জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ কামিল মাদ্রাসার সবুজ চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে একটি জীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবন। ওপরের পলেস্তারা খসা আর লোনা ধরা দেয়াল দেখে বোঝার উপায় নেই, এই ভবনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত ইতিহাস। একাত্তরে এটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী আলবদর ও আলব শামস বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর বা টর্চার সেল। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর ইতিহাসের সেই নীরব সাক্ষীটি এখন নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয় প্রবীণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেওয়ানগঞ্জের সারমারা এলাকার মোনায়েম হোসেনের নেতৃত্বে আলবদর ও আলব শামস বাহিনী এই মাদ্রাসা ভবনটি দখল করে ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। মোনায়েমের সহযোগী হিসেবে ছিলেন মোফাজ্জল ও মহিজসহ স্থানীয় কয়েকজন জামায়াত নেতা। ভবনের একটি কক্ষে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ নির্যাতন সেল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ধরে এনে অমানবিক নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। এমনকি আটক নারীদের ওপর চলত পাশবিক নির্যাতন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার মাহবুবুর রশীদ সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এই ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনারা নিয়মিত যাতায়াত করত। এখান থেকেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের শনাক্ত করে ধরে আনা হতো। রাতের বেলা এখানে আসর বসত। বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা বাঙালি নারীদের উর্দু গানের তালে নাচতে বাধ্য করা হতো, এরপর চলত নির্যাতন। পরে তাদের বাহাদুরাবাদ ঘাট বা ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো।’
দেশ স্বাধীনের পর অভিযুক্ত রাজাকার মোনায়েম সৌদি আরব পালিয়ে যান। পরে একবার দেশে ফিরলেও জনরোষের মুখে পুনরায় দেশত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থীই এই ভবনের ইতিহাস জানে না। মাদ্রাসার দাখিল শাখার শিক্ষার্থী মুজাক্কির রহমান রাহাত ও সাবেক শিক্ষার্থী মো. রকিিবুল হাসান জানান, তাঁরা ভবনটিকে সব সময় পরিত্যক্ত গ্যারেজ হিসেবেই দেখে এসেছেন। সাইকেল ও মোটরসাইকেল রাখার জায়গা হিসেবেই এটি ব্যবহৃত হয়। এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের এমন করুণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তা তাঁদের অজানাই ছিল।
মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা জানান, ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে তারা অবগত থাকলেও কোনো স্মৃতিফলক বা সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় ইতিহাসটি বিস্মৃত হতে বসেছে। সম্প্রতি ভবনটি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন, এটি ভেঙে না ফেলে সংরক্ষণ করা হোক। সামনের একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, এই শান্ত শিক্ষাঙ্গনটিই একসময় ছিল একাত্তরের বর্বরতার সাক্ষী।
আপনার মতামত লিখুন