চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের মুখেই বিশাল আকৃতির ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য যেন পর্যটকদের স্বাগত জানায়। মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম পরিচিত এই স্থাপনাটি প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীকে টেনে আনে। তবে জনপ্রিয় এই পর্যটনস্থলে ছবি তুলতে গিয়ে এখন অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
সাতগাঁও চা-বাগানসংলগ্ন ঢাকা–মৌলভীবাজার আঞ্চলিক সড়কের একেবারে পাশে স্থাপিত ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের পাশেই রয়েছে ‘আই লাভ শ্রীমঙ্গল’ স্থাপনা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে পর্যটকদের ভিড় থাকে। কিন্তু নিরাপদে ছবি তোলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভিউ পয়েন্ট বা প্ল্যাটফর্ম নেই। নেই পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা তদারকি।
ফলে পুরো ভাস্কর্যটি ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে গিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কের ওপর দাঁড়ান। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সচেতন নাগরিকেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাস্কর্যসংলগ্ন সড়কটি বাঁকানো ও ঢালু হওয়ায় যানবাহন মোড় ঘোরার সময় বাম পাশ ঘেঁষে দ্রুতগতিতে চলাচল করে। অন্যদিকে ভাস্কর্যটির উচ্চতা বেশি হওয়ায় ছবি তুলতে পর্যটকদের অনেকটা দূরে সরে দাঁড়াতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কিশোরগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক রনি ধর বলেন, “চা কন্যা ভাস্কর্যটি রাস্তার একেবারে পাশে। এটি অনেক উঁচু হওয়ায় পুরো ভাস্কর্যটি ফ্রেমে আনতে দূরে দাঁড়াতে হয়। তখন অনেকেই সড়কের ওপর চলে যান, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ও সাংবাদিক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি বাঁকের মধ্যে অবস্থিত। সড়কটি ঢালু হওয়ায় যানবাহন মোড় ঘোরার সময় বাম দিকে চেপে আসে। ফলে এখানে সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীরাও জানান, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক সেখানে ভিড় করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি। ফলে আনন্দময় ভ্রমণ অনেক সময় আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে।
গত ২৮ জুন বিকেলে সাতগাঁও ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের সামনে হবিগঞ্জ–মৌলভীবাজার সড়কে একটি মোটরসাইকেল ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের সৌরভ (১৭) ও নাঈম (১৭) নিহত হন। তারা মোটরসাইকেলে করে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে এসেছিলেন। ওই ঘটনার পর থেকে এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও দেশ-বিদেশের পর্যটক যাতায়াত করেন। অনেকেই গাড়ি থামিয়ে চা কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ছবি, ভিডিও ও বিভিন্ন রিল তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এভাবেই স্থানটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “‘চা কন্যা’ এলাকা আরও দৃষ্টিনন্দন করতে এবং পর্যটকদের সুবিধার্থে ওয়াশ ব্লকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগ, মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। শিগগিরই এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করব। মিরপুর থেকে শেরপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণের কাজের সময় বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের সুযোগ রয়েছে।”
শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাংবাদিক এএফএম আব্দুল হাই ডন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “চা কন্যা ভাস্কর্যসংলগ্ন সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৌশলগতভাবে বাঁকটি আরও নিরাপদ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য পৃথক ভিউ পয়েন্ট, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, স্পিড ব্রেকার বা রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি কেদারপুর টি কোম্পানির আওতাধীন সাতগাঁও চা-বাগান এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবির। তার স্বামী দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য আহমদুল কবির।
পর্যটকদের দাবি, ভাস্কর্যের বিপরীত পাশে নিরাপদ ভিউ পয়েন্ট নির্মাণ, সড়কের দুই পাশে স্পিড ব্রেকার বা রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকটি প্রকৌশলগতভাবে সংস্কার করা হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে।
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যকে আরও নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের মুখেই বিশাল আকৃতির ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য যেন পর্যটকদের স্বাগত জানায়। মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম পরিচিত এই স্থাপনাটি প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীকে টেনে আনে। তবে জনপ্রিয় এই পর্যটনস্থলে ছবি তুলতে গিয়ে এখন অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
সাতগাঁও চা-বাগানসংলগ্ন ঢাকা–মৌলভীবাজার আঞ্চলিক সড়কের একেবারে পাশে স্থাপিত ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের পাশেই রয়েছে ‘আই লাভ শ্রীমঙ্গল’ স্থাপনা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে পর্যটকদের ভিড় থাকে। কিন্তু নিরাপদে ছবি তোলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভিউ পয়েন্ট বা প্ল্যাটফর্ম নেই। নেই পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা তদারকি।
ফলে পুরো ভাস্কর্যটি ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে গিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কের ওপর দাঁড়ান। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সচেতন নাগরিকেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাস্কর্যসংলগ্ন সড়কটি বাঁকানো ও ঢালু হওয়ায় যানবাহন মোড় ঘোরার সময় বাম পাশ ঘেঁষে দ্রুতগতিতে চলাচল করে। অন্যদিকে ভাস্কর্যটির উচ্চতা বেশি হওয়ায় ছবি তুলতে পর্যটকদের অনেকটা দূরে সরে দাঁড়াতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কিশোরগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক রনি ধর বলেন, “চা কন্যা ভাস্কর্যটি রাস্তার একেবারে পাশে। এটি অনেক উঁচু হওয়ায় পুরো ভাস্কর্যটি ফ্রেমে আনতে দূরে দাঁড়াতে হয়। তখন অনেকেই সড়কের ওপর চলে যান, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ও সাংবাদিক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি বাঁকের মধ্যে অবস্থিত। সড়কটি ঢালু হওয়ায় যানবাহন মোড় ঘোরার সময় বাম দিকে চেপে আসে। ফলে এখানে সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীরাও জানান, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক সেখানে ভিড় করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি। ফলে আনন্দময় ভ্রমণ অনেক সময় আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে।
গত ২৮ জুন বিকেলে সাতগাঁও ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের সামনে হবিগঞ্জ–মৌলভীবাজার সড়কে একটি মোটরসাইকেল ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের সৌরভ (১৭) ও নাঈম (১৭) নিহত হন। তারা মোটরসাইকেলে করে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে এসেছিলেন। ওই ঘটনার পর থেকে এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও দেশ-বিদেশের পর্যটক যাতায়াত করেন। অনেকেই গাড়ি থামিয়ে চা কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ছবি, ভিডিও ও বিভিন্ন রিল তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এভাবেই স্থানটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “‘চা কন্যা’ এলাকা আরও দৃষ্টিনন্দন করতে এবং পর্যটকদের সুবিধার্থে ওয়াশ ব্লকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগ, মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। শিগগিরই এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করব। মিরপুর থেকে শেরপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণের কাজের সময় বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের সুযোগ রয়েছে।”
শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাংবাদিক এএফএম আব্দুল হাই ডন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “চা কন্যা ভাস্কর্যসংলগ্ন সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৌশলগতভাবে বাঁকটি আরও নিরাপদ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য পৃথক ভিউ পয়েন্ট, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, স্পিড ব্রেকার বা রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি কেদারপুর টি কোম্পানির আওতাধীন সাতগাঁও চা-বাগান এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবির। তার স্বামী দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাবেক সংসদ সদস্য আহমদুল কবির।
পর্যটকদের দাবি, ভাস্কর্যের বিপরীত পাশে নিরাপদ ভিউ পয়েন্ট নির্মাণ, সড়কের দুই পাশে স্পিড ব্রেকার বা রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকটি প্রকৌশলগতভাবে সংস্কার করা হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে।
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যকে আরও নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।

আপনার মতামত লিখুন