সংবাদ

জুলাইয়ের চেতনা কি কেবলই ক্ষমতার সিঁড়ি, প্রশ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম

জুলাইয়ের চেতনা কি কেবলই ক্ষমতার সিঁড়ি, প্রশ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

একাত্তরের পর চব্বিশ। রক্তস্নাত এক নতুন ভোরের সাক্ষী বাংলাদেশ। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন আশার আলো দেশ দেখেছিল, তা কি এখন কেবলই কিছু মানুষের ক্ষমতার মসনদে বসার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে? জুলাইয়ের সেই অবিনাশী চেতনাকে পুঁজি করে যারা রাজনীতির চোরাবালিতে পা বাড়াচ্ছেন, তাদের দিকেই এবার কড়া বার্তা ছুড়ে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

রবিবার বিকেলে গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, আত্মত্যাগের এই পবিত্র চেতনাকে সস্তা রাজনীতির পণ্য বানানো যাবে না।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের তরুণদের এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে নতুন ধারার রাজনীতির নামে পুরনো অভ্যাসের চর্চা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাইয়ের চেতনাকে ক্ষমতার সিঁড়ি বানানোর এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "যারা জুলাই চেতনার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন তাদের প্রতি আমার নসিহত হলো, শুধুমাত্র জুলাইয়ের চেতনাকে বিক্রি করে বেশিদিন রাজনীতি করা যাবে না।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যারা শুধু এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য, উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইকে ব্যবহার করেছেন, তাদের এখনই সময় আছে যে নতুন বন্দোবস্তের, নতুন রাজনীতির, নতুন ধারা প্রণয়ন করার যে অঙ্গীকার তারা করেছে, আমার বন্ধুরা করেছেন, তারা যেন নতুন বন্দোবস্তের নতুন ধারাটা মানুষের সামনে প্রকাশ করেন। কিন্তু পুরাতন বন্দোবস্তের আদলে নয়। তারা নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কথা বলে পুরাতন বন্দোবস্তের মতো আওয়ামী বন্ধুদের, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন, সেটা সঠিক নয়।"

নতুন রাজনীতির নামে গালভরা শব্দচয়ন এবং ইতিহাসের বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন নিয়েও মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "জনগণের সামনে তাদেরকে উন্মুক্ত হতে হবে যে নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কোনটা? ‘দায় ও দরদের’ রাজনীতির যেই ভাষাটা আমার কিছু কিছু বৃদ্ধ বুদ্ধিজীবীর ভাষা, তারা আমারও বন্ধু, পুরাতন বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের। শব্দগুলো উচ্চারণ করে যে নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি, ‘দায় ও দরদের’ রাজনীতি, এত বাক্যবিশারদ হওয়া ভালো না। কারণ, এই শব্দগুলো অনেক বেশি ওজন বহন করে। এগুলো আমরা ব্যাখ্যা দাবি করি যে আপনাদের নতুন বন্দোবস্ত কী? ‘দরদ এবং দায়ের’ রাজনীতি কী সেটাও বলুন। শুধু বক্তৃতা দিলে হবে না। যদি আপনাদের এই নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি জনগণ গ্রহণ করে, আপনাদের পক্ষে জনগণ থাকবে।"

ইতিহাসের বিকৃতি ও রাজনৈতিক হীন স্বার্থের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, "কিন্তু শুধু একটা দল গঠন করে জুলাইয়ের চেতনার ভিত্তিতে এবং এই চেতনাকে ব্যবহার করে যারা ৪৭-এর চেতনার কথা বলে তাদের কাছে গেলে তো অসুবিধা। এখন আমি বলেছিলাম একদিন সংসদে যে আপনারা তো ৪৭-এও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। এখন একাত্তরের প্রসঙ্গ যখনই আসে বলে ৪৭, আমরা ৪৭-এ যাই—তো ৪৭-এও ছিলেন না আপনারা। একাত্তরে তো ছিলেনই না। এখন দয়া করে চব্বিশে থাকেন। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে।"

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ আর নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সবসময় স্রোতের বিপরীতে, জনগণের চাহিদার বিপরীতে বক্তব্য দিয়ে এ দেশের মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। নিজেদের রাজনৈতিক হীন স্বার্থের জন্য আপনারা ৪৭-কেও ব্যবহার করেন, একাত্তরকে অস্বীকার করেন, ২৪-কে আবার ব্যবহার করবেন; তা হবে না।"

বাংলাদেশ আর কোনো স্বৈরাচার কিংবা রাজপথে রক্তের হোলিখেলা দেখতে চায় না। সেই পথ রুদ্ধ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, "আমাদের রাজনীতি পরিষ্কার। আমাদের সামনের রাজনীতিও পরিষ্কার। আমরা আর কখনো ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি চাই না। পরিষ্কার কি না? আমরা আর কখনো রাজপথে গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দিতে চাই না। সেই পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী জাতীয় ঐক্যটাকে আমরা ধরে রাখতে হবে।"

মতভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আমাদের মধ্যে দ্বিমত থাকবে, বহুমত থাকবে, সেটা সংসদে থাকবে, সংসদের বাইরে থাকবে; কিন্তু জাতীয় এই প্রশ্নগুলোতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যদি আমরা না থাকি, কেবলই স্বৈরাচারের ফেরার পথটা প্রসারিত হবে। সেটা কি আমরা কেউ চাই? না। যদি না চাই যে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান, স্বৈরাচারের পুনরুৎপাদন বা ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি বা উৎপাত কোনোকিছুই যদি আমরা না চাই; তাহলে আমরা এই সংসদীয় রাজনীতিটাকে শক্তিশালী করি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিটাকে শক্তিশালী করি, জাতীয় ঐক্যটাকে আমরা আরও শক্তিশালী করি এবং নিজেদের হীন রাজনৈতিক চরিতার্থ করার জন্য আমরা জাতির মধ্যে বিভক্তিমূলক কোনো বক্তব্য যাতে না দেই, যার ফল কেবল ফ্যাসিবাদই পাবে আর কেউ পাবে না।"

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বা মব জাস্টিস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে সরাসরি ‘অপকালচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "মব জাস্টিস কোনোদিন জাস্টিস হতে পারে না। মব কালচার হতে পারে, অপকালচার হতে পারে। তো এটা ব্যবহার হতে হতে অনেকটা অনেকেই মব জাস্টিস বলে থাকেন। তবে এটাকে মবের নামে যেই ইনজাস্টিস হয়েছে সেটা বলা যায়। মবের নামে যে অপকালচার সৃষ্টি হয়েছে তা বলা যায়। আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই মব কালচারটা সৃষ্টি হওয়ার কারণও ছিল, যেহেতু তখন আইনের শাসন কার্যকরভাবে তেমন কোনো প্রয়োগ করা যাচ্ছিল না।"

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল প্রশাসন নয়, বিচার বিভাগের সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা জরুরি। কিন্তু অতীতের ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো বিচার বিভাগে ঘাপটি মেরে আছে বলে ইঙ্গিত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, "আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাতে প্রশাসন, শাসন বিভাগ সহযোগিতা করতে পারে, পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করতে পারে; কিন্তু সেই আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের সহযোগিতা ইত্যাদির ফলে এ আইনের শাসনটা বাস্তবায়ন হবে জুডিশিয়ারির হাত ধরে। জুডিশিয়ারি বিরুদ্ধে আমরা তেমন কিছু বলতে চাই না, এখন সমালোচনাও করতে চাই না। কারণ, সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে তখন আমরা তাদেরকে দায়ী করতে পারবো। এখনো পর্যন্ত যে বক্তব্যটা মাঠে আছে তা হলো যে, বিচার বিভাগ স্বাধীন কি না।"

উচ্চ ও নিম্ন আদালতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি বলবো বিচার বিভাগ শুধু স্বাধীন নয় প্রায় সার্বভৌমের কাছাকাছি। যার জন্য এখন লোয়ার জুডিশিয়ারি এবং আপার জুডিশিয়ারিতে যারা অনেকেই বসে আছেন, যাদের কারণে ইনজাস্টিস হচ্ছে, সমাজে যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ হিসেবে উচ্চ আদালতে বসে আছেন তাদের অনেকেই এমন ভূমিকা পালন করছেন। এর ফলে সমাজের অস্থিরতাটা এখনো বিদ্যমান এবং লোয়ার কোর্টের অবস্থাও তাই।"

অতীতের কালো অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, "যদি আমি বলি যে যারা জুলাই গণঅভ্যত্থানের বিভিন্ন স্তরে এ দেশের নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপরে নির্যাতনের জন্য দায়ী ছিল, সহযোগী ছিল এবং বিভিন্নভাবে কর্মকাণ্ড তাদেরকে সহযোগিতা করেছে; যারা রাতের ভোটের নির্বাচনে রাতের ভোটের তথাকথিত প্রহসনের নির্বাচনে সহযোগিতা করেছে; তাদের মধ্যে কি জুডিশিয়ারি ছিল না? লোয়ার জুডিশিয়ারি অন্তর্ভুক্ত ছিল না? তারা কি এ দেশের পলিটিশিয়ানদের নির্বাচনের বাইরে রাখার জন্য রাতে আদালত বসিয়ে সাজা প্রদান করেনি? তারা কি ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের এই নির্যাতনের মধ্যে, সিস্টেমেটিক নির্যাতনের মধ্যে তারা কি সহযোগী ছিল না? তাহলে আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্য একটা সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।"

পরিশেষে, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি সুশাসিত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের কাঠামোগত গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।"

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬


জুলাইয়ের চেতনা কি কেবলই ক্ষমতার সিঁড়ি, প্রশ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

একাত্তরের পর চব্বিশ। রক্তস্নাত এক নতুন ভোরের সাক্ষী বাংলাদেশ। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন আশার আলো দেশ দেখেছিল, তা কি এখন কেবলই কিছু মানুষের ক্ষমতার মসনদে বসার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে? জুলাইয়ের সেই অবিনাশী চেতনাকে পুঁজি করে যারা রাজনীতির চোরাবালিতে পা বাড়াচ্ছেন, তাদের দিকেই এবার কড়া বার্তা ছুড়ে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

রবিবার বিকেলে গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, আত্মত্যাগের এই পবিত্র চেতনাকে সস্তা রাজনীতির পণ্য বানানো যাবে না।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের তরুণদের এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে নতুন ধারার রাজনীতির নামে পুরনো অভ্যাসের চর্চা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাইয়ের চেতনাকে ক্ষমতার সিঁড়ি বানানোর এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "যারা জুলাই চেতনার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন তাদের প্রতি আমার নসিহত হলো, শুধুমাত্র জুলাইয়ের চেতনাকে বিক্রি করে বেশিদিন রাজনীতি করা যাবে না।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যারা শুধু এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য, উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইকে ব্যবহার করেছেন, তাদের এখনই সময় আছে যে নতুন বন্দোবস্তের, নতুন রাজনীতির, নতুন ধারা প্রণয়ন করার যে অঙ্গীকার তারা করেছে, আমার বন্ধুরা করেছেন, তারা যেন নতুন বন্দোবস্তের নতুন ধারাটা মানুষের সামনে প্রকাশ করেন। কিন্তু পুরাতন বন্দোবস্তের আদলে নয়। তারা নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কথা বলে পুরাতন বন্দোবস্তের মতো আওয়ামী বন্ধুদের, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন, সেটা সঠিক নয়।"

নতুন রাজনীতির নামে গালভরা শব্দচয়ন এবং ইতিহাসের বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন নিয়েও মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "জনগণের সামনে তাদেরকে উন্মুক্ত হতে হবে যে নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কোনটা? ‘দায় ও দরদের’ রাজনীতির যেই ভাষাটা আমার কিছু কিছু বৃদ্ধ বুদ্ধিজীবীর ভাষা, তারা আমারও বন্ধু, পুরাতন বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের। শব্দগুলো উচ্চারণ করে যে নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি, ‘দায় ও দরদের’ রাজনীতি, এত বাক্যবিশারদ হওয়া ভালো না। কারণ, এই শব্দগুলো অনেক বেশি ওজন বহন করে। এগুলো আমরা ব্যাখ্যা দাবি করি যে আপনাদের নতুন বন্দোবস্ত কী? ‘দরদ এবং দায়ের’ রাজনীতি কী সেটাও বলুন। শুধু বক্তৃতা দিলে হবে না। যদি আপনাদের এই নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি জনগণ গ্রহণ করে, আপনাদের পক্ষে জনগণ থাকবে।"

ইতিহাসের বিকৃতি ও রাজনৈতিক হীন স্বার্থের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, "কিন্তু শুধু একটা দল গঠন করে জুলাইয়ের চেতনার ভিত্তিতে এবং এই চেতনাকে ব্যবহার করে যারা ৪৭-এর চেতনার কথা বলে তাদের কাছে গেলে তো অসুবিধা। এখন আমি বলেছিলাম একদিন সংসদে যে আপনারা তো ৪৭-এও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। এখন একাত্তরের প্রসঙ্গ যখনই আসে বলে ৪৭, আমরা ৪৭-এ যাই—তো ৪৭-এও ছিলেন না আপনারা। একাত্তরে তো ছিলেনই না। এখন দয়া করে চব্বিশে থাকেন। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে।"

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ আর নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সবসময় স্রোতের বিপরীতে, জনগণের চাহিদার বিপরীতে বক্তব্য দিয়ে এ দেশের মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। নিজেদের রাজনৈতিক হীন স্বার্থের জন্য আপনারা ৪৭-কেও ব্যবহার করেন, একাত্তরকে অস্বীকার করেন, ২৪-কে আবার ব্যবহার করবেন; তা হবে না।"

বাংলাদেশ আর কোনো স্বৈরাচার কিংবা রাজপথে রক্তের হোলিখেলা দেখতে চায় না। সেই পথ রুদ্ধ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, "আমাদের রাজনীতি পরিষ্কার। আমাদের সামনের রাজনীতিও পরিষ্কার। আমরা আর কখনো ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি চাই না। পরিষ্কার কি না? আমরা আর কখনো রাজপথে গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দিতে চাই না। সেই পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী জাতীয় ঐক্যটাকে আমরা ধরে রাখতে হবে।"

মতভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আমাদের মধ্যে দ্বিমত থাকবে, বহুমত থাকবে, সেটা সংসদে থাকবে, সংসদের বাইরে থাকবে; কিন্তু জাতীয় এই প্রশ্নগুলোতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যদি আমরা না থাকি, কেবলই স্বৈরাচারের ফেরার পথটা প্রসারিত হবে। সেটা কি আমরা কেউ চাই? না। যদি না চাই যে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান, স্বৈরাচারের পুনরুৎপাদন বা ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি বা উৎপাত কোনোকিছুই যদি আমরা না চাই; তাহলে আমরা এই সংসদীয় রাজনীতিটাকে শক্তিশালী করি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিটাকে শক্তিশালী করি, জাতীয় ঐক্যটাকে আমরা আরও শক্তিশালী করি এবং নিজেদের হীন রাজনৈতিক চরিতার্থ করার জন্য আমরা জাতির মধ্যে বিভক্তিমূলক কোনো বক্তব্য যাতে না দেই, যার ফল কেবল ফ্যাসিবাদই পাবে আর কেউ পাবে না।"

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বা মব জাস্টিস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে সরাসরি ‘অপকালচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "মব জাস্টিস কোনোদিন জাস্টিস হতে পারে না। মব কালচার হতে পারে, অপকালচার হতে পারে। তো এটা ব্যবহার হতে হতে অনেকটা অনেকেই মব জাস্টিস বলে থাকেন। তবে এটাকে মবের নামে যেই ইনজাস্টিস হয়েছে সেটা বলা যায়। মবের নামে যে অপকালচার সৃষ্টি হয়েছে তা বলা যায়। আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই মব কালচারটা সৃষ্টি হওয়ার কারণও ছিল, যেহেতু তখন আইনের শাসন কার্যকরভাবে তেমন কোনো প্রয়োগ করা যাচ্ছিল না।"

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল প্রশাসন নয়, বিচার বিভাগের সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা জরুরি। কিন্তু অতীতের ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো বিচার বিভাগে ঘাপটি মেরে আছে বলে ইঙ্গিত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, "আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাতে প্রশাসন, শাসন বিভাগ সহযোগিতা করতে পারে, পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করতে পারে; কিন্তু সেই আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের সহযোগিতা ইত্যাদির ফলে এ আইনের শাসনটা বাস্তবায়ন হবে জুডিশিয়ারির হাত ধরে। জুডিশিয়ারি বিরুদ্ধে আমরা তেমন কিছু বলতে চাই না, এখন সমালোচনাও করতে চাই না। কারণ, সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে তখন আমরা তাদেরকে দায়ী করতে পারবো। এখনো পর্যন্ত যে বক্তব্যটা মাঠে আছে তা হলো যে, বিচার বিভাগ স্বাধীন কি না।"

উচ্চ ও নিম্ন আদালতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি বলবো বিচার বিভাগ শুধু স্বাধীন নয় প্রায় সার্বভৌমের কাছাকাছি। যার জন্য এখন লোয়ার জুডিশিয়ারি এবং আপার জুডিশিয়ারিতে যারা অনেকেই বসে আছেন, যাদের কারণে ইনজাস্টিস হচ্ছে, সমাজে যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ হিসেবে উচ্চ আদালতে বসে আছেন তাদের অনেকেই এমন ভূমিকা পালন করছেন। এর ফলে সমাজের অস্থিরতাটা এখনো বিদ্যমান এবং লোয়ার কোর্টের অবস্থাও তাই।"

অতীতের কালো অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, "যদি আমি বলি যে যারা জুলাই গণঅভ্যত্থানের বিভিন্ন স্তরে এ দেশের নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপরে নির্যাতনের জন্য দায়ী ছিল, সহযোগী ছিল এবং বিভিন্নভাবে কর্মকাণ্ড তাদেরকে সহযোগিতা করেছে; যারা রাতের ভোটের নির্বাচনে রাতের ভোটের তথাকথিত প্রহসনের নির্বাচনে সহযোগিতা করেছে; তাদের মধ্যে কি জুডিশিয়ারি ছিল না? লোয়ার জুডিশিয়ারি অন্তর্ভুক্ত ছিল না? তারা কি এ দেশের পলিটিশিয়ানদের নির্বাচনের বাইরে রাখার জন্য রাতে আদালত বসিয়ে সাজা প্রদান করেনি? তারা কি ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের এই নির্যাতনের মধ্যে, সিস্টেমেটিক নির্যাতনের মধ্যে তারা কি সহযোগী ছিল না? তাহলে আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্য একটা সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।"

পরিশেষে, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি সুশাসিত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের কাঠামোগত গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।"


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত