চলতি মৌসুমে থেমে থেমে বর্ষণ ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে পুঁজি করে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে মুছে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে উল্টো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি মশা।
এর ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে ডেঙ্গু সংক্রমিত হলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, “দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডিইএন-২ (৭০.২ শতাংশ)। যা এর আগের বছরগুলোর তুলনায় ভিন্ন। এই সেরোটাইপ পরিবর্তনই আংশিকভাবে ২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমণ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আক্রান্তদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ ভেবে অনেকে ভুল করেন। অথচ জ্বর কমার এই সময়টিতেই শুরু হয় বিপজ্জনক ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। তখন শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।
তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিগত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় বর্তমানে ভয়াবহ সময় পার করছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। প্রাণহানি ছিল ১৭৯ জনের। তবে কয়েক বছর পর ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। যা ঢাকা মহানগরের রোগীকে (১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন) ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ডেঙ্গু এখন শুধু শহরের রোগ নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বুধবার (৫ আগস্ট) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১২৮১ জন চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারেও মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশার উপদ্রব রয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভারতের কলকাতা শহর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ সাল থেকে এডিস মশা নিধন ও বিস্তার রোধে আটঘাট বেঁধে নামে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। চলতি বছর কলকাতায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ২৬০ জন। মৃত্যু হয়েছে ১ জনের।
কলকাতার কর্তারা বলেন, ফগার দিয়ে মশা তাড়ালে এক পাড়ার মশা আরেক পাড়ায় যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমরা তাই উৎপত্তিস্থলে মশা নির্মূলের লক্ষ্য ঠিক করি।'
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, কার পার্কিং বা বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা এসির ট্রের পানি তিন দিনের বেশি জমতে দেওয়া যাবে না।কেবল মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
চলতি মৌসুমে থেমে থেমে বর্ষণ ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে পুঁজি করে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে মুছে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে উল্টো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি মশা।
এর ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে ডেঙ্গু সংক্রমিত হলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, “দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডিইএন-২ (৭০.২ শতাংশ)। যা এর আগের বছরগুলোর তুলনায় ভিন্ন। এই সেরোটাইপ পরিবর্তনই আংশিকভাবে ২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমণ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আক্রান্তদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ ভেবে অনেকে ভুল করেন। অথচ জ্বর কমার এই সময়টিতেই শুরু হয় বিপজ্জনক ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। তখন শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।
তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিগত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় বর্তমানে ভয়াবহ সময় পার করছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। প্রাণহানি ছিল ১৭৯ জনের। তবে কয়েক বছর পর ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। যা ঢাকা মহানগরের রোগীকে (১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন) ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ডেঙ্গু এখন শুধু শহরের রোগ নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বুধবার (৫ আগস্ট) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১২৮১ জন চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারেও মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশার উপদ্রব রয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভারতের কলকাতা শহর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ সাল থেকে এডিস মশা নিধন ও বিস্তার রোধে আটঘাট বেঁধে নামে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। চলতি বছর কলকাতায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ২৬০ জন। মৃত্যু হয়েছে ১ জনের।
কলকাতার কর্তারা বলেন, ফগার দিয়ে মশা তাড়ালে এক পাড়ার মশা আরেক পাড়ায় যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমরা তাই উৎপত্তিস্থলে মশা নির্মূলের লক্ষ্য ঠিক করি।'
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, কার পার্কিং বা বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা এসির ট্রের পানি তিন দিনের বেশি জমতে দেওয়া যাবে না।কেবল মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন