সংবাদ

ঋণখেলাপিতে যেভাবে বিশ্ব ‘চ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

ঋণখেলাপিতে যেভাবে বিশ্ব ‘চ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

একটি ব্যাংক কল্পনা করুন, যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে। তবে সেই ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই নিয়মিত ফেরত আসছে না। না, এটা আর নিছক কল্পনা নয়। দেশের ব্যাংক খাতের এখন এক চরম বাস্তবতা।

খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন চলতি বছরের জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি। মার্চ শেষে এই হার ছিল ৩২.২৬ শতাংশ; তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এটি শুধু বড় একটা সংখ্যা নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের সমস্যার হিমালয়।সর্বশেষ পাওয়া আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) অনুপাতের দেশ। বাংলাদেশের পরে চাদের ৩১.৫১ শতাংশ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনির ৩০ শতাংশ এবং আলজেরিয়ার ২০.০৫ শতাংশ।  তবে বলা ভালো, আন্তর্জাতিক তুলনায় সতর্কতা জরুরি যে, সব দেশের তথ্য একই সময়ের নয়। চাদের তথ্য যেমন ২০২৩ সালের।

রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ঋণ

প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি দুই বছরে তৈরি হওয়া কোনো বিপর্যয়? না, মোটেই নয়।  বরং দুই বছরে বিপর্যয়টি দৃশ্যমান হয়েছে মাত্র। ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার মতো। দুই বছরের মধ্যে তা তিন গুণের কাছাকাছি বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দুই বছরে ৪ লাখ কোটি টাকার নতুন ঋণ হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। এর বড় একটি অংশ ছিল আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত।

বহুদিন ধরে ফাটল ধরে থাকা কোনো বাড়ির দেয়ালের ওপর যদি বারবার রং করা হয়, বাইরে থেকে বাড়িটিকে বেশ ভালোই দেখায়। কিন্তু রং উঠে গেলে মনে প্রশ্ন জাগবে হঠাৎ এত ফাটল হলো কীভাবে? ঠিক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতেও সেটিই ঘটেছে।

দীর্ঘদিন ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড়, শিথিল শ্রেণীকরণ এবং নানা ধরনের হিসাবগত সুবিধার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের একটি অংশকে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর করার পর সেই ‘রং’ অনেকটাই উঠে গেছে।

আইএমএফের নথিতেও বলা হয়েছে, নতুন শ্রেণীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি অনুপাত ছিল ১২.৬ শতাংশ। ডিসেম্বরেই তা ২০.২ শতাংশে ওঠে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি বড় কারণ নতুন করে ঋণখেলাপি তৈরি হওয়া নয়; পুরোনো সমস্যাকে এবার সত্যিকার অর্থে খেলাপি হিসেবে স্বীকার করা।

রাজনৈতিক প্রভাবের ঋণ

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে গভীর সমস্যাগুলোর একটি হলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সমস্যার পেছনে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রেগুলেটরি ক্যাপচার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান-এর কথা বলেছে। গেল মার্চে দেশের খেলাপি অনুপাত ছিল ৩২.৬ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল মাত্র ৭.৯ শতাংশ।

পুনঃতফসিল বার বার

সহজ করে বললে, ব্যাংক যখন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে ঋণ দেওয়ার বদলে দেখে ‘কে চাইছে?’, তখন ব্যাংক আর ঠিকমতো ব্যাংক থাকে না। ঋণের ক্ষেত্রে তখন জামানত, ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ঋণ ফেরতের ইতিহাস- এসবের চেয়ে পরিচয় ও প্রভাব বড় হয়ে ওঠে। এভাবেই তৈরি হয় বেনামি ঋণ, সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে ঋণ, অতিমূল্যায়িত প্রকল্পে ঋণ কিংবা এমন ঋণ যার ফেরত আসার সম্ভাবনা শুরু থেকেই দুর্বল।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, বিশেষ নিরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের কাজ এগোয়।

আইএমএফ জানিয়েছে, বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে সম্পদের মান যাচাই (একিউআর) করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে প্রকৃত সম্পদের মান প্রকাশ এবং পুনঃতফসিল করা ঋণকে দ্রুত ‘ভালো ঋণ’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এতদিনের লুকানো ক্ষত একে একে প্রকাশ পাচ্ছে। এটি স্বল্পমেয়াদে ভয়ংকর দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয়। কারণ রোগ ধরা পড়েছে বলেই রোগ তৈরি হয়েছে- এমন নয়।

ইউক্রেন পারল কীভাবে

ইউক্রেন ছিল বিশ্বে খেলাপি ঋণের শীর্ষে। তবে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে সংকট থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেন পারলে, বাংলাদেশ পারছে না কেন। এখানে বাংলাদেশের জন্য ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে খেলাপি অনুপাত গত ১ জুলাই ১২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২২ সালের যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে ব্যাংক খাতকে তুলনামূলক শক্ত ভিত্তিতে রাখার আগের সংস্কারগুলোও ভূমিকা রেখেছে। পুরোনো, পুরোপুরি প্রভিশন রাখা খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন এবং নতুন ভালো মানের ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে তারা খেলাপি কমিয়েছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমস্যা ঠিক উল্টো। এখানে পুরোনো সমস্যাকে অনেক দিন ধরে টেনে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে খারাপ ঋণ তৈরি ঠেকানো, পুরোনো ঋণ উদ্ধার এবং ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করার কাজ একই গতিতে এগোয়নি। তাই শুধু ‘খেলাপি ঋণ কমাতে হবে’ বললে হবে না। প্রশ্ন হলো- কীভাবে কমবে? ৬ লাখ কোটি টাকা কি সবই আদায়যোগ্য? না। এ জায়গাটিও বোঝা জরুরি।

খেলাপি ঋণ মানেই পুরো টাকা চিরতরে হারিয়ে গেছে- এমন নয়। কোনো ঋণের বিপরীতে জামানত থাকতে পারে, কোনো ব্যবসা পুনর্গঠন করে চালু করা সম্ভব হতে পারে, কোনো ঋণ আইনি প্রক্রিয়ায় আদায় হতে পারে। কিন্তু যত বেশি সময় যায়, আদায়ের সম্ভাবনা তত কমতে পারে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে সম্পদের মূল্য কমে, মালিকানা বদলায়, মামলা দীর্ঘ হয়, সম্পদ বিক্রির মূল্য কমে যায়। অর্থাৎ আজ যে ১০০ টাকা আদায় করা সম্ভব, পাঁচ বছর পর হয়তো তার ৫০ টাকাও উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে। এই কারণেই খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্ত এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।

সমাধানের নামে ‘পুরোনো খেলা’?

বাংলাদেশ এখন ঋণ শ্রেণীকরণ কঠোর করেছে। সম্পদের মান যাচাই করছে, দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বদলেছে এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করছে। আইএমএফও ব্যাংকগুলোর পূর্ণাঙ্গ সম্পদ মূল্যায়ন, সুশাসন এবং ব্যালান্সশিটের স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে। তবে সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। যদি আবার নির্বিচারে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, কিস্তি না দিয়েও বছরের পর বছর ঋণকে ‘ভালো’ দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কাগজে খেলাপি ঋণ কমতে পারে- কিন্তু বাস্তবে কমবে না।

এটা অনেকটা থার্মোমিটার ভেঙে জ্বর কমানোর মতো। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও এই ঝুঁকি স্পষ্ট। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ও খেলাপি—দুই ধরনের ঋণগ্রহীতাকে একইভাবে ছাড় দিলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের আসল লড়াই শুধু ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমানো নয়। আসল লড়াই হলো নতুন করে যেন আর ৬ লাখ কোটি টাকা তৈরি না হয়। তার জন্য দরকার তিনটি জিনিস।

প্রথমত, ঋণ দেওয়ার সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে ব্যবসার সক্ষমতা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্পদ লুকিয়ে ফেলা, বেনামি মালিকানা কিংবা অর্থ পাচারের মাধ্যমে ঋণ উদ্ধারের পথ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা ও তদারকি ব্যবস্থাকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ দুর্বল ব্যাংককে যত টাকা দেওয়া হোক, যদি একই পদ্ধতিতে আবার ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে সেই টাকা আবারও খারাপ ঋণে পরিণত হবে।

রোগ সারবে কীভাবে

বাংলাদেশের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি অনুপাত নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কিন্তু এই সংখ্যার মধ্যে একটি সুযোগও আছে। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সমস্যা এখন দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক মানে ঋণ শ্রেণীকরণ হচ্ছে। ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটিকে আর পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এখন সিদ্ধান্তের বিষয় হলো—বাংলাদেশ কি আবার সংখ্যাটি কম দেখানোর চেষ্টা করবে, নাকি সত্যিকার অর্থে ব্যাংক খাতকে সুস্থ করবে?

রোগ সারার দাওয়া দিতে হবে

কারণ খেলাপি ঋণের হার ৩৩ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা কঠিন। কিন্তু আরও কঠিন হলো এমন একটি ব্যাংকিং সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে ঋণ পাওয়া যাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, ঋণ ফেরত দিতে হবে সময়মতো এবং ঋণ না ফেরালে পরিচয় বা প্রভাব কাউকেই রক্ষা করবে না।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নয়; সবচেয়ে বড় সংকট হলো—কেন ব্যাংকগুলো এত বিপুল টাকা এমন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়েছিল, যাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত আসার নিশ্চয়তা ছিল না। সেই প্রশ্নের উত্তর বদলাতে না পারলে আজকের ‘চ্যাম্পিয়ন’ কাল আবারও নতুন রেকর্ড গড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঋণখেলাপিতে যেভাবে বিশ্ব ‘চ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি ব্যাংক কল্পনা করুন, যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে। তবে সেই ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই নিয়মিত ফেরত আসছে না। না, এটা আর নিছক কল্পনা নয়। দেশের ব্যাংক খাতের এখন এক চরম বাস্তবতা।

খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন চলতি বছরের জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি। মার্চ শেষে এই হার ছিল ৩২.২৬ শতাংশ; তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এটি শুধু বড় একটা সংখ্যা নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের সমস্যার হিমালয়।সর্বশেষ পাওয়া আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) অনুপাতের দেশ। বাংলাদেশের পরে চাদের ৩১.৫১ শতাংশ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনির ৩০ শতাংশ এবং আলজেরিয়ার ২০.০৫ শতাংশ।  তবে বলা ভালো, আন্তর্জাতিক তুলনায় সতর্কতা জরুরি যে, সব দেশের তথ্য একই সময়ের নয়। চাদের তথ্য যেমন ২০২৩ সালের।

রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ঋণ

প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি দুই বছরে তৈরি হওয়া কোনো বিপর্যয়? না, মোটেই নয়।  বরং দুই বছরে বিপর্যয়টি দৃশ্যমান হয়েছে মাত্র। ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার মতো। দুই বছরের মধ্যে তা তিন গুণের কাছাকাছি বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দুই বছরে ৪ লাখ কোটি টাকার নতুন ঋণ হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। এর বড় একটি অংশ ছিল আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত।

বহুদিন ধরে ফাটল ধরে থাকা কোনো বাড়ির দেয়ালের ওপর যদি বারবার রং করা হয়, বাইরে থেকে বাড়িটিকে বেশ ভালোই দেখায়। কিন্তু রং উঠে গেলে মনে প্রশ্ন জাগবে হঠাৎ এত ফাটল হলো কীভাবে? ঠিক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতেও সেটিই ঘটেছে।

দীর্ঘদিন ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড়, শিথিল শ্রেণীকরণ এবং নানা ধরনের হিসাবগত সুবিধার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের একটি অংশকে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর করার পর সেই ‘রং’ অনেকটাই উঠে গেছে।

আইএমএফের নথিতেও বলা হয়েছে, নতুন শ্রেণীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি অনুপাত ছিল ১২.৬ শতাংশ। ডিসেম্বরেই তা ২০.২ শতাংশে ওঠে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি বড় কারণ নতুন করে ঋণখেলাপি তৈরি হওয়া নয়; পুরোনো সমস্যাকে এবার সত্যিকার অর্থে খেলাপি হিসেবে স্বীকার করা।

রাজনৈতিক প্রভাবের ঋণ

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে গভীর সমস্যাগুলোর একটি হলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সমস্যার পেছনে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, রেগুলেটরি ক্যাপচার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান-এর কথা বলেছে। গেল মার্চে দেশের খেলাপি অনুপাত ছিল ৩২.৬ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল মাত্র ৭.৯ শতাংশ।

পুনঃতফসিল বার বার

সহজ করে বললে, ব্যাংক যখন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে ঋণ দেওয়ার বদলে দেখে ‘কে চাইছে?’, তখন ব্যাংক আর ঠিকমতো ব্যাংক থাকে না। ঋণের ক্ষেত্রে তখন জামানত, ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ঋণ ফেরতের ইতিহাস- এসবের চেয়ে পরিচয় ও প্রভাব বড় হয়ে ওঠে। এভাবেই তৈরি হয় বেনামি ঋণ, সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে ঋণ, অতিমূল্যায়িত প্রকল্পে ঋণ কিংবা এমন ঋণ যার ফেরত আসার সম্ভাবনা শুরু থেকেই দুর্বল।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, বিশেষ নিরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের কাজ এগোয়।

আইএমএফ জানিয়েছে, বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে সম্পদের মান যাচাই (একিউআর) করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে প্রকৃত সম্পদের মান প্রকাশ এবং পুনঃতফসিল করা ঋণকে দ্রুত ‘ভালো ঋণ’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এতদিনের লুকানো ক্ষত একে একে প্রকাশ পাচ্ছে। এটি স্বল্পমেয়াদে ভয়ংকর দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয়। কারণ রোগ ধরা পড়েছে বলেই রোগ তৈরি হয়েছে- এমন নয়।

ইউক্রেন পারল কীভাবে

ইউক্রেন ছিল বিশ্বে খেলাপি ঋণের শীর্ষে। তবে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে সংকট থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেন পারলে, বাংলাদেশ পারছে না কেন। এখানে বাংলাদেশের জন্য ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে খেলাপি অনুপাত গত ১ জুলাই ১২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২২ সালের যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে ব্যাংক খাতকে তুলনামূলক শক্ত ভিত্তিতে রাখার আগের সংস্কারগুলোও ভূমিকা রেখেছে। পুরোনো, পুরোপুরি প্রভিশন রাখা খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন এবং নতুন ভালো মানের ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে তারা খেলাপি কমিয়েছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমস্যা ঠিক উল্টো। এখানে পুরোনো সমস্যাকে অনেক দিন ধরে টেনে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে খারাপ ঋণ তৈরি ঠেকানো, পুরোনো ঋণ উদ্ধার এবং ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করার কাজ একই গতিতে এগোয়নি। তাই শুধু ‘খেলাপি ঋণ কমাতে হবে’ বললে হবে না। প্রশ্ন হলো- কীভাবে কমবে? ৬ লাখ কোটি টাকা কি সবই আদায়যোগ্য? না। এ জায়গাটিও বোঝা জরুরি।

খেলাপি ঋণ মানেই পুরো টাকা চিরতরে হারিয়ে গেছে- এমন নয়। কোনো ঋণের বিপরীতে জামানত থাকতে পারে, কোনো ব্যবসা পুনর্গঠন করে চালু করা সম্ভব হতে পারে, কোনো ঋণ আইনি প্রক্রিয়ায় আদায় হতে পারে। কিন্তু যত বেশি সময় যায়, আদায়ের সম্ভাবনা তত কমতে পারে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে সম্পদের মূল্য কমে, মালিকানা বদলায়, মামলা দীর্ঘ হয়, সম্পদ বিক্রির মূল্য কমে যায়। অর্থাৎ আজ যে ১০০ টাকা আদায় করা সম্ভব, পাঁচ বছর পর হয়তো তার ৫০ টাকাও উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে। এই কারণেই খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্ত এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।

সমাধানের নামে ‘পুরোনো খেলা’?

বাংলাদেশ এখন ঋণ শ্রেণীকরণ কঠোর করেছে। সম্পদের মান যাচাই করছে, দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বদলেছে এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করছে। আইএমএফও ব্যাংকগুলোর পূর্ণাঙ্গ সম্পদ মূল্যায়ন, সুশাসন এবং ব্যালান্সশিটের স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে। তবে সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। যদি আবার নির্বিচারে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, কিস্তি না দিয়েও বছরের পর বছর ঋণকে ‘ভালো’ দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কাগজে খেলাপি ঋণ কমতে পারে- কিন্তু বাস্তবে কমবে না।

এটা অনেকটা থার্মোমিটার ভেঙে জ্বর কমানোর মতো। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও এই ঝুঁকি স্পষ্ট। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ও খেলাপি—দুই ধরনের ঋণগ্রহীতাকে একইভাবে ছাড় দিলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের আসল লড়াই শুধু ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমানো নয়। আসল লড়াই হলো নতুন করে যেন আর ৬ লাখ কোটি টাকা তৈরি না হয়। তার জন্য দরকার তিনটি জিনিস।

প্রথমত, ঋণ দেওয়ার সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে ব্যবসার সক্ষমতা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্পদ লুকিয়ে ফেলা, বেনামি মালিকানা কিংবা অর্থ পাচারের মাধ্যমে ঋণ উদ্ধারের পথ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা ও তদারকি ব্যবস্থাকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ দুর্বল ব্যাংককে যত টাকা দেওয়া হোক, যদি একই পদ্ধতিতে আবার ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে সেই টাকা আবারও খারাপ ঋণে পরিণত হবে।

রোগ সারবে কীভাবে

বাংলাদেশের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি অনুপাত নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কিন্তু এই সংখ্যার মধ্যে একটি সুযোগও আছে। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সমস্যা এখন দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক মানে ঋণ শ্রেণীকরণ হচ্ছে। ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটিকে আর পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এখন সিদ্ধান্তের বিষয় হলো—বাংলাদেশ কি আবার সংখ্যাটি কম দেখানোর চেষ্টা করবে, নাকি সত্যিকার অর্থে ব্যাংক খাতকে সুস্থ করবে?

রোগ সারার দাওয়া দিতে হবে

কারণ খেলাপি ঋণের হার ৩৩ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা কঠিন। কিন্তু আরও কঠিন হলো এমন একটি ব্যাংকিং সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে ঋণ পাওয়া যাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, ঋণ ফেরত দিতে হবে সময়মতো এবং ঋণ না ফেরালে পরিচয় বা প্রভাব কাউকেই রক্ষা করবে না।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নয়; সবচেয়ে বড় সংকট হলো—কেন ব্যাংকগুলো এত বিপুল টাকা এমন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়েছিল, যাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত আসার নিশ্চয়তা ছিল না। সেই প্রশ্নের উত্তর বদলাতে না পারলে আজকের ‘চ্যাম্পিয়ন’ কাল আবারও নতুন রেকর্ড গড়বে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত