অতি সম্প্রতি নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে একটি জীবন্ত কুকুরের গলায় ইট বেঁধে মেঘনায় ফেলে দেয়ার ভিডিও দেখে স্তব্ধ হয়নি কে? নদীতে ফেলে দেয়ার পরও অসহায় প্রাণীটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ছাগল কামড়ানোর ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ২টি কুকুরকে হত্যা এবং একটি কুকুরকে জখম করার ঘটনাও জুন ‘২৬ মাসে ঘটে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, আঘাত বা হত্যা করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার আদালত সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রাণিবিদ অ্যাডাম ব্রিটনকে ৬০টির বেশি কুকুরের ওপর পাশবিক নির্যাতনের দায়ে ২৪৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশে শাস্তিটা কেন তত ভারী নয়? অপরাধ একই, অথচ আইনের দাঁত-নখের ফারাক এত বেশি।
পশু-পাখির ভোট নেই, বাকশক্তি নেই। তাই তাদের পক্ষে সংসদে বিল ওঠে না, রাজপথে মিছিল হয় না। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে কিছু মানুষের বিবেকের ওপর। কিন্তু সেই বিবেকটাই যদি শিশুকাল থেকে পাথর হয়ে যায়, তাহলে একটি জাতির ভবিষ্যতও পাথর হয়ে যায়। কারণ যে শিশু আজ অবলার যন্ত্রণা দেখে আনন্দ পায়, সে কাল মানুষের যন্ত্রণায় উদাসীন হবে। এখন অনেক শিশু-কিশোর বন্যার পানিতে আটকা ইঁদুর, বেজি, শিয়ালকে পিটিয়ে মারাকে ‘খেলা’ বানিয়েছে। রাস্তার কুকুর দেখলেই ইট ছোড়ে, লাথি মারে। অথচ প্রাণিবিদ্যা বলে, কোনো পশুই অকারণে আক্রমণ করে না। আমরা ভয় দেখিয়ে, কষ্ট দিয়ে তাদের আক্রমণাত্মক বানিয়ে দিই। তারপর সেই দাঁত-নখের দোষও তাদের ঘাড়েই চাপাই। এই নিষ্ঠুরতার উল্টো পিঠে আছে এক গভীর বন্ধন।
কুকুর হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভুভক্ত প্রাণী। সে মনিবের জন্য জীবন দিতে পারে। পরিবারকে চোর-ডাকাত থেকে আগলে রাখে, বিপদে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক করে। মনিব অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকে, মনিব মারা গেলে কবরের পাশ ছাড়ে না। এই কারণেই পৃথিবীর বহু দেশে কুকুর শুধু ‘পোষা প্রাণী’ নয়, পরিবারের সদস্যও। বিদেশে শিশু লালন-পালনে কুকুরের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে শিশুর জন্মের পর থেকেই বাড়িতে কুকুর রাখা হয়। গবেষণা বলে, কুকুরের সঙ্গে বড় হওয়া শিশুরা কম অ্যালার্জিতে ভোগে, তাদের ইমিউনিটি ভালো হয়। মানসিকভাবেও তারা বেশি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ একটি অবলা প্রাণীর খাবার দেয়া, গোসল করানো, হাঁটানো এসবের মধ্য দিয়েই শিশু প্রথমবারের মতো ‘যত্ন’ শব্দটা শেখে। কুকুর তাই শিশুর কাছে খেলার সাথীও, আবার প্রথম শিক্ষকও।
কুরআনে পাঁচ বার কুকুরের কথা এসেছে, কোথাও কুকুরকে অপবিত্র বা মন্দ বলা হয়নি। সহিহ হাদিসে কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী নারীর অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার কথা আছে। বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যখন রাস্তার ফকির তার ভিক্ষার খাবার কুকুরকে ভাগ করে দেয়। কিন্তু আমরা আতরমাখা ভদ্রলোকেরা কী করছি? আল্লাহর সৃষ্টি কুকুর দেখলেই আঘাত করছি, গরম পানি গায়ে ঢেলে দিচ্ছি, ‘নাপাক’ বলে ঘৃণা করছি। কুরআন নয়, হাদিস বলছে কুকুরের লালা নাপাক। কিন্তু মানুষের লালাও নাপাক, জীবানুতে ভর্তি। লালা জামায় লাগবে এই ভয়ে কুকুর দেখলে যমের মতো ভয় করি, কিন্তু ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, মিথ্যুক ‘নাপাক’ নয় কেন? কুকুর ঘুষ খায় না, সুদ খায় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে না- তারপরও সে নাপাক। দেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী পাগলা কুকুর মারতেও অনুমতি লাগে। শুধু তাই নয়, মোরগ-মুরগিকে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখাও ফেরিওয়ালার শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সমাজে এই সব অপরাধের গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব থাকার কথা নয়, কারণ যেখানে শত শত মানুষের সামনে গলায় ছুরি ধরলেও কেউ এগিয়ে আসে না, সেখানে অবলা প্রাণীদের রক্ষা করার গরজ থাকবে কেন। এই নির্লিপ্ততার বীজ বপন হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কোরবানির সময় জবাইয়ের রক্তাক্ত দৃশ্য শিশুরা উপভোগ করে। সেই শিশুই বড় হয়ে গুলশান হোলি আর্টিজানের মতো জায়গায় মানুষকে টুকরো টুকরো করে। যখন একটি অসহায়, অবলা কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়াকে শিশুরা ‘মজা’ ভাবে, যখন সে রক্ত দেখে উল্লাস করে, তখন তার ভেতরের মায়াটাই মরে যায়। চেঙ্গিস-হালাকুর যুগ শেষ হয়নি, শুধু পোশাক বদলেছে।
আমরা প্রায়ই বলি, ‘এটা তো একটা কুকুরই’। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যারা প্রথমে কুকুরের ওপর হাত তুলেছে, তারাই পরে মানুষের ওপরও তুলেছে। জার্মানিতে নাৎসিরা প্রথমে পাগলা কুকুর নিধনের নামে বিষ ছড়িয়েছিল, তারপর গ্যাস চেম্বার বানিয়েছিল মানুষ মারার জন্য। পশুর প্রতি দয়া তাই বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের নিজের নিরাপত্তার বীমা। যে সমাজ অবলার আর্তনাদকে উপেক্ষা করতে শেখে, সে সমাজ একদিন নিজের সন্তানের আর্তনাদও শুনতে পায় না। নরসিংদীর কুকুরের গলার ইট আসলে আমাদের সমাজের পচনের প্রতীক। একটি সভ্য সমাজকে মাপা হয় সে তার দুর্বলতম সদস্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। কুকুরের ওপর নিষ্ঠুরতা তাই শুধু পশুর সমস্যা নয়, এটি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে মেরে ফেলার শুরু।
একটা কুকুরের গলায় বাঁধা ইট আসলে আমাদের বিবেকের গলায় বাঁধা পাথর। অথচ এই প্রাণীটিই মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ খুঁজে বের করে রেসকিউ কুকুর। তুষারধসে হারিয়ে যাওয়া পথিকের প্রাণ বাঁচায় সেন্ট বার্নার্ড জাতের কুকুর। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সামরিক কুকুর। অন্ধ মানুষের চোখ হয়ে সারাজীবন পথ দেখায় গাইড ডগ। করোনার সময় হাসপাতালে রোগীর পাশে সেবাদানকারী থেরাপি ডগ মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। আর পুলিশ-বিজিবির ডগ স্কোয়াড মাদক আর বিস্ফোরক শনাক্ত করে হাজারো প্রাণ বাঁচায়। এত নিঃস্বার্থ সেবার পরও আমরা তাকে ‘নাপাক’ বলে দূরে সরাই, নির্যাতন করে সুখ পাই, গাড়ি চাপা দিয়ে আনন্দ করি।
আমরা যদি আজ অবলার চোখের ভাষা বুঝতে না শিখি, কাল মানুষের চোখের জলও আমাদের স্পর্শ করবে না। সভ্যতা মানে উঁচু বিল্ডিং নয়, সভ্যতা মানে দুর্বলের প্রতি দয়া। যে সমাজ তার সবচেয়ে প্রভুভক্ত বন্ধুকেই নিরাপদে বাঁচতে দিতে পারে না, সে সমাজ তার কোনো সন্তানকেই নিরাপদ রাখতে পারবে না। তাই যে গলায় আমরা ইট বাঁধছি, সেই গলায় বাঁধা চেইনটাই খুলে দিই, যাতে তারা নিশ্চিন্তে মনুষ্য সমাজে নিরাপদে ঘুরতে পারে। স্মতর্ব্য যে, মানুষ যখন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথীর চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তখন এই পৃথিবীটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
অতি সম্প্রতি নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে একটি জীবন্ত কুকুরের গলায় ইট বেঁধে মেঘনায় ফেলে দেয়ার ভিডিও দেখে স্তব্ধ হয়নি কে? নদীতে ফেলে দেয়ার পরও অসহায় প্রাণীটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ছাগল কামড়ানোর ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ২টি কুকুরকে হত্যা এবং একটি কুকুরকে জখম করার ঘটনাও জুন ‘২৬ মাসে ঘটে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, আঘাত বা হত্যা করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার আদালত সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রাণিবিদ অ্যাডাম ব্রিটনকে ৬০টির বেশি কুকুরের ওপর পাশবিক নির্যাতনের দায়ে ২৪৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশে শাস্তিটা কেন তত ভারী নয়? অপরাধ একই, অথচ আইনের দাঁত-নখের ফারাক এত বেশি।
পশু-পাখির ভোট নেই, বাকশক্তি নেই। তাই তাদের পক্ষে সংসদে বিল ওঠে না, রাজপথে মিছিল হয় না। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে কিছু মানুষের বিবেকের ওপর। কিন্তু সেই বিবেকটাই যদি শিশুকাল থেকে পাথর হয়ে যায়, তাহলে একটি জাতির ভবিষ্যতও পাথর হয়ে যায়। কারণ যে শিশু আজ অবলার যন্ত্রণা দেখে আনন্দ পায়, সে কাল মানুষের যন্ত্রণায় উদাসীন হবে। এখন অনেক শিশু-কিশোর বন্যার পানিতে আটকা ইঁদুর, বেজি, শিয়ালকে পিটিয়ে মারাকে ‘খেলা’ বানিয়েছে। রাস্তার কুকুর দেখলেই ইট ছোড়ে, লাথি মারে। অথচ প্রাণিবিদ্যা বলে, কোনো পশুই অকারণে আক্রমণ করে না। আমরা ভয় দেখিয়ে, কষ্ট দিয়ে তাদের আক্রমণাত্মক বানিয়ে দিই। তারপর সেই দাঁত-নখের দোষও তাদের ঘাড়েই চাপাই। এই নিষ্ঠুরতার উল্টো পিঠে আছে এক গভীর বন্ধন।
কুকুর হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভুভক্ত প্রাণী। সে মনিবের জন্য জীবন দিতে পারে। পরিবারকে চোর-ডাকাত থেকে আগলে রাখে, বিপদে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক করে। মনিব অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকে, মনিব মারা গেলে কবরের পাশ ছাড়ে না। এই কারণেই পৃথিবীর বহু দেশে কুকুর শুধু ‘পোষা প্রাণী’ নয়, পরিবারের সদস্যও। বিদেশে শিশু লালন-পালনে কুকুরের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে শিশুর জন্মের পর থেকেই বাড়িতে কুকুর রাখা হয়। গবেষণা বলে, কুকুরের সঙ্গে বড় হওয়া শিশুরা কম অ্যালার্জিতে ভোগে, তাদের ইমিউনিটি ভালো হয়। মানসিকভাবেও তারা বেশি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ একটি অবলা প্রাণীর খাবার দেয়া, গোসল করানো, হাঁটানো এসবের মধ্য দিয়েই শিশু প্রথমবারের মতো ‘যত্ন’ শব্দটা শেখে। কুকুর তাই শিশুর কাছে খেলার সাথীও, আবার প্রথম শিক্ষকও।
কুরআনে পাঁচ বার কুকুরের কথা এসেছে, কোথাও কুকুরকে অপবিত্র বা মন্দ বলা হয়নি। সহিহ হাদিসে কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী নারীর অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার কথা আছে। বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যখন রাস্তার ফকির তার ভিক্ষার খাবার কুকুরকে ভাগ করে দেয়। কিন্তু আমরা আতরমাখা ভদ্রলোকেরা কী করছি? আল্লাহর সৃষ্টি কুকুর দেখলেই আঘাত করছি, গরম পানি গায়ে ঢেলে দিচ্ছি, ‘নাপাক’ বলে ঘৃণা করছি। কুরআন নয়, হাদিস বলছে কুকুরের লালা নাপাক। কিন্তু মানুষের লালাও নাপাক, জীবানুতে ভর্তি। লালা জামায় লাগবে এই ভয়ে কুকুর দেখলে যমের মতো ভয় করি, কিন্তু ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, মিথ্যুক ‘নাপাক’ নয় কেন? কুকুর ঘুষ খায় না, সুদ খায় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে না- তারপরও সে নাপাক। দেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী পাগলা কুকুর মারতেও অনুমতি লাগে। শুধু তাই নয়, মোরগ-মুরগিকে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখাও ফেরিওয়ালার শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সমাজে এই সব অপরাধের গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব থাকার কথা নয়, কারণ যেখানে শত শত মানুষের সামনে গলায় ছুরি ধরলেও কেউ এগিয়ে আসে না, সেখানে অবলা প্রাণীদের রক্ষা করার গরজ থাকবে কেন। এই নির্লিপ্ততার বীজ বপন হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কোরবানির সময় জবাইয়ের রক্তাক্ত দৃশ্য শিশুরা উপভোগ করে। সেই শিশুই বড় হয়ে গুলশান হোলি আর্টিজানের মতো জায়গায় মানুষকে টুকরো টুকরো করে। যখন একটি অসহায়, অবলা কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়াকে শিশুরা ‘মজা’ ভাবে, যখন সে রক্ত দেখে উল্লাস করে, তখন তার ভেতরের মায়াটাই মরে যায়। চেঙ্গিস-হালাকুর যুগ শেষ হয়নি, শুধু পোশাক বদলেছে।
আমরা প্রায়ই বলি, ‘এটা তো একটা কুকুরই’। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যারা প্রথমে কুকুরের ওপর হাত তুলেছে, তারাই পরে মানুষের ওপরও তুলেছে। জার্মানিতে নাৎসিরা প্রথমে পাগলা কুকুর নিধনের নামে বিষ ছড়িয়েছিল, তারপর গ্যাস চেম্বার বানিয়েছিল মানুষ মারার জন্য। পশুর প্রতি দয়া তাই বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের নিজের নিরাপত্তার বীমা। যে সমাজ অবলার আর্তনাদকে উপেক্ষা করতে শেখে, সে সমাজ একদিন নিজের সন্তানের আর্তনাদও শুনতে পায় না। নরসিংদীর কুকুরের গলার ইট আসলে আমাদের সমাজের পচনের প্রতীক। একটি সভ্য সমাজকে মাপা হয় সে তার দুর্বলতম সদস্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। কুকুরের ওপর নিষ্ঠুরতা তাই শুধু পশুর সমস্যা নয়, এটি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে মেরে ফেলার শুরু।
একটা কুকুরের গলায় বাঁধা ইট আসলে আমাদের বিবেকের গলায় বাঁধা পাথর। অথচ এই প্রাণীটিই মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ খুঁজে বের করে রেসকিউ কুকুর। তুষারধসে হারিয়ে যাওয়া পথিকের প্রাণ বাঁচায় সেন্ট বার্নার্ড জাতের কুকুর। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সামরিক কুকুর। অন্ধ মানুষের চোখ হয়ে সারাজীবন পথ দেখায় গাইড ডগ। করোনার সময় হাসপাতালে রোগীর পাশে সেবাদানকারী থেরাপি ডগ মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। আর পুলিশ-বিজিবির ডগ স্কোয়াড মাদক আর বিস্ফোরক শনাক্ত করে হাজারো প্রাণ বাঁচায়। এত নিঃস্বার্থ সেবার পরও আমরা তাকে ‘নাপাক’ বলে দূরে সরাই, নির্যাতন করে সুখ পাই, গাড়ি চাপা দিয়ে আনন্দ করি।
আমরা যদি আজ অবলার চোখের ভাষা বুঝতে না শিখি, কাল মানুষের চোখের জলও আমাদের স্পর্শ করবে না। সভ্যতা মানে উঁচু বিল্ডিং নয়, সভ্যতা মানে দুর্বলের প্রতি দয়া। যে সমাজ তার সবচেয়ে প্রভুভক্ত বন্ধুকেই নিরাপদে বাঁচতে দিতে পারে না, সে সমাজ তার কোনো সন্তানকেই নিরাপদ রাখতে পারবে না। তাই যে গলায় আমরা ইট বাঁধছি, সেই গলায় বাঁধা চেইনটাই খুলে দিই, যাতে তারা নিশ্চিন্তে মনুষ্য সমাজে নিরাপদে ঘুরতে পারে। স্মতর্ব্য যে, মানুষ যখন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথীর চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তখন এই পৃথিবীটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন