অতএব, চেকে হস্তাক্ষরের ভিন্নতা, কালির অমিল এবং ভিন্ন সময়ে লিখনকাল যদি ফরেনসিক বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আদালতে তুলে ধরা যায়, তবে শতকোটি টাকার চেকের মামলাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ফাঁকা চেকের ব্যবসার দিন এবার শেষ হতে চলেছে!
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
‘চেকের স্বাক্ষর তো আপনারই, তাহলে টাকা দেন না কেন?’ এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত কক্ষে এই একটি প্রশ্নই বহু আসামিকে কোণঠাসা করে ফেলে। আইনের ১১৮ ও ১৩৯ ধারার ‘সংবিধিবদ্ধ অনুমান’ অনেক সময়ই বাদীর পক্ষে একচেটিয়া সুবিধা তৈরি করে। কিন্তু আসলেই কি তাই? শুধু একটি স্বাক্ষর থাকলেই কি যেকোনো ফাঁকা চেক আইনি বৈধতা পেয়ে যায়?
উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক কিছু যুগান্তকারী রায় এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন আর ফাঁকা চেকে নিজের ইচ্ছেমতো অংক বসিয়ে মামলা জিতে যাওয়া সহজ নয়।
স্বাক্ষর সঠিক, কিন্তু ভেতরের লেখা আলাদা?
আমাদের সমাজে ব্যবসা, ঋণ বা সিকিউরিটির নামে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর রাখার একটা ভয়াবহ কু-প্রথা রয়েছে। পরবর্তীতে শত্রুতা বা লোভের বশে সেই চেকে কোটি টাকা বসিয়ে মামলা ঠুকে দেয়া হয়।
এখানেই ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৬৩৬ (এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব) মামলাটি। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করে বলেছেন:
‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এন.আই অ্যাক্ট-এর ধারা ৩ (ই) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাবে না এবং অনুরূপ চেক আইনানুগভাবে বৈধ নয়। ‘অর্থাৎ, চেকটি যে আসামি নিজেই বাদীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়ার উদ্দেশে পূরণ করে দিয়েছেন তা বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে।
কেন অন্য হাতে লেখা?
অনেক সময় বাদী দাবি করেন, ‘আসামি লিখতে পারেন না বা অনুরোধ করেছেন, তাই আমি লিখেছি।’ কিন্তু উচ্চ আদালত এই খোঁড়া যুক্তিকে কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন। ৭৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪৪৭ (এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র) মামলায় আদালত পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। যদি চেকের হস্তাক্ষরে অসংগতি থাকে, তবে মামলার মোড় ঘুরে যাবে। বাদীকে আদালতে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে: কেন চেকটি ড্রয়ার (আসামি) নিজে পূরণ করেননি? অন্য কে এটি পূরণ করেছে? অন্যের পূরণের ক্ষেত্রে ড্রয়ারের লিখিত বা স্পষ্ট অনুমতি ছিল কি-না? বাদী যদি এই হস্তাক্ষরের ভিন্নতার কোনো সন্তোষজনক এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তবে মামলার মূল ভিত্তিই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এবং আসামি সরাসরি খালাস পাবেন।
চেকের বস্তুতগত পরিবর্তন:
এন.আই অ্যাক্টের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি দাতার সম্মতি ছাড়া পরবর্তীতে কোনো কাটাকাটি, ঘষামাজা বা এমন কোনো পরিবর্তন করা হয় যা চেকের মূল চরিত্র বদলে দেয় (যেমন: তারিখ বসানো বা টাকার অংক বাড়ানো), তবে সেই চেকটি আইনগতভাবে বাতিল হয়ে যায়। ফাঁকা চেকে পরবর্তীতে তারিখ বা অংক বসানোও এক ধরণের অবৈধ পরিবর্তন, যদি তা প্রমাণের সুযোগ আসামি পান।
ফরেনসিক পরীক্ষা ও ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ আসামির মৌলিক অধিকার
‘স্বাক্ষর আমার, কিন্তু ভেতরের লেখা ৫ বছর পরের!’ এই সত্যটি প্রমাণ করার বৈজ্ঞানিক উপায় কী? এখানেই আসে ফরেনসিক বা হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৩ (২) ধারা অনুযায়ী এই পরীক্ষা আসামির একটি আইনি অধিকার।
উপ-মহাদেশের সমাদৃত নজির ‘টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর’ (এআইআর ২০০৮ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০) এবং ‘কল্যাণী ভাস্কর’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে:
শুধু আইনের অনুমানের ওপর ভর করে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কেড়ে নেয়া যাবে না। চেকের কালি, হস্তাক্ষর এবং তা ভিন্ন সময়ে (যেমন ৫ বছর পর) পূরণ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে চেক ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অংশ। আদালত এই আবেদন সহজে খারিজ করতে পারেন না।
সন্দেহের সুবিধা কার?
মহামান্য আপিল বিভাগ ৭১ ডিএলআর (এডি)-তে (হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ) সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ফৌজদারি আইনের চিরন্তন সত্য হলো যেকোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বা অসংগতির সুবিধা পাবেন আসামি।
অতএব, চেকে হস্তাক্ষরের ভিন্নতা, কালির অমিল এবং ভিন্ন সময়ে লিখনকাল যদি ফরেনসিক বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আদালতে তুলে ধরা যায়, তবে শতকোটি টাকার চেকের মামলাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ফাঁকা চেকের ব্যবসার দিন এবার শেষ হতে চলেছে!
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আপনার মতামত লিখুন