প্রকৃতির বুক চিরে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর আকাশভাঙা বৃষ্টি যেন এক লহমায় বিষাদের চাদরে ঢেকে দিয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে। যত দূর চোখ যায়, কেবলই থৈ থৈ পানি আর মানুষের হাহাকার। সাতটি জেলার লাখ লাখ মানুষের চোখের জল আর বন্যার ঘোলা জল আজ মিলেমিশে একাকার। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সাজানো সংসার; সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সর্বনাশা বন্যা।
বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জনপদ এখন এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। দুর্গম পাহাড় থেকে শুরু করে গ্রামীণ সমতল, সর্বত্রই এখন বেঁচে থাকার আকুল আকুতি।
বন্যার গ্রাসে ৪ লাখ প্রাণ: বুকসমান পানিতে বাঁচার লড়াই
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়াসহ বিস্তীর্ণ জনপদে এখন শুধুই পানির রাজত্ব। অন্তত চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ির ছাদ কিংবা মাচায় আশ্রয় নিয়ে মানুষ গুনছেন মুক্তির প্রহর। অনেকেই গবাদিপশু আর যৎসামান্য সম্বল নিয়ে ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রের খোঁজে।
কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি মাড়িয়ে কোলের
শিশুকে বাঁচানোর আকুল চেষ্টা চলছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই মিললেও সেখানে
দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির
সংকট। শুকনো খাবার আর এক ফোঁটা
নিরাপদ পানির জন্য শিশুদের কান্না
ভারী করে তুলছে উপদ্রুত
এলাকার বাতাস।
পাশে সেনাবাহিনী: ভাঙল রাঙ্গামাটি-বান্দরবানের সংযোগ সেতু
এই ঘোর সংকটে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ও বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম সম্বলিত স্পিডবোট নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, "জেলা প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ এবং অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে।"
সেনাবাহিনীর এই তৎপরতা অবরুদ্ধ
মানুষের মনে কিছুটা আশার
আলো জাগালেও ভাঙন আর ধসের
তীব্রতা পরিস্থিতিকে প্রতিনিয়ত জটিল করে তুলছে।
এদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে
পড়ায় দুই পার্বত্য জেলার
সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙ্গুনিয়ার
একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে রাজস্থলীসহ বিস্তীর্ণ
এলাকা নতুন করে প্লাবিত
হওয়ায় শত শত পরিবার
এখন গৃহহীন।
নিভে গেল চার শিশুর প্রাণের প্রদীপ
বন্যার এই তাণ্ডবের মধ্যেই হু হু করে বাড়ছে লাশের মিছিল। সাতকানিয়ায় ঘরের পেছনে জমে থাকা বন্যার পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে মাত্র দুই বছরের শিশু ইসমাঈল হোসেন। তার পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। অন্যদিকে গত দুদিনে বাঁশখালীতে পানিতে ডুবে মারা গেছে দুই শিশুসহ আরও তিনজন।
নিখোঁজ
স্বজনদের খোঁজে স্বজনদের কান্না আর আহাজারি যেন
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের চেয়েও
কঠিন হয়ে উঠেছে। স্থানীয়
প্রশাসন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের অনতিবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বারবার সতর্কবার্তা
জারি করছে।
নদীতে তীব্র গর্জন, পাহাড়ধসের লাল সংকেত
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, "বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার; এই সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। সাঙ্গু, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই নদীর ছয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।"
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। ১৪ জুলাইয়ের আগে এই বৃষ্টিপাত কমার কোনো লক্ষণ নেই, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সুনামগঞ্জে পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে কন্ট্রোলরুম খোলা হলেও সুরমা ও কুশিয়ারার পানি যেকোনো সময় নতুন ঢলে উপচে পড়ার আশঙ্কায় কাঁপছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলও।
অন্যদিকে মাগুরার শালিখায় পানির তোড়ে কালভার্ট ধসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রাম। প্রকৃতির এই ভয়াবহ রুদ্ররূপের সামনে মানুষ আজ বড় অসহায়, তবে এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও চলছে বেঁচে থাকার এবং একে অপরকে বাঁচানোর এক মানবিক লড়াই।

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
প্রকৃতির বুক চিরে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর আকাশভাঙা বৃষ্টি যেন এক লহমায় বিষাদের চাদরে ঢেকে দিয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে। যত দূর চোখ যায়, কেবলই থৈ থৈ পানি আর মানুষের হাহাকার। সাতটি জেলার লাখ লাখ মানুষের চোখের জল আর বন্যার ঘোলা জল আজ মিলেমিশে একাকার। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সাজানো সংসার; সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সর্বনাশা বন্যা।
বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জনপদ এখন এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। দুর্গম পাহাড় থেকে শুরু করে গ্রামীণ সমতল, সর্বত্রই এখন বেঁচে থাকার আকুল আকুতি।
বন্যার গ্রাসে ৪ লাখ প্রাণ: বুকসমান পানিতে বাঁচার লড়াই
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়াসহ বিস্তীর্ণ জনপদে এখন শুধুই পানির রাজত্ব। অন্তত চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ির ছাদ কিংবা মাচায় আশ্রয় নিয়ে মানুষ গুনছেন মুক্তির প্রহর। অনেকেই গবাদিপশু আর যৎসামান্য সম্বল নিয়ে ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রের খোঁজে।
কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি মাড়িয়ে কোলের
শিশুকে বাঁচানোর আকুল চেষ্টা চলছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই মিললেও সেখানে
দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির
সংকট। শুকনো খাবার আর এক ফোঁটা
নিরাপদ পানির জন্য শিশুদের কান্না
ভারী করে তুলছে উপদ্রুত
এলাকার বাতাস।
পাশে সেনাবাহিনী: ভাঙল রাঙ্গামাটি-বান্দরবানের সংযোগ সেতু
এই ঘোর সংকটে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ও বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম সম্বলিত স্পিডবোট নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, "জেলা প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ এবং অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে।"
সেনাবাহিনীর এই তৎপরতা অবরুদ্ধ
মানুষের মনে কিছুটা আশার
আলো জাগালেও ভাঙন আর ধসের
তীব্রতা পরিস্থিতিকে প্রতিনিয়ত জটিল করে তুলছে।
এদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে
পড়ায় দুই পার্বত্য জেলার
সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙ্গুনিয়ার
একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে রাজস্থলীসহ বিস্তীর্ণ
এলাকা নতুন করে প্লাবিত
হওয়ায় শত শত পরিবার
এখন গৃহহীন।
নিভে গেল চার শিশুর প্রাণের প্রদীপ
বন্যার এই তাণ্ডবের মধ্যেই হু হু করে বাড়ছে লাশের মিছিল। সাতকানিয়ায় ঘরের পেছনে জমে থাকা বন্যার পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে মাত্র দুই বছরের শিশু ইসমাঈল হোসেন। তার পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। অন্যদিকে গত দুদিনে বাঁশখালীতে পানিতে ডুবে মারা গেছে দুই শিশুসহ আরও তিনজন।
নিখোঁজ
স্বজনদের খোঁজে স্বজনদের কান্না আর আহাজারি যেন
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের চেয়েও
কঠিন হয়ে উঠেছে। স্থানীয়
প্রশাসন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের অনতিবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বারবার সতর্কবার্তা
জারি করছে।
নদীতে তীব্র গর্জন, পাহাড়ধসের লাল সংকেত
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, "বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার; এই সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। সাঙ্গু, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই নদীর ছয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।"
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। ১৪ জুলাইয়ের আগে এই বৃষ্টিপাত কমার কোনো লক্ষণ নেই, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সুনামগঞ্জে পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে কন্ট্রোলরুম খোলা হলেও সুরমা ও কুশিয়ারার পানি যেকোনো সময় নতুন ঢলে উপচে পড়ার আশঙ্কায় কাঁপছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলও।
অন্যদিকে মাগুরার শালিখায় পানির তোড়ে কালভার্ট ধসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রাম। প্রকৃতির এই ভয়াবহ রুদ্ররূপের সামনে মানুষ আজ বড় অসহায়, তবে এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও চলছে বেঁচে থাকার এবং একে অপরকে বাঁচানোর এক মানবিক লড়াই।

আপনার মতামত লিখুন