সংবাদ

ধেয়ে আসছে হাজার বছরের ভয়ঙ্কর জলবায়ু বিপদ


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

ধেয়ে আসছে হাজার বছরের ভয়ঙ্কর জলবায়ু বিপদ
প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসছে এমন এক জলবায়ু হুমকি, যার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো পৃথিবীতে

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসছে এমন এক জলবায়ু হুমকি যার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো পৃথিবীতে। জাতিসংঘ বলছে, শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো ‘চোখের সামনে সুপারসাইজ’ হচ্ছে। সর্বশেষ মডেল পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি অন্তত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ওপর এই অতিরিক্ত তাপের ধাক্কায় ২০২৭ সাল হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এর অভিঘাত পড়বে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, খরা, বন্যা, দাবানল, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, এল নিনো ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।আগামী কয়েক মাসে আরও শক্তিশালী হবে। ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এটি টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারে।

এটি কেবল সমুদ্রের তাপমাত্রার গল্প নয়। পৃথিবী এমনিতেই মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই উত্তপ্ত পৃথিবীর ওপর এল নিনো আরও তাপের বোঝা চাপাতে পারে। ফলে ২০২৭ সাল নতুন করে বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলের বিশাল অংশের চলাচল বদলে যায়। এর প্রভাব এক অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়াতে পারে, অন্য অঞ্চলে তৈরি করতে পারে খরা। কোথাও তাপপ্রবাহ, কোথাও প্রবল বর্ষণ ও বন্যা—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব এক রকম নয়।

এ কারণেই শক্তিশালী এল নিনোকে শুধু ‘গরমের ঘটনা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এটি বিশ্বের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে এবং বন্যা, খরা ও চরম তাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৬ সময়ে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মডেলগুলো।

এল নিনোর অভিঘাত ইতোমধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। ভারতে মৌসুমি বৃষ্টির ধরন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় বাড়তে পারে দাবানলের ঝুঁকি। আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় তৈরি হতে পারে অতিবৃষ্টির পরিস্থিতি ও ভয়াবহ বন্যা।

অর্থাৎ একই সময়ে পৃথিবীর এক প্রান্তে মানুষ পানির অভাবে ভুগতে পারে, অন্য প্রান্তে অতিরিক্ত পানিতে ঘরবাড়ি ও ফসল হারাতে পারে। এই বৈপরীত্যই এল নিনোর সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি উৎপাদন চাপে রয়েছে। তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি করছে। শক্তিশালী এল নিনো সেই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আশঙ্কা, এল নিনোর অভিঘাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট বা ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চরম আবহাওয়া শুধু ফসল নষ্ট করবে না, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করে খাদ্যের দামও বাড়াতে পারে।

এর সবচেয়ে বড় বোঝা পড়বে দরিদ্র মানুষের ওপর। কারণ আয় কম এমন পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লাগে।

যুক্তরাজ্যের এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ক্রিস জ্যাকারিনি সতর্ক করেছেন, একের পর এক তাপপ্রবাহ ও ব্যাপক খরার পর ব্রিটিশ কৃষকরা ২০২৬ সালে ভয়াবহ ফসল বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কঠিন বছরগুলোতে বর্তমান সময়কেই হয়তো তুলনামূলক ভালো সময় বলে মনে হবে।

তাপপ্রবাহ প্রবল হবে

এবারের এল নিনোর সম্ভাব্য মাত্রা বোঝাতে বিশেষজ্ঞরা ব্যবহার করছেন অস্বাভাবিক শক্তিশালী কিছু উপমা। কোথাও একে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘গডজিলা-স্তরের’ ঘটনা হিসেবে। কারণ যে পৃথিবীতে এর অভিঘাত পড়তে যাচ্ছে, সেই পৃথিবী আগের পৃথিবীর মতো নেই।

শিল্পবিপ্লবের পর জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই বিপজ্জনকভাবে উষ্ণ। ফলে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উষ্ণায়নের একটি শক্তিশালী পর্যায় যখন এই অতিরিক্ত উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সম্মিলিত অভিঘাত আরও ভয়াবহ হতে পারে।

এ কারণেই এবারের এল নিনোকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং জলবায়ু সংকটের ওপর আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘এক হাজার বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী’- এই বক্তব্যটি অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে বোঝা দরকার। গত এক হাজার বছরের সরাসরি সমুদ্র-তাপমাত্রার পরিমাপ আমাদের হাতে নেই। বিজ্ঞানীরা অতীতের এল নিনোর মাত্রা বোঝার জন্য প্রবালের রাসায়নিক গঠন, গাছের বলয় এবং ঐতিহাসিক নথিসহ বিভিন্ন প্রক্সি তথ্য ব্যবহার করেন।

তাই এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণিত রেকর্ড না বলে বৈজ্ঞানিক পুনর্গঠন ও বর্তমান মডেল পূর্বাভাসের ভিত্তিতে করা একটি আশঙ্কা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যে ব্যতিক্রমী, সে বিষয়ে পূর্বাভাসে শক্তিশালী ঐকমত্য রয়েছে।  বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বার্তা

এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি ‘এত ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়বে’- এভাবে বলা যায় না। কারণ কোনো একটি দেশের আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব নির্ভর করে মৌসুম, ভারত মহাসাগরের অবস্থা, আটলান্টিকের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য জলবায়ু নিয়ামকের ওপরও। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও সতর্ক করেছে, শুধু এল নিনোর তীব্রতা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।

তবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর সম্ভাব্য পরোক্ষ অভিঘাত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো ঝুঁকিও নজরে রাখতে হবে। অর্থাৎ ঢাকার মানুষের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের উষ্ণ জলরাশির খবরটি আসলে মোটেই দূরের খবর নয়।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভয়াবহ হয়ে উঠবে

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ভাষায়, পৃথিবী এখন ‘অচেনা জলে’ ভাসছে—আর সেই পানি ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে, যখন প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র এবং মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন একে অন্যের অভিঘাতকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এবারের এল নিনো শেষ হওয়ার আগেই এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাই প্রশ্নটি শুধু ২০২৬ সালের শেষ দিকে কতটা গরম হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—আরও উষ্ণ পৃথিবীতে পরবর্তী শক্তিশালী এল নিনো এলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব?

প্রশান্ত মহাসাগরের পানি ইতোমধ্যেই অস্বাভাবিক উষ্ণ। আগামী কয়েক মাসে তা আরও উষ্ণ হওয়ার পূর্বাভাস। আর সেই উত্তাপ যদি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে ২০২৭ সাল হয়তো শুধু ক্যালেন্ডারের নতুন একটি বছর হবে না—হয়ে উঠতে পারে জলবায়ু সংকটের নতুন এক সতর্কসংকেত। 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ধেয়ে আসছে হাজার বছরের ভয়ঙ্কর জলবায়ু বিপদ

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসছে এমন এক জলবায়ু হুমকি যার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো পৃথিবীতে। জাতিসংঘ বলছে, শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো ‘চোখের সামনে সুপারসাইজ’ হচ্ছে। সর্বশেষ মডেল পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি অন্তত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ওপর এই অতিরিক্ত তাপের ধাক্কায় ২০২৭ সাল হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এর অভিঘাত পড়বে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, খরা, বন্যা, দাবানল, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, এল নিনো ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।আগামী কয়েক মাসে আরও শক্তিশালী হবে। ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এটি টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারে।

এটি কেবল সমুদ্রের তাপমাত্রার গল্প নয়। পৃথিবী এমনিতেই মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই উত্তপ্ত পৃথিবীর ওপর এল নিনো আরও তাপের বোঝা চাপাতে পারে। ফলে ২০২৭ সাল নতুন করে বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলের বিশাল অংশের চলাচল বদলে যায়। এর প্রভাব এক অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়াতে পারে, অন্য অঞ্চলে তৈরি করতে পারে খরা। কোথাও তাপপ্রবাহ, কোথাও প্রবল বর্ষণ ও বন্যা—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব এক রকম নয়।

এ কারণেই শক্তিশালী এল নিনোকে শুধু ‘গরমের ঘটনা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এটি বিশ্বের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে এবং বন্যা, খরা ও চরম তাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৬ সময়ে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মডেলগুলো।

এল নিনোর অভিঘাত ইতোমধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। ভারতে মৌসুমি বৃষ্টির ধরন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় বাড়তে পারে দাবানলের ঝুঁকি। আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় তৈরি হতে পারে অতিবৃষ্টির পরিস্থিতি ও ভয়াবহ বন্যা।

অর্থাৎ একই সময়ে পৃথিবীর এক প্রান্তে মানুষ পানির অভাবে ভুগতে পারে, অন্য প্রান্তে অতিরিক্ত পানিতে ঘরবাড়ি ও ফসল হারাতে পারে। এই বৈপরীত্যই এল নিনোর সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি উৎপাদন চাপে রয়েছে। তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি করছে। শক্তিশালী এল নিনো সেই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আশঙ্কা, এল নিনোর অভিঘাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট বা ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চরম আবহাওয়া শুধু ফসল নষ্ট করবে না, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করে খাদ্যের দামও বাড়াতে পারে।

এর সবচেয়ে বড় বোঝা পড়বে দরিদ্র মানুষের ওপর। কারণ আয় কম এমন পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লাগে।

যুক্তরাজ্যের এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ক্রিস জ্যাকারিনি সতর্ক করেছেন, একের পর এক তাপপ্রবাহ ও ব্যাপক খরার পর ব্রিটিশ কৃষকরা ২০২৬ সালে ভয়াবহ ফসল বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কঠিন বছরগুলোতে বর্তমান সময়কেই হয়তো তুলনামূলক ভালো সময় বলে মনে হবে।

তাপপ্রবাহ প্রবল হবে

এবারের এল নিনোর সম্ভাব্য মাত্রা বোঝাতে বিশেষজ্ঞরা ব্যবহার করছেন অস্বাভাবিক শক্তিশালী কিছু উপমা। কোথাও একে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘গডজিলা-স্তরের’ ঘটনা হিসেবে। কারণ যে পৃথিবীতে এর অভিঘাত পড়তে যাচ্ছে, সেই পৃথিবী আগের পৃথিবীর মতো নেই।

শিল্পবিপ্লবের পর জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই বিপজ্জনকভাবে উষ্ণ। ফলে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উষ্ণায়নের একটি শক্তিশালী পর্যায় যখন এই অতিরিক্ত উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সম্মিলিত অভিঘাত আরও ভয়াবহ হতে পারে।

এ কারণেই এবারের এল নিনোকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং জলবায়ু সংকটের ওপর আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘এক হাজার বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী’- এই বক্তব্যটি অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে বোঝা দরকার। গত এক হাজার বছরের সরাসরি সমুদ্র-তাপমাত্রার পরিমাপ আমাদের হাতে নেই। বিজ্ঞানীরা অতীতের এল নিনোর মাত্রা বোঝার জন্য প্রবালের রাসায়নিক গঠন, গাছের বলয় এবং ঐতিহাসিক নথিসহ বিভিন্ন প্রক্সি তথ্য ব্যবহার করেন।

তাই এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণিত রেকর্ড না বলে বৈজ্ঞানিক পুনর্গঠন ও বর্তমান মডেল পূর্বাভাসের ভিত্তিতে করা একটি আশঙ্কা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি যে ব্যতিক্রমী, সে বিষয়ে পূর্বাভাসে শক্তিশালী ঐকমত্য রয়েছে।  বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বার্তা

এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি ‘এত ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়বে’- এভাবে বলা যায় না। কারণ কোনো একটি দেশের আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব নির্ভর করে মৌসুম, ভারত মহাসাগরের অবস্থা, আটলান্টিকের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য জলবায়ু নিয়ামকের ওপরও। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও সতর্ক করেছে, শুধু এল নিনোর তীব্রতা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।

তবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর সম্ভাব্য পরোক্ষ অভিঘাত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো ঝুঁকিও নজরে রাখতে হবে। অর্থাৎ ঢাকার মানুষের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের উষ্ণ জলরাশির খবরটি আসলে মোটেই দূরের খবর নয়।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভয়াবহ হয়ে উঠবে

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ভাষায়, পৃথিবী এখন ‘অচেনা জলে’ ভাসছে—আর সেই পানি ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে, যখন প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র এবং মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন একে অন্যের অভিঘাতকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এবারের এল নিনো শেষ হওয়ার আগেই এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাই প্রশ্নটি শুধু ২০২৬ সালের শেষ দিকে কতটা গরম হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—আরও উষ্ণ পৃথিবীতে পরবর্তী শক্তিশালী এল নিনো এলে আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব?

প্রশান্ত মহাসাগরের পানি ইতোমধ্যেই অস্বাভাবিক উষ্ণ। আগামী কয়েক মাসে তা আরও উষ্ণ হওয়ার পূর্বাভাস। আর সেই উত্তাপ যদি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে ২০২৭ সাল হয়তো শুধু ক্যালেন্ডারের নতুন একটি বছর হবে না—হয়ে উঠতে পারে জলবায়ু সংকটের নতুন এক সতর্কসংকেত। 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত