সংবাদ

জলবায়ু বদলেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, উৎস ধ্বংসেই সমাধান


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

জলবায়ু বদলেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, উৎস ধ্বংসেই সমাধান
ছবি: এআই

চলতি মৌসুমে থেমে থেমে বর্ষণ ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে পুঁজি করে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে মুছে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে উল্টো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি মশা।

এর ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে ডেঙ্গু সংক্রমিত হলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

অনেকের ধারণা একবার ডেঙ্গু হলে পরবর্তীতে আর হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে ডিইএন-১, ২, ৩ ও ৪। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলেও বাকি তিনটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, “দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডিইএন-২ (৭০.২ শতাংশ)। যা এর আগের বছরগুলোর তুলনায় ভিন্ন। এই সেরোটাইপ পরিবর্তনই আংশিকভাবে ২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমণ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আক্রান্তদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ ভেবে অনেকে ভুল করেন। অথচ জ্বর কমার এই সময়টিতেই শুরু হয় বিপজ্জনক ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। তখন শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।

তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয়, তখন এটিকে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে ডাকা হতো। এরপর ১৯৭৭-৭৮ সালে কিছু বিচ্ছিন্ন রোগী সনাক্ত হয়। ২০০০ সালে ডেঙ্গু বড় আকার ধারণ করে। সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

বিগত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় বর্তমানে ভয়াবহ সময় পার করছে বাংলাদেশ।  ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। প্রাণহানি ছিল ১৭৯ জনের। তবে কয়েক বছর পর ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। 

উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। যা ঢাকা মহানগরের রোগীকে (১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন) ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ডেঙ্গু এখন শুধু শহরের রোগ নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।  বুধবার (৫ আগস্ট) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১২৮১ জন চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারেও মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম জুলাই-আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে স্থানান্তরিত হয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে বৃষ্টির ধরণ পরিবর্তন ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশার উপদ্রব রয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভারতের কলকাতা শহর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ সাল থেকে এডিস মশা নিধন ও বিস্তার রোধে আটঘাট বেঁধে নামে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। চলতি বছর কলকাতায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ২৬০ জন।  মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। 

কলকাতার সাফল্যের মূল কৌশল হলো, উৎপত্তিস্থলেই মশাকে ধ্বংস করা। ফগার মেশিন দিয়ে মশা তাড়ানোর পরিবর্তে তারা মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং মাঠকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। 

কলকাতার কর্তারা বলেন, ফগার দিয়ে মশা তাড়ালে এক পাড়ার মশা আরেক পাড়ায় যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমরা তাই উৎপত্তিস্থলে মশা নির্মূলের লক্ষ্য ঠিক করি।' 

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, কার পার্কিং বা বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা এসির ট্রের পানি তিন দিনের বেশি জমতে দেওয়া যাবে না।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার বলেন, ‘বাড়ির ছাদ, বারান্দায় ফুলের টব, এসির ট্রে কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ত করে মশার উৎসে একযোগে ধ্বংস অভিযান চালাতে হবে।’

কেবল মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


জলবায়ু বদলেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, উৎস ধ্বংসেই সমাধান

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চলতি মৌসুমে থেমে থেমে বর্ষণ ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে পুঁজি করে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে মুছে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে উল্টো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি মশা।

এর ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে ডেঙ্গু সংক্রমিত হলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

অনেকের ধারণা একবার ডেঙ্গু হলে পরবর্তীতে আর হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে ডিইএন-১, ২, ৩ ও ৪। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলেও বাকি তিনটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, “দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডিইএন-২ (৭০.২ শতাংশ)। যা এর আগের বছরগুলোর তুলনায় ভিন্ন। এই সেরোটাইপ পরিবর্তনই আংশিকভাবে ২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমণ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আক্রান্তদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ ভেবে অনেকে ভুল করেন। অথচ জ্বর কমার এই সময়টিতেই শুরু হয় বিপজ্জনক ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। তখন শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়।

তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয়, তখন এটিকে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে ডাকা হতো। এরপর ১৯৭৭-৭৮ সালে কিছু বিচ্ছিন্ন রোগী সনাক্ত হয়। ২০০০ সালে ডেঙ্গু বড় আকার ধারণ করে। সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

বিগত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় বর্তমানে ভয়াবহ সময় পার করছে বাংলাদেশ।  ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। প্রাণহানি ছিল ১৭৯ জনের। তবে কয়েক বছর পর ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। 

উল্লেখযোগ্য, ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। যা ঢাকা মহানগরের রোগীকে (১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন) ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ডেঙ্গু এখন শুধু শহরের রোগ নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।  বুধবার (৫ আগস্ট) ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১২৮১ জন চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারেও মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম জুলাই-আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে স্থানান্তরিত হয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে বৃষ্টির ধরণ পরিবর্তন ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশার উপদ্রব রয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভারতের কলকাতা শহর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ সাল থেকে এডিস মশা নিধন ও বিস্তার রোধে আটঘাট বেঁধে নামে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। চলতি বছর কলকাতায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ২৬০ জন।  মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। 

কলকাতার সাফল্যের মূল কৌশল হলো, উৎপত্তিস্থলেই মশাকে ধ্বংস করা। ফগার মেশিন দিয়ে মশা তাড়ানোর পরিবর্তে তারা মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং মাঠকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। 

কলকাতার কর্তারা বলেন, ফগার দিয়ে মশা তাড়ালে এক পাড়ার মশা আরেক পাড়ায় যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমরা তাই উৎপত্তিস্থলে মশা নির্মূলের লক্ষ্য ঠিক করি।' 

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, কার পার্কিং বা বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা এসির ট্রের পানি তিন দিনের বেশি জমতে দেওয়া যাবে না।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার বলেন, ‘বাড়ির ছাদ, বারান্দায় ফুলের টব, এসির ট্রে কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ত করে মশার উৎসে একযোগে ধ্বংস অভিযান চালাতে হবে।’

কেবল মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত