সংবাদ

খেলার মাধ্যমে শেখা: শ্রেণীকক্ষে প্রাণ ফেরানোর কৌশল


রফিকুল ইসলাম তালুকদার
রফিকুল ইসলাম তালুকদার
প্রকাশ: ৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

খেলার মাধ্যমে শেখা:  শ্রেণীকক্ষে প্রাণ ফেরানোর কৌশল
একটি শিশু যখন হেসে, খেলে, বিতর্ক করে, গল্প বলে শেখে, তখন সে শুধু তথ্য মনে রাখে না সে চিন্তা করতে শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শেখে

বাংলাদেশের গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি সাধারণ দৃশ্যের কথা ভাবুন— শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, শিক্ষার্থীরা নোট তুলছে, আর ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। পড়ানো হচ্ছে, কিন্তু শেখা হচ্ছে কি? গবেষণা বলছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, খেলার ছলে শেখে — তখন তাদের মস্তিষ্কে তথ্য গভীরে গেঁথে যায়। কিন্তু এই ‘খেলার মাধ্যমে শেখা’ মানে ক্লাসে বিশৃঙ্খলা নয়। এর অর্থ হলো— এমন কার্যকলাপ যা শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগায়, চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং শ্রেণীকক্ষকে একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা-পরিবেশে পরিণত করে। বিশেষত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য— যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, সেখানে এই কৌশলগুলো কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই প্রয়োগ করা সম্ভব।

আসুন, এমন ১০টি কৌশল দেখি যা যেকোনো গ্রামীণ শ্রেণীকক্ষে সহজেই ব্যবহার করা যায়।

১. পপকর্ন কৌশল 

এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তর দিতে পারে— ঠিক যেভাবে তেলের কড়াইতে পপকর্ন হঠাৎ ফুটে ওঠে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন করেন, এবং যে কেউ হাত তোলা ছাড়াই উত্তর দিতে পারে। উত্তর দেয়ার পর সে পরবর্তী প্রশ্ন করতে পারে বা অন্যকে নাম ধরে ডেকে সুযোগ দিতে পারে।

উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘সালোকসংশ্লেষণে কী কী লাগে— যে জানো বলো!’ রিমা বলল ‘সূর্যের আলো’, তারপর সে বলল ‘করিম, তুমি বলো আরেকটি।’ করিম বললো ‘পানি’, এবং এভাবে পুরো ক্লাস সক্রিয় হয়ে উঠলো। এই পদ্ধতিতে লাজুক শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে সাহস পায়।

২. স্নোবল আলোচনা 

প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি কাগজে তার মতামত বা উত্তর লেখে, তারপর সেটা বলের মতো গোল করে ভাঁজ করে ক্লাসে ছুঁড়ে দেয়। প্রত্যেকে একটি কাগজ তুলে পড়ে এবং সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে পরিচয় গোপন থাকে বলে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতামত লিখতে পারে।

উদাহরণ: বাংলা ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কেমন ছিল বলে তুমি মনে করো?’ শিক্ষার্থীরা লিখে কাগজ ছুঁড়ে দিল। তারপর যে কাগজ পেল সে জোরে পড়ল। অনেক অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এলো — যা সরাসরি প্রশ্ন করলে হয়তো আসত না।

৩. ভাবো-জুটি বাঁধো-ভাগ করো 

তিনটি ধাপে এই কৌশল চলে। প্রথমে শিক্ষার্থী একা ভাবে (৩০ সেকেন্ড), তারপর পাশের সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করে (১ মিনিট), তারপর পুরো ক্লাসে সেই ধারণা শেয়ার করে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি শিক্ষার্থী চিন্তা করার সুযোগ পায়, একেবারে চুপ থেকে পার পাওয়ার উপায় থাকে না।

উদাহরণ: গণিত ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘লাভ-ক্ষতির সমস্যাটি নিজে একবার চেষ্টা করো।’ তারপর ‘পাশের জনকে তোমার সমাধান বুঝিয়ে দাও।’ সবশেষে দুটো জুটির সমাধান তুলনা করা হলো। ভুল হলেও শিক্ষার্থী লজ্জা পেল না — কারণ সে শুধু নিজের জুটিকে বলেছিল।

৪. গ্যালারি ওয়াক 

শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে বা বেঞ্চে বিভিন্ন পোস্টার বা প্রশ্নকার্ড লাগানো হয়। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি কার্ডের কাছে যায়, পড়ে, মতামত যোগ করে এবং পরের দলের জন্য ছেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়— শুধু কয়েকটি কাগজ ও কলম দরকার।

উদাহরণ: সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে ৫টি কাগজে লেখা হলো— ‘বন্যার কারণ’, ‘বন্যার ক্ষতি’, ‘বন্যা প্রতিরোধ’, ‘সরকারের ভূমিকা’, ‘আমাদের করণীয়’। প্রতিটি দল একটি করে পয়েন্ট যোগ করে এগিয়ে গেল। ক্লাস শেষে পুরো বিষয়টি একটি সমৃদ্ধ মানচিত্রে পরিণত হলো।

৫. হট সিট 

একটি চেয়ার ‘হট সিট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন শিক্ষার্থী সেখানে বসে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, বিজ্ঞানী বা গল্পের পাত্র হওয়ার ভান করে। বাকি শিক্ষার্থীরা সেই চরিত্রকে প্রশ্ন করে। এটি রোল-প্লে ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি একসঙ্গে বিকাশ করে।

উদাহরণ: ইতিহাস ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায় হট সিটে বসলো। অন্যরা প্রশ্ন করলো— ‘আপনি ৭ মার্চের ভাষণে কেন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না?’ শিক্ষার্থীকে উত্তর দিতে গিয়ে তার পড়া জ্ঞান প্রয়োগ করতে হলো।

৬. স্পিড চ্যাটিং 

শিক্ষার্থীরা দুই সারিতে মুখোমুখি বসে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন দেন এবং ২ মিনিটের জন্য তারা কথা বলে। সময় শেষ হলে এক সারি এক আসন সরে যায়, নতুন জুটি তৈরি হয়, নতুন প্রশ্ন আসে। এটি বিশেষত ভাষা শেখা ও মৌখিক দক্ষতা বিকাশে চমৎকার।

উদাহরণ: ইংরেজি ক্লাসে প্রশ্ন ছিল ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু বি ইন দ্যা ফিউচার?’ প্রতিটি জুটিতে দুজন ইংরেজিতে উত্তর দিল। প্রথমে ভুল হলেও তৃতীয়-চতুর্থ রাউন্ডে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল।

৭. জিগস পাজল পদ্ধতি

একটি বড় বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল একটি ভাগ পড়ে বিশেষজ্ঞ হয়। তারপর দল ভেঙে নতুন মিশ্র দল তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি বিশেষজ্ঞ তার অংশ বাকিদের শেখায়। এতে প্রত্যেকে একই সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক  দুটো ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে ‘মানব পাচনতন্ত্র’ পড়ানো হচ্ছে। চার দলকে চারটি অঙ্গ দেয়া হলো  পাকস্থলী, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র। প্রতিটি দল তাদের অংশ পড়ে নোট করলো। পরে মিশ্র দলে প্রত্যেকে নিজের অংশ বুঝিয়ে দিল  পুরো পাচনতন্ত্র জানা হয়ে গেল।

৮. চার কোণা বিতর্ক 

শ্রেণীকক্ষের চারটি কোণায় লেখা থাকে  ‘সম্পূর্ণ একমত’, ‘একমত’, ‘দ্বিমত’, ‘সম্পূর্ণ দ্বিমত’। শিক্ষক একটি বিতর্কিত বিবৃতি দেন এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত অনুযায়ী কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় ও কারণ ব্যাখ্যা করে। এটি সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা তৈরি করে।

উদাহরণ: নাগরিক শিক্ষা ক্লাসে বিবৃতি দেয়া হলো — ‘মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে।’ কেউ সম্পূর্ণ একমত, কেউ দ্বিমত হলো। প্রত্যেককে কারণ বলতে হলো। শেষে অনেকে অবস্থান বদলাল  এটাই প্রকৃত শিক্ষা।

৯. গল্পের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান

বাস্তব জীবনের একটি সমস্যাকে ছোট গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীরা চরিত্রের ভূমিকায় সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদ্ধতিতে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত হয়, তাই শেখাটা অর্থবহ হয়।

উদাহরণ: গণিত ক্লাসে গল্প  রহিম চাচা ১০ বিঘা জমি তার ৩ ছেলেকে ভাগ করে দিতে চান। বড় ছেলে বলল তার দরকার মোটের ৪০%, মেজো বললো ৩৫%। ছোট ছেলে কতটুকু পাবে এবং প্রত্যেকের জমি কত বিঘা?’ এই গল্পের মাধ্যমে শতকরা হিসাব সহজ হয়ে গেল।

১০. এক্সিট টিকেট 

ক্লাস শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ছোট কাগজে (এক্সিট টিকেট) তিনটি জিনিস লেখে— আজ কী শিখলাম, কোন জায়গাটা এখনও বুঝিনি, পরের ক্লাসে কী জানতে চাই। এটা শুধু মূল্যায়ন নয়, শিক্ষার্থীকে নিজের শেখার বিষয়ে সচেতন করে তোলে।

উদাহরণ: ক্লাস শেষে শিক্ষক বললেন, ‘বের হওয়ার আগে কাগজে লেখো  একটি জিনিস যা আজ শিখলে।’ শিক্ষক কাগজগুলো সংগ্রহ করলেন। পরের দিন দেখলেন ১২ জন এখনও বুঝতে পারেনি পরের ক্লাস সেই বিষয় দিয়েই শুরু হলো।


শেষ কথা: শ্রেণীকক্ষ হোক আনন্দের জায়গা

ওপরের দশটি কৌশলের কোনোটিতেই বাড়তি সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি লাগে না। লাগে শুধু একটু পরিকল্পনা, সাহস এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্বাস। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিদিন যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন, সেখানে এই কৌশলগুলো আলোর মশাল হতে পারে।

একটি শিশু যখন হেসে, খেলে, বিতর্ক করে, গল্প বলে শেখে, তখন সে শুধু তথ্য মনে রাখে না  সে চিন্তা করতে শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শেখে। এই দক্ষতাগুলো তাকে পরীক্ষায় নম্বর দেবে না হয়তো, কিন্তু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।

আমাদের শ্রেণীকক্ষকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা না বানিয়ে, এটিকে পরিণত করি এমন একটি জায়গায় যেখানে প্রতিটি শিশু প্রতিদিন আসতে চায়, কারণ এখানে শেখা মানেই আনন্দ।

[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


খেলার মাধ্যমে শেখা: শ্রেণীকক্ষে প্রাণ ফেরানোর কৌশল

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি সাধারণ দৃশ্যের কথা ভাবুন— শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, শিক্ষার্থীরা নোট তুলছে, আর ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। পড়ানো হচ্ছে, কিন্তু শেখা হচ্ছে কি? গবেষণা বলছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, খেলার ছলে শেখে — তখন তাদের মস্তিষ্কে তথ্য গভীরে গেঁথে যায়। কিন্তু এই ‘খেলার মাধ্যমে শেখা’ মানে ক্লাসে বিশৃঙ্খলা নয়। এর অর্থ হলো— এমন কার্যকলাপ যা শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগায়, চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং শ্রেণীকক্ষকে একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা-পরিবেশে পরিণত করে। বিশেষত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য— যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, সেখানে এই কৌশলগুলো কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই প্রয়োগ করা সম্ভব।

আসুন, এমন ১০টি কৌশল দেখি যা যেকোনো গ্রামীণ শ্রেণীকক্ষে সহজেই ব্যবহার করা যায়।

১. পপকর্ন কৌশল 

এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তর দিতে পারে— ঠিক যেভাবে তেলের কড়াইতে পপকর্ন হঠাৎ ফুটে ওঠে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন করেন, এবং যে কেউ হাত তোলা ছাড়াই উত্তর দিতে পারে। উত্তর দেয়ার পর সে পরবর্তী প্রশ্ন করতে পারে বা অন্যকে নাম ধরে ডেকে সুযোগ দিতে পারে।

উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘সালোকসংশ্লেষণে কী কী লাগে— যে জানো বলো!’ রিমা বলল ‘সূর্যের আলো’, তারপর সে বলল ‘করিম, তুমি বলো আরেকটি।’ করিম বললো ‘পানি’, এবং এভাবে পুরো ক্লাস সক্রিয় হয়ে উঠলো। এই পদ্ধতিতে লাজুক শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে সাহস পায়।

২. স্নোবল আলোচনা 

প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি কাগজে তার মতামত বা উত্তর লেখে, তারপর সেটা বলের মতো গোল করে ভাঁজ করে ক্লাসে ছুঁড়ে দেয়। প্রত্যেকে একটি কাগজ তুলে পড়ে এবং সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে পরিচয় গোপন থাকে বলে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতামত লিখতে পারে।

উদাহরণ: বাংলা ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কেমন ছিল বলে তুমি মনে করো?’ শিক্ষার্থীরা লিখে কাগজ ছুঁড়ে দিল। তারপর যে কাগজ পেল সে জোরে পড়ল। অনেক অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এলো — যা সরাসরি প্রশ্ন করলে হয়তো আসত না।

৩. ভাবো-জুটি বাঁধো-ভাগ করো 

তিনটি ধাপে এই কৌশল চলে। প্রথমে শিক্ষার্থী একা ভাবে (৩০ সেকেন্ড), তারপর পাশের সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করে (১ মিনিট), তারপর পুরো ক্লাসে সেই ধারণা শেয়ার করে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি শিক্ষার্থী চিন্তা করার সুযোগ পায়, একেবারে চুপ থেকে পার পাওয়ার উপায় থাকে না।

উদাহরণ: গণিত ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘লাভ-ক্ষতির সমস্যাটি নিজে একবার চেষ্টা করো।’ তারপর ‘পাশের জনকে তোমার সমাধান বুঝিয়ে দাও।’ সবশেষে দুটো জুটির সমাধান তুলনা করা হলো। ভুল হলেও শিক্ষার্থী লজ্জা পেল না — কারণ সে শুধু নিজের জুটিকে বলেছিল।

৪. গ্যালারি ওয়াক 

শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে বা বেঞ্চে বিভিন্ন পোস্টার বা প্রশ্নকার্ড লাগানো হয়। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি কার্ডের কাছে যায়, পড়ে, মতামত যোগ করে এবং পরের দলের জন্য ছেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়— শুধু কয়েকটি কাগজ ও কলম দরকার।

উদাহরণ: সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে ৫টি কাগজে লেখা হলো— ‘বন্যার কারণ’, ‘বন্যার ক্ষতি’, ‘বন্যা প্রতিরোধ’, ‘সরকারের ভূমিকা’, ‘আমাদের করণীয়’। প্রতিটি দল একটি করে পয়েন্ট যোগ করে এগিয়ে গেল। ক্লাস শেষে পুরো বিষয়টি একটি সমৃদ্ধ মানচিত্রে পরিণত হলো।

৫. হট সিট 

একটি চেয়ার ‘হট সিট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন শিক্ষার্থী সেখানে বসে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, বিজ্ঞানী বা গল্পের পাত্র হওয়ার ভান করে। বাকি শিক্ষার্থীরা সেই চরিত্রকে প্রশ্ন করে। এটি রোল-প্লে ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি একসঙ্গে বিকাশ করে।

উদাহরণ: ইতিহাস ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায় হট সিটে বসলো। অন্যরা প্রশ্ন করলো— ‘আপনি ৭ মার্চের ভাষণে কেন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না?’ শিক্ষার্থীকে উত্তর দিতে গিয়ে তার পড়া জ্ঞান প্রয়োগ করতে হলো।

৬. স্পিড চ্যাটিং 

শিক্ষার্থীরা দুই সারিতে মুখোমুখি বসে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন দেন এবং ২ মিনিটের জন্য তারা কথা বলে। সময় শেষ হলে এক সারি এক আসন সরে যায়, নতুন জুটি তৈরি হয়, নতুন প্রশ্ন আসে। এটি বিশেষত ভাষা শেখা ও মৌখিক দক্ষতা বিকাশে চমৎকার।

উদাহরণ: ইংরেজি ক্লাসে প্রশ্ন ছিল ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু বি ইন দ্যা ফিউচার?’ প্রতিটি জুটিতে দুজন ইংরেজিতে উত্তর দিল। প্রথমে ভুল হলেও তৃতীয়-চতুর্থ রাউন্ডে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল।

৭. জিগস পাজল পদ্ধতি

একটি বড় বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল একটি ভাগ পড়ে বিশেষজ্ঞ হয়। তারপর দল ভেঙে নতুন মিশ্র দল তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি বিশেষজ্ঞ তার অংশ বাকিদের শেখায়। এতে প্রত্যেকে একই সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক  দুটো ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে ‘মানব পাচনতন্ত্র’ পড়ানো হচ্ছে। চার দলকে চারটি অঙ্গ দেয়া হলো  পাকস্থলী, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র। প্রতিটি দল তাদের অংশ পড়ে নোট করলো। পরে মিশ্র দলে প্রত্যেকে নিজের অংশ বুঝিয়ে দিল  পুরো পাচনতন্ত্র জানা হয়ে গেল।

৮. চার কোণা বিতর্ক 

শ্রেণীকক্ষের চারটি কোণায় লেখা থাকে  ‘সম্পূর্ণ একমত’, ‘একমত’, ‘দ্বিমত’, ‘সম্পূর্ণ দ্বিমত’। শিক্ষক একটি বিতর্কিত বিবৃতি দেন এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত অনুযায়ী কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় ও কারণ ব্যাখ্যা করে। এটি সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা তৈরি করে।

উদাহরণ: নাগরিক শিক্ষা ক্লাসে বিবৃতি দেয়া হলো — ‘মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে।’ কেউ সম্পূর্ণ একমত, কেউ দ্বিমত হলো। প্রত্যেককে কারণ বলতে হলো। শেষে অনেকে অবস্থান বদলাল  এটাই প্রকৃত শিক্ষা।

৯. গল্পের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান

বাস্তব জীবনের একটি সমস্যাকে ছোট গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীরা চরিত্রের ভূমিকায় সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদ্ধতিতে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত হয়, তাই শেখাটা অর্থবহ হয়।

উদাহরণ: গণিত ক্লাসে গল্প  রহিম চাচা ১০ বিঘা জমি তার ৩ ছেলেকে ভাগ করে দিতে চান। বড় ছেলে বলল তার দরকার মোটের ৪০%, মেজো বললো ৩৫%। ছোট ছেলে কতটুকু পাবে এবং প্রত্যেকের জমি কত বিঘা?’ এই গল্পের মাধ্যমে শতকরা হিসাব সহজ হয়ে গেল।

১০. এক্সিট টিকেট 

ক্লাস শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ছোট কাগজে (এক্সিট টিকেট) তিনটি জিনিস লেখে— আজ কী শিখলাম, কোন জায়গাটা এখনও বুঝিনি, পরের ক্লাসে কী জানতে চাই। এটা শুধু মূল্যায়ন নয়, শিক্ষার্থীকে নিজের শেখার বিষয়ে সচেতন করে তোলে।

উদাহরণ: ক্লাস শেষে শিক্ষক বললেন, ‘বের হওয়ার আগে কাগজে লেখো  একটি জিনিস যা আজ শিখলে।’ শিক্ষক কাগজগুলো সংগ্রহ করলেন। পরের দিন দেখলেন ১২ জন এখনও বুঝতে পারেনি পরের ক্লাস সেই বিষয় দিয়েই শুরু হলো।


শেষ কথা: শ্রেণীকক্ষ হোক আনন্দের জায়গা

ওপরের দশটি কৌশলের কোনোটিতেই বাড়তি সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি লাগে না। লাগে শুধু একটু পরিকল্পনা, সাহস এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্বাস। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিদিন যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন, সেখানে এই কৌশলগুলো আলোর মশাল হতে পারে।

একটি শিশু যখন হেসে, খেলে, বিতর্ক করে, গল্প বলে শেখে, তখন সে শুধু তথ্য মনে রাখে না  সে চিন্তা করতে শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শেখে। এই দক্ষতাগুলো তাকে পরীক্ষায় নম্বর দেবে না হয়তো, কিন্তু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।

আমাদের শ্রেণীকক্ষকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা না বানিয়ে, এটিকে পরিণত করি এমন একটি জায়গায় যেখানে প্রতিটি শিশু প্রতিদিন আসতে চায়, কারণ এখানে শেখা মানেই আনন্দ।

[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত