সংবাদ

ক্ষুদ্র বীমার অপূর্ব দা


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

ক্ষুদ্র বীমার অপূর্ব দা
সহকর্মীর মৃত্যুতে শোকসভায় বক্তব্য রাখছেন অপূর্ব কান্তি ধর। তার পাশে ডেল্টা লাইফের বর্তমান সিইও উত্তম কুমার সাধু

অপূর্ব দা’র সাথে কবে থেকে পরিচয় স্মরণে নেই। তিনি দীর্ঘ সময় যাবত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। কর্মস্থল ছিল মৌলভীবাজার জেলা আর চা বাগান। পার্টির কাজে বা সভায় তিনি ঢাকা আসলে কিংবা আমি ছাত্র ইউনিয়নের কাজে মৌলভীবাজার গেলে দেখা হ’ত, কুশল বিনিময় হত। বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল না। ছাত্র জীবন শেষ করে আমি যখন রাজনৈতিক কর্মী, জেনারেল এরশাদের শাসনামলে কমিউনিস্ট পার্টি, ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার কর’ এবং ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেবো’- এই আওয়াজ তুলে সারাদেশ থেকে ঢাকামুখী পদযাত্রা করে এবং ঢাকায় বিশাল সমাবেশ আহ্বান করে। কেন্দ্রীয় যে সকল নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব পড়ে সিলেট থেকে ঢাকা মুখী পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেয়ার আমি সেই টিমের কনিষ্ঠ সদস্য ছিলাম। এই দীর্ঘ পদযাত্রায় মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ অতিক্রম করার সময় কমরেড অপূর্ব কান্তি ধরের সাথে একত্রে পথ চলতে চলতে এবং রাতে যখন কোথাও কোনো স্কুলে, ইউনিয়ন পরিষদ বা জেলা পরিষদ মিলনায়তনে গন আহার ও রাতের ঘুমের ব্যবস্থা করা হত তখন আলাপ হতে হতে ঘনিষ্ঠতা হয়।

এরশাদ শাহীর পতনের অল্প সময় পরেই আমি ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানির ক্ষুদ্র বীমা প্রকল্পে চাকুরিতে নিয়োজিত হই। প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মৌলভীবাজারের প্রাক্তন জাসদ নেতা ও প্রাক্তন সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র লড়াইয়ের একজন খেতাব প্রাপ্ত সাহসী যোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী। তিনি আমাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন আমার পরিচিতি ব্যবহার করে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক - সামাজিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রিক্রুট করার জন্য। কিন্তু আমি নিজে ভালো ভাবে না বুঝে এবং প্রকল্পের ‘ফিজিবিলিটি’ নিশ্চিত না হয়ে কাউকে ‘এপ্রোচ’ করতে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম।

১৯৯২ সনের মধ্যভাগে একদিন মাহবুবুর রব সাদী বললেন, আনোয়ার তুমি তো কিছু করলা না; আমি মৌলভীবাজারের সবচেয়ে সম্মানিত রাজনীতিবিদকে ঐ অঞ্চলের দায়িত্ব দেব। উনি কাল আসবেন, অফিসে থেকো। আমি ধারনা করি নাই যে, অপূর্ব কান্তি ধর আসবেন। আমিই চাকরিতে যোগ দিয়েছি প্রায় মধ্য বয়সে। উনি বয়সে আমার থেকে আরো ১০/১২ বছরের বড়। তাই ওনাকে দেখে অবাক হলাম। আমার সাথে খুব একটা কথা হ’ল না। দীর্ঘ সময় প্রকল্প পরিচালকের কক্ষে বসে ওনারা আলোচনা করলেন। যাওয়ার সময় আমার রুমে আসলেন। আমাকে তিনি শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘টিকবো নি?’ আমি বললাম সারা জীবন যেটা করে আসলেন সেই পার্টিই টিকাইতে পারলেন না, এটার নিশ্চয়তা কে দেবে। যা হোক উনি মৌলভীবাজার অঞ্চলের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করলেন।

মৌলভীবাজারে গ্রামীণ বীমার কার্যালয় নেয়ার পর, আমি প্রথম দাপ্তরিক সফরে যাই। সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই অপূর্ব দা অফিস ঘর ঝাড়ু দিচ্ছেন। সেই যে ঝাড়ু হাতে শুরু, তারপর ২৫ বছর এক নাগাড়ে গ্রামীণ বীমা তথা গণ-গ্রামীণ বীমা কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। গোটা মৌলভীবাজার এলাকায় ডেল্টা লাইফের ক্ষুদ্র বীমার এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলেন। বিশেষতঃ চা বাগান এলাকায় চা শ্রমিকদের মধ্য থেকেই বীমা ব্যবসা আহরণে কর্মী সংগ্রহ এবং চা শ্রমিকদেরও বীমা নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাপ্তাহিক মজুরির সিংহভাগ যে শ্রমিকেরা তাড়ি পান করে ব্যয় করে ফেলতেন তাদেরকে তিনি বীমার মাধ্যমে সঞ্চয়ে অভ্যস্ত করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। চা বাগান এলাকার অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান - মেম্বাররা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বা সমর্থক ছিলেন। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও তাকে সমীহ করতেন । ফলে তার জন্য কাজটা কিছুটা সহজ ছিলো। নিউইয়র্ক থেকে ’উইমেন্স ওয়ার্লড ব্যাংকিং’-এর প্রতিনিধিরা শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের কলোনি পরিদর্শন করে তাদের বীমা সচেতনতা এবং বীমার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে ডেল্টা লাইফের কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। ক্ষুদ্র বীমার প্রবর্তক বাংলাদেশের প্রথম একচ্যুয়ারী সাফাত আহমদ চৌধুরী যে ধাঁচের ক্ষুদ্র বীমা সংগঠন গড়তে চেয়েছিলেন তা করতে অপূর্ব কান্তি ধর অনেকটাই সফল হয়েছিলেন।

এক সময়ে তিনি রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন। তার পেশাগত দায়িত্ব আরো বিস্তৃত হয়। হবিগঞ্জ জেলার ক্ষুদ্র বীমা কার্যক্রম তত্ত্বাবধানেরও দায়িত্ব পান। রাজনীতি ছেড়ে দিলেও সবাই তাকে কমিউনিস্ট পার্টির অপূর্ব দা হিসেবেই চিনতেন, জানতেন। কমিউনিস্ট পার্টি বা রাজনৈতিক দল ছেড়ে আসা আরো অনেক জেলা নেতা ক্ষুদ্র বীমা কার্যক্রমে যুক্ত হন।এদের মধ্যে বগুড়ার মোস্তাফিজুর রহমান ফিজু, ময়মনসিংহের প্রদীপ চক্রবর্তী, রংপুরের আমজাদ হোসেন সরকার, জয়পুরহাটের আমিনুল হক বাবুল, রাজশাহীর প্রয়াত রায়হানুল হক মন্টু, বরিশালের সুভাষ মজুমদার সহ আরো অনেকে। রাজনীতি না ছেড়ে আসা একজনই ছিলেন ঢাকা অঞ্চলের দায়িত্বে রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন এবং এখনও সিপিবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। যাহোক তারা সবাই ক্ষুদ্র বীমা সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্বে অসামান্য অবদান রাখেন। চাকরি থেকে এরা সবাই অবসরে গিয়েছেন। আমার বিবেচনায় পেশাগত কাজে এঁদের মধ্যে সেরা ছিলেন অপূর্ব দা।

মৌলভীবাজারের কর্মীদের মুখে শুনেছি কোন সমস‍্যাই তাকে কাবু করতে পারতো না। কর্মীরা কোন সমস্যা নিয়ে আসলে তিনি একটা না একটা সমাধান বের করেই দিতেন। অপূর্ব দা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সারা দেশের মধ্যে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ কর্ম এলাকায় গণ-গ্রামীণ বীমার ইউনিট প্রতি গড় প্রিমিয়াম আয় এবং সংগঠক বা এজেন্ট প্রতি গড় প্রিমিয়াম আয় ছিলো সবসময়ই সর্বোচ্চ। তুলনামূলক বিচারে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষতঃ মার্কেটিং কর্মীদের ‘মোটিভেট’ করার কাজে আমি সবসময় অপূর্ব দার পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করতাম। গণ-গ্রামীণ বীমার স্মৃতিতে তিনি উজ্জ্বল হয় থাকবেন।

একটা প্রসঙ্গ উল্লেখ না করে পারছি না। অপূর্ব দা রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পরেও সবাই ওনাকে কমিউনিস্ট পার্টির দাদা হিসেবেই চিনতেন ডাকতেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার বেশ পরে তিনি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের রাজনৈতিক আড্ডায় যাতায়াত শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে যোগও দেন।যোগাযোগ না থাকায় এবং তিনিও দৈনন্দিন দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত না হওয়ায় এটা আমার জানা ছিলো না বা নজরে পড়েনি।

অপূর্ব দা শ্রীমঙ্গলে আমাকে কিছু ব্যক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কার দোকান থেকে চা পাতা কিনতে হবে, কোন্ আড়ত থেকে আনারস/লেবু নিতে হবে বা কোন্ দোকান থেকে মনিপুরী সামগ্রী ক্রয় করতে হবে এসব চিনিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীমঙ্গলে গেলে সেগুলো ঐ জায়গা থেকেই কিনতাম এবং দোকানিদের সাথে অপূর্ব দা-কে নিয়ে কথা বার্তা হতো এবং তার প্রতি তাদের সম্মানবোধ দেখে মোহিত হতাম। তার মৃত্যুর পর এসব দোকানে যখন গেলাম অপূর্ব দা-কে নিয়ে তারা অনেক স্মৃতির কথা বললেন এবং প্রায় সবাই আক্ষেপ করে বললেন দাদা শেষ বয়সে আমাদের মনটা ভেঙে দিয়ে কেনো যে আওয়ামী লীগে গেলেন! আমার মনে হলো মানব জীবন যেমন মাতৃভূমিতেই রংঙিন তেমনি কৈশোর কাল থেকে কমিউনিস্ট হিসেবে গড়ে ওঠা একজন মানুষ বার্ধক্যে এসে ভিন্ন রাজনৈতিক পাত্রে অনেকটাই বিবর্ণ।

তারপরেও যাপিত জীবনে নীতি-নৈতিকতা এবং সততা-সরলতা ও মানব প্রেমের এক অনন্য নজীর স্থাপন করে তিনি কিন্তু মাহবুবুর রব সাদী-র সেই উক্তি ‘মৌলভীবাজার জেলার সবচেয়ে সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’-র মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর তাই অপূর্ব দার শেষ যাত্রাকে এক বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ভাবগম্ভীর অথচ বর্নিল করার সব আয়োজনই করেছিলেন তার প্রাক্তন রাজনৈতিক সহকর্মী কমরেডরাই। অপূর্ব দা পরিণত বয়সেই প্রয়াত হয়েছেন। তবে শুধু দীর্ঘ জীবন নিয়ে বাঁচাতেই কিন্তু স্বার্থকতা নেই, জীবনের গভীরতা নিয়ে বাঁচতে পারাই জীবনের স্বার্থকতা। সে দিক থেকে তিনি সফল। ৩ সেপ্টেম্বর, প্রয়ানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি রইলো শ্রদ্ধার্ঘ্য। লাল সালাম অপূর্ব দা।

[লেখক: ক্ষুদ্র বীমা কর্মী]



আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ক্ষুদ্র বীমার অপূর্ব দা

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অপূর্ব দা’র সাথে কবে থেকে পরিচয় স্মরণে নেই। তিনি দীর্ঘ সময় যাবত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। কর্মস্থল ছিল মৌলভীবাজার জেলা আর চা বাগান। পার্টির কাজে বা সভায় তিনি ঢাকা আসলে কিংবা আমি ছাত্র ইউনিয়নের কাজে মৌলভীবাজার গেলে দেখা হ’ত, কুশল বিনিময় হত। বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল না। ছাত্র জীবন শেষ করে আমি যখন রাজনৈতিক কর্মী, জেনারেল এরশাদের শাসনামলে কমিউনিস্ট পার্টি, ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার কর’ এবং ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেবো’- এই আওয়াজ তুলে সারাদেশ থেকে ঢাকামুখী পদযাত্রা করে এবং ঢাকায় বিশাল সমাবেশ আহ্বান করে। কেন্দ্রীয় যে সকল নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব পড়ে সিলেট থেকে ঢাকা মুখী পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেয়ার আমি সেই টিমের কনিষ্ঠ সদস্য ছিলাম। এই দীর্ঘ পদযাত্রায় মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ অতিক্রম করার সময় কমরেড অপূর্ব কান্তি ধরের সাথে একত্রে পথ চলতে চলতে এবং রাতে যখন কোথাও কোনো স্কুলে, ইউনিয়ন পরিষদ বা জেলা পরিষদ মিলনায়তনে গন আহার ও রাতের ঘুমের ব্যবস্থা করা হত তখন আলাপ হতে হতে ঘনিষ্ঠতা হয়।

এরশাদ শাহীর পতনের অল্প সময় পরেই আমি ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানির ক্ষুদ্র বীমা প্রকল্পে চাকুরিতে নিয়োজিত হই। প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মৌলভীবাজারের প্রাক্তন জাসদ নেতা ও প্রাক্তন সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র লড়াইয়ের একজন খেতাব প্রাপ্ত সাহসী যোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী। তিনি আমাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন আমার পরিচিতি ব্যবহার করে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক - সামাজিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রিক্রুট করার জন্য। কিন্তু আমি নিজে ভালো ভাবে না বুঝে এবং প্রকল্পের ‘ফিজিবিলিটি’ নিশ্চিত না হয়ে কাউকে ‘এপ্রোচ’ করতে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম।

১৯৯২ সনের মধ্যভাগে একদিন মাহবুবুর রব সাদী বললেন, আনোয়ার তুমি তো কিছু করলা না; আমি মৌলভীবাজারের সবচেয়ে সম্মানিত রাজনীতিবিদকে ঐ অঞ্চলের দায়িত্ব দেব। উনি কাল আসবেন, অফিসে থেকো। আমি ধারনা করি নাই যে, অপূর্ব কান্তি ধর আসবেন। আমিই চাকরিতে যোগ দিয়েছি প্রায় মধ্য বয়সে। উনি বয়সে আমার থেকে আরো ১০/১২ বছরের বড়। তাই ওনাকে দেখে অবাক হলাম। আমার সাথে খুব একটা কথা হ’ল না। দীর্ঘ সময় প্রকল্প পরিচালকের কক্ষে বসে ওনারা আলোচনা করলেন। যাওয়ার সময় আমার রুমে আসলেন। আমাকে তিনি শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘টিকবো নি?’ আমি বললাম সারা জীবন যেটা করে আসলেন সেই পার্টিই টিকাইতে পারলেন না, এটার নিশ্চয়তা কে দেবে। যা হোক উনি মৌলভীবাজার অঞ্চলের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করলেন।

মৌলভীবাজারে গ্রামীণ বীমার কার্যালয় নেয়ার পর, আমি প্রথম দাপ্তরিক সফরে যাই। সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই অপূর্ব দা অফিস ঘর ঝাড়ু দিচ্ছেন। সেই যে ঝাড়ু হাতে শুরু, তারপর ২৫ বছর এক নাগাড়ে গ্রামীণ বীমা তথা গণ-গ্রামীণ বীমা কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। গোটা মৌলভীবাজার এলাকায় ডেল্টা লাইফের ক্ষুদ্র বীমার এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলেন। বিশেষতঃ চা বাগান এলাকায় চা শ্রমিকদের মধ্য থেকেই বীমা ব্যবসা আহরণে কর্মী সংগ্রহ এবং চা শ্রমিকদেরও বীমা নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাপ্তাহিক মজুরির সিংহভাগ যে শ্রমিকেরা তাড়ি পান করে ব্যয় করে ফেলতেন তাদেরকে তিনি বীমার মাধ্যমে সঞ্চয়ে অভ্যস্ত করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। চা বাগান এলাকার অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান - মেম্বাররা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বা সমর্থক ছিলেন। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও তাকে সমীহ করতেন । ফলে তার জন্য কাজটা কিছুটা সহজ ছিলো। নিউইয়র্ক থেকে ’উইমেন্স ওয়ার্লড ব্যাংকিং’-এর প্রতিনিধিরা শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের কলোনি পরিদর্শন করে তাদের বীমা সচেতনতা এবং বীমার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে ডেল্টা লাইফের কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। ক্ষুদ্র বীমার প্রবর্তক বাংলাদেশের প্রথম একচ্যুয়ারী সাফাত আহমদ চৌধুরী যে ধাঁচের ক্ষুদ্র বীমা সংগঠন গড়তে চেয়েছিলেন তা করতে অপূর্ব কান্তি ধর অনেকটাই সফল হয়েছিলেন।

এক সময়ে তিনি রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন। তার পেশাগত দায়িত্ব আরো বিস্তৃত হয়। হবিগঞ্জ জেলার ক্ষুদ্র বীমা কার্যক্রম তত্ত্বাবধানেরও দায়িত্ব পান। রাজনীতি ছেড়ে দিলেও সবাই তাকে কমিউনিস্ট পার্টির অপূর্ব দা হিসেবেই চিনতেন, জানতেন। কমিউনিস্ট পার্টি বা রাজনৈতিক দল ছেড়ে আসা আরো অনেক জেলা নেতা ক্ষুদ্র বীমা কার্যক্রমে যুক্ত হন।এদের মধ্যে বগুড়ার মোস্তাফিজুর রহমান ফিজু, ময়মনসিংহের প্রদীপ চক্রবর্তী, রংপুরের আমজাদ হোসেন সরকার, জয়পুরহাটের আমিনুল হক বাবুল, রাজশাহীর প্রয়াত রায়হানুল হক মন্টু, বরিশালের সুভাষ মজুমদার সহ আরো অনেকে। রাজনীতি না ছেড়ে আসা একজনই ছিলেন ঢাকা অঞ্চলের দায়িত্বে রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন এবং এখনও সিপিবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। যাহোক তারা সবাই ক্ষুদ্র বীমা সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্বে অসামান্য অবদান রাখেন। চাকরি থেকে এরা সবাই অবসরে গিয়েছেন। আমার বিবেচনায় পেশাগত কাজে এঁদের মধ্যে সেরা ছিলেন অপূর্ব দা।

মৌলভীবাজারের কর্মীদের মুখে শুনেছি কোন সমস‍্যাই তাকে কাবু করতে পারতো না। কর্মীরা কোন সমস্যা নিয়ে আসলে তিনি একটা না একটা সমাধান বের করেই দিতেন। অপূর্ব দা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সারা দেশের মধ্যে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ কর্ম এলাকায় গণ-গ্রামীণ বীমার ইউনিট প্রতি গড় প্রিমিয়াম আয় এবং সংগঠক বা এজেন্ট প্রতি গড় প্রিমিয়াম আয় ছিলো সবসময়ই সর্বোচ্চ। তুলনামূলক বিচারে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষতঃ মার্কেটিং কর্মীদের ‘মোটিভেট’ করার কাজে আমি সবসময় অপূর্ব দার পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করতাম। গণ-গ্রামীণ বীমার স্মৃতিতে তিনি উজ্জ্বল হয় থাকবেন।

একটা প্রসঙ্গ উল্লেখ না করে পারছি না। অপূর্ব দা রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পরেও সবাই ওনাকে কমিউনিস্ট পার্টির দাদা হিসেবেই চিনতেন ডাকতেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার বেশ পরে তিনি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের রাজনৈতিক আড্ডায় যাতায়াত শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে যোগও দেন।যোগাযোগ না থাকায় এবং তিনিও দৈনন্দিন দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত না হওয়ায় এটা আমার জানা ছিলো না বা নজরে পড়েনি।

অপূর্ব দা শ্রীমঙ্গলে আমাকে কিছু ব্যক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কার দোকান থেকে চা পাতা কিনতে হবে, কোন্ আড়ত থেকে আনারস/লেবু নিতে হবে বা কোন্ দোকান থেকে মনিপুরী সামগ্রী ক্রয় করতে হবে এসব চিনিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীমঙ্গলে গেলে সেগুলো ঐ জায়গা থেকেই কিনতাম এবং দোকানিদের সাথে অপূর্ব দা-কে নিয়ে কথা বার্তা হতো এবং তার প্রতি তাদের সম্মানবোধ দেখে মোহিত হতাম। তার মৃত্যুর পর এসব দোকানে যখন গেলাম অপূর্ব দা-কে নিয়ে তারা অনেক স্মৃতির কথা বললেন এবং প্রায় সবাই আক্ষেপ করে বললেন দাদা শেষ বয়সে আমাদের মনটা ভেঙে দিয়ে কেনো যে আওয়ামী লীগে গেলেন! আমার মনে হলো মানব জীবন যেমন মাতৃভূমিতেই রংঙিন তেমনি কৈশোর কাল থেকে কমিউনিস্ট হিসেবে গড়ে ওঠা একজন মানুষ বার্ধক্যে এসে ভিন্ন রাজনৈতিক পাত্রে অনেকটাই বিবর্ণ।

তারপরেও যাপিত জীবনে নীতি-নৈতিকতা এবং সততা-সরলতা ও মানব প্রেমের এক অনন্য নজীর স্থাপন করে তিনি কিন্তু মাহবুবুর রব সাদী-র সেই উক্তি ‘মৌলভীবাজার জেলার সবচেয়ে সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’-র মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর তাই অপূর্ব দার শেষ যাত্রাকে এক বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ভাবগম্ভীর অথচ বর্নিল করার সব আয়োজনই করেছিলেন তার প্রাক্তন রাজনৈতিক সহকর্মী কমরেডরাই। অপূর্ব দা পরিণত বয়সেই প্রয়াত হয়েছেন। তবে শুধু দীর্ঘ জীবন নিয়ে বাঁচাতেই কিন্তু স্বার্থকতা নেই, জীবনের গভীরতা নিয়ে বাঁচতে পারাই জীবনের স্বার্থকতা। সে দিক থেকে তিনি সফল। ৩ সেপ্টেম্বর, প্রয়ানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি রইলো শ্রদ্ধার্ঘ্য। লাল সালাম অপূর্ব দা।

[লেখক: ক্ষুদ্র বীমা কর্মী]




সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত