চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে নগরের একের পর এক এলাকা। গত তিন মাসেই অন্তত তিন দফা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বন্দরনগরী। এতে থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থবির হয়েছে জনজীবন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের শুরুতেই গলদ থাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও মিলছে না সুফল।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও সোমবারের (১৭ আগস্ট) বৃষ্টিতে নগরের বৃহত্তম পাইকারি বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ অন্তত ২০টি এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুমণ্ডি লেনের প্রায় ৮শ দোকানে পানি ঢুকে ২০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সিডিএ, যার ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ বলে দাবি করা হয়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবুও সামান্য বৃষ্টিতে চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি ও বহদ্দারহাটের মতো এলাকাগুলো হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি রেললাইন ডুবে যাওয়ায় সোমবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন চলাচলও পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল।
রিয়াজউদ্দিন বাজারের শাড়ির দোকান ‘রূপরাজ’-এর মালিক মাহমুদুল হক জানান, তার দোকানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাপড় ছিল, যার মধ্যে ১০-১২ লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। জুতা ব্যবসায়ী জিয়াউল হাকিম বলেন, ‘দোকান খুলে দেখি জুতাগুলো পানিতে ভাসছে। প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হলো আমার।’ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নালা-নর্দমা ময়লায় ভরাট হয়ে থাকায় পানি নামার কোনো পথ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ। নগরের ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খালকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, বাকি ৩৮টি খাল রয়ে গেছে অবহেলিত। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বর্তমান প্রকল্পগুলোতে উপেক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে তিনটি নতুন মূল খাল খনন এবং পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার নির্মাণের প্রস্তাবগুলো বাদ পড়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া এবং জোয়ার-ভাটা ও পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ না করেই স্লুইসগেট নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজ করায় সুফল মিলছে না। মাস্টারপ্ল্যানকে তোয়াক্কা না করার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী।’
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ। বাকি খালগুলোতে কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। আগামী বছর থেকে নগরবাসী সুফল পাবেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে তপ্ত রোদেও জলমগ্ন থাকা চট্টগ্রামবাসীর কাছে এই আশ্বাস এখন কেবলই সান্ত্বনা।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে নগরের একের পর এক এলাকা। গত তিন মাসেই অন্তত তিন দফা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বন্দরনগরী। এতে থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থবির হয়েছে জনজীবন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের শুরুতেই গলদ থাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও মিলছে না সুফল।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও সোমবারের (১৭ আগস্ট) বৃষ্টিতে নগরের বৃহত্তম পাইকারি বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ অন্তত ২০টি এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুমণ্ডি লেনের প্রায় ৮শ দোকানে পানি ঢুকে ২০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সিডিএ, যার ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ বলে দাবি করা হয়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবুও সামান্য বৃষ্টিতে চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি ও বহদ্দারহাটের মতো এলাকাগুলো হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি রেললাইন ডুবে যাওয়ায় সোমবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন চলাচলও পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল।
রিয়াজউদ্দিন বাজারের শাড়ির দোকান ‘রূপরাজ’-এর মালিক মাহমুদুল হক জানান, তার দোকানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাপড় ছিল, যার মধ্যে ১০-১২ লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। জুতা ব্যবসায়ী জিয়াউল হাকিম বলেন, ‘দোকান খুলে দেখি জুতাগুলো পানিতে ভাসছে। প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হলো আমার।’ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নালা-নর্দমা ময়লায় ভরাট হয়ে থাকায় পানি নামার কোনো পথ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ। নগরের ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খালকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, বাকি ৩৮টি খাল রয়ে গেছে অবহেলিত। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বর্তমান প্রকল্পগুলোতে উপেক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে তিনটি নতুন মূল খাল খনন এবং পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার নির্মাণের প্রস্তাবগুলো বাদ পড়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া এবং জোয়ার-ভাটা ও পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ না করেই স্লুইসগেট নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজ করায় সুফল মিলছে না। মাস্টারপ্ল্যানকে তোয়াক্কা না করার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী।’
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ। বাকি খালগুলোতে কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। আগামী বছর থেকে নগরবাসী সুফল পাবেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে তপ্ত রোদেও জলমগ্ন থাকা চট্টগ্রামবাসীর কাছে এই আশ্বাস এখন কেবলই সান্ত্বনা।

আপনার মতামত লিখুন